সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

তাদের বিশ্বাস অনুকরণ করুন

 অধ্যায় আঠারো

তিনি “হৃদয় মধ্যে আন্দোলন” করেছিলেন

তিনি “হৃদয় মধ্যে আন্দোলন” করেছিলেন

১, ২. মরিয়মের যাত্রা সম্বন্ধে বর্ণনা করুন আর ব্যাখ্যা করুন যে, কেন এটা তার পক্ষে অস্বস্তিকর ছিল?

মরিয়ম অস্বস্তির সঙ্গে তার শরীরের ভার ছোট্ট মালবাহী পশুটার ওপর ছেড়ে দেন। তিনি অনেকটা সময় ধরে এই পশুর পিঠে চড়ে যাত্রা করছেন। ঠিক সামনেই, যোষেফ হেঁটে চলেছেন আর দূরবর্তী বৈৎলেহমের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছেন। মরিয়ম আবারও টের পান যে, তার গর্ভের শিশুটি নড়ে উঠেছে।

বিবরণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, মরিয়মের প্রসবের সময় এগিয়ে আসছে। (লূক ২:৫, ৬) এই দম্পতি যখন একটার পর একটা শস্য খেতের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন কিছু কৃষক সম্ভবত জমি চাষ করার কিংবা বীজ বোনার সময় তাদের দিকে তাকিয়েছিল এবং অবাক হয়ে ভেবেছিল, এইরকম অবস্থায় এই মহিলা কেন যাত্রা করছেন। কোন বিষয়টা মরিয়মকে তার নিজের এলাকা নাসরৎ থেকে এত দূরে যাত্রা করতে পরিচালিত করেছিল?

৩. মরিয়ম কোন কার্যভার পেয়েছিলেন আর আমরা তার সম্বন্ধে কোন বিষয়গুলো শিখব?

এই সমস্তকিছু কয়েক মাস আগে শুরু হয়েছিল, যখন এই যিহুদি যুবতী এমন এক কার্যভার পেয়েছিলেন, যা সমগ্র মানব ইতিহাসে অদ্বিতীয় ছিল। তিনি যে-সন্তান জন্ম দিতে যাচ্ছিলেন, সেই সন্তান হলেন ঈশ্বরের পুত্র, যিনি মশীহ হবেন! (লূক ১:৩৫) সন্তান প্রসবের সময় যখন এগিয়ে এসেছিল, তখনই এই যাত্রা করার প্রয়োজন হয়েছিল। এই যাত্রার সময়, মরিয়মকে বিভিন্ন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, যা তার বিশ্বাসকে পরীক্ষায় ফেলেছিল। আসুন আমরা দেখি, কী তাকে আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী থাকতে সাহায্য করেছিল।

বৈৎলেহমের উদ্দেশে যাত্রা

৪, ৫. (ক) কেন যোষেফ ও মরিয়ম বৈৎলেহমের দিকে যাত্রা করছিলেন? (খ) কৈসরের আদেশ কোন ভবিষ্যদ্‌বাণী পরিপূর্ণ করার দিকে পরিচালিত করেছিল?

কেবলমাত্র যোষেফ ও মরিয়মকেই এই যাত্রা করতে হয়নি। আগস্ত কৈসর সেই সময়ে সমগ্র দেশে নাম লেখানোর বা রেজিস্ট্রি করার আদেশ জারি করেছিলেন আর সেই আদেশ পালন করার জন্য লোকেদেরকে নিজ নিজ জন্মস্থানে যেতে হয়েছিল। যোষেফ কীভাবে সাড়া দিয়েছিলেন? বিবরণ বলে: “আর যোষেফও গালীলের নাসরৎ নগর হইতে যিহূদিয়ায় বৈৎলেহম নামক দায়ূদের নগরে গেলেন, কারণ তিনি দায়ূদের কুল ও গোষ্ঠীজাত ছিলেন।”—লূক ২:১-৪.

সেই সময়ে কৈসরের এমন আদেশ জারি করা, কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। প্রায়  সাত-শো বছর আগে লিখিত একটা ভবিষ্যদ্‌বাণীতে বলা হয়েছিল যে, মশীহ বৈৎলেহমে জন্মগ্রহণ করবেন। ঘটনা হচ্ছে, নাসরৎ থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরেও বৈৎলেহম নামে একটা নগর ছিল। কিন্তু, ভবিষ্যদ্‌বাণী নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছিল যে, মশীহ ‘বৈৎলেহম-ইফ্রাথায়’ জন্মগ্রহণ করবেন। (পড়ুন, মীখা ৫:২.) নাসরৎ থেকে শমরিয়া হয়ে সেই ছোট্ট গ্রামে পৌঁছানোর জন্য ভ্রমণকারীদের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হতো। যোষেফকে এই বৈৎলেহমেই উপস্থিত হওয়ার জন্য আদেশ দেওয়া হয়েছিল, কারণ এটা ছিল রাজা দায়ূদের গোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদের বাসস্থান আর যোষেফ ও তার স্ত্রী দু-জনেই সেই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

৬, ৭. (ক) বৈৎলেহমের দিকে যাত্রা করা কেন মরিয়মের কাছে হয়তো এক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল? (খ) যোষেফের স্ত্রী হওয়ায় মরিয়মকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন ধরনের রদবদল করতে হয়েছিল? (এ ছাড়া, পাদটীকা দেখুন।)

মরিয়ম কি যোষেফের এইরকম সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন? কারণ এই যাত্রা তার জন্য খুবই কঠিন হবে। সম্ভবত বছরের সেই সময়টা ছিল শরৎকালের প্রথমদিক, তাই শুষ্ক মরসুম ধীরে ধীরে শেষ হয়ে তখন হালকা বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এ ছাড়া, বৈৎলেহম সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭৬০ মিটারেরও বেশি উঁচুতে অবস্থিত ছিল আর কয়েক দিনের যাত্রার শেষ দিকে বেশ খাড়া ও দুর্গম পথ অতিক্রম করতে হতো। এ-বার হয়তো সাধারণ সময়ের চেয়ে আরও বেশি সময় লাগবে, কারণ মরিয়মের শারীরিক অবস্থার জন্য সম্ভবত অনেক বার বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন হবে। গর্ভাবস্থার এই শেষের দিকে, একজন যুবতী হয়তো তার ঘরেই থাকতে চাইবেন, যেখানে তার পরিবার ও বন্ধুবান্ধব রয়েছে, যারা তার প্রসববেদনা শুরু হলে তাকে সাহায্য করতে পারে। নিঃসন্দেহে, এই যাত্রা করার জন্য তার সাহসের দরকার ছিল।

বৈৎলেহমের উদ্দেশে যাত্রা সহজ ছিল না

 যা-ই হোক, লূক লিখেছিলেন যে, যোষেফ “মরিয়মের সহিত নাম লিখিয়া দিবার জন্য” গিয়েছিলেন। এ ছাড়া, তিনি মরিয়মকে “[যোষেফের] বাগ্‌দত্তা স্ত্রী” বলে উল্লেখ করেন। (লূক ২:৪, ৫) এই সময়ের মধ্যে, মরিয়ম যোষেফের স্ত্রী হয়ে যাওয়ায়, তা মরিয়মের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর অনেক প্রভাব ফেলেছিল। তিনি তার স্বামীকে পরিবারের মস্তক হিসেবে গণ্য করেছিলেন, স্বামীর সিদ্ধান্তগুলোকে সমর্থন করার মাধ্যমে তার সহকারিণী হিসেবে নিজের ঈশ্বরদত্ত ভূমিকা পালন করেছিলেন। * তাই, শুধুমাত্র বাধ্য হওয়ার মাধ্যমে তিনি তার বিশ্বাসের এই সম্ভাব্য পরীক্ষার সঙ্গে মোকাবিলা করেছিলেন।

৮. (ক) মরিয়মকে যোষেফের সঙ্গে বৈৎলেহম যাওয়ার জন্য আর কোন বিষয়টা হয়তো পরিচালিত করেছিল? (খ) কোন অর্থে মরিয়মের উদাহরণ বিশ্বস্ত লোকেদের জন্য এক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে?

আর কোন বিষয়টা হয়তো মরিয়মকে বাধ্য হতে অনুপ্রাণিত করেছিল? তিনি কি মশীহের জন্মস্থান হিসেবে বৈৎলেহমের বিষয়ে ভবিষ্যদ্‌বাণীটা জানতেন? বাইবেল এই বিষয়ে কিছু জানায় না। আমরা এই সম্ভাবনাকে বাতিলও করে দিতে পারি না, কারণ সেই বিষয়ে ধর্মীয় নেতারা আর এমনকী সাধারণ লোকেরাও স্পষ্টতই জানত। (মথি ২:১-৭; যোহন ৭:৪০-৪২) আর শাস্ত্র সম্বন্ধে মরিয়মও নিশ্চয়ই অজ্ঞ ছিলেন না। (লূক ১:৪৬-৫৫) যা-ই হোক, মরিয়ম তার স্বামী, সরকারি আদেশ অথবা স্বয়ং যিহোবার ভবিষ্যদ্‌বাণীর প্রতি বাধ্যতা—কিংবা এই সমস্তকিছুর প্রতি বাধ্যতা—যে-কারণেই সিদ্ধান্ত নিন না কেন, তিনি এক চমৎকার  উদাহরণ স্থাপন করেছেন। যিহোবা পুরুষ ও নারী উভয়ের নম্র ও বাধ্যতার মনোভাবকে উচ্চমূল্য দেন। আমাদের সময়ে, যখন বাধ্যতাকে প্রায়ই অবজ্ঞা করা হয়, তখন সব জায়গার বিশ্বস্ত লোকেদের জন্য মরিয়মের উদাহরণ এক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

খ্রিস্টের জন্ম

৯, ১০. (ক) বৈৎলেহমের কাছাকাছি আসার সময় মরিয়ম ও যোষেফ হয়তো কী চিন্তা করছিলেন? (খ) যোষেফ ও মরিয়মকে কোথায় থাকতে হয়েছিল ও কেন?

দূর থেকে বৈৎলেহমকে দেখতে পেয়ে মরিয়ম নিশ্চয়ই এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। মরিয়ম ও যোষেফ যখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠছিলেন এবং শেষ ফল সংগ্রহ বাকি রয়েছে, এমন জলপাই বাগানগুলোর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তারা হয়তো এই ছোট্ট গ্রামের ইতিহাস সম্বন্ধে চিন্তা করছিলেন। এটা যিহুদার নগরগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্র ছিল বলে এটাকে নগণ্য হিসেবে ধরা হতো, যেমনটা ভাববাদী মীখা বলেছিলেন; কিন্তু এক হাজার বছরেরও বেশি আগে এখানেই বোয়স, নয়মী এবং পরে দায়ূদের জন্ম হয়েছিল।

১০ মরিময় ও যোষেফ দেখেছিলেন যে, গ্রামটা লোকে পরিপূর্ণ। নাম রেজিস্ট্রি করার জন্য অন্যেরা তাদের আগেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল, তাই পান্থশালায় তাদের জন্য জায়গা ছিল না। * রাতে থাকার জন্য অন্য কোনো জায়গা না পেয়ে তাদেরকে একটা আস্তাবলে থাকতে হয়েছিল। আমরা যোষেফের উদ্‌বিগ্নতার বিষয় কল্পনা করতে পারি, যখন তিনি তার স্ত্রীকে ব্যথায় কষ্ট পেতে দেখেছিলেন, যে-ব্যথা সম্বন্ধে মরিয়মের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না আর ক্রমশ তা তীব্র হচ্ছিল। আর এত জায়গা থাকতে এখানেই কিনা মরিয়মের প্রসববেদনা শুরু হয়েছে!

১১. (ক) কেন সমস্ত জায়গার নারীরা মরিয়মের প্রতি সমবেদনা দেখাতে পারে? (খ) কোন কোন দিক দিয়ে যিশু “প্রথমজাত” ছিলেন?

১১ সমস্ত জায়গার নারীরা মরিয়মের প্রতি সমবেদনা দেখাতে পারে। সেই সময়ের চেয়ে প্রায় ৪,০০০ বছর আগে, যিহোবা ভবিষ্যদ্‌বাণী করেছিলেন যে, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পাপের কারণে সমস্ত নারীই সন্তান প্রসবের সময় বেদনা ভোগ করবে। (আদি. ৩:১৬) এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, মরিয়মের ক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রম ছিল। তার প্রসববেদনার কষ্ট সম্বন্ধে লূক নির্দিষ্টভাবে কোনো বর্ণনা না দিয়ে কেবল এটুকু বলেন: “তিনি আপনার প্রথমজাত পুত্ত্র প্রসব করিলেন।” (লূক ২:৭) হ্যাঁ, মরিয়ম তার অনেক সন্তানের মধ্যে, কমপক্ষে তার সাত সন্তানের মধ্যে, “প্রথমজাত” সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। (মার্ক ৬:৩) কিন্তু, এই প্রথম সন্তান অন্যদের চেয়ে আলাদা হবেন। এই সন্তান কেবলমাত্র মরিয়মেরই প্রথমজাত সন্তান ছিলেন না, কিন্তু সেইসঙ্গে স্বয়ং যিহোবারও “সমুদয় সৃষ্টির প্রথমজাত” অর্থাৎ ঈশ্বরের একজাত পুত্র ছিলেন!—কল. ১:১৫.

১২. মরিয়ম শিশুটিকে কোথায় শুইয়ে রেখেছিলেন এবং কেন তা যিশুর জন্ম বিষয়ক বিভিন্ন নাটক, ছবি এবং দৃশ্য থেকে আলাদা?

১২ এই পর্যায়ে এসে সেই বিবরণ সুপরিচিত এক বর্ণনা যুক্ত করে: ‘তিনি তাঁহাকে কাপড়ে জড়াইয়া যাবপাত্রে শোয়াইয়া রাখিলেন।’ (লূক ২:৭) পৃথিবীব্যাপী যিশুর জন্ম বিষয়ক  বিভিন্ন নাটক, ছবি এবং দৃশ্য এই পরিবেশকে অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ করে ও অবাস্তবভাবে তুলে ধরে। কিন্তু, প্রকৃত বিষয়টা বিবেচনা করুন। মরিয়ম শিশুটিকে যাবপাত্রে শুইয়ে রেখেছিলেন। মনে রাখুন, এই পরিবার আস্তাবলে ছিল আর তখন হোক বা এখন, এইরকম পরিবেশে বিশুদ্ধ বায়ু অথবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আশা করা যায় না। সত্যি বলতে কী, সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য কোন বাবা-মা এইরকম একটা স্থান বেছে নেবে, যদি তাদের কাছে অন্য কোনো বিকল্প থাকে? অধিকাংশ বাবা-মা তাদের সন্তানদের জন্য সর্বোত্তমটাই চায়। মরিয়ম এবং যোষেফ ঈশ্বরের পুত্রের জন্য আরও কত উত্তম পরিবেশই না জোগাতে চেয়েছিলেন!

১৩. (ক) মরিয়ম ও যোষেফ কোন উপায়ে তাদের কাছে যা ছিল, তা দিয়েই যথাসাধ্য করেছিলেন? (খ) আজকে বিজ্ঞ বাবা-মারা তাদের সন্তানদেরকে মানুষ করে তোলার সময় কীভাবে যোষেফ ও মরিয়মের মতো একইরকম অগ্রাধিকার স্থাপন করে থাকেন?

১৩ কিন্তু, তারা নিজেদের সীমাবদ্ধতার জন্য তিক্তবিরক্ত হয়ে যাননি; তাদের কাছে যা ছিল, তা দিয়েই তারা তাদের যথাসাধ্য করেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে লক্ষ করুন, মরিয়ম নিজেই সেই শিশুর যত্ন নিয়েছিলেন, তাঁকে আরামদায়কভাবে কাপড় দিয়ে জড়িয়ে দিয়েছিলেন, এরপর ঘুমানোর জন্য শিশুটিকে যত্নের সঙ্গে যাবপাত্রে শুইয়ে দিয়েছিলেন আর খেয়াল রেখেছিলেন যেন শিশুটি উষ্ণ ও নিরাপদ থাকে। মরিয়ম সেই পরিস্থিতির কারণে উদ্‌বিগ্ন হয়ে তার যথাসাধ্য করা থেকে বিরত হননি। তিনি এবং যোষেফ উভয়েই জানতেন যে, এই সন্তানের জন্য তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে-বিষয়টা করতে পারেন তা হল, আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোর যত্ন নেওয়া। (পড়ুন, দ্বিতীয় বিবরণ ৬:৬-৮.) আজকে, আধ্যাত্মিকভাবে অধঃপতিত এই জগতে বিজ্ঞ বাবা-মারা তাদের সন্তানদেরকে মানুষ করে তোলার সময় একইরকম অগ্রাধিকার স্থাপন করে থাকেন।

এক পরিদর্শন উৎসাহিত করে

১৪, ১৫. (ক) কেন মেষপালকরা শিশুটিকে দেখার জন্য উৎসুক ছিল? (খ) মেষপালকরা আস্তাবলে যা দেখেছিল, সেটার পর তারা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল?

১৪ হঠাৎ এক হইচই সেই শান্ত পরিবেশকে বিঘ্নিত করে। মেষপালকরা তাড়াহুড়ো করে সেই আস্তাবলে ঢুকে পড়ে, তারা সেই পরিবার এবং বিশেষ করে শিশুটিকে দেখার জন্য উৎসুক ছিল। তারা অত্যন্ত আনন্দিত ছিল, তাদের চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক দেখা যাচ্ছিল। তারা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ছুটে এসেছিল, যেখানে তারা তাদের পালের সঙ্গে ছিল। * সেই মেষপালকরা তখন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাওয়া বাবা-মাকে সবেমাত্র তাদের যে-চমৎকার অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তা জানিয়েছিল। পাহাড়ের ঢালে রাতের বেলা পাহারা দেওয়ার সময় তাদের সামনে হঠাৎ একজন স্বর্গদূত উপস্থিত হয়েছিলেন। যিহোবার প্রতাপ চারিদিকে দেদীপ্যমান হয়েছিল আর সেই স্বর্গদূত তাদেরকে বলেছিলেন যে, খ্রিস্ট বা মশীহ বৈৎলেহমে জন্ম নিয়েছেন। তারা শিশুটিকে কাপড়ে জড়ানো, যাবপাত্রে শোয়ানো অবস্থায় দেখতে পাবে। তারপর, এর চেয়েও আশ্চর্যজনক একটা ঘটনা ঘটে—স্বর্গদূতদের একটা বিরাট দল আবির্ভূত হয় ও ঈশ্বরের প্রশংসা করে!—লূক ২:৮-১৪.

 ১৫ এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, এই নম্র ব্যক্তিরা তাড়াহুড়ো করে বৈৎলেহমে এসেছিল! তারা নিশ্চয়ই স্বর্গদূতের বর্ণনা অনুযায়ী, এক নবজাত শিশুকে শোয়ানো অবস্থায় দেখে রোমাঞ্চিত হয়েছিল। তারা এই সুসংবাদ নিজেদের কাছে রেখে দেয়নি। “যে কথা তাহাদিগকে বলা হইয়াছিল, তাহা জানাইল। তাহাতে যত লোক মেষপালকগণের মুখে ঐ সব কথা শুনিল, সকলে এই সকল বিষয়ে আশ্চর্য্য জ্ঞান করিল।” (লূক ২:১৭, ১৮) সেই সময়কার ধর্মীয় নেতারা স্পষ্টতই মেষপালকদের নীচু চোখে দেখত। কিন্তু, যিহোবা স্পষ্টতই এই নম্র, বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মূল্যবান বলে গণ্য করেছিলেন। কিন্তু, এই পরিদর্শন মরিয়মকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল?

স্পষ্টতই যিহোবা নম্র, বিশ্বস্ত মেষপালকদের মূল্য দিয়েছিলেন

১৬. কীভাবে মরিয়ম দেখিয়েছিলেন যে, তিনি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন আর এটা তার বিশ্বাস সম্বন্ধে কী প্রকাশ করে?

১৬ মরিয়ম নিশ্চিতভাবেই সন্তান প্রসবের কষ্টের কারণে পরিশ্রান্ত ছিলেন কিন্তু তিনি প্রতিটা কথা মন দিয়ে শুনেছিলেন। আর তিনি এর চেয়েও বেশি কিছু করেছিলেন: “মরিয়ম সেই সকল কথা হৃদয় মধ্যে আন্দোলন করিতে করিতে মনে সঞ্চয় করিয়া রাখিলেন।” (লূক ২:১৯) সত্যিই, এই যুবতী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন। তিনি জানতেন যে, স্বর্গদূতের এই বার্তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার ঈশ্বর যিহোবা চেয়েছিলেন, যেন তিনি তার সন্তানের পরিচিতি ও গুরুত্বকে উপলব্ধি করেন। তাই, মরিয়ম শুধুমাত্র শোনার চেয়ে আরও বেশি কিছু করেছিলেন। তিনি সেই কথা তার হৃদয়ে সঞ্চয় করে রেখেছিলেন, যাতে আসন্ন মাস ও বছরগুলোতে সেই বিষয়ে বার বার চিন্তা করতে পারেন। এটাই হচ্ছে মরিয়মের বিশ্বাসের এক অসাধারণ চাবিকাঠি, যে-বিশ্বাস তিনি জীবনভর দেখিয়েছিলেন।পড়ুন,  ইব্রীয় ১১:১.

মরিয়ম মেষপালকদের কথা মন দিয়ে শুনেছিলেন আর তার হৃদয়ে সঞ্চয় করে রেখেছিলেন

১৭. যখন আধ্যাত্মিক সত্যের বিষয়গুলো আসে, তখন কীভাবে আমরা মরিয়মের উদাহরণ অনুসরণ করতে পারি?

১৭ আপনি কি মরিয়মের উদাহরণ অনুসরণ করবেন? যিহোবা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন আধ্যাত্মিক সত্য দিয়ে তাঁর বাক্যের পৃষ্ঠাগুলো পূর্ণ করেছেন। কিন্তু, আমরা যদি প্রথমে সেই সত্যের প্রতি মনোযোগ না দিই, তাহলে তা আমাদের সামান্যই উপকার করবে। বাইবেলকে শুধুমাত্র এক সাহিত্য হিসেবে নয় বরং ঈশ্বর নিশ্বসিত বা অনুপ্রাণিত এক বাক্য হিসেবে নিয়মিত অধ্যয়ন করে আমরা সত্যের প্রতি মনোযোগ দিই। (২ তীম. ৩:১৬) তাই, মরিয়মের মতো আমাদেরও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো নিজেদের হৃদয়ে সঞ্চয় করতে হবে, সেগুলোকে আন্দোলিত বা সেগুলো নিয়ে ধ্যান করতে হবে। আমরা যদি বাইবেল থেকে যা পড়ি, তা নিয়ে ধ্যান করি এবং যিহোবার পরামর্শ আরও পূর্ণরূপে কাজে লাগানোর উপায় মনোযোগের সঙ্গে বিবেচনা করি, তাহলে আমরা নিজেদের বিশ্বাস বৃদ্ধি করার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাতে পারব।

 সঞ্চয় করে রাখার মতো আরও বিষয়

১৮. (ক) কীভাবে মরিয়ম ও যোষেফ যিশুর শৈশব অবস্থায় মোশির ব্যবস্থা পালন করেছিলেন? (খ) মন্দিরে যোষেফ ও মরিয়ম যা উৎসর্গ করেছিলেন, তা তাদের আর্থিক অবস্থা সম্বন্ধে কী প্রকাশ করে?

১৮ শিশুটির বয়স আট দিন হলে, মরিয়ম ও যোষেফ মোশির ব্যবস্থানুযায়ী তাঁর ত্বক্‌ছেদ করিয়েছিলেন ও নির্দেশমতো তাঁর নাম যিশু রেখেছিলেন। (লূক ১:৩১) এরপর, ৪০তম দিনে তারা তাঁকে বৈৎলেহম থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে যিরূশালেমের মন্দিরে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং শুচিকরণ বলি হিসেবে দরিদ্র লোকেদের জন্য ব্যবস্থায় অনুমোদিত দুটো ঘুঘু অথবা দুটো পায়রা উৎসর্গ করেছিলেন। অন্য বাবা-মারা যা উৎসর্গ করতে সমর্থ ছিল, যেমন একটা মেষ ও একটা ঘুঘু, তা উৎসর্গ করতে না পারায় তাদের মধ্যে যদি কোনোরকম লজ্জা এসেও থাকে, তারা সেই অনুভূতিকে উপেক্ষা করেছিলেন। যা-ই হোক, সেখানে থাকাকালীন তারা প্রচুর উৎসাহ লাভ করেছিলেন।—লূক ২:২১-২৪.

১৯. (ক) শিমিয়োন মরিয়মকে এমন আর কোন কথা বলেছিলেন, যা তিনি হৃদয়ে সঞ্চয় করে রেখেছিলেন? (খ) যিশুকে দেখে হান্নার কেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?

১৯ শিমিয়োন নামে একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি তাদের কাছে এসেছিলেন এবং মরিয়মের হৃদয়ে সঞ্চয় করে রাখার মতো আরও কিছু বিষয় বলেছিলেন। শিমিয়োনের কাছে প্রতিজ্ঞা করা হয়েছিল যে, তিনি তার মৃত্যুর আগেই মশীহকে দেখতে পাবেন আর যিহোবার পবিত্র আত্মা তাকে ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, ছোট্ট যিশুই ছিলেন সেই ভবিষ্যদ্‌বাণীকৃত ত্রাণকর্তা। এ ছাড়া, মরিয়মকে যে একদিন কষ্ট সহ্য করতে হবে, সেই বিষয়েও শিমিয়োন তাকে আগেই জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, মরিয়ম এমন অনুভব করবেন যেন তার মধ্যে এক খড়্গ বিদ্ধ হয়েছে। (লূক ২:২৫-৩৫) পূর্বাভাস হিসেবে বলা এই কথাগুলোই হয়তো মরিয়মকে ত্রিশ বছরেরও বেশি  সময় পরে যে-কঠিন সময় এসেছিল, তা সহ্য করতে সাহায্য করেছিল। শিমিয়োনের পর, হান্না নামে একজন ভাববাদিনী ছোট্ট যিশুকে দেখেছিলেন এবং যিরূশালেমের মুক্তির আশায় ছিল এমন প্রত্যেকের কাছে তাঁর সম্বন্ধে বলতে শুরু করেছিলেন।—পড়ুন, লূক ২:৩৬-৩৮.

মরিয়ম ও যোষেফ যিরূশালেমে যিহোবার মন্দিরে অনেক উৎসাহ পেয়েছিলেন

২০. যিশুকে যিরূশালেমে নিয়ে আসা কেন এক চমৎকার সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল?

২০ যোষেফ এবং মরিয়ম তাদের সন্তানকে যিরূশালেমে যিহোবার মন্দিরে নিয়ে এসে কী চমৎকার এক সিদ্ধান্তই না নিয়েছিলেন! তাদের ছেলের জন্য এই উপলক্ষ্য ছিল, সারা জীবন ধরে যিহোবার মন্দিরে বিশ্বস্তভাবে উপস্থিত থাকার শুরু। সেখানে থাকাকালীন, তারা নিজেরদের যথাসাধ্য করেছিলেন এবং নির্দেশনামূলক ও উৎসাহজনক বাক্য লাভ করেছিলেন। নিশ্চিতভাবেই মরিয়ম সেইদিন বিশ্বাসে আরও দৃঢ় হয়ে এবং নিজের ধ্যানের জন্য ও অন্যদের কাছে বলার মতো অনেক আধ্যাত্মিক বিষয় দিয়ে পূর্ণ হৃদয় নিয়ে মন্দির ত্যাগ করেছিলেন।

২১. মরিয়মের মতো আমাদের বিশ্বাসও যাতে আগের চেয়ে আরও দৃঢ় হয়, তা আমরা কীভাবে নিশ্চিত করতে পারি?

২১ বর্তমানে, বাবা-মায়েদের সেই উদাহরণ অনুসরণ করতে দেখা এক চমৎকার বিষয়। যিহোবার সাক্ষিদের মাঝে থাকা বাবা-মারা বিশ্বস্তভাবে তাদের সন্তানদেরকে খ্রিস্টীয় সভাগুলোতে নিয়ে আসে। এই বাবা-মারা তাদের সহবিশ্বাসীদের জন্য উৎসাহজনক কথাবার্তা বলে ঈশ্বরের সেবায় তাদের যথাসাধ্য করে। আর তারা খ্রিস্টীয় সভাগুলো থেকে চলে যাওয়ার সময় আরও বেশি দৃঢ় ও সুখী হয় এবং তাদের কাছে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মতো অনেক উত্তম বিষয় থাকে। তাদের সঙ্গে মিলিত হতে পারা কতই-না বিশেষ এক সুযোগ! আমরা যদি তাদের সঙ্গে মেলামেশা করি, তাহলে আমরা দেখতে পাব যে, মরিয়মের মতো আমাদের বিশ্বাসও আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হবে।

^ অনু. 7 এই যাত্রার বর্ণনা এবং পূর্বের আরেকটা যাত্রার বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করুন: ইলীশাবেতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য “মরিয়ম উঠিয়া . . . গেলেন।” (লূক ১:৩৯) বাগ্‌দত্তা অথচ অবিবাহিত একজন নারী হিসেবে মরিয়ম সেই সময়ে হয়তো যোষেফের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করেই কাজ করেছিলেন। বিবাহের পর, এই দম্পতির একত্রে যাত্রার ব্যবস্থা মরিয়ম নয় বরং যোষেফই করেছিলেন।

^ অনু. 10 ভ্রমণকারীদের এবং অভিযাত্রীদের থাকার জন্য একটা ভাড়া করা ঘরের ব্যবস্থা করা, সেই সময়কার নগরগুলোর রীতি ছিল।

^ অনু. 14 এই মেষপালকরা যে সেই সময়ে তাদের পাল নিয়ে মাঠে ছিল, সেই বিষয়টা বাইবেলের কালনিরূপণবিদ্যা যা ইঙ্গিত করে, সেটাকে নিশ্চিত করে: খ্রিস্টের জন্ম ডিসেম্বর মাসে হয়নি, যখন কিনা পালগুলো ঘরের কাছেই ছাউনিতে থাকত বরং অক্টোবর মাসের প্রথমদিকের কোনো একসময়ে হয়েছিল।