সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

তাদের বিশ্বাস অনুকরণ করুন

 অধ্যায় একুশ

তিনি ভয় ও সন্দেহের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন

তিনি ভয় ও সন্দেহের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন

১-৩. ঘটনাবহুল একটা দিনে পিতর কী লক্ষ করেছিলেন আর সেই রাতে তার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

পিতর প্রাণপণে দাঁড় টানতে টানতে রাতের আকাশের দিকে তাকান। পূর্ব দিকে ওই হালকা আলোর আভাটা কীসের, তাহলে কি ভোর হয়ে এলো? ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে দাঁড় টানায়, তার পিঠে ও কাঁধে প্রচণ্ড যন্ত্রণা করছে। ঝোড়ো বাতাস তার চুলকে এলোমেলো করে দিচ্ছে আর গালীল সমুদ্রকে আরও উত্তাল করে তুলছে। নৌকার সামনের দিকে একটার পর একটা ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে, তার সারা শরীর ঠান্ডা জলের ছিটায় ভিজে যাচ্ছে। তিনি সমুদ্রে দাঁড় টেনেই চলেছেন।

এই সমুদ্র তীরেরই কোনো এক জায়গায় পিতর ও তার সঙ্গীরা যিশুকে একা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। সেই দিন তারা দেখেছিলেন যে, যিশু কয়েকটা রুটি ও মাছ দিয়ে হাজার হাজার ক্ষুধার্ত জনতাকে খাইয়েছিলেন। এর ফলে, সেই লোকেরা যিশুকে রাজা করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তিনি রাজনীতিতে অংশ নিতে চাননি। আর তিনি তাঁর অনুসারীদেরও শেখাতে চেয়েছিলেন, যেন তারা রাজনীতিতে অংশ না নেয়। সেই জনতাকে এড়িয়ে তিনি তাঁর শিষ্যদের দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, যেন তারা নৌকায় চড়ে অন্য তীরে চলে যায় আর তিনি প্রার্থনা করার জন্য একা পর্বতে চলে গিয়েছিলেন।—মার্ক ৬:৩৫-৪৫; পড়ুন, যোহন ৬:১৪-১৭.

শিষ্যরা যখন যাত্রা শুরু করেছিলেন, তখন পূর্ণিমা চাঁদ মাথার ওপর ছিল; এখন তা ধীরে ধীরে পশ্চিম দিগন্তে ঢলে পড়েছে। কিন্তু, তারা মাত্র কয়েক কিলোমিটারই যেতে পেরেছেন। ক্লান্ত হয়ে পড়ায় এবং ঝোড়ো বাতাস আর ঢেউয়ের গর্জনে কথাও বলা যাচ্ছে না। তাই পিতর হয়তো একাই তার চিন্তায় মগ্ন রয়েছেন।

দুই বছরে পিতর যিশুর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন, কিন্তু এখনও অনেক কিছু শেখা বাকি আছে

৪. আমাদের অনুকরণ করার জন্য কেন পিতর এক অসাধারণ উদাহরণ?

চিন্তা করার মতো কত কিছুই না রয়েছে! দুই বছরেরও বেশি আগে নাসরতীয় যিশুর সঙ্গে পিতরের প্রথম দেখা হয়েছিল আর তারপর থেকে এখন পর্যন্ত অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। তিনি তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন, কিন্তু এখনও অনেক কিছু  শেখা বাকি আছে। সন্দেহ ও ভয়ের মতো বাধাগুলোর সঙ্গে লড়াই করা জন্য তার ইচ্ছুক মনোভাব, তাকে আমাদের কাছে অনুকরণযোগ্য এক অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে। আসুন আমরা এর কারণগুলো বিবেচনা করে দেখি।

“আমরা মশীহের দেখা পাইয়াছি”!

৫, ৬. পিতরের জীবনযাত্রা কেমন ছিল?

যিশুর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের দিনটা পিতর কখনো ভুলতে পারবেন না। তার ভাই আন্দ্রিয় প্রথমে তার কাছে এই রোমাঞ্চকর সংবাদ নিয়ে এসেছিলেন: “আমরা মশীহের দেখা পাইয়াছি।” সেই কথাগুলো পিতরের জীবনকে বদলে দিতে শুরু করেছিল। তার জীবন আর আগের মতো রইল না।—যোহন ১:৪১.

পিতর কফরনাহূমে বাস করতেন, যে-নগরটা গালীল সমুদ্র বলে অভিহিত মিঠা জলের এক হ্রদের উত্তর তীরে অবস্থিত ছিল। তিনি ও আন্দ্রিয় এবং সিবদিয়ের পুত্র যাকোব ও যোহন মাছের ব্যাবসায় অংশীদার ছিলেন। পিতরের সঙ্গে শুধুমাত্র তার স্ত্রী নয়, কিন্তু সেইসঙ্গে তার শাশুড়ি ও ভাই আন্দ্রিয়ও থাকতেন। মাছ ধরে এইরকম এক পরিবারের ভরণ-পোষণ জোগানোর জন্য পিতরের কঠোর পরিশ্রমী, শক্তিশালী ও দক্ষ হওয়ার প্রয়োজন ছিল। আমরা কল্পনা করতে পারি, রাতের পর রাত তারা কঠোর পরিশ্রম করছেন, দুটো নৌকার মাঝখানে জাল ফেলছেন আর তাতে যা উঠছে, তা নৌকায় টেনে তুলছেন। এ ছাড়া, আমরা চিন্তা করতে পারি যে, মাছ বাছাই ও বিক্রি করার আর জাল মেরামত ও পরিষ্কার করার জন্য তাদেরকে দিনের বেলাতেও কঠোর পরিশ্রম করতে হতো।

৭. পিতর যিশুর বিষয়ে কী শুনেছিলেন আর খবরটা কেন রোমাঞ্চকর ছিল?

বাইবেল আমাদের জানায় যে, আন্দ্রিয় যোহন বাপ্তাইজকের শিষ্য ছিলেন। নিশ্চিতভাবেই পিতর খুব মনোযোগ দিয়ে তার ভাইয়ের কাছে যোহনের বার্তা শুনতেন। এক দিন, আন্দ্রিয় নাসরতীয় যিশুর দিকে নির্দেশ করে যোহনকে বলতে শুনেছিলেন: “ঐ দেখ, ঈশ্বরের মেষশাবক।” আন্দ্রিয় সঙ্গেসঙ্গে যিশুকে অনুসরণ করেছিলেন আর উৎসুকভাবে এই রোমাঞ্চকর খবরটা পিতরকে জানিয়েছিলেন: মশীহের আবির্ভাব হয়েছে! (যোহন ১:৩৫-৪১) প্রায় ৪,০০০ বছর আগে এদনে বিদ্রোহের পর যিহোবা ঈশ্বর প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, এক বিশেষ ব্যক্তি আসবেন, যিনি মানবজাতির জন্য প্রকৃত আশা প্রদান করবেন। (আদি. ৩:১৫) এখন আন্দ্রিয় সেই উদ্ধারকর্তা, সেই মশীহের সাক্ষাৎ পেয়েছেন! সেইসঙ্গে পিতরও যিশুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য দৌড়ে যান।

৮. যিশু পিতরকে যে-নাম দিয়েছিলেন, সেটার অর্থ কী আর কেন কেউ কেউ এখনও সেই নাম বেছে নেওয়ার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে?

সেই দিন পর্যন্ত পিতর শিমোন নামে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু, যিশু তার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন: “তুমি যোহনের পুত্ত্র শিমোন, তোমাকে কৈফা বলা যাইবে, অনুবাদ করিলে ইহার অর্থ পিতর।” (যোহন ১:৪২) “কৈফা” হল একটা বিশেষ্য পদ, যেটার অর্থ “পাথর।” এটা স্পষ্ট যে, যিশুর কথাগুলো ভবিষ্যদ্‌বাণীমূলক ছিল। তিনি আগে থেকে বুঝতে পেরেছিলেন যে, পিতর খ্রিস্টের অনুসারীদের জন্য পাথরের মতো দৃঢ়, জোরালো ও নির্ভরযোগ্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবেন। পিতর কি নিজেকে এভাবে দেখতেন? হয়তো না। এমনকী  আধুনিক দিনে যারা সুসমাচারের বইগুলো পড়ে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ পিতরের মধ্যে পাথরের মতো দৃঢ়তা দেখতে পায় না। কেউ কেউ বলে যে, বাইবেলে তার সম্বন্ধে যে-বর্ণনা পাওয়া যায়, সেই অনুসারে তিনি ছিলেন অস্থির চিত্ত, পরিবর্তনশীল আর তার মধ্যে দৃঢ়তার অভাব ছিল।

৯. যিহোবা ও তাঁর পুত্র কী খোঁজেন এবং কেন আপনার মনে হয় যে, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর আমাদের আস্থা রাখা উচিত?

পিতরের নিজের কিছু দোষত্রুটি ছিল। যিশুও তা জানতেন। কিন্তু, তাঁর পিতা যিহোবার মতো যিশুও লোকেদের মধ্যে সবসময় ভালো কিছু খুঁজতেন। যিশু পিতরের মধ্যে অনেক সম্ভাবনা লক্ষ করেছিলেন আর তার মধ্যে যে-ভালো গুণগুলো ছিল, সেগুলো গড়ে তুলতে তাকে সাহায্য করেছিলেন। আজকেও যিহোবা ও তাঁর পুত্র আমাদের মধ্যে ভালো কিছু খুঁজে থাকেন। আমাদের পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন বলে মনে হতে পারে যে, তাঁরা আমাদের মধ্যে ভালো কিছু খুঁজে পাবেন। কিন্তু, পিতরের মতো আমাদেরও তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং প্রশিক্ষণ নিতে ও নিজেদেরকে পরিবর্তন করতে ইচ্ছুক থাকতে হবে।—পড়ুন, ১ যোহন ৩:১৯, ২০.

“ভয় করিও না”

১০. পিতর হয়তো কোন ঘটনার সাক্ষি ছিলেন, কিন্তু তিনি কোথায় ফিরে গিয়েছিলেন?

১০ এর ঠিক পরেই যিশু যে-প্রচার কাজ আরম্ভ করেছিলেন, খুব সম্ভবত তাতে পিতর যোগ দিয়েছিলেন। তিনি হয়তো যিশুর প্রথম আশ্চর্য কাজ নিজের চোখে দেখেছিলেন, যখন যিশু কান্না নগরের এক বিয়েবাড়িতে জলকে দ্রাক্ষারসে পরিণত করেছিলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হল, তিনি ঈশ্বরের রাজ্য সংক্রান্ত যিশুর অসাধারণ আশার বার্তাটা শুনেছিলেন। তবুও তিনি যিশুকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ও আবারও মাছের ব্যাবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু, কয়েক মাস পরেই পিতর আবার যিশুর সামনাসামনি হয়েছিলেন আর এইবার যিশু পিতরকে পূর্ণসময়ের জন্য তাঁকে অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

১১, ১২. (ক) পিতর সারারাত কীভাবে কাটিয়েছিলেন? (খ) যিশুর কথা শুনে পিতরের মনে হয়তো কোন প্রশ্নগুলো এসেছিল?

১১ পিতর সবেমাত্র ক্লান্তিকর এক রাত কাটিয়েছেন। বার বার জেলেরা তাদের জাল ফেলছিল কিন্তু কিছুই ধরতে পারছিল না। নিশ্চয়ই পিতর তার সমস্ত অভিজ্ঞতা ও কৌশলতা কাজে লাগিয়ে হ্রদের বিভিন্ন স্থানে যেখানে মাছ থাকতে পারে, সেখানে মাছ খোঁজার চেষ্টা করছিলেন। কোনো সন্দেহ নেই, কখনো কখনো তিনিও অন্য জেলেদের মতো এমন চিন্তা করেছেন, কত ভালো হতো যদি তিনি ঘোলা জলের মধ্যে উঁকি মেরে মাছের ঝাঁক দেখতে পেতেন বা কোনোভাবে সেগুলোকে জাল দিয়ে ধরতে পারতেন। অবশ্য, এ-রকম চিন্তা তার হতাশাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। মাছ ধরা তার কাছে কোনো বিনোদনের বিষয় ছিল না, তার মাছ ধরার সঙ্গে অনেকের ভরণ-পোষণ জড়িত ছিল। শেষে, তিনি খালি হাতে তীরে ফিরে আসেন। এ-বার জাল পরিষ্কার করতে হবে। তাই যিশু যখন তার কাছে আসেন, তখন তিনি খুবই ব্যস্ত ছিলেন।

ঈশ্বরের রাজ্য —এই মূল বিষয়ের ওপর যিশু যখন প্রচার করতেন, তখন পিতর উৎসাহের সঙ্গে তা শুনতেন

১২ যিশুর চারপাশে অনেক লোক ছিল, যারা তাঁর কথা মন দিয়ে শুনছিল। প্রচুর লোক থাকায় যিশু পিতরের নৌকায় উঠে নৌকাকে তীর থেকে কিছুটা দূরে নিয়ে যেতে বলেছিলেন।  জলের ওপর থেকে যিশুর কণ্ঠস্বর স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল আর তিনি সেই জনতাকে শিক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন। তীরে থাকা লোকেদের মতোই পিতরও খুব মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনছিলেন। ঈশ্বরের রাজ্য—এই মূল বিষয়ের ওপর যিশু যখন প্রচার করতেন, তখন পিতর উৎসাহের সঙ্গে তা শুনতেন। দেশের সর্বত্র এই আশার বার্তা ছড়িয়ে দিতে খ্রিস্টকে সাহায্য করতে পারা, তার জন্য কতই-না বড়ো এক সুযোগ! কিন্তু এটা কি বাস্তবসম্মত হবে? পিতর কীভাবে তার পরিবারের ভরণ-পোষণ জোগাবেন? পিতর হয়তো আবারও সেই দীর্ঘ ক্লান্তিকর রাতের কথা মনে করছিলেন, যখন তিনি কিছুই ধরতে পারেননি।—লূক ৫:১-৩.

১৩, ১৪. যিশু পিতরের জন্য কোন আশ্চর্য কাজ করেছিলেন আর পিতর কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন?

১৩ যিশু তাঁর কথা শেষ করে পিতরকে বলেছিলেন: “তুমি গভীর জলে নৌকা লইয়া চল, আর তোমরা মাছ ধরিবার জন্য তোমাদের জাল ফেল।” পিতরের মনে সন্দেহ ছিল। তিনি বলেছিলেন: “হে নাথ, আমরা সমস্ত রাত্রি পরিশ্রম করিয়া কিছুমাত্র পাই নাই, কিন্তু আপনার কথায় আমি জাল ফেলিব।” পিতর সবেমাত্র তার জাল পরিষ্কার করেছেন। খুব সম্ভবত তিনি আর জাল ফেলতে চাইছিলেন না, বিশেষ করে এমন সময়, যখন মাছের ঝাঁক খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তবুও তিনি রাজি হয়েছিলেন ও ইশারা করে তার অংশীদারদের আরেকটা নৌকায় করে তাদের অনুসরণ করতে বলেছিলেন।—লূক ৫:৪, ৫.

১৪ জাল টেনে তোলার সময় পিতর এত ভার অনুভব করেছিলেন, যা তিনি একেবারেই আশা করেননি। আশ্চর্য হয়ে তিনি আরও জোরে জাল টেনেছিলেন আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি দেখেছিলেন যে, প্রচুর পরিমাণে মাছ জালের মধ্যে কিলবিল করছিল! উত্তেজিত হয়ে তিনি ইশারা করে অন্য নৌকার লোকেদের সাহায্য করার জন্য ডেকেছিলেন। তারা যখন এসেছিল, তখন বোঝা গিয়েছিল যে, একটা নৌকায় এত মাছ রাখা যাবে না। তারা দুটো নৌকাই ভরতি করেছিল কিন্তু মাছের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে, সেই ভারে নৌকাগুলো ডুবতে শুরু করেছিল। পিতর বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আগেও খ্রিস্টের শক্তির প্রমাণ পেয়েছিলেন, কিন্তু এই ঘটনায় তিনি নিজে জড়িত ছিলেন। যিশু ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি এমনকী মাছকেও জালে প্রবেশ করাতে পারেন! পিতর ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। তিনি হাঁটু গেঁড়ে বলেছিলেন: “আমার নিকট হইতে প্রস্থান করুন, কেননা, হে প্রভু, আমি পাপী।” তিনি কীভাবে এমন একজনের সঙ্গী হওয়ার জন্য যোগ্য বলে প্রমাণিত হতে পারেন, যাঁর ঈশ্বরের শক্তিকে এভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা ছিল?—পড়ুন, লূক ৫:৬-৯.

“হে প্রভু, আমি পাপী”

১৫. কীভাবে যিশু পিতরকে শিখিয়েছিলেন যে, তার সন্দেহ ও ভয় করার কোনো কারণ ছিল না?

১৫ যিশু সদয়ভাবে বলেছিলেন: “ভয় করিও না, এখন অবধি তুমি জীবনার্থে মানুষ ধরিবে।” (লূক ৫:১০) এটা সন্দেহ করার অথবা ভয় পাওয়ার সময় নয়। মাছ ধরার মতো  এইরকম বিষয়ে তার সন্দেহ করার কোনো কারণ ছিল না; তার নিজের দোষ ও অযোগ্যতার অনুভূতির বিষয়ে ভয়ও ছিল ভিত্তিহীন। যিশুর সামনে একটা বড়ো কার্যভার ছিল, এমন এক পরিচর্যা কাজ, যা মানবজাতির ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে। তিনি এমন একজন ঈশ্বরের উপাসক ছিলেন, যিনি “প্রচুররূপে ক্ষমা করিবেন।” (যিশা. ৫৫:৭) যিহোবা পিতরের শারীরিক ও আধ্যাত্মিক উভয় প্রয়োজনীয়তা পূরণ করবেন।—মথি ৬:৩৩.

১৬. কীভাবে পিতর, যাকোব ও যোহন যিশুর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছিলেন আর কেন এটা ছিল তাদের নেওয়া সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত?

১৬ পিতর এবং সেইসঙ্গে যাকোব ও যোহন সঙ্গেসঙ্গে যিশুর কথামতো কাজ করেছিলেন। “তাঁহারা নৌকা কূলে আনিয়া সকলই পরিত্যাগ করিয়া তাঁহার পশ্চাদ্গামী হইলেন।” (লূক ৫:১১) যিশু ও তাঁর প্রেরণকর্তার প্রতি পিতর বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। এটা ছিল তার নেওয়া সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। যে-খ্রিস্টানরা আজকে ঈশ্বরের সেবার জন্য তাদের  সন্দেহ ও ভয় কাটিয়ে উঠেছে, তারাও একইরকম বিশ্বাস দেখাচ্ছে। যারা তাঁর ওপর আস্থা রাখে, যিহোবা সবসময় তাদের যত্ন নেন।—গীত. ২২:৪, ৫.

“কেন সন্দেহ করিলে?”

১৭. যিশুর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হওয়ার পর, প্রায় দুই বছর ধরে পিতর কোন কোন অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন?

১৭ যিশুর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হওয়ার প্রায় দুই বছর পর, সেই ঝোড়ো রাতে গালীল সমুদ্রে পিতর দাঁড় টেনে চলেছেন, যেমনটা এই অধ্যায়ের শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য আমরা জানতে পারি না যে, তিনি কী চিন্তা করছিলেন। চিন্তা করার মতো অনেক কিছুই ছিল। যিশু পিতরের শাশুড়িকে সুস্থ করেছিলেন। তিনি পর্বতেদত্ত উপদেশ দিয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষা ও ক্ষমতাপূর্ণ কাজের দ্বারা তিনি বার বার দেখিয়েছিলেন যে, তিনি হলেন যিহোবার মনোনীত ব্যক্তি, সেই মশীহ। সময় গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, পিতর তার ভয় ও সন্দেহ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছিলেন। যিশু তাকে ১২ জন প্রেরিতদের মধ্যে একজন হিসেবে মনোনীতও করেছিলেন। তবুও, পিতর পুরোপুরিভাবে ভয় ও সন্দেহ কাটিয়ে উঠতে পারেননি, যা তিনি শীঘ্র বুঝতে পেরেছিলেন।

১৮, ১৯. (ক) পিতর গালীল সমুদ্রে যে-অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, তা বর্ণনা করুন। (খ) যিশু কীভাবে পিতরের অনুরোধ রেখেছিলেন?

১৮ রাতের চতুর্থ প্রহরে অর্থাৎ ভোর তিনটে থেকে সূর্যোদয়ের মধ্যে কোনো এক সময়ে, পিতর হঠাৎ করে দাঁড় টানা থামিয়ে সোজা হয়ে বসেন। দূরে ঢেউয়ের ওপর কিছু একটা যেন নড়ছে! ওটা কি ঢেউয়ের ওপর পড়া চাঁদের আলো? না, ওটা ছিল একেবারে স্থির ও খাড়া কিছু। ওটা একটা মানুষ! হ্যাঁ, একটা মানুষ সমুদ্রের ওপর দিয়ে হেঁটে আসছেন! মানুষটি যখন কাছাকাছি এসে পৌঁছান, তখন মনে হল যেন তিনি তাদেরকে ছাড়িয়ে চলে যাবেন। ভয় পেয়ে, শিষ্যরা মনে করে, ওটা হয়তো কোনো অপচ্ছায়া। সেই মানুষটি বলে ওঠেন: “সাহস কর, এ আমি, ভয় করিও না।” ইনি হলেন যিশু!—মথি ১৪:২৫-২৭.

১৯ পিতর উত্তরে বলেন: “হে প্রভু, যদি আপনি হন, তবে আমাকে জলের উপর দিয়া আপনার নিকটে যাইতে আজ্ঞা করুন।” (মথি ১৪:২৮) তিনি প্রথমেই বেশ সাহসী প্রতিক্রিয়া দেখান। এই অলৌকিক কাজ দেখে রোমঞ্চিত হয়ে পিতর তার নিজের বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করেন। তিনি তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে চান। দয়া দেখিয়ে যিশু তাকে ইশারা করে ডাকলেন। পিতর নৌকার ধার ধরে অস্থির সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপর পা রাখলেন। সেইসময় পিতরের অনুভূতি কল্পনা করুন, যখন তিনি তার পায়ের নীচে শক্ত তল অনুভব করে জলের ওপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। যিশুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় তিনি একেবারে আশ্চর্য হয়ে যান। কিন্তু তখন, পিতরের মধ্যে আর এক প্রকারের প্রতিক্রিয়া কাজ করতে শুরু করে।—পড়ুন, মথি ১৪:২৯.

“বাতাস দেখিয়া তিনি ভয় পাইলেন”

২০. (ক) কীভাবে পিতর বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন আর সেটার ফল কী হয়েছিল? (খ) যিশু পিতরকে কোন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছিলেন?

২০ পিতরের উচিত ছিল যিশুর ওপর তার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখা। আসলে যিশুই, যিহোবার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পিতরকে উত্তাল সমুদ্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু, পিতর বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন। আমরা পড়ি: “বাতাস দেখিয়া তিনি ভয়  পাইলেন।” নৌকার ওপর আছড়ে পড়া ঢেউ, উত্তাল তরঙ্গ ও জলের ফেনার দিকে পিতরের দৃষ্টি চলে যায় আর তিনি ভয় পেয়ে যান। তিনি হয়তো চিন্তা করতে থাকেন যে, তিনি জলের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছেন। ভয় বাড়তে থাকায় তার বিশ্বাসও হ্রাস পেতে থাকে। যে-ব্যক্তিকে তার সম্ভাব্য দৃঢ়তার জন্য পাথর বলে অভিহিত করা হয়েছিল, তিনিই একটা ভারি পাথরের মতো জলে তলিয়ে যেতে শুরু করেন। একজন দক্ষ সাঁতারু হওয়া সত্ত্বেও, সেইসময় পিতর তার দক্ষতাকে কাজে লাগাননি। তিনি চিৎকার করে বলে ওঠেন: “হে প্রভু, আমায় রক্ষা করুন।” যিশু তার হাত ধরে ফেলেন ও তাকে টেনে তোলেন। এরপর, জলের ওপর থাকার সময়ই তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে পিতরকে বলেন: “হে অল্পবিশ্বাসি, কেন সন্দেহ করিলে?”—মথি ১৪:৩০, ৩১.

২১. সন্দেহ করা কেন বিপদজনক আর কীভাবে আমরা এটার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারি?

২১ “সন্দেহ করিলে”—কত উপযুক্ত এক কথা! সন্দেহ করা এক জোরালো, ধ্বংসাত্মক শক্তি হতে পারে। আমরা যদি এর কাছে নতিস্বীকার করি, তবে তা আমাদের বিশ্বাসকে নষ্ট করে ফেলতে পারে ও আধ্যাত্মিকভাবে আমরা তলিয়ে যেতে পারি। সমস্ত শক্তি দিয়ে আমাদেরকে এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। কীভাবে? সঠিক বিষয়ের ওপর আমাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার দ্বারা। আমরা যদি এমন বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করতেই থাকি, যেগুলো আমাদের ভয় পাইয়ে দেয়, আমাদের হতাশ করে, যিহোবা ও তাঁর পুত্রের ওপর থেকে মনোযোগকে সরিয়ে দেয়, তাহলে আমরা দেখব আমাদের মনে সন্দেহ দেখা দিচ্ছে। আমরা যদি যিহোবা ও তাঁর পুত্রের ওপর এবং তাঁদেরকে ভালোবাসে এমন ব্যক্তিদের জন্য তাঁরা যা করেছেন, করছেন ও করবেন, সেই বিষয়ের ওপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখি, তাহলে আমরা আমাদের মধ্যে সন্দেহের বীজ রোপিত হতে দেব না।

২২. কেন পিতরের উদাহরণ অনুকরণযোগ্য?

২২ পিতর যখন যিশুর সঙ্গে নৌকায় এসে ওঠেন, তখন তিনি লক্ষ করেন যে, ঝড় থেমে গিয়েছে। গালীল সমুদ্র শান্ত হয়ে গিয়েছে। পিতরও অন্য শিষ্যদের সঙ্গে বলে ওঠেন: “সত্যই আপনি ঈশ্বরের পুত্ত্র।” (মথি ১৪:৩৩) ইতিমধ্যে সকাল হয়ে গিয়েছে আর পিতরের মনও নিশ্চয়ই কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। তিনি সন্দেহ ও ভয় কাটিয়ে ওঠেন। এটা ঠিক যে, যিশু যেমন পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, সেইরকম পাথরের মতো দৃঢ় একজন খ্রিস্টান হয়ে ওঠার জন্য তাকে এখনও অনেকটা পথ অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু তিনি চেষ্টা করে চলার ও আধ্যাত্মিকভাবে উন্নতি করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। আপনারও কি একইরকম মনোভাব রয়েছে? আপনি দেখতে পাবেন যে, এই ক্ষেত্রে পিতরের উদাহরণ অনুকরণযোগ্য।