সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

তাদের বিশ্বাস অনুকরণ করুন

 অধ্যায় দুই

তিনি “ঈশ্বরের সহিত গমনাগমন করিতেন”

তিনি “ঈশ্বরের সহিত গমনাগমন করিতেন”

১, ২. নোহ ও তার পরিবার কোন কাজে ব্যস্ত ছিলেন আর তাদেরকে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলোর মুখোমুখি হতে হয়েছিল?

নোহ তার পিঠ সোজা করে দাঁড়ান এবং তার পেশিগুলো টান টান করে নেন। কল্পনা করুন, তিনি একটা চওড়া কড়িকাঠের ওপর বসে রয়েছেন আর তার কাজের ফাঁকে জাহাজের বিশাল কাঠামোটাকে দেখছেন। বাতাসে গরম আলকাতরার তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে; বিভিন্ন যন্ত্রপাতির শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তিনি যেখানে বসে রয়েছেন, সেখান থেকে তিনি তার ছেলেদেরকে কঠোর পরিশ্রম করতে দেখছেন, যারা কাঠের এই বিশাল কাঠামোর বিভিন্ন অংশ তৈরি করতে ব্যস্ত। তার ছেলেরা, তাদের স্ত্রীরা ও তার নিজের প্রিয় স্ত্রী তার সঙ্গে এই কাজে কয়েক দশক ধরে কাজ করে চলেছেন। তাদের কাজ অনেকটা হয়ে গিয়েছে কিন্তু এখনও অনেক কাজ বাকি আছে!

সেই এলাকার লোকেরা মনে করেছিল যে, তারা সবাই বোকা। জাহাজ তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণা সম্বন্ধে লোকেদের উপহাসও বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, এক জলপ্লাবনে পুরো পৃথিবী ডুবে যাবে। নোহ যে-বিপর্যয় সম্বন্ধে তাদের বার বার সতর্ক করতেন, তা তাদের কাছে একেবারে অসম্ভব, অবাস্তব বলে মনে হয়েছিল। তারা বুঝতে পারেনি যে, কেন একজন ব্যক্তি তার নিজের ও সেইসঙ্গে তার পরিবারের জীবন এইরকম এক মূর্খতাপূর্ণ কাজের পিছনে নষ্ট করছিল। কিন্তু, নোহের ঈশ্বর যিহোবা তাকে একেবারে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছিলেন।

৩. কোন অর্থে নোহ ঈশ্বরের সঙ্গে গমনাগমন করেছিলেন?

ঈশ্বরের বাক্য বলে: “নোহ ঈশ্বরের সহিত গমনাগমন করিতেন।” (পড়ুন, আদিপুস্তক ৬:৯.) এর মানে কী ছিল? এর মানে এই নয় যে, ঈশ্বর পৃথিবীতে এসেছিলেন অথবা নোহ কোনোভাবে স্বর্গে গিয়েছিলেন। বরং, নোহ এত নিখুঁতভাবে তার ঈশ্বরের বাধ্য হয়েছিলেন ও এত গভীরভাবে তাঁকে ভালোবেসেছিলেন যে, ঠিক যেন তিনি ও যিহোবা একসঙ্গে বন্ধুর মতো চলেছিলেন। কয়েক হাজার বছর পর, বাইবেল নোহের বিষয় বলে: “বিশ্বাসে [তিনি] . . . জগৎকে দোষী করিলেন।” (ইব্রীয় ১১:৭) কীভাবে? আজকে আমরা তার বিশ্বাস থেকে কী শিখতে পারি?

এক দুষ্ট জগতে একজন নির্দোষ ব্যক্তি

৪, ৫. নোহের দিনে জগতের অবস্থা কীভাবে মন্দ থেকে মন্দতর হয়েছিল?

নোহ এমন এক জগতে বড়ো হয়ে উঠেছিলেন, যেটা খুব দ্রুত মন্দ থেকে মন্দতর হচ্ছিল। তার প্রপিতামহ হনোকের সময় থেকেই তা মন্দতায় ভরে গিয়েছিল। হনোক ছিলেন  আরেকজন ধার্মিক ব্যক্তি, যিনি ঈশ্বরের সঙ্গে গমনাগমন করেছিলেন। হনোক ভবিষ্যদ্‌বাণী করেছিলেন যে, জগতের দুষ্ট লোকেদের ওপর এক বিচারের দিন আসতে চলেছে। এখন নোহের সময় দুষ্টতা আরও বেশি বেড়ে গিয়েছে। এমনকী যিহোবার দৃষ্টিতে তা ভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে কারণ এটা দৌরাত্ম্যে ভরে গিয়েছে। (আদি. ৫:২২; ৬:১১; যিহূদা ১৪, ১৫) এমন কী ঘটেছিল যার ফলে পরিস্থিতি এত খারাপ হয়ে গিয়েছিল?

ঈশ্বরের আত্মিক পুত্র অর্থাৎ স্বর্গদূতদের মধ্যে খুবই দুঃখজনক কিছু ঘটেছিল। ইতিমধ্যে এদের একজন যিহোবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল আর ঈশ্বরের নামে অপবাদ দেওয়ার এবং আদম ও হবাকে পাপ করতে প্রলোভিত করার দ্বারা শয়তান দিয়াবল হয়ে উঠেছিল। নোহের দিনে অন্য স্বর্গদূতেরাও বিদ্রোহে তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। স্বর্গে ঈশ্বরের দেওয়া অবস্থান ত্যাগ করে তারা পৃথিবীতে নেমে এসেছিল, মানুষের রূপ ধারণ করেছিল আর সুন্দরী নারীদের বিবাহ করেছিল। সেই গর্বিত, স্বার্থপর বিদ্রোহী স্বর্গদূতেরা মানুষের ওপর খুবই মন্দ প্রভাব বিস্তার করেছিল।—আদি. ৬:১, ২; যিহূদা ৬, ৭.

৬. কীভাবে নেফিলিমরা জগতের পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছিল আর যিহোবা কী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

এ ছাড়া, মানবদেহ ধারণকারী দূত ও নারীদের মিলনে সংকর-জাতীয় যে-সমস্ত পুত্রসন্তান জন্মেছিল, তারা অস্বাভাবিক আকার ও ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল। বাইবেলে তাদেরকে ‘মহাবীর’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আসলে ইব্রীয় শব্দ নেফিলিম, যা বাংলা বাইবেলে ‘মহাবীর’ হিসেবে অনুবাদিত হয়েছে, সেটার অর্থ হল, “পতনকারী”—যারা অন্যদের পতনের কারণ হয়। নির্মম উৎপীড়নকারী এই নেফিলিমরা জগতের হিংস্র, অধার্মিক মনোভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। কোনো সন্দেহ নেই যে, সৃষ্টিকর্তার দৃষ্টিতে “পৃথিবীতে মনুষ্যের দুষ্টতা বড়, এবং তাহার অন্তঃকরণের চিন্তার সমস্ত কল্পনা নিরন্তর কেবল মন্দ” ছিল। যিহোবা সেই দুষ্ট সমাজকে ১২০ বছরের মধ্যে ধ্বংস করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।—পড়ুন, আদিপুস্তক ৬:৩-৫.

৭. মন্দ প্রভাবগুলো থেকে তাদের ছেলেদের সুরক্ষা করার ক্ষেত্রে নোহ ও তার স্ত্রী কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়েছিলেন?

 এইরকম এক জগতে পরিবারকে গড়ে তোলা যে কত কষ্টকর, তা একটু চিন্তা করে দেখুন! তবুও নোহ তা করেছিলেন। তিনি এক উপযুক্ত স্ত্রী পেয়েছিলেন। নোহের বয়স ৫০০ বছর হওয়ার পর, তার স্ত্রী শেম, হাম ও যেফৎ নামে তিন সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। * বাবা-মা হিসেবে দু-জনকেই তাদের চারপাশে ছেয়ে থাকা মন্দ প্রভাবগুলো থেকে তাদের ছেলেদের সুরক্ষা করতে হয়েছিল। ছোটো ছোটো ছেলেরা প্রায়ই ‘প্রসিদ্ধ বীরদের’ দেখে অবাক ও বিস্মিত হয়ে থাকে আর সেই সময়ের নেফিলিমরা ঠিক এমনটাই ছিল। অনেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নোহ ও তার স্ত্রী যদিও তাদের সন্তানদের ওই বীরদের মন্দ কাজের সমস্ত ঘটনার খবর থেকে দূরে রাখতে পারতেন না, কিন্তু তারা তাদের সন্তানদের যিহোবা ঈশ্বর সম্বন্ধে আগ্রহজনক সত্যগুলো শেখাতে পারতেন, যিনি সমস্ত মন্দতাকে ঘৃণা করেন। তাদের সন্তানদের এটা শেখানোর দায়িত্ব ছিল যে, যিহোবা জগতের মধ্যে ঘটে চলা দৌরাত্ম্য ও বিদ্রোহ দেখে দুঃখ পান।—আদি. ৬:৬.

নোহ ও তার স্ত্রীকে মন্দ প্রভাবগুলো থেকে তাদের ছেলেদের সুরক্ষা করতে হয়েছিল

৮. আজকে বিজ্ঞ বাবা-মায়েরা কীভাবে নোহ ও তার স্ত্রীর উদাহরণ অনুকরণ করতে পারে?

আজকের দিনের বাবা-মায়েরাও নোহ ও তার স্ত্রীর মতো একই সমস্যা ভোগ করে। আজকে আমাদের চারপাশও একইরকম দৌরাত্ম্য ও বিদ্রোহী মনোভাবে ছেয়ে গিয়েছে। শহরগুলোতে প্রায়ই উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের দুর্বৃত্ত দলগুলোকে দাপিয়ে বেড়াতে দেখা যায়। এমনকী ছোটো ছেলে-মেয়েদের জন্য আমোদপ্রমোদের বিষয়গুলোও দৌরাত্ম্যে পূর্ণ থাকে। এইসমস্ত মন্দ প্রভাব প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে বিজ্ঞ বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের শান্তির ঈশ্বর যিহোবা সম্বন্ধে শেখানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে থাকেন, যিনি একদিন সমস্ত দৌরাত্ম্য শেষ করবেন। (গীত. ১১:৫; ৩৭:১০, ১১) এই ক্ষেত্রে সফল হওয়া সম্ভব। নোহ ও তার স্ত্রী সফল হয়েছিলেন। তাদের ছেলেরা ভালো ব্যক্তি হিসেবে বড়ো হয়ে উঠেছিলেন আর তারা এমন নারীদের বিয়ে করেছিলেন, যারা তাদের মতো সত্য ঈশ্বর যিহোবাকে তাদের জীবনে প্রথম স্থান দিতে ইচ্ছুক ছিলেন।

“তুমি . . . এক জাহাজ নির্ম্মাণ কর”

৯, ১০. (ক) যিহোবার কোন আদেশ নোহের জীবন পালটে দিয়েছিল? (খ) জাহাজ তৈরির নকশা ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে যিহোবা নোহকে কী জানিয়েছিলেন?

একদিন নোহের জীবন একেবারে পালটে গিয়েছিল। যিহোবা তাঁর প্রিয় দাসের সঙ্গে কথা বলেছিলেন এবং সেই সময়ের জগৎকে ধ্বংস করে দেওয়ার বিষয়ে তাঁর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তাকে জানিয়েছিলেন। ঈশ্বর নোহকে আদেশ দিয়েছিলেন: “তুমি গোফর কাষ্ঠ দ্বারা এক জাহাজ নির্ম্মাণ কর।”—আদি. ৬:১৪.

১০ এই জাহাজ অন্যান্য জাহাজের মতো ছিল না, যেমনটা অনেকে মনে করে থাকে। এতে কোনো বাঁকানো অংশ যেমন অগ্র ও পশ্চাদ্ভাগ এবং পাটাতন ও হাল ছিল না। আসলে এটা ছিল বিরাট আকারের একটা বাক্স। যিহোবা নোহকে সেই জাহাজের সঠিক মাপ, এটার নকশার বর্ণনা ও এটার বাইরে ও ভিতরে আলকাতরা দিয়ে লেপন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর এটার কারণ তিনি নোহকে জানিয়েছিলেন: “সকলকে বিনষ্ট করণার্থে আমি পৃথিবীর  উপরে জলপ্লাবন আনিব, পৃথিবীস্থ সকলে প্রাণত্যাগ করিবে।” কিন্তু যিহোবা নোহের সঙ্গে এই চুক্তি করেছিলেন: “তুমি আপন পুত্ত্রগণ, স্ত্রী ও পুত্ত্রবধূদিগকে সঙ্গে লইয়া সেই জাহাজে প্রবেশ করিবে।” এ ছাড়া, নোহকে সমস্ত প্রকারের পশুপাখি নিয়ে আসতে হয়েছিল। কেবলমাত্র জাহাজের মধ্যে যারা থাকবে তারাই আসন্ন জলপ্লাবন থেকে রক্ষা পাবে।—আদি. ৬:১৭-২০.

ঈশ্বরের আদেশ পূর্ণ করার জন্য নোহ ও তার পরিবার একত্রে কাজ করেছিল

১১, ১২. নোহ কোন বিশাল কার্যভার পেয়েছিলেন আর এই কার্যভারকে তিনি কীভাবে সম্পন্ন করেছিলেন?

১১ নোহের সামনে এক বিশাল কার্যভার ছিল। এই প্রকাণ্ড জাহাজটা ১৩৩ মিটার দীর্ঘ, ২২ মিটার প্রস্থ ও ১৩ মিটার উচ্চ ছিল। এটা একটা ফুটবল মাঠের চেয়েও বড়ো ছিল। এই কাজ খুব কঠিন এমন অভিযোগ করে নোহ কি পিছিয়ে গিয়েছিলেন কিংবা নিজের কাজকে সহজ করার জন্য নকশায় ইচ্ছেমতো রদবদল করেছিলেন? বাইবেল উত্তর দেয়: “নোহ সেইরূপ করিলেন, ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারেই সকল কর্ম্ম করিলেন।”—আদি. ৬:২২.

১২ এই কাজে হয়তো ৪০ থেকে ৫০ বছর লেগেছিল। গাছ কাটতে হয়েছিল, গুঁড়িগুলো টেনে নিয়ে যেতে হয়েছিল, কাঠ নির্দিষ্ট আকারে কাটতে ও জোড়া লাগাতে হয়েছিল। জাহাজটা তিন-তলা ছিল, যেটার মধ্যে অনেকগুলি কক্ষ ও পাশের দিকে দরজা ছিল। স্পষ্টতই ওপরের দিকে জানালা আর সেইসঙ্গে ছাদ ছিল, যেটার মাঝখানটা একটু উঁচু করতে হয়েছিল, যাতে জল গড়িয়ে যায়।—আদি. ৬:১৪-১৬.

১৩. নোহের কাজের কোন দিকটা হয়তো জাহাজ তৈরি করার চেয়েও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ছিল আর এর প্রতি লোকেরা কীভাবে সাড়া দিয়েছিল?

১৩ বছর গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন জাহাজ আকার নিতে শুরু করেছিল, তখন নোহ স্বভাবতই তার পরিবারের সমর্থন পেয়ে কতই-না খুশি হয়েছিলেন! তার কাজের আরেকটা দিক ছিল, যেটা হয়তো জাহাজ তৈরি করার চেয়েও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ছিল। বাইবেল আমাদের জানায় যে, নোহ “ধার্ম্মিকতার প্রচারক” ছিলেন। (পড়ুন, ২ পিতর ২:৫.) তাই তিনি সাহসের সঙ্গে সেই দুষ্ট, অধার্মিক সমাজের লোকেদের আসন্ন ধ্বংস সম্বন্ধে সতর্ক করার চেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। লোকেরা কীভাবে সাড়া দিয়েছিল? পরে যিশু সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেছিলেন যে, সেই লোকেরা “বুঝিতে পারিল না [“মনোযোগ দিল না,” NW]।” তিনি বলেছিলেন যে, তারা দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্মে যেমন, খাওয়া-দাওয়া ও বিয়ে করার মতো বিষয়গুলোতে এত ব্যস্ত ছিল যে, নোহের কথায় মনোযোগ দেয়নি। (মথি ২৪:৩৭-৩৯) এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, অনেকে তাকে ও তার পরিবারকে উপহাস করেছিল; কেউ কেউ হয়তো তাকে হুমকি দিয়েছিল এবং প্রচণ্ডভাবে তার বিরোধিতা করেছিল। তারা হয়তো এমনকী নির্মাণ কাজে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল।

যিহোবা নোহকে ও তার প্রচেষ্টায় আশীর্বাদ করছেন, এই প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বেও লোকেরা তাকে উপহাস করেছিল এবং তার বার্তা উপেক্ষা করেছিল

১৪. আজকে খ্রিস্টীয় পরিবারগুলো নোহ ও তার পরিবারের কাছ থেকে কী শিখতে পারে?

১৪ তা সত্ত্বেও, নোহ ও তার পরিবার কখনো হাল ছেড়ে দেয়নি। তারা জাহাজ তৈরি করেই চলেছিল, যদিও তাদের চারপাশের লোকেরা এটাকে অর্থহীন, ভ্রান্ত ও বোকামির কাজ বলে মনে করেছিল। আজকে খ্রিস্টীয় পরিবারগুলোও নোহ ও তার পরিবারের বিশ্বাস থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। আসলে আমরা এমন এক সময়ে বাস করি, যেটাকে বাইবেল এই জগতের বিধিব্যবস্থার ‘শেষ কাল’ বলে উল্লেখ করে। (২ তীম. ৩:১) যিশু বলেছিলেন যে, আমাদের সময়কাল ঠিক সেই সময়ের মতো হবে যে-সময়ে নোহ জাহাজ তৈরি করেছিলেন। যদি লোকেরা ঈশ্বরের রাজ্যের বার্তার প্রতি উদাসীন হয়, উপহাস করে অথবা এমনকী তাড়না  করে, তবে খ্রিস্টানদের নোহের কথা মনে রাখা উচিত। তাদেরকেই যে প্রথম এইরকম প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলোর মুখোমুখি হতে হচ্ছে এমন নয়।

“জাহাজে প্রবেশ কর”

১৫. নোহের বয়স যখন ৬০০ বছরের কাছাকাছি ছিল, তখন তিনি কাদের হারিয়েছিলেন?

১৫ সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের আসল আকার বোঝা যেতে শুরু করেছিল। নোহের বয়স যখন ৬০০ বছরের কাছাকাছি, তখন পর পর তাকে তার প্রিয় কয়েক জনকে হারানোর ব্যথা অনুভব করতে হয়েছিল। তার বাবা লেমক মারা গিয়েছিলেন। * পাঁচ বছর পর লেমকের বাবা, নোহের পিতামহ মথূশেলহ ৯৬৯ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন, যিনি বাইবেলের বিবরণ অনুসারে সবচেয়ে বেশি বছর বেঁচে ছিলেন। (আদি. ৫:২৭) মথূশেলহ ও লেমক উভয়েই প্রথম মানব আদমের সমসাময়িক সময়ে বেঁচে ছিলেন।

১৬, ১৭. (ক) তার বয়স যখন ৬০০ বছর, তখন নোহ কোন নতুন বার্তা পেয়েছিলেন? (খ) নোহ ও তার পরিবার যে-অবিস্মরণীয় দৃশ্য দেখেছিল, তা বর্ণনা করুন।

১৬ তার বয়স যখন ৬০০ বছর, তখন কুলপতি নোহ যিহোবা ঈশ্বরের কাছ থেকে আরেকটা নতুন বার্তা পেয়েছিলেন: “তুমি সপরিবারে জাহাজে প্রবেশ কর।” সেইসঙ্গে ঈশ্বর নোহকে সমস্ত ধরনের পশুপাখি—বলির জন্য উপযুক্ত এমন শুচি পশু সাতটা করে এবং বাকিগুলো দুটো করে নিয়ে—জাহাজে প্রবেশ করাতে বলেছিলেন।—আদি. ৭:১-৩.

১৭ এটা নিশ্চয়ই এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য ছিল। দূরদূরান্ত থেকে বিভিন্ন আকৃতি ও প্রকৃতির হাজার হাজার পশুপাখি এসেছিল—কিছু হেঁটে, কিছু উড়ে, কিছু বুকে ভর দিয়ে হেঁটে, কিছু থপ থপ করে হেঁটে। আমাদের এ-রকম মনে করার প্রয়োজন নেই যে, সেই সমস্ত বন্য পশুপাখিকে  জাহাজের মধ্যে প্রবেশ করানোর জন্য নোহ সেগুলোকে তাড়া করছেন বা টানতে টানতে নিয়ে আসছেন। বিবরণ বলে যে, ‘যাবতীয় জীব জাহাজে নোহের নিকটে প্রবেশ করিল।’—আদি. ৭:৯.

১৮, ১৯. (ক) নোহের বিবরণের ঘটনাগুলো সম্বন্ধে সমালোচকরা যে-প্রশ্নগুলো তোলে, সেগুলোর সঙ্গে কীভাবে আমরা যুক্তি করতে পারি? (খ) যিহোবা যেভাবে তাঁর সৃষ্ট পশুপাখিদের রক্ষা করার উপায় বেছে নিয়েছিলেন, তাতে কীভাবে আমরা তাঁর প্রজ্ঞা দেখতে পাই?

১৮ কোনো কোনো সমালোচক হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারে: ‘কীভাবে এমনটা হতে পারে? আর সেই সমস্ত পশুপাখি কীভাবে এক আবদ্ধ জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে থাকতে পারে?’ চিন্তা করুন: তাঁর সৃষ্ট পশুপাখিদের নিয়ন্ত্রণ করার, এমনকী প্রয়োজনে তাদেরকে হিংস্রতা ত্যাগ করে বশীভূত হতে বাধ্য করা কি সত্যিই এই বিশ্বের সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতার বাইরে? মনে রাখবেন, যিহোবাই হলেন সেই ঈশ্বর যিনি পশুপাখিদের সৃষ্টি করেছেন। এর অনেক পরে, তিনি লোহিত সমুদ্রকে দু-ভাগ করেছিলেন এবং সূর্যকে স্থির করে দিয়েছিলেন। তাই, নোহের বিবরণে যে-ঘটনাগুলো বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলো কি তিনি ঘটাতে পারেন না? অবশ্যই তিনি পারেন আর তিনি তা করেও ছিলেন!

১৯ এটা ঠিক যে, ঈশ্বর তাঁর সৃষ্ট পশুপাখিদের রক্ষা করার জন্য অন্য উপায়ও বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু, তিনি বিজ্ঞতার সঙ্গে এমন একটা উপায় বেছে নিয়েছিলেন, যা আমাদেরকে সেই আস্থার বিষয়ে মনে করিয়ে দেয়, যা তিনি প্রথমে মানুষের ওপর রেখেছিলেন, যেটা হল পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর যত্ন নেওয়া। (আদি. ১:২৮) তাই, অনেক বাবা-মা আজকে নোহের গল্প ব্যবহার করে তাদের সন্তানদের শিক্ষা দেয় যে, যিহোবা তাঁর সৃষ্ট পশুপাখি ও মানুষদের মূল্যবান হিসেবে গণ্য করেন।

২০. জলপ্লাবনের আগের সপ্তাহে নোহ ও তার পরিবার হয়তো কোন কাজে ব্যস্ত ছিল?

২০ যিহোবা নোহকে বলেছিলেন যে, এক সপ্তাহের মধ্যে জলপ্লাবন আসবে। পরিবারের জন্য এটা নিশ্চয়ই খুব ব্যস্ত সময় ছিল। সমস্ত পশুপাখি ও সেইসঙ্গে পশুপাখির ও  পরিবারের জন্য খাবার ঠিকঠাক সাজিয়ে রাখা এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জাহাজে তোলার কথা চিন্তা করুন। নোহের স্ত্রী আর শেম, হাম ও যেফতের স্ত্রীরা হয়তো সেই জাহাজের ভিতরটা বসবাস যোগ্য করে তোলার জন্য খুবই চিন্তিত ছিলেন।

২১, ২২. (ক) নোহের দিনের লোকেদের উদাসীনতা দেখে কেন আমাদের অবাক হওয়া উচিত নয়? (খ) নোহ ও তার পরিবার তাদের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে যে-উপহাসের মুখোমুখি হয়েছিল, তা কখন শেষ হয়েছিল?

২১ তাদের আশেপাশের লোকেদের সম্বন্ধে কী বলা যায়? এমনকী যখন তারা এটার প্রমাণ পেয়েছিল যে, যিহোবা নোহকে ও তার প্রচেষ্টায় আশীর্বাদ করছেন, তখনও তারা “বুঝিতে পারিল না [“মনোযোগ দিল না,” NW]।” তাদের চোখের সামনে পশুপাখিরা জাহাজে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু তাদের উদাসীনতা দেখে আমাদের অবাক হওয়া উচিত নয়। আমরা যে এই বিধিব্যবস্থার একেবারে শেষ দিনে বাস করছি, সেটার দৃঢ় প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আজকের দিনের লোকেরাও একইরকমভাবে কোনো মনোযোগ দেয় না। প্রেরিত পিতর যেমন ভবিষ্যদ্‌বাণী করেছিলেন, তেমনই উপহাসের সঙ্গে উপহাসকেরা উপস্থিত হয়েছে আর যারা ঈশ্বরের সতর্কবাণীতে কান দেয়, তাদের বিদ্রুপ করে থাকে। (পড়ুন, ২ পিতর ৩:৩-৬.) একইরকমভাবে লোকেরা নিশ্চয়ই নোহ ও তার পরিবারকেও উপহাস করেছিল।

২২ এই উপহাস কখন বন্ধ হয়েছিল? বিবরণ আমাদের বলে যে, নোহ তার পরিবার ও পশুপাখিদের নিয়ে জাহাজে প্রবেশ করার পর, “সদাপ্রভু তাঁহার পশ্চাৎ দ্বার বদ্ধ করিলেন।” কাছাকাছি যদি কোনো উপহাসক থেকেও থাকে, ঈশ্বরের এই কাজ নিশ্চয়ই তাদের চুপ করিয়ে দিয়েছিল। তাতেও যদি তারা চুপ না করে থাকে, তবে উপর থেকে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা তাদের চুপ করিয়ে দিয়েছিল। প্রথমে ফোঁটা ফোঁটা করে, পরে আরও জোরে, তারপর মুষলধারে বৃষ্টি পড়তে থাকে, যা পুরো পৃথিবীকে জলে ডুবিয়ে দিয়েছিল, ঠিক যেমনটা যিহোবা বলেছিলেন।—আদি. ৭:১৬-২১.

২৩. (ক) কীভাবে আমরা জানি যে, যিহোবা নোহের দিনে সেই দুষ্ট লোকেদের মৃত্যুতে আনন্দিত হননি? (খ) আজকে নোহের বিশ্বাস অনুকরণ করা কেন বিজ্ঞতার কাজ?

২৩ যিহোবা কি সেই দুষ্ট লোকেদের মৃত্যুতে আনন্দিত হয়েছিলেন? না। (যিহি. ৩৩:১১) এর পরিবর্তে, তিনি তাদেরকে তাদের পথ পরিবর্তন করার ও যা সঠিক তা করার জন্য যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছিলেন। তারা কি পরিবর্তিত হতে পারত? নোহের জীবন এই প্রশ্নের উত্তর দেয়। যিহোবার সঙ্গে গমনাগমন করে ও সমস্ত ক্ষেত্রে তার ঈশ্বরের বাধ্য হয়ে নোহ দেখিয়েছিলেন যে, রক্ষা পাওয়া সম্ভব ছিল। এই অর্থে তার বিশ্বাস তাদের সময়ের জগৎকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল; তা তার সময়ের লোকেদের দুষ্টতা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছিল। তার বিশ্বাস তাকে ও তার পরিবারকে রক্ষা করেছিল। আপনি যদি নোহের বিশ্বাস অনুকরণ করেন, তাহলে আপনিও একইরকমভাবে নিজেকে ও সেইসঙ্গে যাদেরকে আপনি ভালোবাসেন, তাদেরকে রক্ষা করতে পারবেন। নোহের মতো আপনিও যিহোবা ঈশ্বরের সঙ্গে একজন বন্ধুর মতো গমনাগমন করতে পারেন। আর সেই বন্ধুত্ব চিরস্থায়ী হতে পারে!

^ অনু. 7 সেই সময়ের লোকেদের জীবনকাল আজকে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। তাদের দীর্ঘ আয়ুর কারণ হল, একসময় আদম ও হবার যে-কর্মক্ষমতা ও সিদ্ধতা ছিল, তারা সেটার খুব কাছাকাছি সময়ে বাস করত।

^ অনু. 15 লেমক তার ছেলের নাম নোহ রেখেছিলেন, যেটার অর্থ সম্ভবত “বিশ্রাম” আর তিনি ভবিষ্যদ্‌বাণী করেছিলেন যে, অভিশপ্ত ভূমিতে মানুষকে যে-পরিশ্রম করতে হয়, তা থেকে মানবজাতিকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার দ্বারা নোহ তার নামের অর্থ অনুসারে কাজ করবেন। (আদি. ৫:২৮, ২৯) তার ভবিষ্যদ্‌বাণী পূর্ণ হওয়ার সময় পর্যন্ত লেমক জীবিত ছিলেন না। নোহের মা ও ভাই-বোনেরা হয়তো জলপ্লাবনে মারা গিয়েছিল।