সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

যিহোবার নিকটবর্তী হোন

 অধ্যায় ৬

ধ্বংসাত্মক শক্তি—“যিহোবা যুদ্ধবীর”

ধ্বংসাত্মক শক্তি—“যিহোবা যুদ্ধবীর”

১-৩. (ক) মিশরীয়দের কাছ থেকে ইস্রায়েলীয়রা কোন হুমকির মুখোমুখি হয়েছিল? (খ) যিহোবা কীভাবে তাঁর লোকেদের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন?

ইস্রায়েলীয়দের ফাঁদে ফেলা হয়েছিল—দুর্গম পাহাড়ের ঢালে ও অনতিক্রম্য সমুদ্রের মধ্যবর্তী স্থানে আটকা পড়েছিল। মিশরীয় সৈন্যবাহিনী, এক নির্মম হত্যাকারী সংগঠন তাদের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার সংকল্প নিয়ে ক্ষিপ্তভাবে ধাওয়া করে আসছিল। * তবুও, মোশি ঈশ্বরের লোকেদের আশা না হারাতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। তিনি তাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন: “সদাপ্রভু তোমাদের পক্ষ হইয়া যুদ্ধ করিবেন।”—যাত্রাপুস্তক ১৪:১৪.

তারপরও, মোশি স্পষ্টতই যিহোবাকে ডেকেছিলেন আর ঈশ্বর সাড়া দিয়েছিলেন: “তুমি আমার কাছে কেন ক্রন্দন করিতেছ? . . . তুমি আপন যষ্টি তুলিয়া সমুদ্রের উপরে হস্ত বিস্তার কর, সমুদ্রকে দুই ভাগ কর।” (যাত্রাপুস্তক ১৪:১৫, ১৬) ঘটনাগুলো যেভাবে ঘটতে শুরু করেছিল, তা কল্পনা করুন। যিহোবা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দূতকে আদেশ দিয়েছিলেন আর মেঘের স্তম্ভটা ইস্রায়েলের পিছনে সম্ভবত একটা দেওয়ালের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল এবং মিশরীয়দের আক্রমণে বাধা দিয়েছিল। (যাত্রাপুস্তক ১৪:১৯, ২০; গীতসংহিতা ১০৫:৩৯) মোশি তাঁর হাত প্রসারিত করেছিলেন। প্রচণ্ড এক বাতাসের দ্বারা তাড়িত হয়ে, সমুদ্র দুভাগ হয়েছিল। জল যেকোনোভাবেই হোক জমাট বাঁধে এবং দেওয়ালের মতো দাঁড়িয়ে থাকে, পুরো জাতিকে ধারণ করার মতো প্রশস্ত এক পথ খুলে দেয়!—যাত্রাপুস্তক ১৪:২১; ১৫:৮.

শক্তির এই প্রদর্শনের মুখোমুখি হয়ে, ফরৌণের তার বাহিনীকে পিছু হটার আদেশ দেওয়া উচিত ছিল। তা না করে, উদ্ধত ফরৌণ আক্রমণের আদেশ দিয়েছিলেন। (যাত্রাপুস্তক ১৪:২৩) মিশরীয়রা ধাওয়া করতে করতে সমুদ্রতলের ওপর ছুটে যায় কিন্তু শীঘ্রই তাদের রথের চাকাগুলো যখন খুলে পড়তে শুরু করে, তখন আক্রমণ  বিভ্রান্তিতে পরিণত হয়। ইস্রায়েলীয়রা যখন অপর পাড়ে নিরাপদে পৌঁছায়, তখন যিহোবা মোশিকে আদেশ দিয়েছিলেন: “তুমি সমুদ্রের উপরে হস্ত বিস্তার কর; তাহাতে জল ফিরিয়া মিস্রীয়দের উপরে ও তাহাদের রথের উপরে ও অশ্বারূঢ়দের উপরে আসিবে।” জলের দেয়ালগুলো ভেঙে পড়ে, ফরৌণ ও তার বাহিনীকে সমাহিত করে!—যাত্রাপুস্তক ১৪:২৪-২৮; গীতসংহিতা ১৩৬:১৫.

লোহিত সাগরে, যিহোবা নিজেকে “যুদ্ধবীর” প্রমাণ করেছিলেন

৪. (ক) লোহিত সাগরে যিহোবা কী প্রমাণিত হয়েছিলেন? (খ) যিহোবার এই ভাবমূর্তির প্রতি কেউ কেউ হয়তো কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে?

লোহিত সমুদ্রে ইস্রায়েল জাতির উদ্ধার মানবজাতির সঙ্গে ঈশ্বরের আচরণের ইতিহাসে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। সেখানে যিহোবা নিজেকে এক “যুদ্ধবীর” প্রমাণিত করেছিলেন। (যাত্রাপুস্তক ১৫:৩, NW) কিন্তু, আপনি যিহোবার এই ভাবমূর্তির প্রতি কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবেন? এটা স্বীকার করতেই হবে যে, যুদ্ধ মানবজাতির জন্য অনেক যন্ত্রণা ও দুর্দশা নিয়ে এসেছে। ঈশ্বরের ধ্বংসাত্মক শক্তির ব্যবহার কি আপনার কাছে তাঁর নিকটবর্তী হতে উৎসাহ দেওয়ার চেয়ে বরং বাধাদায়ক বলে মনে হয়?

ঈশ্বরের যুদ্ধ বনাম মানুষের লড়াইগুলো

৫, ৬. (ক) কেন ঈশ্বরকে উপযুক্তভাবে “বাহিনীগণের যিহোবা” বলা হয়? (খ) কীভাবে ঈশ্বরের যুদ্ধ মানুষের যুদ্ধ থেকে আলাদা?

মূল ভাষার বাইবেল অনুসারে, ইব্রীয় শাস্ত্রে প্রায় তিন শত বার এবং খ্রিস্টীয় গ্রিক শাস্ত্রে দুবার ঈশ্বরকে “বাহিনীগণের সদাপ্রভু [“যিহোবা,” NW]” উপাধি দেওয়া হয়েছে। (১ শমূয়েল ১:১১) সার্বভৌম শাসক হিসেবে, যিহোবা এক বিরাট দূতবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করেন। (যিহোশূয়ের পুস্তক ৫:১৩-১৫; ১ রাজাবলি ২২:১৯) এই বাহিনীর ধ্বংস করার ক্ষমতা ভয়ংকর। (যিশাইয় ৩৭:৩৬) মানুষের ধ্বংস সম্বন্ধে চিন্তা করা আনন্দের বিষয় নয়। কিন্তু, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ঈশ্বরের যুদ্ধ মানুষের তুচ্ছ লড়াইগুলোর চেয়ে একেবারে আলাদা। সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা হয়তো তাদের আগ্রাসনের পিছনে মহৎ উদ্দেশ্যগুলো দেখানোর চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু, মানুষের যুদ্ধে সবসময় লোভ ও স্বার্থপরতা জড়িত।

এর বৈসাদৃশ্যে, যিহোবা অন্ধ আবেগের দ্বারা পরিচালিত হন না। দ্বিতীয়  বিবরণ ৩২:৪ পদ ঘোষণা করে: “তিনি শৈল, তাঁহার কর্ম্ম সিদ্ধ, কেননা তাঁহার সমস্ত পথ ন্যায্য; তিনি বিশ্বাস্য ঈশ্বর, তাঁহাতে অন্যায় নাই; তিনিই ধর্ম্মময় ও সরল।” ঈশ্বরের বাক্য অসংযত ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা এবং হিংস্রতাকে নিন্দা করে। (আদিপুস্তক ৪৯:৭; গীতসংহিতা ১১:৫) অতএব যিহোবা কখনোই কারণ ছাড়া কাজ করেন না। তিনি তাঁর ধ্বংসাত্মক শক্তিকে সংযতভাবে এবং শেষ অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করেন। এটা তিনি তাঁর ভাববাদী যিহিষ্কেলের মাধ্যমে যা বলেছিলেন ঠিক তা-ই: “দুষ্ট লোকের মরণে কি আমার কিছু সন্তোষ আছে? ইহা প্রভু সদাপ্রভু কহেন; বরং সে আপন কুপথ হইতে ফিরিয়া বাঁচে, ইহাতে কি আমার সন্তোষ হয় না?”—যিহিষ্কেল ১৮:২৩.

৭, ৮. (ক) ইয়োব তার কষ্টভোগ সম্বন্ধে ভুলভাবে কোন উপসংহারে পৌঁছেছিলেন? (খ) ইলীহূ কীভাবে এই বিষয়ে ইয়োবের চিন্তাধারা সংশোধন করেছিলেন? (গ) ইয়োবের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কোন শিক্ষা লাভ করতে পারি?

তা হলে, কেন যিহোবা ধ্বংসাত্মক শক্তি ব্যবহার করেন? উত্তর দেওয়ার আগে, আমরা ধার্মিক ব্যক্তি ইয়োবের কথা মনে করতে পারি। ইয়োব—বাস্তবিকপক্ষে যেকোনো মানুষ—পরীক্ষার মধ্যে তার নীতিনিষ্ঠা বজায় রাখতে পারবে কি না, সেই বিষয়ে শয়তান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। শয়তানকে ইয়োবের নীতিনিষ্ঠা পরীক্ষা করতে দিয়ে যিহোবা সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তর দিয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, ইয়োব রোগে কষ্টভোগ করেছিলেন, সম্পত্তি এবং তার সন্তানদের হারিয়েছিলেন। (ইয়োব ১:১–২:৮) যে-বিচার্য বিষয়গুলো জড়িত ছিল তা না জানায়, ইয়োব ভুলভাবে এই উপসংহারে পৌঁছেছিলেন যে, তার কষ্টভোগ ঈশ্বরের কাছ থেকে অন্যায় শাস্তি ছিল। তিনি ঈশ্বরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তিনি কেন তাকে “শরলক্ষ্য,” “শত্রু” বানিয়েছেন।—ইয়োব ৭:২০; ১৩:২৪.

ইলীহূ নামে একজন যুবক ইয়োবের চিন্তাধারার ত্রুটি প্রকাশ করেছিলেন, এই বলে: “আপনি কি বলিতেছেন, ঈশ্বরের ধর্ম্ম হইতে আমার ধর্ম্ম অধিক?” (ইয়োব ৩৫:২) হ্যাঁ, আমরা ঈশ্বরের চেয়ে ভাল জানি, এটা চিন্তা করা বা তিনি অন্যায় আচরণ করেছেন, এটা ধরে নেওয়া বোকামি। ইলীহূ ঘোষণা করেছিলেন: “ইহা দূরে থাকুক যে, ঈশ্বর দুষ্কার্য্য করিবেন, সর্ব্বশক্তিমান্‌ অন্যায় করিবেন।” পরে তিনি বলেছিলেন: “সর্ব্বশক্তিমান! তিনি আমাদের বোধের অগম্য; তিনি পরাক্রমে মহান্‌, তিনি ন্যায়বিচার ও প্রচুর ধর্ম্মগুণ বিপরীত করেন না।” (ইয়োব ৩৪:১০; ৩৬: ২২, ২৩; ৩৭:২৩) আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে, ঈশ্বর যখন যুদ্ধ করেন, তখন তা করার জন্য তাঁর উপযুক্ত কারণ থাকে। তা মনে রেখে, আসুন আমরা কয়েকটা কারণ পরীক্ষা করে দেখি যে কেন শান্তির ঈশ্বর কখনও কখনও যোদ্ধার রূপ ধারণ করেন।—১ করিন্থীয় ১৪:৩৩.

যেকারণে শান্তির ঈশ্বর যুদ্ধ করতে বাধ্য হন

৯. কেন শান্তির ঈশ্বর যুদ্ধ করেন?

“যুদ্ধবীর” হিসেবে ঈশ্বরের প্রশংসা করার পর, মোশি ঘোষণা করেছিলেন: “হে সদাপ্রভু, দেবগণের মধ্যে কে তোমার তুল্য? কে তোমার ন্যায় পবিত্রতায় আদরণীয়?” (যাত্রাপুস্তক ১৫:১১) ভাববাদী হবক্‌কূক একইভাবে লিখেছিলেন: “তুমি এমন নির্ম্মলচক্ষু যে মন্দ দেখিতে পার না, এবং দুষ্কার্য্যের প্রতি তুমি দৃষ্টিপাত করিতে পার না।” (হবক্‌কূক ১:১৩) যদিও যিহোবা হলেন প্রেমের ঈশ্বর, সেইসঙ্গে তিনি পবিত্রতা, ধার্মিকতা এবং ন্যায়বিচারেরও ঈশ্বর। কখনও কখনও, এই গুণগুলো তাঁকে তাঁর ধ্বংসাত্মক শক্তি ব্যবহার করতে বাধ্য করে। (যিশাইয় ৫৯:১৫-১৯; লূক ১৮:৭) তাই ঈশ্বর যখন যুদ্ধ করেন, তখন তিনি তাঁর পবিত্রতাকে কলঙ্কিত করেন না। বরং, তিনি যুদ্ধ করেন কারণ তিনি পবিত্র।—লেবীয় পুস্তক ১৯:২.

১০. (ক) কখন এবং কীভাবে প্রথমবারের মতো ঈশ্বরের যুদ্ধ করার প্রয়োজন হয়েছিল? (খ) একমাত্র কীভাবে আদিপুস্তক ৩:১৫ পদে ভবিষ্যদ্বাণীকৃত শত্রুতার শেষ হবে এবং ধার্মিক মানবজাতির জন্য কোন উপকারগুলো আসবে?

১০ প্রথম মানব দম্পতি, আদম ও হবা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার পর যে-পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল, সেই বিষয়ে বিবেচনা করুন। (আদিপুস্তক ৩:১-৬) তিনি যদি তাদের অধার্মিকতাকে সহ্য করতেন, তা হলে যিহোবা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সার্বভৌম কর্তা হিসেবে তাঁর নিজের অবস্থানকে দুর্বল করে ফেলতেন। একজন ন্যায্য ঈশ্বর হিসেবে, তিনি তাদের মৃত্যুদণ্ড দিতে বাধ্য ছিলেন। (রোমীয় ৬:২৩) বাইবেলের প্রথম ভবিষ্যদ্বাণীতে, তিনি বলেছিলেন যে তাঁর দাসদের এবং ‘সর্পের’ অর্থাৎ শয়তানের অনুসারীদের মধ্যে শত্রুতা থাকবে। (প্রকাশিত বাক্য ১২:৯; আদিপুস্তক ৩:১৫) শেষ পর্যন্ত, এই শত্রুতা একমাত্র শয়তানকে চূর্ণ করার মাধ্যমে শেষ হবে। (রোমীয় ১৬:২০) কিন্তু সেই বিচারের ফল হবে ধার্মিক মানবজাতির জন্য প্রচুর আশীর্বাদ, পৃথিবীকে শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত করা এবং বিশ্বব্যাপী এক  পরমদেশের পথ খুলে দেওয়া। (মথি ১৯:২৮) সেই সময় পর্যন্ত, যারা শয়তানের পক্ষ নেবে তারা ঈশ্বরের লোকেদের শারীরিক ও আধ্যাত্মিক মঙ্গলের প্রতি এক হুমকিস্বরূপ হবে। তাই, মাঝে মাঝে যিহোবাকে হস্তক্ষেপ করতে হবে।

ঈশ্বর দুষ্টতা দূর করার জন্য কাজ করেন

১১. কেন ঈশ্বর পৃথিবীব্যাপী এক জলপ্লাবন নিয়ে আসার বাধ্যবাধকতা অনুভব করেছিলেন?

১১ নোহের দিনের জলপ্লাবন এইরকম এক হস্তক্ষেপ ছিল। আদিপুস্তক ৬:১১, ১২ পদ বলে: “তৎকালে পৃথিবী ঈশ্বরের সাক্ষাতে ভ্রষ্ট, পৃথিবী দৌরাত্ম্যে পরিপূর্ণ ছিল। আর ঈশ্বর পৃথিবীতে দৃষ্টিপাত করিলেন, আর দেখ, সে ভ্রষ্ট হইয়াছে, কেননা পৃথিবীস্থ সমুদয় প্রাণী ভ্রষ্টাচারী হইয়াছিল।” ঈশ্বর কি নৈতিকতার যে-শেষ চিহ্ন পৃথিবীতে ছিল, তা দুষ্টদের মুছে ফেলতে দেবেন? না। যারা হিংস্রতা ও অনৈতিকতার দিকে প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়েছিল তাদের কাছ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য যিহোবা বিশ্বব্যাপী এক জলপ্লাবন নিয়ে আসার বাধ্যবাধকতা অনুভব করেছিলেন।

১২. (ক) অব্রাহামের ‘বংশ’ সম্বন্ধে যিহোবা কী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন? (খ) কেন ইমোরীয়দের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হবে?

১২ কনানীয়দের বিরুদ্ধে ঈশ্বরের বিচারও একইরকম ছিল। যিহোবা প্রকাশ করেছিলেন যে, অব্রাহামের কাছ থেকে আসা এক ‘বংশের’ মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত পরিবার আশীর্বাদ পাবে। সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিল রেখে ঈশ্বর ঘোষণা করেছিলেন যে, অব্রাহামের বংশধরদের কনান দেশ দেওয়া হবে, যেখানে ইমোরীয় নামের লোকেরা বাস করত। এই লোকেদের তাদের দেশ থেকে জোর করে উচ্ছেদ করায় ঈশ্বরকে কীভাবে ন্যায্য প্রতিপন্ন করা যেতে পারে? যিহোবা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এই উচ্ছেদ প্রায় ৪০০ বছর অর্থাৎ ‘ইমোরীয়দের অপরাধ সম্পূর্ণ’ না হওয়া পর্যন্ত করা হবে না। * (আদিপুস্তক ১২:১-৩; ১৩:১৪, ১৫; ১৫:১৩, ১৬: ২২:১৮) সেই সময়ের মধ্যে, ইমোরীয়রা নৈতিক অধঃপতনের গভীর থেকে গভীরে ডুবে গিয়েছিল। কনান প্রতিমাপূজা, রক্তপাত ও অধঃপতিত যৌন অভ্যাসগুলোর এক দেশে পরিণত হয়েছিল। (যাত্রাপুস্তক ২৩:২৪; ৩৪:১২, ১৩; গণনাপুস্তক  ৩৩:৫২) সেই দেশের অধিবাসীরা এমনকি বলি উৎসর্গের জন্য সন্তানদের পর্যন্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল। একজন পবিত্র ঈশ্বর কি তাঁর লোকেদের এইরকম দুষ্টতার মধ্যে ছেড়ে দিতে পারেন? না! তিনি ঘোষণা করেছিলেন: “দেশও অশুচি হইয়াছে; অতএব আমি উহার অপরাধ উহাকে ভোগ করাইব, এবং দেশ আপন নিবাসীদিগকে উদগীরণ করিবে।” (লেবীয় পুস্তক ১৮:২১-২৫) কিন্তু, যিহোবা বাছবিচারহীনভাবে লোকেদের হত্যা করেননি। রাহব ও গিবিয়োনীয়দের মতো উত্তম মনোভাবের কনানীয়রা বেঁচে গিয়েছিল।—যিহোশূয়ের পুস্তক ৬:২৫; ৯:৩-২৭.

তাঁর নামের জন্য যুদ্ধ করা

১৩, ১৪. (ক) কেন যিহোবা তাঁর নামকে পবিত্রীকৃত করার জন্য বাধ্য ছিলেন? (খ) কীভাবে যিহোবা তাঁর নামের কলঙ্ক দূর করেছিলেন?

১৩ যেহেতু যিহোবা পবিত্র, তাই তাঁর নামও পবিত্র। (লেবীয় পুস্তক ২২:৩২) যিশু তাঁর শিষ্যদের প্রার্থনা করতে শিখিয়েছিলেন: “তোমার নাম পবিত্র বলিয়া মান্য হউক।” (মথি ৬:৯) এদনের বিদ্রোহ ঈশ্বরের নামকে অপবিত্র করেছিল, ঈশ্বরের সুনাম ও শাসন করার পদ্ধতি সম্বন্ধে সন্দেহ জাগিয়েছিল। যিহোবা এইরকম অপবাদ ও বিদ্রোহ কখনোই ক্ষমা করতে পারেন না। তিনি তাঁর নামকে কলঙ্কমুক্ত করতে বাধ্য ছিলেন।—যিশাইয় ৪৮:১১.

১৪ আবারও, ইস্রায়েলীয়দের কথা বিবেচনা করুন। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা মিশরে দাস ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত অব্রাহামের কাছে করা ঈশ্বরের এই প্রতিজ্ঞা যে, তার বংশের মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত পরিবার আশীর্বাদ পাবে, তা অর্থহীন মনে হয়েছিল। কিন্তু, তাদের মুক্ত করে ও একটা জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যিহোবা তাঁর নামের কলঙ্ক দূর করেছিলেন। তাই, ভাববাদী দানিয়েল প্রার্থনায় পুনরায় স্মরণ করেছিলেন: “হে প্রভু, আমাদের ঈশ্বর, তুমি বলবান হস্ত দ্বারা মিসর দেশ হইতে আপন প্রজাদিগকে আনিয়া কীর্ত্তিলাভ করিয়াছ।”—দানিয়েল ৯:১৫.

১৫. কেন যিহোবা বাবিলের বন্দিত্ব থেকে যিহুদিদের উদ্ধার করেছিলেন?

১৫ আগ্রহের বিষয় হল যে, দানিয়েল এমন এক সময়ে এভাবে প্রার্থনা করেছিলেন যখন যিহুদিদের দরকার হয়েছিল যেন যিহোবা তাঁর নামের জন্য আবারও কাজ করেন। অবাধ্য যিহুদিরা বন্দিত্বে ছিল আর এবার বাবিলে। তাদের নিজেদের রাজধানী যিরূশালেম ধ্বংসাবস্থায় রয়েছে। দানিয়েল জানতেন যে, যিহুদিদের নিজ  মাতৃভূমিতে পুনর্স্থাপিত করা যিহোবার নামকে মহিমান্বিত করবে। তাই দানিয়েল প্রার্থনা করেছিলেন: “হে প্রভু [“যিহোবা,” NW], ক্ষমা কর; হে প্রভু [“যিহোবা,” NW], মনোযোগ কর ও কর্ম্ম কর, বিলম্ব করিও না; হে আমার ঈশ্বর, তোমার নিজের অনুরোধে কার্য্য কর, কেননা তোমার নগরের ও তোমার প্রজাগণের উপরে তোমার নাম কীর্ত্তিত হইয়াছে।” (বাঁকা অক্ষরে মুদ্রণ আমাদের।)—দানিয়েল ৯:১৮, ১৯.

তাঁর লোকেদের জন্য যুদ্ধ করা

১৬. ব্যাখ্যা করুন যে, কেন যিহোবার তাঁর নাম রক্ষা করতে আগ্রহী হওয়া বোঝায় না যে তিনি আবেগহীন ও স্বার্থপর।

১৬ যিহোবা তাঁর নাম রক্ষা করতে আগ্রহী বলতে কি এই বোঝায় যে তিনি আবেগহীন ও স্বার্থপর? না, কারণ তাঁর পবিত্রতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি তাঁর প্রেম অনুযায়ী কাজ করায়, তিনি তাঁর লোকেদের রক্ষা করেন। আদিপুস্তক ১৪ অধ্যায় বিবেচনা করুন। সেখানে আমরা চার জন আক্রমণকারী রাজা সম্বন্ধে পড়ি, যারা অব্রাহামের ভাইপো লোট ও সেইসঙ্গে লোটের পরিবারকে হরণ করেছিল। ঈশ্বরের সাহায্যে, অব্রাহাম বিরাট সংখ্যক বাহিনীগুলোকে বিস্ময়করভাবে পরাজিত করেছিলেন! এই বিজয়ের বিবরণই সম্ভবত “সদাপ্রভুর যুদ্ধপুস্তকে” প্রথম লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, এটা সম্ভবত এমন এক পুস্তক যেখানে অন্য কিছু সামরিক লড়াইয়ের বিষয়েও লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যেগুলো বাইবেলে লেখা হয়নি। (গণনাপুস্তক ২১:১৪) পরে আরও অনেক বিজয় ঘটেছিল।

১৭. কোন বিষয়টা দেখায় যে, ইস্রায়েলীয়রা কনানে ঢোকার পর যিহোবা তাদের জন্য লড়াই করেছিলেন? উদাহরণ দিন।

১৭ ইস্রায়েলীয়রা কনান দেশে ঢোকার অল্প কিছুদিন আগে, মোশি তাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন: “তোমাদের ঈশ্বর সদাপ্রভু যিনি তোমাদের অগ্রগামী, তিনি মিসর দেশে . . . তোমাদের জন্য যে সমস্ত কার্য্য করিয়াছিলেন, তদনুসারে তোমাদের জন্য যুদ্ধ করিবেন।” (দ্বিতীয় বিবরণ ১:৩০; ২০:১) মোশির পরবর্তী নেতা যিহোশূয় থেকে শুরু করে বিচারকর্তৃগণ এবং যিহূদার বিশ্বস্ত রাজাদের রাজত্বের সময়কালে, যিহোবা তাঁর লোকেদের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন, তাদের শত্রুদের ওপর তাদেরকে চমকপ্রদভাবে জয়ী করেছিলেন।—যিহোশূয়ের পুস্তক ১০:১-১৪; বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ ৪:১২-১৭; ২ শমূয়েল ৫:১৭-২১.

১৮. (ক) যিহোবার যে পরিবর্তন হয়নি সেইজন্য আমরা কেন কৃতজ্ঞ হতে পারি? (খ) কী হবে যখন আদিপুস্তক ৩:১৫ পদে বর্ণিত শত্রুতা চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছাবে?

 ১৮ যিহোবার পরিবর্তন হয়নি; এই গ্রহকে এক শান্তিপূর্ণ পরমদেশ বানানোর ব্যাপারে তাঁর উদ্দেশ্যও পরিবর্তিত হয়নি। (আদিপুস্তক ১:২৭, ২৮) ঈশ্বর এখনও দুষ্টতাকে ঘৃণা করেন। একই সময়ে, তিনি তাঁর লোকেদের অনেক ভালবাসেন এবং শীঘ্রই তাদের জন্য কাজ করবেন। (গীতসংহিতা ১১:৭) বস্তুত, আদিপুস্তক ৩:১৫ পদে বর্ণিত শত্রুতা নিকট ভবিষ্যতে এক নাটকীয় ও চরম সন্ধিক্ষণে পৌঁছাবে বলে আশা করা হয়। তাঁর নামকে পবিত্র করার ও তাঁর লোকেদের রক্ষা করার জন্য যিহোবা আবারও “যুদ্ধবীর” হবেন।—সখরিয় ১৪:৩; প্রকাশিত বাক্য ১৬:১৪, ১৬.

১৯. (ক) ঈশ্বরের ধ্বংসাত্মক শক্তির ব্যবহার কেন আমাদেরকে তাঁর নিকটবর্তী করতে পারে, সেই বিষয়ে উদাহরণ সহ বর্ণনা করুন। (খ) ঈশ্বরের লড়াই করার ইচ্ছা আমাদের ওপর কেমন প্রভাব ফেলা উচিত?

১৯ একটা উদাহরণ বিবেচনা করুন: মনে করুন যে একজন ব্যক্তির পরিবারকে একটা হিংস্র পশু আক্রমণ করেছে আর তাই সেই ব্যক্তি লড়াই করে হিংস্র পশুটাকে হত্যা করেন। আপনি কি আশা করবেন যে তার স্ত্রী ও সন্তানেরা এই কাজের জন্য তার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে? এর বিপরীতে, আপনি আশা করবেন যে তাদের জন্য তার নিঃস্বার্থ প্রেম তাদের হৃদয়কে নাড়া দেবে। একইভাবে, ঈশ্বরের  ধ্বংসাত্মক শক্তির ব্যবহার দেখে আমাদের দূরে সরে যাওয়া উচিত নয়। আমাদের রক্ষা করার জন্য তাঁর লড়াই করার ইচ্ছা দেখে তাঁর প্রতি আমাদের প্রেম বৃদ্ধি হওয়া উচিত। সেইসঙ্গে তাঁর অসীম শক্তির প্রতি আমাদের সম্মান আরও গভীর হওয়া উচিত। এভাবে, আমরা “ভক্তি ও ভয় সহকারে ঈশ্বরের প্রীতিজনক আরাধনা করিতে পারি।”—ইব্রীয় ১২:২৮.

‘যুদ্ধবীরের’ নিকটবর্তী হোন

২০. আমরা যখন ঐশিক যুদ্ধ সম্বন্ধে বাইবেলের বিবরণগুলো পড়ি, যা আমরা হয়তো পুরোপুরি বুঝতে পারি না, তখন আমাদের কীভাবে সাড়া দেওয়া উচিত এবং কেন?

২০ অবশ্য, বাইবেল প্রতিটা ক্ষেত্রে ঐশিক যুদ্ধের বিষয়ে যিহোবার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে না। কিন্তু আমরা এই বিষয়ে সবসময় নিশ্চিত থাকতে পারি: যিহোবা কখনোই অন্যায়, বিদ্বেষপরায়ণ বা নিষ্ঠুরভাবে ধ্বংসাত্মক শক্তিকে ব্যবহার করেন না। প্রায়ই, বাইবেলের একটা বিবরণের প্রসঙ্গ বা পটভূমির কিছু তথ্য বিবেচনা করা আমাদের বিষয়গুলোর পারস্পরিক সংযোগ দেখতে সাহায্য করতে পারে। (হিতোপদেশ ১৮:১৩) এমনকি আমাদের কাছে যখন সমস্ত বিস্তারিত বর্ণনা থাকেও না, তখনও যিহোবা সম্বন্ধে আরও বেশি জানা ও তাঁর মূল্যবান গুণগুলো নিয়ে ধ্যান করা, আমাদের মনে জাগতে পারে এমন যেকোনো সন্দেহের অবসান ঘটাতে সাহায্য করতে পারে। আমরা যখন তা করি, তখন আমরা দেখি যে আমাদের ঈশ্বর, যিহোবার ওপর নির্ভর করার প্রচুর কারণ আমাদের রয়েছে।—ইয়োব ৩৪:১২.

২১. কখনও কখনও যিহোবা “যুদ্ধবীর” হলেও তিনি আসলে কেমন ব্যক্তি?

২১ যদিও পরিস্থিতির প্রয়োজনে যিহোবা “যুদ্ধবীর” কিন্তু সেটার মানে এই নয় যে, তিনি যুদ্ধপ্রিয় ব্যক্তি। স্বর্গীয় রথ সম্বন্ধে যিহিষ্কেলের দর্শনে, যিহোবাকে তাঁর শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তৈরি হচ্ছেন বলে চিত্রিত করা হয়েছে। এ ছাড়া, যিহিষ্কেল ঈশ্বরকে ঘিরে এক রংধনুও দেখেছিলেন, যা শান্তির প্রতীক। (আদিপুস্তক ৯:১৩; যিহিষ্কেল ১:২৮; প্রকাশিত বাক্য ৪:৩) স্পষ্টতই, যিহোবা হলেন শান্ত এবং তিনি শান্তি বজায় রাখেন। প্রেরিত যোহন লিখেছিলেন “ঈশ্বর প্রেম।” (১ যোহন ৪:৮) যিহোবার সমস্ত গুণ সঠিক ভারসাম্য বজায় রেখে বিদ্যমান। অতএব, আমরা এইরকম একজন শক্তিশালী অথচ প্রেমময় ঈশ্বরের নিকটবর্তী হতে পেরে কত বড় সুযোগই না পেয়েছি!

^ অনু. 1 যিহুদি ইতিহাসবেত্তা জোসেফাসের মতে, ইব্রীয়দের “পিছনে ৬০০ রথ ও সেইসঙ্গে ৫০,০০০ অশ্বারোহী ও ২,০০,০০০ ভারী বর্ম-আচ্ছাদিত পদাতিক সৈন্যবাহিনী ধাওয়া করে আসছিল।”—যিহুদি নিদর্শনগুলো (ইংরেজি), ২য়, ৩২৪ [১৫, ৩].

^ অনু. 12 স্পষ্টতই, এখানে “ইমোরীয়রা” শব্দটি কনানের সমস্ত লোকেদের অন্তর্ভুক্ত করে।—দ্বিতীয় বিবরণ ১:৬-৮, ১৯-২১, ২৭; যিহোশূয়ের পুস্তক ২৪:১৫, ১৮.