সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

যিহোবার নিকটবর্তী হোন

 অধ্যায় ১

“এই দেখ, ইনিই আমাদের ঈশ্বর”

“এই দেখ, ইনিই আমাদের ঈশ্বর”

১, ২. (ক) ঈশ্বরকে আপনি কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে চান? (খ) মোশি ঈশ্বরকে কী জিজ্ঞেস করেছিলেন?

ঈশ্বরের সঙ্গে কথাবার্তা বলার বিষয়টা কি আপনি চিন্তা করতে পারেন? এইরকম চিন্তাই মনে সশ্রদ্ধ ভয় জাগিয়ে তোলে যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সার্বভৌম ব্যক্তি আপনার সঙ্গে কথা বলছেন! প্রথমে আপনি দ্বিধাবোধ করলেন কিন্তু পরে কোনোরকমে উত্তর দিতে পারলেন। তিনি শুনলেন, উত্তর দিলেন আর এমনকি এমন মনোভাব দেখালেন, যাতে আপনি যেকোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। এখন, আপনি কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবেন?

অনেক অনেক দিন আগে, একজন ব্যক্তি ঠিক এইরকম এক অবস্থায় ছিলেন। তার নাম ছিল মোশি। তিনি ঈশ্বরকে যে-প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবেন বলে ঠিক করেছিলেন, তা হয়তো আপনাকে অবাক করতে পারে। তিনি নিজের সম্বন্ধে, তার ভবিষ্যতের বিষয়ে অথবা মানবজাতির অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেননি। পরিবর্তে, তিনি ঈশ্বরের নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। আপনার কাছে হয়তো সেটা অদ্ভুত বলে মনে হতে পারে কারণ মোশি ইতিমধ্যেই ঈশ্বরের ব্যক্তিগত নাম জানতেন। তা হলে, নিশ্চয়ই তার প্রশ্নের এক গভীর অর্থ ছিল। সত্যি বলতে কী, মোশি যে-প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করতে পারতেন, সেগুলোর মধ্যে এটা ছিল সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এর উত্তর আমাদের সকলকে প্রভাবিত করে। এটা আপনাকে ঈশ্বরের নিকটবর্তী হওয়ার বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করতে পারে। কীভাবে? আসুন আমরা সেই উল্লেখযোগ্য কথাবার্তার দিকে একটু মনোযোগ দিই।

৩, ৪. কোন ঘটনাগুলো মোশিকে ঈশ্বরের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পরিচালিত করেছিল আর সেই কথাবার্তার মূল বিষয় কী ছিল?

মোশির বয়স ছিল ৮০ বছর। তিনি চার দশক ধরে তার লোকেদের অর্থাৎ ইস্রায়েলীয়দের থেকে পৃথক ছিলেন, যারা মিশরে দাস ছিল। একদিন, তিনি তার শ্বশুরের পশুপাল দেখাশোনা করার সময় এক অস্বাভাবিক বিস্ময়কর ঘটনা দেখেছিলেন। একটা ঝোপে আগুন জ্বলছে কিন্তু সেটা পুড়ে যাচ্ছে না। এটা শুধুই জ্বলছিল, পাহাড়ের ঢালে একটা বাতিঘরের মতো আলো দিচ্ছিল। মোশি দেখার জন্য এগিয়ে  গিয়েছিলেন। তিনি কত অবাকই না হয়েছিলেন, যখন সেই আগুনের মধ্যে থেকে একটি স্বর তার সঙ্গে কথা বলেছিল! এরপর, একজন দূত মুখপাত্রের মাধ্যমে, ঈশ্বর ও মোশি দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলেছিলেন। আর আপনি হয়তো জানেন যে, ঈশ্বর সেখানে দ্বিধাগ্রস্ত মোশিকে তার শান্তিপূর্ণ জীবন ছেড়ে ইস্রায়েলীয়দের দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য মিশরে ফিরে যাওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন।—যাত্রাপুস্তক ৩:১-১২.

সেই সময়, মোশি ঈশ্বরকে যেকোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারতেন। কিন্তু, লক্ষ করুন যে তিনি কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলেন: “দেখ, আমি যখন ইস্রায়েল-সন্তানদের নিকটে গিয়া বলিব, তোমাদের পিতৃপুরুষদের ঈশ্বর তোমাদের নিকটে আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন, তখন যদি তাহারা জিজ্ঞাসা করে, তাঁহার নাম কি? তবে তাহাদিগকে কি বলিব?”—যাত্রাপুস্তক ৩:১৩.

৫, ৬. (ক) মোশির প্রশ্ন আমাদের কোন সাধারণ, অতি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সম্বন্ধে শিক্ষা দেয়? (খ) ঈশ্বরের ব্যক্তিগত নাম নিয়ে কোন নিন্দনীয় বিষয় করা হয়েছে? (গ) ঈশ্বর যে মানবজাতির কাছে তাঁর নাম প্রকাশ করেছেন, সেটা কেন এত তাৎপর্যপূর্ণ?

সেই প্রশ্ন সবচেয়ে প্রথমে আমাদের শেখায় যে, ঈশ্বরের একটা নাম রয়েছে। এই সাধারণ সত্যটাকে আমরা অবশ্যই হালকাভাবে নেব না। কিন্তু, অনেকেই নিয়ে থাকে। অসংখ্য বাইবেল অনুবাদ থেকে ঈশ্বরের ব্যক্তিগত নামকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে “সদাপ্রভু” এবং “ঈশ্বর” উপাধিগুলো দেওয়া হয়েছে। ধর্মের নামে যা কিছু করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে এটা হল সবচেয়ে দুঃখজনক ও নিন্দনীয় একটা বিষয়। সাধারণত, আপনি যখন কারও সঙ্গে পরিচিত হন, তখন প্রথমে আপনি কী করেন? আপনি কি তার নাম জিজ্ঞেস করেন না? ঈশ্বরকে জানার ক্ষেত্রে একই বিষয় প্রযোজ্য। তিনি এক নামহীন, গম্ভীর প্রকৃতির সত্তা নন, যাঁকে জানা যায় না বা বোঝা যায় না। অদৃশ্য হলেও, তিনি একজন ব্যক্তি আর তাঁর একটা নাম রয়েছে, যেটা হল যিহোবা।

এ ছাড়া, ঈশ্বর যখন তাঁর ব্যক্তিগত নাম প্রকাশ করেন, তখন নিকট ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য ও রোমাঞ্চকর কিছু রয়েছে। তিনি তাঁকে জানার জন্য আমাদের আমন্ত্রণ জানান। তিনি চান যেন আমরা জীবনে সর্বোত্তম বিষয়টা—তাঁর নিকটবর্তী হওয়া—বেছে নিতে পারি। কিন্তু, যিহোবা তাঁর নাম বলার চেয়েও আরও বেশি কিছু করেছেন। এই নাম যে-ব্যক্তিকে প্রতিনিধিত্ব করে, তাঁর সম্বন্ধেও তিনি আমাদের শিখিয়েছেন।

 ঈশ্বরের নামের অর্থ

৭. (ক) ঈশ্বরের ব্যক্তিগত নামের অর্থ কী? (খ) মোশি যখন ঈশ্বরকে তাঁর নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন, তখন তিনি আসলে কী জানতে চেয়েছিলেন?

যিহোবা নিজে তাঁর নাম স্থির করেন, যেটার অর্থ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। “যিহোবা” নামের অর্থ হল, “তিনি অস্তিত্বে আনেন।” পুরো নিখিলবিশ্বে তিনি হলেন অদ্বিতীয়, কারণ তিনি সমস্তকিছু অস্তিত্বে এনেছিলেন এবং তিনি তাঁর সমস্ত উদ্দেশ্য পরিপূণ করেন। এই তথ্য মনের মধ্যে সশ্রদ্ধ ভয় জাগিয়ে তোলে। কিন্তু ঈশ্বরের নামের অর্থের আর কোনো দিক কি রয়েছে? স্পষ্টতই, মোশি আরও বেশি কিছু জানতে চেয়েছিলেন। আসলে, তিনি জানতেন যে, যিহোবা হলেন সৃষ্টিকর্তা আর তিনি ঈশ্বরের নামও জানতেন। ঐশিক নাম নতুন কিছু ছিল না। লোকেরা শত শত বছর ধরে তা ব্যবহার করছিল। নিঃসন্দেহে, ঈশ্বরের নাম জিজ্ঞেস করে মোশি সেই নাম যে-ব্যক্তিকে প্রতিনিধিত্ব করে, তাঁর সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছিলেন। আসলে, তিনি বলছিলেন: ‘আপনার লোক ইস্রায়েলকে আপনার সম্বন্ধে আমি এমন কী বলতে পারি, যা আপনার ওপর তাদের বিশ্বাস গড়ে তুলবে, যা তাদের মধ্যে এই প্রত্যয় জন্মাবে যে আপনি সত্যিই তাদের উদ্ধার করবেন?’

৮, ৯. (ক) যিহোবা কীভাবে মোশির প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন আর তাঁর উত্তরকে প্রায়ই যেভাবে অনুবাদ করা হয়েছে, তাতে কী ভুল রয়েছে? (খ) “আমি যা হতে চাই, তা-ই হই,” এই উক্তির অর্থ কী?

উত্তরে যিহোবা তাঁর ব্যক্তিত্বের এক অপূর্ব দিক প্রকাশ করেছিলেন, যা তাঁর নামের অর্থের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তিনি মোশিকে বলেছিলেন: “আমি যা হতে চাই, তা-ই হই।” (যাত্রাপুস্তক ৩:১৪, NW) অনেক বাইবেল অনুবাদে এভাবে বলা হয়: “আমি যে আছি সেই আছি।” কিন্তু, সতর্কতার সঙ্গে করা অনুবাদ দেখায় যে, ঈশ্বর শুধু তাঁর নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করছিলেন না। বরং, সেই নাম কী অর্থ প্রকাশ করে, তা যিহোবা মোশিকে—এবং আরও ব্যাপক অর্থে আমাদের সকলকে—শিক্ষা দিচ্ছিলেন যে, তাঁর প্রতিজ্ঞাগুলো পরিপূর্ণ করার জন্য যা-কিছু দরকার ছিল, তিনি “তা-ই” হন বা নিজেকে সেটাতে পরিণত করা বেছে নেন। জে. বি. রদারহ্যামের অনুবাদ এই পদটিকে সঠিকভাবেই অনুবাদ করে: “আমার যা ইচ্ছা আমি তা-ই হব।” বাইবেলের ইব্রীয় ভাষার একজন পণ্ডিত এই বাক্যাংশটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন: “পরিস্থিতি বা প্রয়োজন যাই হোক না কেন, . . . ঈশ্বর সেই প্রয়োজনের সমাধান ‘হবেন।’”

 ইস্রায়েলীয়দের জন্য সেটার অর্থ কী ছিল? তাদের সামনে যে-বাধাই আসুক না কেন ও যত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই তারা পড়ুক না কেন, দাসত্ব থেকে তাদের উদ্ধার করার ও প্রতিজ্ঞাত দেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য যা কিছুই হওয়ার দরকার, যিহোবা তা-ই হবেন। সত্যিই সেই নাম ঈশ্বরের ওপর আস্থা জাগিয়ে তুলেছিল। এটি আজকে আমাদের জন্যও একই বিষয় করতে পারে। (গীতসংহিতা ৯:১০) কেন?

১০, ১১. যিহোবার নাম কীভাবে তাঁকে সবচেয়ে নমনীয় ও সর্বোত্তম পিতা হিসেবে চিন্তা করতে আমাদের আমন্ত্রণ জানায়? উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করুন।

১০ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: বাবামারা জানে যে তাদের সন্তানদের যত্ন নেওয়ার জন্য তাদের কতটা নমনীয় হতে হয়। শুধু একটা দিনের মধ্যেই, একজন বাবা অথবা মাকে হয়তো একজন নার্স, রাঁধুনি, শিক্ষক, শাসনকারী, বিচারক এবং আরও অনেক কিছু হিসেবে কাজ করতে হতে পারে। তারা যে-ব্যাপক ভূমিকা পূর্ণ করবে বলে আশা করা হয়, তাতে অনেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বাবামারা তাদের ওপর তাদের সন্তানদের পূর্ণ বিশ্বাস লক্ষ করে, যারা কখনোই এইরকম বিষয়ে সন্দেহ করে না যে, বাবা অথবা মা ক্ষত ভাল করে দিতে, সমস্ত ঝগড়া মেটাতে, ভাঙা খেলনা জোড়া লাগাতে ও তাদের অসীম কৌতূহলী মনে যে-প্রশ্নই আসুক না কেন, সেটার উত্তর দিতে পারে কি না। কিছু বাবামা তাদের সীমাবদ্ধতাগুলোর জন্য নিজেদের অযোগ্য ও মাঝে মাঝে ব্যর্থ মনে করে। তারা এগুলোর মধ্যে অনেক ভূমিকাই পূর্ণ করার ব্যাপারে নিজেদের একেবারে অযোগ্য মনে করে।

১১ যিহোবাও একজন প্রেমময় পিতা। কিন্তু, তিনি তাঁর নিজের নিখুঁত মানগুলোর মধ্যে থেকে, তাঁর পার্থিব সন্তানদের সবচেয়ে ভালভাবে যত্ন নেওয়ার জন্য এমন কিছু নেই, যা তিনি হতে পারেন না। তাই তাঁর যিহোবা নামটি, তাঁকে সবচেয়ে উত্তম পিতা হিসেবে ভাবতে আমাদের আমন্ত্রণ জানায়। (যাকোব ১:১৭) মোশি ও অন্য সমস্ত বিশ্বস্ত ইস্রায়েলীয় শীঘ্রই জানতে পেরেছিল যে, যিহোবা তাঁর নামে যথার্থ। তিনি যখন নিজেকে এক অজেয় সেনাপতি, সমস্ত প্রাকৃতিক উপাদানের কর্তা, অতুলনীয় ব্যবস্থাপক, বিচারক, স্থপতি, খাদ্য ও জল সরবরাহকারী, জামা ও জুতা সংরক্ষণকারী এবং আরও অনেক কিছুতে পরিণত করেছিলেন, তখন তারা সশ্রদ্ধ ভয়ের সঙ্গে তা দেখেছিল।

১২. যিহোবার প্রতি ফরৌণের মনোভাব কীভাবে মোশির চেয়ে আলাদা ছিল?

১২ এভাবে ঈশ্বর তাঁর ব্যক্তিগত নাম জানিয়েছেন, এই নাম যাকে প্রতিনিধিত্ব করে  তাঁর সম্বন্ধে অপূর্ব বিষয়গুলো আমাদের জানিয়েছেন আর এমনকি দেখিয়েছেন যে, তিনি নিজের বিষয়ে যা বলেন, তা যথার্থ। নিঃসন্দেহে, ঈশ্বর চান যেন আমরা তাঁকে জানি। আমরা কীভাবে সাড়া দিতে পারি? মোশি ঈশ্বরকে জানতে চেয়েছিলেন। সেই আকুল আকাঙ্ক্ষা মোশির জীবনধারাকে পরিচালিত করেছিল এবং তার স্বর্গীয় পিতার আরও নিকটবর্তী করেছিল। (গণনাপুস্তক ১২:৬-৮; ইব্রীয় ১১:২৭) কিন্তু দুঃখের বিষয় হল যে, মোশির সময়ের খুব কম লোকেরই এইরকম আকাঙ্ক্ষা ছিল। মোশি যখন ফরৌণের কাছে নাম উল্লেখ করে যিহোবার কথা বলেছিলেন, তখন উদ্ধত মিশরীয় রাজা বলেছিলেন: “সদাপ্রভু [“যিহোবা,” NW] কে?” (যাত্রাপুস্তক ৫:২) যিহোবা সম্বন্ধে ফরৌণ আরও বেশি জানতে চাননি। বরং, তিনি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ইস্রায়েলের ঈশ্বরকে গুরুত্বহীন ও অবান্তর হিসেবে অগ্রাহ্য করেছিলেন। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি আজকেও খুব সাধারণ। এটা সমস্ত সত্যের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা সত্য যে, যিহোবাই হলেন সার্বভৌম প্রভু, সেই বিষয়ে লোকেদের অন্ধ করে রাখে।

সার্বভৌম প্রভু যিহোবা

১৩, ১৪. (ক) বাইবেলে কেন যিহোবাকে বিভিন্ন উপাধি দেওয়া হয়েছে আর সেগুলোর কয়েকটা কী? (“ যিহোবার কিছু উপাধি” শিরোনামের বাক্স দেখুন।) (খ) কেন একমাত্র যিহোবাই “সার্বভৌম প্রভু” বলে অভিহিত হওয়ার যোগ্য?

১৩ যিহোবা এতটাই নমনীয় যে তিনি উপযুক্তভাবেই শাস্ত্রে উল্লেখিত বিবিধ উপাধি ধারণ করেন। এগুলো তাঁর ব্যক্তিগত নামের ওপর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে আসে না; বরং এগুলো তাঁর নাম কী প্রতিনিধিত্ব করে তা প্রকাশ করে, সেই বিষয়ে আমাদের আরও শিক্ষা দেয়। যেমন, তাঁকে “সার্বভৌম প্রভু যিহোবা” (NW) বলা হয়। (২ শমূয়েল ৭:২২) এই উচ্চ উপাধি, যেটা বাইবেলে শত শত বার রয়েছে সেটা যিহোবার পদমর্যাদা সম্বন্ধে আমাদের জানায়। একমাত্র তাঁরই সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শাসক হওয়ার অধিকার রয়েছে। কেন, তা লক্ষ করুন।

১৪ সৃষ্টিকর্তা হিসেবে যিহোবা অদ্বিতীয়। প্রকাশিত বাক্য ৪:১১ পদ বলে: “হে আমাদের প্রভু [“যিহোবা,” NW] ও আমাদের ঈশ্বর, তুমিই প্রতাপ ও সমাদর ও পরাক্রম গ্রহণের যোগ্য; কেননা তুমিই সকলের সৃষ্টি করিয়াছ, এবং তোমার ইচ্ছাহেতু সকলই অস্তিত্বপ্রাপ্ত ও সৃষ্ট হইয়াছে।” এই মর্যাদাপূর্ণ শব্দগুলো আর অন্য কোনো সত্তার প্রতি প্রযোজ্য নয়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্তকিছু তাদের অস্তিত্বের জন্য  যিহোবার কাছে ঋণী! অতএব কোনো সন্দেহ নেই যে, যিহোবা সমাদর, পরাক্রম ও প্রতাপ গ্রহণের যোগ্য, যা উপযুক্তভাবে সার্বভৌম প্রভু ও সমস্তকিছুর সৃষ্টিকর্তার অধিকারভুক্ত।

১৫. কেন যিহোবাকে “যুগপর্য্যায়ের রাজা” বলা হয়?

১৫ আরেকটা উপাধি, যা শুধু যিহোবার প্রতিই প্রযোজ্য তা হল, “যুগপর্য্যায়ের রাজা।” (১ তীমথিয় ১:১৭; প্রকাশিত বাক্য ১৫:৩, পাদটীকা) এর মানে কী? এটা আমাদের সীমিত মানসিক শক্তিতে বোঝা কঠিন কিন্তু যিহোবা অতীত ও ভবিষ্যৎ উভয় দিকেই অনন্তকালস্থায়ী। গীতসংহিতা ৯০:২ পদ বলে: “এমন কি, অনাদিকাল হইতে অনন্তকাল তুমিই ঈশ্বর।” অতএব যিহোবার কোনো শুরু নেই; তিনি সবসময়ই ছিলেন। তাঁকে উপযুক্তভাবেই বলা যায়, “অনেক দিনের বৃদ্ধ”—বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কেউ বা কোনো কিছু অস্তিত্বে আসার আগেই তিনি অনন্তকালের জন্য অস্তিত্বে ছিলেন! (দানিয়েল ৭:৯, ১৩, ২২) সার্বভৌম প্রভু হিসেবে তাঁর অধিকার নিয়ে কে ন্যায়সংগতভাবে প্রশ্ন করতে পারে?

১৬, ১৭. (ক) কেন আমরা যিহোবাকে দেখতে পাই না এবং তাতে কেন আমাদের অবাক হওয়া উচিত নয়? (খ) আমরা যা কিছু দেখতে ও স্পর্শ করতে পারি, সেগুলোর চেয়ে যিহোবা কোন অর্থে আরও বেশি বাস্তব?

১৬ কিন্তু, ফরৌণের মতো কেউ কেউ সেই অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একটা সমস্যা হল যে, অসিদ্ধ মানুষেরা যে-বিষয়গুলো চোখ দিয়ে দেখতে পারে, সেগুলোর ওপর অতিরিক্ত আস্থা রাখে। আমরা সার্বভৌম প্রভুকে দেখতে পারি না। তিনি একজন আত্মিক সত্তা, মানুষের দৃষ্টিতে অদৃশ্য। (যোহন ৪:২৪) সেইসঙ্গে, একজন রক্তমাংসের মানুষকে যদি সরাসরি যিহোবা ঈশ্বরের একেবারে সামনে দাঁড়াতে হয়, তা হলে সেটার ফল মারাত্মক হবে। যিহোবা নিজে মোশিকে বলেছিলেন: “তুমি আমার মুখ দেখিতে পাইবে না, কেননা মনুষ্য আমাকে দেখিলে বাঁচিতে পারে না।”—যাত্রাপুস্তক ৩৩:২০; যোহন ১:১৮.

১৭ এতে আমাদের অবাক হওয়া উচিত নয়। স্পষ্টতই, মোশি একজন দূত প্রতিনিধির মাধ্যমে যিহোবার প্রতাপের একটা অংশ মাত্র দেখেছিলেন। ফল কী হয়েছিল? পরবর্তী কিছু সময়ের জন্য মোশির মুখ “উজ্জ্বল” ছিল। ইস্রায়েলীয়রা এমনকি সরাসরি মোশির মুখের দিকে তাকাতেও ভয় পেয়েছিল। (যাত্রাপুস্তক ৩৩:২১-২৩; ৩৪:৫-৭, ২৯, ৩০) অতএব এটা নিশ্চিত যে, সম্পূর্ণ প্রতাপান্বিত অবস্থায় সার্বভৌম  প্রভুর দিকে কোনো নগণ্য মানুষই তাকাতে পারবে না! এর মানে কি এই যে, আমরা যা দেখতে ও স্পর্শ করতে পারি সেগুলোর মতো তিনি বাস্তব নন? না, আমরা দেখতে পাই না এমন অনেক কিছুর অস্তিত্বকেই মেনে নিই যেমন, বাতাস, বেতার তরঙ্গ ও চিন্তাভাবনা। এ ছাড়া, যিহোবা হলেন স্থায়ী এবং সময়ের ধারায়—এমনকি তা অগণিত কোটি কোটি বছর হলেও—প্রভাবিত হন না! এই অর্থে, আমরা স্পর্শ করতে বা দেখতে পাই এমন যেকোনো কিছুর চেয়ে তিনি আরও বেশি বাস্তব কারণ প্রাকৃতিক বিষয় নির্দিষ্ট কাল ও ক্ষয়ের অধীন। (মথি ৬:১৯) কিন্তু তাই বলে, তাঁর সম্বন্ধে কি আমাদের চিন্তা করা উচিত যে তিনি কোনো দুর্বোধ্য, নৈর্ব্যক্তিক শক্তি বা এক অস্পষ্ট স্রষ্টা? আসুন আমরা তা দেখি।

একজন ব্যক্তিত্ববান ঈশ্বর

১৮. যিহিষ্কেলকে কোন দর্শন দেওয়া হয়েছিল আর যিহোবার সামনে চারটে “প্রাণীর” মুখ কী চিত্রিত করে?

১৮ যদিও আমরা ঈশ্বরকে দেখতে পাই না, তবুও বাইবেলে কিছু রোমাঞ্চকর ঘটনা রয়েছে, যেগুলো আমাদের স্বর্গ সম্বন্ধে বিভিন্ন আভাস পেতে সাহায্য করে। যিহিষ্কেলের প্রথম অধ্যায় হল একটা উদাহরণ। যিহিষ্কেলকে যিহোবার স্বর্গীয় সংগঠনের একটা দর্শন দেওয়া হয়েছিল, যেখানে তিনি বিরাট এক স্বর্গীয় রথ দেখেছিলেন। বিশেষ করে যিহোবার চারিদিকে যে-শক্তিশালী আত্মিক প্রাণীরা রয়েছে, তাদের বর্ণনা মনে দাগ কাটে। (যিহিষ্কেল ১:৪-১০, NW) এই ‘প্রাণীরা’ যিহোবার খুব কাছে রয়েছে আর তাদের বাহ্যিক চেহারা তারা যে-ঈশ্বরের সেবা করে, তাঁর সম্বন্ধে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানায়। প্রত্যেকের চার রকমের মুখ রয়েছে আর সেগুলো একটা ষাঁড়ের, একটা সিংহের, একটা ঈগলের ও একটা মানুষের। এগুলো স্পষ্টতই যিহোবার ব্যক্তিত্বের চারটে উল্লেখযোগ্য গুণকে চিত্রিত করে।—প্রকাশিত বাক্য ৪:৬-৮, ১০.

১৯. কোন গুণকে প্রতিনিধিত্ব করা হয় (ক) ষাঁড়ের মুখ দ্বারা? (খ) সিংহের মুখ দ্বারা? (গ) ঈগলের মুখ দ্বারা? ও (ঘ) মানুষের মুখ দ্বারা?

১৯ বাইবেলে, ষাঁড় প্রায়ই শক্তিকে প্রতিনিধিত্ব করে আর তা উপযুক্ত কারণ এটা অত্যন্ত শক্তিশালী একটা পশু। অন্যদিকে, একটা সিংহ প্রায়ই ন্যায়বিচারকে চিত্রিত করে, কারণ প্রকৃত ন্যায়বিচারের জন্য সাহসের দরকার, যে-গুণের জন্য সিংহেরা খ্যাত। ঈগল পাখিরা তাদের তীক্ষ্ন দৃষ্টির জন্য সুপরিচিত, এমনকি ক্ষুদ্র বস্তুগুলো  তারা অনেক অনেক কিলোমিটার উঁচু থেকে দেখতে পারে। তাই, ঈগলের মুখ ঈশ্বরের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রজ্ঞাকে চিত্রিত করে। আর মানুষের মুখ? ঈশ্বরের মুখ্য গুণ প্রেম প্রতিফলিত করার ব্যাপারে, তাঁর প্রতিমূর্ত্তিতে সৃষ্ট মানুষের অদ্বিতীয় ক্ষমতা রয়েছে। (আদিপুস্তক ১:২৬) যিহোবার ব্যক্তিত্বের এই দিকগুলো যেমন শক্তি, ন্যায়বিচার, প্রজ্ঞা ও প্রেম শাস্ত্রে এত বার তুলে ধরা হয়েছে যে, এগুলোকে ঈশ্বরের মৌলিক গুণ বলা যেতে পারে।

২০. আমাদের কি এই ভেবে চিন্তিত হওয়ার দরকার আছে যে, যিহোবার ব্যক্তিত্ব হয়তো বদলে গিয়েছে আর আপনি কেন এইরকম উত্তর দেন?

২০ আমাদের কি এই নিয়ে চিন্তিত হওয়া উচিত যে, বাইবেলে ঈশ্বরের বিষয়ে যখন বর্ণনা করা হয়েছিল সেই সময় থেকে এই হাজার হাজার বছরের মধ্যে তিনি হয়তো পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছেন? না, ঈশ্বরের ব্যক্তিত্ব কখনোই পরিবর্তিত হয় না। তিনি আমাদের বলেন: “আমি সদাপ্রভু [“যিহোবা,” NW], আমার পরিবর্ত্তন নাই।” (মালাখি ৩:৬) ইচ্ছাখুশিমতো পরিবর্তিত না হয়ে, যিহোবা প্রতিটা পরিস্থিতিতে যেভাবে সাড়া দেন তাতে নিজেকে একজন আদর্শ পিতা হিসেবে প্রমাণ করেন। তিনি তাঁর ব্যক্তিত্বের সেই দিকগুলো প্রদর্শন করেন, যা সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত। চারটে গুণের মধ্যে যেটা সবচেয়ে বেশি প্রভাবসম্পন্ন, সেটা হল প্রেম। ঈশ্বর যা কিছু করেন, সেগুলোর সবকিছুতে এটা প্রদর্শিত হয়। তিনি প্রেমের সঙ্গে তাঁর শক্তি, ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞা প্রয়োগ করেন। সত্যি বলতে কী, ঈশ্বর ও তাঁর এই গুণ সম্বন্ধে  বাইবেল অসাধারণ কিছু বলে। এটা বলে: “ঈশ্বর প্রেম।” (১ যোহন ৪:৮) লক্ষ করুন, এটা বলে না যে ঈশ্বরের প্রেম রয়েছে বা ঈশ্বর প্রেমময়। বরং, এটা বলে যে ঈশ্বর হলেন প্রেম। তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রেম, তিনি যা কিছু করেন সেগুলোর সমস্তকিছুতে তাঁকে প্রেরণা দেয়।

“এই দেখ, ইনিই আমাদের ঈশ্বর”

২১. যিহোবার গুণগুলো আরও ভাল করে জানলে, আমরা কেমন অনুভব করব?

২১ আপনি কি কখনও একটা ছোট বাচ্চাকে তার বন্ধুদের তার বাবাকে দেখিয়ে অকপট আনন্দ ও গর্বের সঙ্গে বলতে শুনেছেন যে, “ওই যে আমার বাবা”? ঈশ্বরের উপাসকদের যিহোবা সম্বন্ধে এই একইরকম অনুভব করার উত্তম কারণ রয়েছে। বাইবেল এমন এক সময় সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করে যখন বিশ্বস্ত লোকেরা বিস্ময়ে চিৎকার করে বলবে: “এই দেখ, ইনিই আমাদের ঈশ্বর।” (যিশাইয় ২৫:৮, ৯) যিহোবার গুণগুলো সম্বন্ধে আপনি যত বেশি অন্তর্দৃষ্টি লাভ করবেন, তত বেশি অনুভব করবেন যে আপনার সবচেয়ে উত্তম পিতা রয়েছে।

২২, ২৩. বাইবেল কীভাবে আমাদের স্বর্গীয় পিতাকে বর্ণনা করে এবং আমরা কীভাবে জানি যে, তিনি চান যেন আমরা তাঁর নিকটবর্তী হই?

২২ এই পিতা আবেগহীন, গম্ভীর প্রকৃতির নন—যদিও কিছু ধর্মগোঁড়া ব্যক্তি ও দার্শনিক তা-ই শিখিয়েছে। আমরা খুব কমই একজন আবেগহীন ঈশ্বরের নিকটবর্তী হতে চাইব আর বাইবেল আমাদের স্বর্গীয় পিতাকে সেভাবে বর্ণনা করে না। এর বিপরীতে, এটি তাঁকে ‘পরম ধন্য [“সুখী,” NW] ঈশ্বর’ বলে। (১ তীমথিয় ১:১১) তাঁর কঠিন ও কোমল উভয় অনুভূতি রয়েছে। তাঁর বুদ্ধিবিশিষ্ট প্রাণীরা যখন তাদের মঙ্গলের জন্য দেওয়া তাঁর নির্দেশনাগুলো লঙ্ঘন করে, তখন তিনি “মনঃপীড়া” পান। (আদিপুস্তক ৬:৬; গীতসংহিতা ৭৮:৪১) কিন্তু, আমরা যখন তাঁর বাক্য অনুযায়ী প্রজ্ঞার সঙ্গে কাজ করি, তখন তাঁর “চিত্তকে আনন্দিত” করি।—হিতোপদেশ ২৭:১১.

২৩ আমাদের পিতা চান যেন আমরা তাঁর নিকটবর্তী হই। তাঁর বাক্য আমাদের উৎসাহ দেয়, যেন আমরা ‘তাঁহার অন্বেষণ করি, যদি কোন মতে হাঁতড়িয়া হাঁতড়িয়া তাঁহার উদ্দেশ পাই; বাস্তবিকপক্ষে তিনি আমাদের কাহারও হইতে দূরে নহেন।’ (প্রেরিত ১৭:২৭) কিন্তু, নগণ্য মানুষের পক্ষে কীভাবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সার্বভৌম প্রভুর নিকটবর্তী হওয়া সম্ভব?