সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

যিহোবার নিকটবর্তী হোন

 অধ্যায় ৩১

“ঈশ্বরের নিকটবর্ত্তী হও, তাহাতে তিনিও তোমাদের নিকটবর্ত্তী হইবেন”

“ঈশ্বরের নিকটবর্ত্তী হও, তাহাতে তিনিও তোমাদের নিকটবর্ত্তী হইবেন”

১-৩. (ক) বাবামা ও তাদের শিশুর মধ্যে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া দেখে আমরা মানুষের স্বভাব সম্বন্ধে কী শিখতে পারি? (খ) কেউ যখন আমাদের প্রেম দেখান, তখন কোন প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয় আর আমরা নিজেদের কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারি?

বাবামারা তাদের নবজাত শিশুকে হাসতে দেখে আনন্দিত হয়। তারা প্রায়ই শিশুর কাছে তাদের মুখ নিয়ে যায়, মিষ্টি স্বরে কথা বলে ও হাসে। তারা প্রতিক্রিয়া দেখতে চায়। আর শীঘ্রই তা দেখা যায়—শিশুর গালে টোল পড়ে, ঠোঁট কুঞ্চিত হয় আর এক মিষ্টি হাসি দেখা যায়। নিজস্ব এক অদ্বিতীয় উপায়ে, সেই হাসি মনে হয় যেন অনুভূতি প্রকাশ করে, বাবামার ভালবাসার প্রতি সাড়া দিয়ে শিশুর ভালবাসার প্রথম অভিব্যক্তি।

শিশুর হাসি আমাদের মানুষের স্বভাব সম্বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে করিয়ে দেয়। প্রেমের প্রতি আমাদের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হল প্রেম। আমাদের এভাবেই তৈরি করা হয়েছে। (গীতসংহিতা ২২:৯) বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রেমের প্রতি আমাদের সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা পরিপক্ব হয়। আপনি হয়তো আপনার ছেলেবেলার কথা স্মরণ করতে পারেন যে আপনার বাবামা, আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব আপনার প্রতি কীভাবে প্রেম প্রকাশ করেছিল। আপনার হৃদয়ে এক উষ্ণ অনুভূতি শিকড় গেড়েছিল, বেড়ে উঠেছিল এবং কাজে বিকশিত হয়েছিল। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ আপনি প্রেম প্রকাশ করেছিলেন। যিহোবা ঈশ্বরের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কি একই প্রক্রিয়ায় বিকশিত হচ্ছে?

বাইবেল বলে: “আমরা প্রেম করি, কারণ তিনিই প্রথমে আমাদিগকে প্রেম করিয়াছেন।” (১ যোহন ৪:১৯) এই বইয়ের প্রথম থেকে তৃতীয় বিভাগে, আপনাকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে যিহোবা ঈশ্বর তাঁর শক্তি, ন্যায়বিচার ও তাঁর প্রজ্ঞা আপনার উপকারের জন্য প্রেমময় উপায়ে ব্যবহার করেছেন। আর চতুর্থ বিভাগে আপনি দেখেছেন যে, তিনি মানবজাতির প্রতি—ব্যক্তিগতভাবে আপনার প্রতি—উল্লেখযোগ্য উপায়ে সরাসরি প্রেম প্রকাশ করেছেন। এখন একটা প্রশ্ন ওঠে। এক অর্থে, এটা হল  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যা আপনি নিজেকে জিজ্ঞেস করতে পারেন: ‘যিহোবার প্রেমের প্রতি আমি কীভাবে সাড়া দেব?

ঈশ্বরকে প্রেম করা বলতে যা বোঝায়

৪. ঈশ্বরকে প্রেম করা বলতে যা বোঝায়, সেই সম্বন্ধে লোকেরা কীভাবে বিভ্রান্ত?

প্রেমের উৎস যিহোবা, ভালভাবেই জানেন যে অন্যদের সর্বোত্তম গুণগুলো প্রকাশ করার জন্য প্রেমের প্রচুর ক্ষমতা রয়েছে। তাই অবিশ্বস্ত মানবজাতির একগুঁয়ে বিদ্রোহ সত্ত্বেও, তাঁর আস্থা রয়েছে যে কিছু মানুষ তাঁর প্রেমের প্রতি সাড়া দেবে। আর সত্যিই লক্ষ লক্ষ লোক সাড়া দিয়েছে। কিন্তু, দুঃখের বিষয় হল যে এই কলুষিত জগতের ধর্মগুলো ঈশ্বরকে প্রেম করা বলতে যা বোঝায়, সেই বিষয়ে লোকেদের বিভ্রান্ত করেছে। অগণিত লোক বলে যে তারা ঈশ্বরকে ভালবাসে কিন্তু দেখে মনে হয় তারা এইরকম চিন্তা করে যে, এই ধরনের ভালবাসা হল নিছক এক অনুভূতি, যা কেবল ভাষায় প্রকাশ করা যায়। বাবামায়ের প্রতি এক শিশুর ভালবাসা যেমন প্রথমে হাসির মাধ্যমে প্রকাশ পায়, ঠিক তেমনই ঈশ্বরের প্রতি প্রেম শুরু হতে পারে। কিন্তু, প্রাপ্তবয়স্ক লোকেদের ক্ষেত্রে প্রেম আরও বেশি কিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে।

৫. কীভাবে বাইবেল ঈশ্বরের প্রতি প্রেমকে বর্ণনা করে এবং সেই বর্ণনা কেন আমাদের কাছে আবেদনময় হওয়া উচিত?

যিহোবাকে প্রেম করা বলতে যা বোঝায়, সেই বিষয়ে তিনি বর্ণনা করেন। তাঁর বাক্য বলে: “ঈশ্বরের প্রতি প্রেম এই, যেন আমরা তাঁহার আজ্ঞা সকল পালন করি।” অতএব, ঈশ্বরের প্রতি প্রেম কাজে প্রকাশ করা দরকার। এটা ঠিক যে, অনেক লোক বাধ্য থাকার ধারণাকে ততটা আবেদনময় বলে মনে করে না। কিন্তু সেই একই পদ আরও বলে: “আর [ঈশ্বরের] আজ্ঞা সকল দুর্ব্বহ নয়।” (১ যোহন ৫:৩) যিহোবার আইন ও নীতিগুলো আমাদের উপকারের জন্য তৈরি, আমাদের নিপীড়ন করার জন্য নয়। (যিশাইয় ৪৮:১৭, ১৮) ঈশ্বরের বাক্য নীতিগুলোতে পূর্ণ, যেগুলো আমাদের তাঁর নিকটবর্তী হতে সাহায্য করে। কীভাবে? আসুন আমরা ঈশ্বরের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের তিনটে দিক পুনরালোচনা করি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ভাববিনিময়, উপাসনা এবং অনুকরণ।

যিহোবার সঙ্গে ভাববিনিময় করা

৬-৮. (ক) কীসের মাধ্যমে আমরা যিহোবার কথা শুনতে পারি? (খ) আমরা যখন শাস্ত্রপদগুলো পড়ি, তখন কীভাবে সেগুলোক জীবন্ত করে তুলতে পারি?

অধ্যায় ১ এই প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয়েছিল, “ঈশ্বরের সঙ্গে কথাবার্তা বলার বিষয়টা  কি আপনি চিন্তা করতে পারেন?” আমরা দেখেছিলাম যে, এটা নিছক কল্পনাই ছিল না। মোশি এইরকম কথাবার্তা বলেছিলেন। আমাদের সম্বন্ধে কী বলা যায়? যিহোবা এখন মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলার জন্য তাঁর দূতেদের পাঠান না। কিন্তু, আজকে আমাদের সঙ্গে ভাববিনিময় করার জন্য যিহোবার চমৎকার উপায়গুলো রয়েছে। কীভাবে আমরা যিহোবার কথা শুনতে পারি?

যেহেতু “প্রত্যেক শাস্ত্রলিপি ঈশ্বর-নিশ্বসিত,” তাই আমরা তাঁর বাক্য বাইবেল পড়ার মাধ্যমে যিহোবার কথা শুনতে পারি। (২ তীমথিয় ৩:১৬, পাদটীকা) এই কারণে গীতরচক যিহোবার দাসদের “দিবারাত্র” এইরকম পড়ার বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন। (গীতসংহিতা ১:১, ২) তা করার জন্য আমাদের যথেষ্ট প্রচেষ্টার দরকার। আর এইরকম সমস্ত প্রচেষ্টা উপযুক্ত। আমরা যেমন ১৮ অধ্যায়ে দেখেছিলাম যে, বাইবেল হল আমাদের স্বর্গীয় পিতার কাছ থেকে আমাদের জন্য এক মূল্যবান চিঠি। তাই এটি পড়া শুধুমাত্র এক দৈনন্দিন তালিকার একটি কাজ হওয়া উচিত নয়। আমরা যখন পড়ি, তখন আমাদের শাস্ত্রকে জীবন্ত করে তুলতে হবে। কীভাবে আমরা তা করতে পারি?

পড়ার সময় বাইবেলের বিবরণগুলোকে মনের চোখে দেখুন। বাইবেলের চরিত্রগুলোকে বাস্তব ব্যক্তি হিসেবে দেখার চেষ্টা করুন। তাদের পটভূমি, পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্যগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। এরপর, আপনি যা পড়েন তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন, নিজেকে এই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করুন: ‘এই বিবরণ যিহোবার সম্বন্ধে আমাকে কী শিক্ষা দেয়? তাঁর কোন গুণটি আমি এখানে দেখতে পাই? কোন নীতিটি আমি শিখি বলে যিহোবা চান আর কীভাবে আমি আমার জীবনে এটি কাজে লাগাতে পারি?’ পড়ুন, ধ্যান করুন এবং কাজে লাগান—আপনি যখন তা করবেন, তখন ঈশ্বরের বাক্য আপনার কাছে জীবন্ত হয়ে উঠবে।—গীতসংহিতা ৭৭:১২; যাকোব ১:২৩-২৫.

৯. “বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান্‌ দাস” কে আর কেন আমাদের মনোযোগের সঙ্গে সেই ‘দাসের’ কথা শোনা গুরুত্বপূর্ণ?

এ ছাড়া যিহোবা ‘বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান্‌ দাসের’ মাধ্যমেও আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। যিশুর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, অভিষিক্ত খ্রিস্টান পুরুষদের এক দল এই সমস্যাপূর্ণ শেষকালে “উপযুক্ত সময়ে” আধ্যাত্মিক “খাদ্য” জোগানোর জন্য নিযুক্ত হয়েছে। (মথি ২৪:৪৫-৪৭) আমরা যখন বাইবেলের সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে সাহায্য করার  জন্য প্রস্তুতকৃত সাহিত্যাদি পড়ি এবং খ্রিস্টীয় সভা ও সম্মেলনগুলোতে যোগ দিই, তখন আমরা সেই দাসের দ্বারা আধ্যাত্মিকভাবে খাবার খাচ্ছি। যেহেতু এটি খ্রিস্টের দাস, তাই আমরা বিজ্ঞতার সঙ্গে যিশুর এই বাক্যগুলো কাজে লাগাই: “দেখিও, তোমরা কিরূপে শুন।” (বাঁকা অক্ষরে মুদ্রণ আমাদের।) (লূক ৮:১৮) আমরা মনোযোগের সঙ্গে শুনি কারণ এই বিশ্বস্ত দাসকে আমরা আমাদের সঙ্গে যিহোবার ভাববিনিময়ের একটা মাধ্যম হিসেবে স্বীকার করি।

১০-১২. (ক) কেন প্রার্থনা যিহোবার কাছ থেকে এক চমৎকার দান? (খ) কীভাবে আমরা যিহোবাকে আনন্দ দেয় এমনভাবে প্রার্থনা করতে পারি এবং কেন আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে, তিনি আমাদের প্রার্থনাগুলোকে মূল্য দেন?

১০ কিন্তু ঈশ্বরের সঙ্গে ভাববিনিময় সম্বন্ধে কী বলা যায়? আমরা কি যিহোবার সঙ্গে কথা বলতে পারি? এটা এক সশ্রদ্ধ ভয় উদ্রেগকারী চিন্তা। আপনি যদি আপনার দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসকের সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য তার নিকটে যাওয়ার চেষ্টা করতেন, তা হলে আপনার সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু থাকত? কিছু ক্ষেত্রে, এইরকম পদক্ষেপ নেওয়াই বিপদজনক হতে পারে! ইষ্টের ও মর্দখয়ের দিনে, একজন ব্যক্তি রাজকীয় আমন্ত্রণ ছাড়া পারস্য রাজার নিকটে গেলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। (ইষ্টের ৪:১০, ১১) এখন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সার্বভৌম প্রভু যাঁর সঙ্গে তুলনা করলে সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষেরা “ফড়িঙ্গস্বরূপ,” তাঁর নিকটবর্তী হওয়ার কথা কল্পনা করুন। (যিশাইয় ৪০:২২) আমাদের কি তাঁর নিকটবর্তী হওয়ার বিষয়ে ভয় পাওয়া উচিত? কখনোই না!

১১ যিহোবা তাঁর নিকটবর্তী হওয়ার জন্য এক উন্মুক্ত কিন্তু সরল একটা উপায় জুগিয়েছেন আর তা হল প্রার্থনা। এমনকি এক ছোট বাচ্চাও বিশ্বাস নিয়ে যিশুর নামে যিহোবার কাছে প্রার্থনা করতে পারে। (যোহন ১৪:৬; ইব্রীয় ১১:৬) তবুও, প্রার্থনা আমাদের সবচেয়ে জটিল, অন্তরঙ্গ চিন্তা ও অনুভূতিগুলো—এমনকি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন এমন বেদনাদায়ক অনুভূতিগুলোও—প্রকাশ করতে সমর্থ করে। (রোমীয় ৮:২৬) বাক্‌পটু, অলংকারপূর্ণ কথা বা দীর্ঘ, শব্দবহুল প্রার্থনার দ্বারা যিহোবাকে মুগ্ধ করার চেষ্টা বৃথা। (মথি ৬:৭, ৮) অন্যদিকে, আমরা তাঁর সঙ্গে কতক্ষণ বা কতবার কথা বলতে পারি, সেই বিষয়ে যিহোবা কোনো সীমা নির্ধারণ করে দেননি। তাঁর বাক্য এমনকি আমাদের “অবিরত প্রার্থনা” করতে আমন্ত্রণ জানায়।—১ থিষলনীকীয় ৫:১৭.

 ১২ মনে রাখবেন যে, একমাত্র যিহোবাকে “প্রার্থনা-শ্রবণকারী” বলা হয় আর তিনি প্রকৃত সহমর্মিতা সহকারে তা শোনেন। (গীতসংহিতা ৬৫:২) তিনি কি শুধু তাঁর বিশ্বস্ত দাসদের প্রার্থনাগুলো কোনোরকমে সহ্য করেন? না, তিনি সেগুলো শুনে আনন্দ পান। তাঁর বাক্য এইরকম প্রার্থনাগুলোকে সুগন্ধি ধূপের সঙ্গে তুলনা করে, যেগুলো পোড়ানোর ফলে সুগন্ধযুক্ত, সুরভিত ধোঁয়া ওপরের দিকে ওঠে। (গীতসংহিতা ১৪১:২; প্রকাশিত বাক্য ৫:৮; ৮:৪) এটা চিন্তা করা কি সান্ত্বনাদায়ক নয় যে, আমাদের অকপট প্রার্থনাগুলো একইভাবে ওপরে ওঠে ও সার্বভৌম প্রভুকে আনন্দ দেয়? তাই আপনি যদি যিহোবার নিকটবর্তী হতে চান, তা হলে নম্রভাবে তাঁর কাছে বার বার, প্রতিদিন প্রার্থনা করুন। তাঁর কাছে হৃদয় খুলে কথা বলুন; কোনোকিছুই বাদ রাখবেন না। (গীতসংহিতা ৬২:৮) আপনার উদ্বিগ্নতা, আনন্দ, ধন্যবাদ এবং প্রশংসা আপনার স্বর্গীয় পিতার সঙ্গে ভাগ করে নিন। ফলস্বরূপ, আপনার ও তাঁর মধ্যে যে-বন্ধন রয়েছে, তা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হবে।

যিহোবার উপাসনা করা

১৩, ১৪. যিহোবার উপাসনা করার মানে কী এবং কেন আমাদের তা করা উপযুক্ত?

১৩ আমরা যখন যিহোবার সঙ্গে ভাববিনিময় করি, তখন আমরা একজন বন্ধু বা আত্মীয়ের সঙ্গে যেভাবে কথা বলি ও তাদের কথা শুনি, সেভাবে করি না। আমরা আসলে যিহোবার উপাসনা করছি, তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সম্মান নিবেদন করছি, যা তিনি পুরোপুরিভাবে পাওয়ার যোগ্য। সত্য উপাসনার দ্বারাই আমাদের সম্পূর্ণ জীবন পরিচালিত। এর মাধ্যমে আমরা যিহোবার প্রতি আমাদের সর্বান্তকরণ প্রেম ও ভক্তি প্রকাশ করি আর এটা স্বর্গ বা পৃথিবীর যিহোবার সমস্ত বিশ্বস্ত প্রাণীকে একতাবদ্ধ করে। একটা দর্শনে, প্রেরিত যোহন একজন দূতকে এই আজ্ঞা ঘোষণা করতে শুনেছিলেন: “যিনি স্বর্গ, পৃথিবী, সমুদ্র ও জলের উনুই সকল উৎপন্ন করিয়াছেন, তাঁহার ভজনা কর।”—প্রকাশিত বাক্য ১৪:৭.

১৪ কেন আমাদের যিহোবার ভজনা বা উপাসনা করা উচিত? এই বইয়ে আমরা যে-গুণগুলো সম্বন্ধে আলোচনা করেছি সেই বিষয়ে চিন্তা করুন, যেমন পবিত্রতা, শক্তি, আত্মসংযম, ন্যায়বিচার, সাহস, করুণা, প্রজ্ঞা, নম্রতা, প্রেম, সমবেদনা, আনুগত্য এবং মঙ্গলভাব। আমরা যেমন দেখেছি যে, যিহোবা প্রতিটা মূল্যবান গুণের সর্বোচ্চ সীমা, উৎকৃষ্ট মানকে প্রতিনিধিত্ব করেন। আমরা যখন তাঁর সমস্ত গুণের  বিষয়ে বোঝার চেষ্টা করি, তখন আমরা উপলব্ধি করি যে তিনি একজন মহান, প্রশংসনীয় ব্যক্তির চেয়েও আরও বেশি কিছু। তিনি অত্যন্ত মহিমান্বিত, আমাদের চেয়ে অপরিমেয়ভাবে উচ্চ। (যিশাইয় ৫৫:৯) নিঃসন্দেহে, যিহোবা হলেন আমাদের ন্যায্য সার্বভৌম প্রভু আর তিনি অবশ্যই আমাদের উপাসনা পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু, কীভাবে আমাদের যিহোবার উপাসনা করা উচিত?

১৫. আমরা কীভাবে “আত্মায় ও সত্যে” যিহোবার উপাসনা করতে পারি এবং খ্রিস্টীয় সভাগুলো আমাদের কোন সুযোগ করে দেয়?

১৫ যিশু বলেছিলেন: “ঈশ্বর আত্মা; আর যাহারা তাঁহার ভজনা করে, তাহাদিগকে আত্মায় ও সত্যে ভজনা করিতে হইবে।” (যোহন ৪:২৪) ঈশ্বরকে “আত্মায়” উপাসনা করার জন্য আমাদের কাছে তাঁর আত্মা থাকার প্রয়োজন রয়েছে এবং আমাদের এটার দ্বারা পরিচালিত হতে হবে। এ ছাড়া, আমাদের উপাসনার সঙ্গে যেন ঈশ্বররের বাক্যে পাওয়া সঠিক জ্ঞানের মিল থাকে। আমরা যখনই সহবিশ্বাসীদের সঙ্গে মিলিত হই, তখনই “আত্মায় ও সত্যে” যিহোবার উপাসনা করার মহামূল্যবান সুযোগ আমাদের রয়েছে। (ইব্রীয় ১০:২৪, ২৫) আমরা যখন যিহোবার উদ্দেশে প্রশংসা  গান গাই, তাঁর কাছে প্রার্থনায় একতাবদ্ধ হই এবং তাঁর বাক্য নিয়ে যে-আলোচনা হয় তা শুনি ও তাতে অংশ নিই, তখন আমরা বিশুদ্ধ উপাসনায় তাঁর প্রতি প্রেম প্রকাশ করি।

খ্রিস্টীয় সভাগুলো যিহোবার উপাসনা করার মনোরম উপলক্ষ

১৬. সত্য খ্রিস্টানদের যে-আজ্ঞাগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একটা সর্বমহৎ আজ্ঞা কী এবং কেন আমরা এটা পালন করতে বাধ্যবাধকতা অনুভব করি?

১৬ আমরা যখন অন্যদের কাছে যিহোবার সম্বন্ধে বলি, প্রকাশ্যে তাঁর প্রশংসা করি তখনও আমরা তাঁর উপাসনা করি। (ইব্রীয় ১৩:১৫) সত্যি বলতে কী, যিহোবার রাজ্যের সুসমাচার প্রচার করা সত্য খ্রিস্টানদের যে-আজ্ঞাগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একটা সর্বমহৎ আজ্ঞা। (মথি ২৪:১৪) আমরা আগ্রহের সঙ্গে তা পালন করি কারণ আমরা যিহোবাকে ভালবাসি। “এই যুগের দেব” শয়তান দিয়াবল যেভাবে “অবিশ্বাসীদের মন অন্ধ করিয়াছে,” যিহোবার সম্বন্ধে বিদ্বেষপূর্ণ মিথ্যা বাড়িয়ে চলেছে, সেই বিষয়ে আমরা যখন চিন্তা করি, তখন আমরা কি আমাদের ঈশ্বরের পক্ষে সাক্ষি হিসেবে কাজ করার, এইরকম মিথ্যা অপবাদ দূর করার জন্য আকুল আকাঙ্ক্ষী হই না? (২ করিন্থীয় ৪:৪; যিশাইয় ৪৩:১০-১২) আর আমরা যখন যিহোবার চমৎকার গুণগুলো নিয়ে চিন্তা করি, তখন আমরা কি তাঁর সম্বন্ধে অন্যদের কাছে বলার জন্য আমাদের মধ্যে এক আকাঙ্ক্ষা অনুভব করি না? বাস্তবিকই, আমাদের স্বর্গীয় পিতাকে আমরা যতটা জানি ও ভালবাসি, ততটা অন্যদের জানাতে ও ভালবাসতে সাহায্য করার চেয়ে বড় সুযোগ আর থাকতে পারে না।

১৭. যিহোবাকে আমাদের উপাসনা কী অন্তর্ভুক্ত করে আর কেন আমাদের নীতিনিষ্ঠার সঙ্গে উপাসনা করতে হবে?

১৭ যিহোবার প্রতি আমাদের উপাসনা আরও বেশি কিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে। এটা আমাদের জীবনের প্রতিটা দিককে প্রভাবিত করে। (কলসীয় ৩:২৩) আমরা যদি সত্যিই যিহোবাকে আমাদের সার্বভৌম প্রভু হিসেবে গ্রহণ করি, তা হলে আমরা সমস্ত ক্ষেত্রে—আমাদের পারিবারিক জীবনে, সাংসারিক জীবনে, অন্যদের সঙ্গে আমাদের আচরণে, ব্যক্তিগত সময়ে—তাঁর ইচ্ছা পালন করার চেষ্টা করব। আমরা “একাগ্র অন্তঃকরণে,” নীতিনিষ্ঠার সঙ্গে যিহোবার সেবা করার চেষ্টা করব। (১ বংশাবলি ২৮:৯) এইরকম উপাসনায় এক বিভক্ত হৃদয় বা দ্বৈত জীবন অর্থাৎ যিহোবাকে সেবা করার ভান করা অথচ গোপনে গুরুতর পাপ করে চলার কোনো জায়গা নেই। নীতিনিষ্ঠা এইরকম কপটতাকে অনুমোদন করে না; প্রেম এটাকে প্রত্যাখ্যান করে। ঈশ্বরীয় ভয়ও সাহায্য করবে। বাইবেল এইরকম শ্রদ্ধাকে যিহোবার সঙ্গে আমাদের ক্রমাগত অন্তরঙ্গতাকে যুক্ত করে।—গীতসংহিতা ২৫:১৪, NW.

 যিহোবাকে অনুকরণ করা

১৮, ১৯. নগণ্য অসিদ্ধ মানুষেরা যিহোবা ঈশ্বরকে অনুকরণ করতে পারে, তা চিন্তা করা কেন বাস্তবসম্মত?

১৮ এই বইয়ের প্রতিটা বিভাগ কীভাবে “প্রিয় বৎসদের ন্যায় . . . ঈশ্বরের অনুকারী” হওয়া যায়, সেটার ওপর একটা অধ্যায় দিয়ে শেষ হয়েছে। (ইফিষীয় ৫:১) এটা মনে রাখা অতি গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা যদিও অসিদ্ধ, তবুও শক্তির ব্যবহার, ন্যায়বিচার অনুশীলন, প্রজ্ঞার সঙ্গে কাজ এবং প্রেম দেখানোর বিষয়ে যিহোবার নিখুঁত পথকে অনুকরণ করতে পারি। আমরা কীভাবে জানি যে, সর্বশক্তিমানকে অনুকরণ করা সত্যিই সম্ভব? মনে রাখবেন যে, যিহোবার নামের অর্থ আমাদের শিক্ষা দেয় যে তিনি তাঁর উদ্দেশ্যগুলো পরিপূর্ণ করার জন্য যা চান তা-ই হতে পারেন। উপযুক্ত কারণেই আমরা সেই সামর্থ্য দেখে ভীত হই কিন্তু তাঁকে অনুকরণ করা কি অসম্ভব? না।

১৯ আমরা ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতে তৈরি। (আদিপুস্তক ১:২৬) তাই, মানুষ পৃথিবীর অন্য যেকোনো প্রাণীর চেয়ে আলাদা। আমরা শুধু সহজাত প্রবৃত্তি, বংশানুক্রম বা পরিবেশের উপাদানগুলোর দ্বারা কোনো কিছু করতে বাধ্য হই না। যিহোবা আমাদের এক মহামূল্যবান উপহার—স্বাধীন ইচ্ছা—দিয়েছেন। আমাদের সীমাবদ্ধতা এবং অসিদ্ধতাগুলো সত্ত্বেও, আমরা যা হতে চাই তা স্বাধীনভাবে বেছে নিতে পারি। আপনি কি একজন প্রেমময়, বিজ্ঞ, ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি হতে চান, যিনি শক্তি সঠিকভাবে ব্যবহার করেন? যিহোবার আত্মার সাহায্যে আপনি ঠিক তা-ই হতে পারেন! আপনি এর মাধ্যমে যে-ভাল কাজ সম্পাদন করতে পারবেন, তা চিন্তা করুন।

২০. আমরা যখন যিহোবাকে অনুকরণ করি, তখন কোন ভাল কাজ সম্পাদন করি?

২০ আপনি আপনার স্বর্গীয় পিতাকে সন্তুষ্ট করবেন, তাঁর হৃদয়কে আনন্দিত করবেন। (হিতোপদেশ ২৭:১১) এমনকি আপনি যিহোবার “সর্ব্বতোভাবে প্রীতিজনক” হতে পারেন কারণ তিনি আপনার সীমাবদ্ধতাগুলো বোঝেন। (কলসীয় ১:৯, ১০) আর আপনি যখন আপনার প্রিয়তম পিতার অনুকরণে ভাল গুণগুলো গড়ে তুলবেন, তখন আপনি এক অদ্বিতীয় সুযোগ পাবেন। ঈশ্বরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন এক অন্ধকার জগতে, আপনি আলোর বাহক হতে পারবেন। (মথি ৫:১, ২, ১৪) আপনি পৃথিবীর চতুর্দিকে যিহোবার গৌরবময় ব্যক্তিত্বের কিছু প্রতিফলন ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করবেন। কত বড় এক সম্মান!

 “ঈশ্বরের নিকটবর্ত্তী হও, তাহাতে তিনিও তোমাদের নিকটবর্ত্তী হইবেন”

আপনি যেন সবসময় যিহোবার আরও নিকটবর্তী হন

২১, ২২. যারা যিহোবাকে ভালবাসে তাদের সকলের সামনে কোন সীমাহীন যাত্রা রয়েছে?

২১ যাকোব ৪:৮ পদে লিপিবদ্ধ এই সরল পরামর্শ এক লক্ষ্যের চেয়েও আরও বেশি কিছু। এটা একটা যাত্রা। আমরা যতদিন বিশ্বস্ত থাকব, সেই যাত্রা কখনোই শেষ হবে না। আমরা কখনোই যিহোবার নিকট থেকে নিকটতর হওয়া বন্ধ করব না। বাস্তবিকপক্ষে, তাঁর সম্বন্ধে সবসময় আরও বেশি কিছু জানার থাকবে। আমাদের কখনোই এমনটা ভাবা উচিত নয় যে, এই বইটি যিহোবা সম্বন্ধে আমাদের সবকিছু শিখিয়েছে। আমাদের ঈশ্বর সম্বন্ধে বাইবেল যা বলে আমরা শুধু তাই আলোচনা করতে শুরু করেছি! আর এমনকি যিহোবার সম্বন্ধে যা জানা যায় তার সমস্তই বাইবেল আমাদের বলে না। প্রেরিত যোহন অনুমান করেছিলেন যে, যিশু তাঁর পার্থিব পরিচর্যাকালে যা কিছু করেছিলেন সেগুলোর সমস্তই যদি লেখা হতো, তা হলে ‘লিখিতে লিখিতে এত গ্রন্থ হইয়া উঠিত যে, জগতেও তাহা ধরিত না।’ (যোহন ২১:২৫) এইরকম একটা বিষয় যদি পুত্রের বেলায় সত্য হয়, তা হলে পিতার সম্বন্ধে তা আরও কতই না বেশি সত্য!

 ২২ এমনকি অনন্তজীবনও যিহোবার সম্বন্ধে জানা শেষ করাতে পারবে না। (উপদেশক ৩:১১) তা হলে, আমাদের সামনে যে-প্রত্যাশা রয়েছে, সেই বিষয়ে চিন্তা করুন। শত শত, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি বছর বেঁচে থাকার পর, আমরা যিহোবা ঈশ্বর সম্বন্ধে এখন যা জানি, সেটার চেয়ে আরও বেশি কিছু জানব। কিন্তু তখনও আমাদের মনে হবে যে, আরও অগণিত চমৎকার বিষয়গুলো জানার বাকি আছে। আমরা আরও জানার জন্য আগ্রহী হব কারণ আমাদের সবসময়ই গীতরচকের মতো অনুভব করার কারণ থাকবে, যিনি গেয়েছিলেন: “ঈশ্বরের নিকটে থাকা আমারই পক্ষে মঙ্গল।” (গীতসংহিতা ৭৩:২৮) অনন্তজীবন অকল্পনীয়ভাবে অর্থপূর্ণ ও বৈচিত্র্যময় হবে—আর যিহোবার নিকটবর্তী হওয়া এর সবচেয়ে সন্তোষজনক অংশ হবে।

২৩. আপনাকে কী করতে উৎসাহিত করা হয়েছে?

২৩ আপনি যেন যিহোবাকে আপনার সমস্ত অন্তকরণ, প্রাণ, মন ও শক্তি দিয়ে ভালবেসে যিহোবার প্রেমে এখনই সাড়া দেন। (মার্ক ১২:২৯, ৩০) আপনার প্রেম যেন অনুগত ও সুস্থির থাকে। আপনি প্রতিদিন ছোটবড় যেসমস্ত সিদ্ধান্ত নেন, সেগুলোর সমস্তই যেন একই পরিচালনাকারী নীতি প্রতিফলন করে অর্থাৎ আপনি সবসময় সেই পথ বেছে নেবেন, যা আপনার স্বর্গীয় পিতার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক দিন দিন আরও দৃঢ় করতে পরিচালিত করে। সবচেয়ে বড় কথা হল, আপনি যেন অনন্তকাল ধরে যিহোবার আরও নিকটবর্তী হন আর তিনি যেন আপনার আরও নিকটবর্তী হন!