সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

যিহোবার নিকটবর্তী হোন

 অধ্যায় ২৫

‘আমাদের ঈশ্বরের কোমল সমবেদনা’

‘আমাদের ঈশ্বরের কোমল সমবেদনা’

১, ২. (ক) একজন মা কীভাবে স্বভাবতই তার বাচ্চার কান্নার প্রতি সাড়া দেন? (খ) একজন মায়ের সমবেদনার চেয়ে কোন অনুভূতি আরও বেশি প্রগাঢ়?

মধ্যরাতে একটা বাচ্চা কেঁদে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে মা জেগে ওঠেন। তিনি আগে যতটা গভীরভাবে ঘুমাতেন এখন আর সেভাবে ঘুমান না—যখন থেকে তার বাচ্চা জন্ম নিয়েছে। তিনি তার বাচ্চার কান্নার বিভিন্ন ধরন সম্বন্ধে জেনেছেন। তাই, তিনি প্রায়ই বলে দিতে পারেন যে তার নবজাতকের খাওয়ার, কোলে নেওয়ার বা অন্য কোনোরকম যত্নের প্রয়োজন আছে কি না। তবে বাচ্চার কান্নার কারণ যা-ই হোক না কেন, মা তাতে সাড়া দেন। তার মন তার বাচ্চার কান্নাকে উপেক্ষা করতে পারে না।

একজন মা তার গর্ভজাত বাচ্চার জন্য যে-সমবেদনা বোধ করেন, তা মানুষের জানা সবচেয়ে কোমল অনুভূতি। তবে, এমন এক অনুভূতি রয়েছে, যা অত্যন্ত প্রগাঢ়—আমাদের ঈশ্বর যিহোবার কোমল সমবেদনা। এই প্রীতিকর গুণ নিয়ে বিবেচনা করা আমাদের যিহোবার আরও নিকটবর্তী হতে সাহায্য করতে পারে। তা হলে, আসুন আমরা আলোচনা করি যে, সমবেদনা কী এবং কীভাবে ঈশ্বর আমাদের তা দেখান।

সমবেদনা কী?

৩. ‘করুণা দেখানো’ অথবা ‘মমতা বোধ করা’ হিসেবে অনুবাদিত ইব্রীয় ক্রিয়া পদের মানে কী?

বাইবেলে, সমবেদনা ও করুণার মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বেশ কিছু ইব্রীয় ও গ্রিক শব্দ কোমল সমবেদনার অর্থ প্রদান করে। উদাহরণ হিসেবে, ইব্রীয় ক্রিয়া পদ রেকেম এর কথা বিবেচনা করুন, যা প্রায়ই ‘করুণা দেখানো’ অথবা ‘মমতা বোধ করা’ হিসেবে অনুবাদিত হয়। একটা তথ্যগ্রন্থ ব্যাখ্যা করে যে রেকেম ক্রিয়া পদ “এক গভীর ও কোমল সমবেদনার অনুভূতি প্রকাশ করে, যা আমাদের প্রিয়জন বা আমাদের সাহায্যের দরকার এমন কারো দুর্বলতা বা কষ্ট দেখে জেগে ওঠে।” এই ইব্রীয় শব্দ, যেটাকে যিহোবা নিজের প্রতি প্রয়োগ করেন,  সেটা “গর্ভ” শব্দটার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত আর এটাকে “মায়ের সমবেদনা” হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। *যাত্রাপুস্তক ৩৩:১৯; যিরমিয় ৩৩:২৬.

‘একজন স্ত্রীলোক কি তার গর্ভজাত পুত্রকে ভুলে যেতে পারে?’

৪, ৫. যিহোবার সমবেদনা সম্বন্ধে আমাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য বাইবেল কীভাবে শিশুর প্রতি তার মায়ের অনুভূতিকে ব্যবহার করে?

বাইবেল আমাদেরকে যিহোবার সমবেদনা সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সেই অনুভূতিকে ব্যবহার করে, যা একজন মায়ের তার শিশুর প্রতি রয়েছে। যিশাইয় ৪৯:১৫ পদে, আমরা পড়ি: “একজন স্ত্রীলোক কি নিজের স্তন পানকারী শিশুকে ভুলে যেতে পারে যে, সে তার গর্ভজাত পুত্রের প্রতি সমবেদনা [রেকেম] দেখাবে না? হ্যাঁ, তারা হয়তো ভুলে যেতে পারে, তবুও আমি তোমাকে ভুলে যাব না।” (দি এমপ্লিফাইড বাইবেল) এই মর্মস্পর্শী বর্ণনা যিহোবার লোকেদের প্রতি তাঁর সমবেদনা কতটা গভীর, সেটার ওপর জোর দেয়। কীভাবে?

একজন মা তার স্তন্যপায়ী শিশুকে খাওয়াতে ও তার যত্ন নিতে ভুলে যাবে এটা কল্পনা করা খুবই কঠিন। কারণ, একটা শিশু অসহায়; একটা শিশুর দিনরাত তার মায়ের মনোযোগ ও স্নেহ দরকার। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় যে, মায়েদের অবহেলার কথা যে শোনা যায় না এমন নয়, বিশেষ করে এই ‘বিষম সময়ে,’ যেটার একটা বৈশিষ্ট্য হল “স্নেহরহিত।” (২ তীমথিয় ৩:১, ৩) “তবুও,” যিহোবা ঘোষণা করেন, “আমি তোমাকে ভুলে যাব না।” তাঁর দাসদের প্রতি যিহোবার যে-কোমল সমবেদনা রয়েছে, তা অফুরন্ত। আমরা যতটা কোমল স্বাভাবিক অনুভূতি সম্বন্ধে কল্পনা করতে পারি—যে-সমবেদনা একজন মা স্বভাবতই তার শিশু সন্তানের প্রতি অনুভব করে—সেটার চেয়েও অপরিমেয়ভাবে প্রগাঢ়। তাই, এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই যে যিশাইয় ৪৯:১৫ পদ সম্বন্ধে একজন মন্তব্যকারী বলেছিলেন: “এটা পুরাতন নিয়মের সবচেয়ে জোরালো না হলেও, জোরালো অভিব্যক্তিগুলোর মধ্যে একটা।”

৬. অনেক অসিদ্ধ মানুষ কোমল সমবেদনাকে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছে কিন্তু যিহোবা আমাদের কী আশ্বাস দেন?

কোমল সমবেদনা কি দুর্বলতার এক চিহ্ন? অনেক অসিদ্ধ মানুষের সেইরকম  দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, রোমীয় দার্শনিক সেনেকার কথা বলা যায়, যিনি যিশুর সমসাময়িক একজন ব্যক্তি এবং রোমের একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি ছিলেন, তিনি শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, “মমতা বোধ হল মনের একটা দুর্বলতা।” সেনেকা স্টোয়িকবাদের একজন সমর্থক ছিলেন, যে-দর্শনবিদ্যা অনুভূতিশূন্য শান্ত অবস্থার ওপর জোর দেয়। সেনেকা বলেছিলেন যে, একজন জ্ঞানী ব্যক্তি হয়তো দুর্দশাগ্রস্ত লোকেদের সাহায্য করতে পারেন কিন্তু তার নিজের কখনোই মমতা বোধ করা উচিত হবে না কারণ এইরকম অনুভূতি তাকে প্রশান্তি লাভ করা থেকে বঞ্চিত করবে। জীবন সম্বন্ধে এইরকম আত্মকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আন্তরিক সমবেদনার কোনো জায়গা নেই। কিন্তু যিহোবা একেবারেই আলাদা! তাঁর বাক্যে যিহোবা আমাদের আশ্বস্ত করেন যে, তিনি “স্নেহপূর্ণ ও দয়াময় [আক্ষরিক অর্থে, “সমব্যাথী”]।” (যাকোব ৫:১১) আমরা দেখব যে, সমবেদনা কোনো দুর্বলতা নয় বরং প্রগাঢ়, অতীব গুরুত্বপূর্ণ এক গুণ। আসুন আমরা পরীক্ষা করে দেখি যে, কীভাবে যিহোবা একজন প্রেমময় পিতার মতো এটা প্রদর্শন করেন।

যিহোবা যখন একটা জাতিকে সমবেদনা দেখিয়েছিলেন

৭, ৮. প্রাচীন মিশরে ইস্রায়েলীয়রা কীভাবে কষ্ট ভোগ করেছিল এবং যিহোবা তাদের কষ্টের প্রতি কীভাবে সাড়া দিয়েছিলেন?

ইস্রায়েল জাতির সঙ্গে যিহোবা যেভাবে আচরণ করেছিলেন, তাতে তাঁর সমবেদনা স্পষ্ট দেখা গিয়েছে। সা.কা.পূ. ১৬ শতাব্দীর শেষের দিকে, লক্ষ লক্ষ ইস্রায়েলীয় প্রাচীন মিশরে দাসত্ব করেছিল, যেখানে তাদের ওপর কঠোর অত্যাচার করা হয়েছিল। মিশরীয়রা “কর্দ্দম, ইষ্টক . . . সমস্ত কার্য্যে কঠিন দাস্যকর্ম্ম দ্বারা উহাদের প্রাণ তিক্ত করিতে লাগিল।” (যাত্রাপুস্তক ১:১১, ১৪) তাদের দুর্দশার সময়ে ইস্রায়েলীয়রা সাহায্যের জন্য যিহোবার কাছে কেঁদেছিল। কোমল সমবেদনাময় ঈশ্বর কীভাবে সাড়া দিয়েছিলেন?

যিহোবার হৃদয় আবেগাপ্লুত হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন: “সত্যই আমি মিসরস্থ আপন প্রজাদের কষ্ট দেখিয়াছি, এবং কার্য্যশাসকদের সমক্ষে তাহাদের  ক্রন্দনও শুনিয়াছি; ফলতঃ আমি তাহাদের দুঃখ জানি।” (যাত্রাপুস্তক ৩:৭) নির্লিপ্তভাবে তাঁর লোকেদের দুঃখকষ্ট দেখা বা তাদের কান্না শোনা যিহোবার পক্ষে অসম্ভব ছিল। আমরা এই বইয়ের ২৪ অধ্যায়ে যেমন দেখেছি যে, যিহোবা এক সহমর্মী ঈশ্বর। আর সহমর্মিতা—অন্যদের ব্যথা অনুভব করার ক্ষমতা—সমবেদনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু যিহোবা তাঁর লোকেদের জন্য শুধু অনুভবই করেননি; তিনি তাদের জন্য কাজ করতে পরিচালিত হয়েছিলেন। যিশাইয় ৬৩:৯ পদ বলে: “তিনি আপন প্রেমে ও আপন স্নেহে [“সমবেদনায়,” NW] তাহাদিগকে মুক্ত করিতেন।” “বলবান্‌ হস্ত” দ্বারা যিহোবা ইস্রায়েলীয়দের মিশর থেকে মুক্ত করেছিলেন। (দ্বিতীয় বিবরণ ৪:৩৪) এরপর, তিনি তাদের অলৌকিকভাবে খাবার জুগিয়েছিলেন এবং তাদেরকে এমন এক ফলবতী দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন, যা তাদের নিজেদের হয়েছিল।

৯, ১০. (ক) ইস্রায়েলীয়রা প্রতিজ্ঞাত দেশে বসবাস করার সময় যিহোবা কেন বার বার তাদের উদ্ধার করেছিলেন? (খ) যিপ্তহের দিনে, যিহোবা ইস্রায়েলীয়দের কোন উৎপীড়ন থেকে উদ্ধার করেছিলেন আর কী তাঁকে তা করতে পরিচালিত করেছিল?

যিহোবার সমবেদনা সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। প্রতিজ্ঞাত দেশে বসবাস করার সময়, ইস্রায়েল বার বার অবিশ্বস্ত হয়েছিল আর এর ফলে কষ্ট ভোগ করেছিল। কিন্তু পরে লোকেরা চেতনা ফিরে পেয়েছিল এবং যিহোবাকে ডেকেছিল। বার বার তিনি তাদের রক্ষা করেছিলেন। কেন? “কেননা তিনি আপন প্রজাদের . . . প্রতি মমতা [“সমবেদনা বোধ,” NW] করিতেন।”—২ বংশাবলি ৩৬:১৫; বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ ২:১১-১৬.

১০ যিপ্তহের দিনে কী ঘটেছিল, তা বিবেচনা করুন। ইস্রায়েলীয়রা মিথ্যা দেবতাদের সেবা করতে শুরু করায়, যিহোবা তাদের ১৮ বছরের জন্য অম্মোনীয়দের দ্বারা উৎপীড়িত হতে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত, ইস্রায়েলীয়রা অনুতপ্ত হয়েছিল। বাইবেল আমাদের বলে: “তাহারা আপনাদের মধ্য হইতে বিজাতীয় দেবগণকে দূর করিয়া সদাপ্রভুর সেবা করিল; তাহাতে ইস্রায়েলের কষ্টে তাঁহার প্রাণ দুঃখিত হইল।” (বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ ১০:৬-১৬) তাঁর লোকেরা যখনই মন থেকে অনুতপ্ত হতো, যিহোবা আর তাদের কষ্ট সহ্য করতে পারতেন না। তাই কোমল সমবেদনার ঈশ্বর, ইস্রায়েলীয়দের তাদের শত্রুদের হাত থেকে  উদ্ধার করার জন্য যিপ্তহকে শক্তি দিয়েছিলেন।—বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ ১১:৩০-৩৩.

১১. ইস্রায়েলীয়দের প্রতি যিহোবার আচরণ থেকে আমরা সমবেদনা সম্বন্ধে কী শিখি?

১১ ইস্রায়েল জাতির সঙ্গে যিহোবার আচরণ কোমল সমবেদনা সম্বন্ধে আমাদের কী শিক্ষা দেয়? একটা বিষয় হল, আমরা দেখতে পাই যে এটা শুধু লোকেদের প্রতিকূল অবস্থার প্রতি সহানুভূতি ছাড়াও বেশি কিছু। একজন মায়ের উদাহরণের কথা মনে করে দেখুন, যার সমবেদনা তার শিশুর কান্নায় সাড়া দিতে তাকে পরিচালিত করে। একইভাবে, যিহোবা তাঁর লোকেদের কান্নাকে উপেক্ষা করেন না। তাঁর কোমল সমবেদনা তাঁকে তাদের কষ্ট দূর করতে পরিচালিত করে। এ ছাড়া, ইস্রায়েলীয়দের সঙ্গে যিহোবা যেভাবে আচরণ করেছিলেন, তা আমাদের এই শিক্ষাও দেয় যে সমবেদনা কোনোভাবেই একটা দুর্বলতা নয় কারণ এই কোমল গুণটা তাঁকে তাঁর লোকেদের পক্ষে দৃঢ়, চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে পরিচালিত করেছিল। কিন্তু, যিহোবা কি তাঁর দাসদের কেবল দলগতভাবে সমবেদনা দেখান?

ব্যক্তিবিশেষের প্রতি যিহোবার সমবেদনা

১২. কীভাবে ব্যবস্থা ব্যক্তিবিশেষদের জন্য যিহোবার সমবেদনাকে প্রতিফলিত করেছিল?

১২ ঈশ্বর ইস্রায়েল জাতিকে যে-ব্যবস্থা দিয়েছিলেন, তা ব্যক্তিবিশেষের প্রতি তাঁর সমবেদনাকে প্রকাশ করেছিল। উদাহরণ হিসেবে, গরিব ব্যক্তিদের জন্য তাঁর চিন্তার কথা বিবেচনা করুন। যিহোবা জানতেন যে, হঠাৎ করে এমন পরিস্থিতির উদয় হতে পারে, যেকারণে একজন ইস্রায়েলীয় গরিব হয়ে যেতে পারে। গরিব ব্যক্তিদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হতো? যিহোবা ইস্রায়েলীয়দের দৃঢ়ভাবে আদেশ দিয়েছিলেন: “তুমি আপন হৃদয় কঠিন করিও না, বা দরিদ্র ভ্রাতার প্রতি আপন হস্ত রুদ্ধ করিও না; তুমি তাহাকে অবশ্য দিবে, দিবার সময়ে হৃদয়ে দুঃখিত হইবে না; কেননা এই কার্য্য প্রযুক্ত তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমার সমস্ত কর্ম্মে . . . তোমাকে আশীর্ব্বাদ করিবেন।” (দ্বিতীয় বিবরণ ১৫:৭, ১০) যিহোবা আরও আদেশ দিয়েছিলেন যে, ইস্রায়েলীয়রা তাদের খেতের কিনারার শস্য সম্পূর্ণভাবে সংগ্রহ করবে না বা পড়ে থাকা শস্য তুলবে না। এই পড়ে থাকা শস্য গরিবদুঃখীদের জন্য ছিল। (লেবীয় পুস্তক ২৩:২২; রূতের বিবরণ ২:২-৭) সেই  জাতি যখন তাদের মধ্যে থাকা গরিব লোকেদের জন্য এই বিবেচনাপূর্ণ আইনটা পালন করেছিল, তখন ইস্রায়েলের অভাবী ব্যক্তিদের খাদ্য ভিক্ষা করতে হয়নি। সেটা কি যিহোবার কোমল সমবেদনার একটা প্রতিফলন ছিল না?

১৩, ১৪. (ক) দায়ূদের কথাগুলো আমাদের কীভাবে আশ্বাস দেয় যে, যিহোবা ব্যক্তিগতভাবে আমাদের সম্বন্ধে গভীরভাবে চিন্তিত? (খ) কীভাবে উদাহরণ দিয়ে বর্ণনা করা যায় যে, যিহোবা “ভগ্নচিত্তদের” ও “চূর্ণমনাদের” নিকটবর্তী?

১৩ আজকেও, আমাদের প্রেমময় ঈশ্বর আমাদের প্রত্যেকের বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তিত। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে আমরা যে-কষ্টভোগই করি না কেন, সেই সম্বন্ধে তিনি ভালভাবে জানেন। গীতরচক দায়ূদ লিখেছিলেন: “ধার্ম্মিকগণের প্রতি সদাপ্রভুর দৃষ্টি আছে, তাহাদের আর্ত্তনাদের প্রতি তাঁহার কর্ণ আছে। সদাপ্রভু ভগ্নচিত্তদের নিকটবর্ত্তী, তিনি চূর্ণমনাদের পরিত্রাণ করেন।” (গীতসংহিতা ৩৪:১৫, ১৮) এই বাক্যগুলো যাদের সম্বন্ধে বর্ণনা করে, তাদের বিষয়ে বাইবেলের একজন মন্তব্যকারী উল্লেখ করেন: ‘তারা ভগ্নচিত্ত ও চূর্ণমনা অর্থাৎ পাপের জন্য অবনমিত আর আত্মসম্মান বোধহীন; নিজেদের চোখে তারা খুবই নিচু এবং নিজেদের যোগ্যতা সম্বন্ধে তাদের কোনো আস্থা নেই।’ এইরকম ব্যক্তিরা হয়তো মনে করতে পারে যে, যিহোবা অনেক দূরে এবং তারা এতই নগণ্য যে, তাঁর মনোযোগ পাওয়ার অযোগ্য। কিন্তু তা ঠিক নয়। দায়ূদের বাক্যগুলো আমাদের আশ্বাস দেয় যে, যিহোবা তাদের পরিত্যাগ করেন না যারা ‘নিজেদের চোখে খুবই নিচু।’ আমাদের সমবেদনাপূর্ণ ঈশ্বর জানেন যে, এই ধরনের সময়গুলোতে তাঁকে আমাদের আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি প্রয়োজন আর তিনি নিকটবর্তী।

১৪ একটা অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনা করুন। যুক্তরাষ্ট্রে একজন মা তাড়াহুড়ো করে তার দুবছরের ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল কারণ সেই ছেলের প্রচণ্ড কাশি ও শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। ছেলেটাকে পরীক্ষানিরীক্ষা করার পর, ডাক্তাররা মাকে জানিয়েছিল যে তারা তাকে সারারাত হাসপাতালে রাখবেন। সেই রাতটা মা কোথায় কাটিয়েছিলেন? হাসপাতালের কক্ষে, তার ছেলের বিছানার পাশে একটা চেয়ারে! তার ছোট ছেলেটি অসুস্থ ছিল আর তাই তাকে তার ছেলের কাছাকাছি থাকতে হয়েছিল। নিশ্চিতভাবে আমরা আমাদের প্রেমময়  স্বর্গীয় পিতার কাছ থেকে আরও বেশি কিছু আশা করতে পারি! কারণ আমরা তাঁর প্রতিমূর্তিতে সৃষ্ট। (আদিপুস্তক ১:২৬) গীতসংহিতা ৩৪:১৮ পদের হৃদয়স্পর্শী কথাগুলো আমাদের বলে যে আমরা যখন ‘ভগ্নচিত্ত’ ও ‘চূর্ণমনা’ হই, তখন যিহোবা একজন প্রেমময় পিতার মতো আমাদের “নিকটবর্ত্তী”—আরও বেশি সমবেদনাপূর্ণ এবং সাহায্য করার জন্য তৈরি।

১৫. কোন কোন দিক দিয়ে যিহোবা আমাদের প্রত্যেককে ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করেন?

১৫ অতএব, কীভাবে যিহোবা আমাদের প্রত্যেককে ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করেন? তিনি সাধারণত আমাদের কষ্টের কারণ দূর করে দেন না। কিন্তু যারা তাঁর কাছে সাহায্যের জন্য কাঁদে, তাদের জন্য তিনি প্রচুর ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর বাক্য বাইবেল ব্যবহারিক পরামর্শ দেয়, যা একটা পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে পারে। মণ্ডলীতে, যিহোবা আধ্যাত্মিকভাবে যোগ্য ভাইদের জোগান যারা সহউপাসকদের সাহায্য করার সময় তাঁর সমবেদনা প্রতিফলিত করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে। (যাকোব ৫:১৪, ১৫) “প্রার্থনা-শ্রবণকারী” হিসেবে তিনি “যাহারা তাঁহার কাছে যাচ্ঞা করে, তাহাদিগকে পবিত্র আত্মা” দেন। (গীতসংহিতা ৬৫:২; লূক ১১:১৩) সেই আত্মা আমাদের “পরাক্রমের উৎকর্ষ” দান করতে পারে, যাতে আমরা ঈশ্বরের রাজ্য সমস্ত চাপপূর্ণ সমস্যা দূর না করা পর্যন্ত স্থির থাকতে পারি। (২ করিন্থীয় ৪:৭) আমরা কি এই সমস্ত ব্যবস্থার জন্য কৃতজ্ঞ নই? আসুন আমরা যেন ভুলে না যাই যে, এগুলো যিহোবার কোমল সমবেদনার অভিব্যক্তি।

১৬. যিহোবার সমবেদনার সবচেয়ে বড় উদাহরণ কী এবং এটা ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে আমাদের প্রভাবিত করে?

১৬ অবশ্য, যিহোবার সমবেদনার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল তাঁর সবচেয়ে প্রিয়পাত্রকে আমাদের জন্য মুক্তির মূল্য হিসেবে দান করা। এটা যিহোবার কাছ থেকে এক প্রেমময় বলিদান ছিল আর এটা আমাদের পরিত্রাণের জন্য পথ খুলে দিয়েছিল। মনে রাখবেন যে, মুক্তির মূল্যের সেই ব্যবস্থা আমাদের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে প্রয়োগ হয়। তাই উপযুক্ত কারণেই, যোহন বাপ্তাইজকের পিতা সখরিয় ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এই ব্যবস্থা ‘আমাদের ঈশ্বরের কোমল সমবেদনাকে’ মহিমান্বিত করেছিল।—লূক ১:৭৮.

 যিহোবা যখন সমবেদনা দেখানো থেকে বিরত থাকেন

১৭-১৯. (ক) কীভাবে বাইবেল দেখায় যে, যিহোবার সমবেদনা সীমাহীন নয়? (খ) কী তাঁর লোকেদের প্রতি যিহোবার সমবেদনাকে এর সীমায় নিয়ে গিয়েছিল?

১৭ আমরা কি মনে করব যে, যিহোবার কোমল সমবেদনা সীমাহীন? এর বিপরীতে বাইবেল স্পষ্ট করে দেখায় যে, যারা তাঁর ধার্মিক মানগুলোর বিরোধিতা করে তাদের প্রতি যিহোবা উপযুক্তভাবেই সমবেদনা দেখানো থেকে বিরত থাকেন। (ইব্রীয় ১০:২৮) তিনি কেন তা করেন, সেটা দেখার জন্য ইস্রায়েল জাতির উদাহরণ স্মরণ করুন।

১৮ যদিও যিহোবা ইস্রায়েলীয়দের তাদের শত্রুদের হাত থেকে বার বার উদ্ধার করেছিলেন, তবুও তাঁর সমবেদনা শেষ পর্যন্ত এর সীমায় গিয়ে পৌঁছেছিল। এই একগুঁয়ে লোকেরা প্রতিমাপূজা করেছিল, এমনকি তাদের জঘন্য প্রতিমাগুলো যিহোবার মন্দিরে নিয়ে এসেছিল! (যিহিষ্কেল ৫:১১; ৮:১৭, ১৮) এ ছাড়া, আমাদের বলা হয়েছে: “তাহারা ঈশ্বরের দূতদিগকে পরিহাস করিত, তাঁহার বাক্য তুচ্ছ করিত, ও তাঁহার ভাববাদিগণকে বিদ্রূপ করিত; তন্নিমিত্ত শেষে আপন প্রজাদের বিরুদ্ধে সদাপ্রভুর ক্রোধ উত্থিত হইল, অবশেষে আর প্রতীকারের উপায় রহিল না।” (২ বংশাবলি ৩৬:১৬) ইস্রায়েলীয়রা এমন এক সীমায় গিয়ে পৌঁছেছিল, যেখানে সমবেদনা দেখানোর জন্য উপযুক্ত কোনো কারণ ছিল না আর তারা যিহোবার মধ্যে ন্যায্য ক্রোধ জাগিয়ে তুলেছিল। ফল কী হয়েছিল?

১৯ যিহোবা তাঁর লোকেদের প্রতি আর সমবেদনা অনুভব করেননি। তিনি ঘোষণা করেছিলেন: “আমি মমতা করিব [“সমবেদনা দেখাব,” NW] না, কৃপা করিব না, করুণা করিব না; তাহাদিগকে বিনষ্ট করিব।” (যিরমিয় ১৩:১৪) তাই, যিরূশালেম এবং এর মন্দির ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল আর ইস্রায়েলীয়দের বাবিলে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পাপী মানুষেরা যখন এতই বিদ্রোহী হয় যে, ঈশ্বরের সমবেদনার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তা কতই না দুঃখদায়ক হয়!—বিলাপ ২:২১.

২০, ২১. (ক) আমাদের দিনে যখন ঈশ্বরের সমবেদনা এর সীমায় গিয়ে পৌঁছাবে, তখন কী ঘটবে? (খ) যিহোবার কোন সমবেদনাপূর্ণ দান সম্বন্ধে পরের অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে?

২০ আজকের সম্বন্ধে কী বলা যায়? যিহোবা বদলাননি। সমবেদনাবশত তিনি  তাঁর সাক্ষিদের পৃথিবীর সমস্ত জায়গায় “রাজ্যের . . . সুসমাচার” প্রচার করার দায়িত্ব দিয়েছেন। (মথি ২৪:১৪) সৎহৃদয়ের লোকেরা যখন সাড়া দেয়, তখন যিহোবা রাজ্যের বার্তাকে উপলব্ধি করতে তাদের সাহায্য করেন। (প্রেরিত ১৬:১৪) কিন্তু, এই কাজ চিরকাল ধরে চলতে থাকবে না। খারাপ অবস্থা ও কষ্ট সহ এই দুষ্ট জগৎকে অনির্দিষ্ট কাল ধরে চলতে দেওয়া যিহোবার জন্য সমবেদনার কাজ হবে না। ঈশ্বরের সমবেদনা যখন এর সীমায় গিয়ে পৌঁছাবে, তখন যিহোবা এই বিধিব্যবস্থার বিচার সম্পন্ন করবেন। এমনকি তখনও তিনি সমবেদনাবশত কাজ করবেন—তাঁর “পবিত্র নাম” এবং তাঁর উৎসর্গীকৃত দাসদের জন্য সমবেদনা দেখাবেন। (যিহিষ্কেল ৩৬:২০-২৩) যিহোবা দুষ্টতা দূর করবেন এবং এক ধার্মিক নতুন জগৎ শুরু করবেন। দুষ্টের সম্বন্ধে যিহোবা ঘোষণা করেন: “আমিও চক্ষুলজ্জা করিব না, দয়াও করিব [“সমবেদনাও দেখাব,” NW] না; তাহাদের কার্য্যের ফল তাহাদের উপরে বর্ত্তাইব।”—যিহিষ্কেল ৯:১০.

২১ সেই সময় পর্যন্ত, যিহোবা তাঁর লোকেদের জন্য সমবেদনা অনুভব করেন, এমনকি তাদের প্রতিও যারা ধ্বংসের মুখোমুখি হয়। যে-পাপী মানুষেরা অকপটভাবে অনুতপ্ত হয়, তারা যিহোবার সবচেয়ে সমবেদনাপূর্ণ দানগুলোর একটা থেকে উপকার পেতে পারে, যা হল ক্ষমা। পরের অধ্যায়ে আমরা বাইবেলের কিছু সুন্দর উদাহরণ সম্বন্ধে আলোচনা করব, যা যিহোবার ক্ষমার সম্পূর্ণতা প্রকাশ করে।

^ অনু. 3 কিন্তু, আগ্রহের বিষয় হল যে, গীতসংহিতা ১০৩:১৩ পদে ইব্রীয় ক্রিয়া পদ রেকেম করুণা অথবা সমবেদনাকে ইঙ্গিত করে, যা একজন বাবা তার সন্তানের প্রতি প্রদর্শন করেন।