সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

যিহোবার নিকটবর্তী হোন

 অধ্যায় ৩০

“প্রেমে চল”

“প্রেমে চল”

১-৩. আমরা যখন প্রেম দেখানোর ক্ষেত্রে যিহোবার উদাহরণ অনুকরণ করি, তখন কোন ফলগুলো আসে?

“গ্রহণ করা অপেক্ষা বরং দান করা ধন্য [“সুখী,” NW] হইবার বিষয়।” (প্রেরিত ২০:৩৫) যিশুর ওই কথাগুলো এই গুরুত্বপূর্ণ সত্যের ওপর জোর দেয়: নিঃস্বার্থ প্রেম স্বয়ং পুরস্কারজনক। যদিও প্রেম গ্রহণে অনেক সুখ পাওয়া যায় কিন্তু অন্যদের প্রেম দান করায় বা দেখানোয় আরও বেশি সুখ রয়েছে।

আমাদের স্বর্গীয় পিতার চেয়ে আর কেউ এটা এত ভালভাবে জানে না। এই বিভাগের আগের অধ্যায়গুলোতে আমরা যেমন দেখেছি যে, যিহোবা হলেন প্রেমের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তাঁর মতো আর কেউই এত মহৎ উপায়ে বা এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রেম দেখাননি। তাই, যিহোবাকে যে ‘ধন্য [“সুখী,” NW] ঈশ্বর’ বলা হয়েছে, তাতে কি অবাক হওয়ার কিছু আছে?—১ তীমথিয় ১:১১.

আমাদের প্রেমময় ঈশ্বর চান যেন আমরা তাঁর মতো হওয়ার চেষ্টা করি, বিশেষ করে প্রেম দেখানোর ক্ষেত্রে। ইফিষীয় ৫:১, ২ পদ আমাদের বলে: “প্রিয় বৎসদের ন্যায় তোমরা ঈশ্বরের অনুকারী হও। আর প্রেমে চল।” আমরা যখন যিহোবার প্রেম প্রদর্শনের উদাহরণ অনুকরণ করি, তখন আমরা দান করা থেকে যে-পরম সুখ আসে, তা উপভোগ করি। এ ছাড়া, আমরা এটা জেনেও সন্তুষ্ট হই যে আমরা যিহোবাকে খুশি করছি কারণ তাঁর বাক্য আমাদের ‘পরস্পরকে প্রেম’ করতে উৎসাহিত করে। (রোমীয় ১৩:৮) কিন্তু, কেন আমাদের ‘প্রেমে চলা’ উচিত, সেটার আরও কারণ রয়েছে।

যেকারণে প্রেম অপরিহার্য

৪, ৫. আমাদের সহবিশ্বাসীদের প্রতি আত্মত্যাগমূলক প্রেম দেখানো গুরুত্বপূর্ণ কেন?

আমাদের সহবিশ্বাসীদের প্রতি প্রেম দেখানো কেন গুরুত্বপূর্ণ? সহজ কথায় বলা যায়, প্রেম হল প্রকৃত খ্রিস্টধর্মের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। প্রেম ছাড়া সহবিশ্বাসীদের সঙ্গে আমাদের কাছের সম্পর্ক থাকতে পারে না আর এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে, যিহোবার চোখে আমাদের কোনো মূল্য থাকে না। ঈশ্বরের বাক্য এই সত্যগুলোকে কীভাবে তুলে ধরে, তা বিবেচনা করুন।

 যিশু তাঁর পার্থিব জীবনের শেষ রাতে তাঁর অনুসারীদের বলেছিলেন: “এক নূতন আজ্ঞা আমি তোমাদিগকে দিতেছি, তোমরা পরস্পর প্রেম কর; আমি যেমন তোমাদিগকে প্রেম করিয়াছি, তোমরাও তেমনি পরস্পর প্রেম কর। তোমরা যদি আপনাদের মধ্যে পরস্পর প্রেম রাখ, তবে তাহাতেই সকলে জানিবে যে, তোমরা আমার শিষ্য।” (যোহন ১৩:৩৪, ৩৫) “আমি যেমন তোমাদিগকে প্রেম করিয়াছি”—হ্যাঁ, আমাদের আজ্ঞা দেওয়া হয়েছে যেন যিশু যেরকম প্রেম দেখিয়েছিলেন, আমরাও সেরকম প্রেম দেখাই। ২৯ অধ্যায়ে আমরা লক্ষ করেছি যে, যিশু অন্যদের চাহিদা ও আগ্রহগুলোকে নিজের ইচ্ছার আগে রেখে আত্মত্যাগমূলক প্রেম দেখানোর উৎকৃষ্ট উদাহরণ স্থাপন করেছেন। আমাদেরও নিঃস্বার্থ প্রেম দেখাতে হবে আর আমাদের তা এতটা স্পষ্টভাবে দেখাতে হবে যে, আমাদের প্রেম যেন এমনকি খ্রিস্টীয় মণ্ডলীর বাইরের লোকেদের কাছেও স্পষ্ট হয়। বাস্তবিকই, আত্মত্যাগমূলক ভ্রাতৃপ্রেম হল সেই চিহ্ন যেটার দ্বারা আমরা খ্রিস্টের প্রকৃত অনুসারী হিসেবে শনাক্তিকৃত হই।

৬, ৭. (ক) কীভাবে আমরা জানি যে, যিহোবার বাক্য প্রেম দেখানোর গুরুত্বের ওপর জোর দেয়? (খ) ১ করিন্থীয় ১৩:৪-৮ পদে লিপিবদ্ধ পৌলের বাক্যগুলো প্রেমের কোন বৈশিষ্ট্যের ওপর মনোযোগ আকর্ষণ করে?

আমাদের মধ্যে যদি প্রেমের অভাব থাকে, তা হলে কী? প্রেরিত পৌল বলেছিলেন যে, “যদি . . . আমার প্রেম না থাকে, তবে আমি শব্দকারক পিত্তল ও ঝম্‌ঝম্‌কারী করতাল হইয়া পড়িয়াছি।” (১ করিন্থীয় ১৩:১) ঝম্‌ঝম্‌কারী করতাল কর্কশ আওয়াজ উৎপন্ন করে। আর শব্দকারক পিতল সম্বন্ধেই বা কী বলা যায়? অন্য অনুবাদগুলো বলে, “শব্দকারী ঘন্টা” বা “প্রতিধ্বনিকারী ঘন্টা।” কতই না উপযুক্ত উদাহরণ! একজন প্রেমহীন ব্যক্তি এমন একটা বাদ্যযন্ত্রের মতো, যেটা উচ্চ, কর্কশ আওয়াজ উৎপন্ন করে, যা আকৃষ্ট করার চেয়ে বরং দূরে সরিয়ে দেয়। এইরকম একজন ব্যক্তি কীভাবে অন্যদের সঙ্গে এক কাছের সম্পর্ক উপভোগ করতে পারে? পৌল এও বলেছিলেন: “যদি আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস থাকে যাহাতে আমি পর্ব্বত স্থানান্তর করিতে পারি, কিন্তু আমার প্রেম না থাকে, তবে আমি কিছুই নহি।” (১ করিন্থীয় ১৩:২) শুধু একবার ভেবে দেখুন, প্রেমহীন একজন ব্যক্তি যত কাজই করুক না কেন, তিনি “একজন অকেজো ব্যক্তি।” (দি অ্যামপ্লিফাইড বাইবেল) অতএব, এটা কি স্পষ্ট নয় যে যিহোবার বাক্য প্রেম দেখানোর গুরুত্বের ওপর জোর দেয়?

তা হলে, কীভাবে আমরা অন্যদের সঙ্গে আচরণের সময় এই গুণ প্রদর্শন করতে  পারি? এর উত্তর দেওয়ার জন্য আসুন আমরা ১ করিন্থীয় ১৩:৪-৮ পদে পাওয়া পৌলের বাক্যগুলো পরীক্ষা করি। এই পদগুলো আমাদের প্রতি ঈশ্বরের প্রেম বা ঈশ্বরের প্রতি আমাদের প্রেমের ওপর জোর দেয় না। বরং, পৌল আমাদের পরস্পরের প্রতি যেভাবে প্রেম দেখানো উচিত, সেটার ওপর মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। প্রেম যা এবং প্রেম যা নয় সেই সম্বন্ধে তিনি কিছু বিষয় বর্ণনা করেছিলেন।

প্রেম যা

৮. দীর্ঘসহিষ্ণুতা কীভাবে অন্যদের সঙ্গে আমাদের আচরণের সময় সাহায্য করতে পারে?

“প্রেম চিরসহিষ্ণু।” চিরসহিষ্ণু বা দীর্ঘসহিষ্ণু হওয়ার অর্থ, ধৈর্যপূর্বক অন্যদের সঙ্গে মানিয়ে চলা। (কলসীয় ৩:১৩) আমাদের কি এইরকম ধৈর্যের দরকার নেই? আমরা অসিদ্ধ মানুষেরা যেহেতু একসঙ্গে উপাসনা করছি, তাই এটা আশা করা যুক্তিযুক্ত যে, সময়ে সময়ে আমাদের খ্রিস্টান ভাইয়েরা হয়তো আমাদের বিরক্তির কারণ হতে পারে এবং একইভাবে আমরাও তাদের বিরক্তির কারণ হতে পারি। কিন্তু, ধৈর্য ও আত্মসংযম আমাদের মণ্ডলীর শান্তিকে নষ্ট না করে বরং অন্যদের সঙ্গে আচরণের  সময় ঘটে থাকা ছোটখাটো ঝগড়া ও বিরক্তিগুলোকে মোকাবিলা করতে সাহায্য করতে পারে।

৯. কীভাবে আমরা অন্যদের প্রতি দয়া দেখাতে পারি?

“প্রেম মধুর [“দয়াশীল,” NW]।” উপকারজনক কাজ এবং সুবিবেচনাপূর্ণ কথার দ্বারা দয়া দেখানো যায়। প্রেম আমাদের বিশেষ করে যাদের বেশি দরকার, তাদের প্রতি দয়া দেখানোর উপায় খুঁজতে পরিচালিত করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, একজন বৃদ্ধ সহবিশ্বাসী হয়তো একাকী হতে পারেন আর তার সঙ্গে উৎসাহমূলক সাক্ষাতের দরকার হতে পারে। একজন একক মা অথবা ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত পরিবারে থাকা একজন বোনের হয়তো কিছু সাহায্যের দরকার হতে পারে। একজন ব্যক্তি, যিনি অসুস্থ বা কিছু সমস্যায় পড়েছেন, তার হয়তো একজন অনুগত বন্ধুর কাছ থেকে দুটো দয়াপূর্ণ কথা শোনার প্রয়োজন হতে পারে। (হিতোপদেশ ১২:২৫; ১৭:১৭) আমরা যখন এভাবে দয়া দেখাতে এগিয়ে যাই, তখন আমরা আমাদের প্রেম যে অকৃত্রিম তা প্রদর্শন করি।—২ করিন্থীয় ৮:৮.

১০. কীভাবে প্রেম আমাদের সত্যকে সমর্থন করতে ও সত্য বলতে সাহায্য করে এমনকি তা করা যখন সহজ নয়?

১০ “প্রেম . . . সত্যের সহিত আনন্দ করে।” আরেকটা অনুবাদ বলে: “প্রেম . . . আনন্দের সঙ্গে সত্যের পক্ষ নেয়।” প্রেম আমাদের সত্যকে তুলে ধরতে এবং একে অপরের সঙ্গে “সত্য” বলতে পরিচালিত করে। (সখরিয় ৮:১৬) উদাহরণস্বরূপ, আমাদের কোনো প্রিয়জন যদি গুরুতর পাপ করে, তা হলে যিহোবার প্রতি—আর যে ভুল করেছে তার প্রতি—প্রেম আমাদের অন্যায় গোপন করার, অন্যায়ের পক্ষে যুক্তি দেখানোর বা এমনকি মিথ্যা বলার পরিবর্তে ঈশ্বরের মানগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকতে সাহায্য করবে। এটা ঠিক যে, বাস্তব সত্যকে মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রিয়জনের মঙ্গলের কথা মনে রেখে, আমরা চাইব যে সে ঈশ্বরের প্রেমময় শাসনকে গ্রহণ করুক ও তাতে সাড়া দিক। (হিতোপদেশ ৩:১১, ১২) প্রেমময় খ্রিস্টান হিসেবে, আমরাও “সর্ব্ববিষয়ে সদাচরণ করিতে” চাই।—ইব্রীয় ১৩:১৮.

১১. প্রেম যেহেতু “সকলই বহন করে,” তাই সহবিশ্বাসীদের ত্রুটিগুলোর বিষয়ে আমাদের কী করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করা উচিত?

১১ “প্রেম . . . সকলই বহন করে।” এই অভিব্যক্তির আক্ষরিক অর্থ, “এটা সমস্তকিছু আচ্ছাদন করে।” (কিংডম ইন্টারলিনিয়ার) প্রথম পিতর ৪:৮ পদ বলে: “প্রেম পাপরাশি আচ্ছাদন করে।” হ্যাঁ, একজন খ্রিস্টান যিনি প্রেমের দ্বারা পরিচালিত হন,  তিনি তার খ্রিস্টান ভাইদের সমস্ত অসিদ্ধতা এবং ত্রুটি প্রকাশ করে দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী নন। অনেক ক্ষেত্রে, সহবিশ্বাসীদের ভুলত্রুটিগুলো ছোটখাটো হয়ে থাকে আর প্রেমের দ্বারা সেগুলোকে আচ্ছাদন করা যেতে পারে।—হিতোপদেশ ১০:১২; ১৭:৯.

প্রেম আমাদের ভাইদের প্রতি আস্থা প্রকাশ করতে পরিচালিত করে

১২. প্রেরিত পৌল কীভাবে দেখিয়েছিলেন যে তিনি ফিলীমনের সর্বোৎকৃষ্ট বিষয়ে বিশ্বাস করেছিলেন আর আমরা পৌলের উদাহরণ থেকে কী শিখতে পারি?

১২ “প্রেম . . . সকলই বিশ্বাস করে।” মোফেটের অনুবাদ বলে যে, প্রেম “সবসময় সর্বোৎকৃষ্ট বিষয় বিশ্বাস করতে আগ্রহী।” আমরা সহবিশ্বাসীদের প্রতি অত্যধিক সন্দেহপ্রবণ হতে চাই না বা তাদের প্রতিটা উদ্দেশ্য নিয়েই সন্দেহ করতে চাই না। প্রেম আমাদের ভাইদের সম্বন্ধে “সর্বোৎকৃষ্ট বিষয় বিশ্বাস” করতে এবং তাদের ওপর নির্ভর করতে সাহায্য করে। * ফিলীমনের কাছে লেখা পৌলের চিঠির একটা উদাহরণ লক্ষ করুন। পৌল ফিলীমনকে এই বিষয়ে উৎসাহ দেওয়ার জন্য লিখেছিলেন, যাতে পলাতক দাস ওনীষিম—যিনি একজন খ্রিস্টান হয়েছিলেন—ফিরে আসলে তাকে যেন সদয়ভাবে অভ্যর্থনা জানান।। ফিলীমনকে বাধ্য করতে চেষ্টা করার পরিবর্তে, পৌল প্রেমের সঙ্গে আবেদন করেছিলেন। ফিলীমন যে সঠিক বিষয়টাই করবেন সেই বিষয়ে তিনি আস্থা প্রকাশ করেছিলেন, এই বলে: “তোমার আজ্ঞাবহতায় দৃঢ় বিশ্বাস আছে বলিয়া তোমাকে লিখিলাম; যাহা বলিলাম, তুমি তদপেক্ষাও অধিক করিবে, ইহা জানি।” (২১ পদ) প্রেম যখন আমাদের ভাইদের প্রতি এইরকম আস্থা প্রকাশ করতে পরিচালিত করে, তখন আমরা তাদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট বিষয়টা খুঁজে বের করি।

১৩. আমরা কীভাবে দেখাতে পারি যে আমরা আমাদের ভাইদের জন্য সর্বোত্তমটা আশা করি?

১৩ “প্রেম . . . সকলই প্রত্যাশা করে।” প্রেম যেমন নির্ভরযোগ্য, তেমনই এটা প্রত্যাশাপূর্ণ। প্রেমের দ্বারা পরিচালিত হয়ে, আমরা আমাদের ভাইদের জন্য সর্বোত্তমটা আশা করি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন ভাই যদি ‘সচেতন হওয়ার আগে ভুল পদক্ষেপ নেন,’ (NW) তা হলে আমরা আশা করতে পারি যে তিনি তাকে পুনঃসমন্বয় করার প্রেমময় প্রচেষ্টায় সাড়া দেবেন। (গালাতীয় ৬:১) এ ছাড়া, আমরা আশা করি যে, যারা বিশ্বাসে দুর্বল তারাও সুস্থ হয়ে উঠবে। আমরা এইরকম ব্যক্তিদের প্রতি ধৈর্য ধরি, বিশ্বাসে দৃঢ় হতে তাদের সাহায্য করার জন্য আমাদের যথাসাধ্য  করি। (রোমীয় ১৫:১; ১ থিষলনীকীয় ৫:১৪) এমনকি কোনো প্রিয়জন যদি ভুল পথেও যায়, তখনও আমরা এই আশা হারাই না যে একদিন সে যিশুর দৃষ্টান্তের অপব্যয়ী পুত্রের মতো তার চেতনা ফিরে পাবে এবং যিহোবার কাছে ফিরে আসবে।—লূক ১৫:১৭, ১৮.

১৪. মণ্ডলীর মধ্যে আমাদের সহ্যশক্তি কোন কোন উপায়ে পরীক্ষিত হতে পারে আর প্রেম কীভাবে আমাদের সাড়া দিতে সাহায্য করবে?

১৪ “প্রেম . . . সকলই ধৈর্যপূর্ব্বক সহ্য করে।” সহ্যশক্তি আমাদের হতাশা বা কষ্টের মধ্যেও দৃঢ় থাকতে সমর্থ করে। সহ্যশক্তির পরীক্ষা কেবল মণ্ডলীর বাইরে থেকেই আসে না। মাঝে মাঝে, আমরা মণ্ডলীর মধ্যেও পরীক্ষিত হতে পারি। অসিদ্ধতার কারণে, আমাদের ভাইয়েরা হয়তো মাঝে মাঝে আমাদের হতাশ করতে পারে। বিবেচনাহীন একটা মন্তব্য হয়তো আমাদের অনুভূতিকে আঘাত করতে পারে। (হিতোপদেশ ১২:১৮) মণ্ডলীর একটা বিষয় আমরা যেভাবে ভেবেছি যে করা উচিত, হয়তো সেভাবে সেটা পরিচালিত হয়নি। একজন সম্মানীয় ভাইয়ের আচরণ হয়তো দুঃখ দিতে পারে, যা আমাদের ভাবতে পরিচালিত করে, ‘একজন খ্রিস্টান কীভাবে এইরকম আচরণ করতে পারেন?’ এইরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে, আমরা কি মণ্ডলী থেকে নিজেদের সরিয়ে নেব এবং যিহোবাকে সেবা করা বন্ধ করে দেব? আমাদের যদি প্রেম থাকে, তবে আমরা তা করব না! হ্যাঁ, প্রেম আমাদের এমন অন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে প্রতিরোধ করে, যেকারণে আমরা একজন ভাইয়ের ত্রুটিগুলোর জন্য তার মধ্যে বা সম্পূর্ণ মণ্ডলীর মধ্যে আর ভাল কিছু দেখতে পারি না। প্রেম আমাদের একজন অসিদ্ধ মানুষ যাই বলুক বা করুক না কেন, তা উপেক্ষা করে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে এবং মণ্ডলীকে সমর্থন করে চলতে সক্ষম করে।—গীতসংহিতা ১১৯:১৬৫.

প্রেম যা নয়

১৫. অনুপযুক্ত ঈর্ষা কী এবং কীভাবে প্রেম আমাদের এই ধ্বংসাত্মক আবেগ এড়িয়ে চলতে সাহায্য করে?

১৫ “প্রেম . . . ঈর্ষা করে না।” অনুপযুক্ত ঈর্ষা অন্যদের যা আছে, যেমন তাদের জিনিসপত্র, বিশেষ সুযোগ বা কর্মদক্ষতাগুলোর জন্য তাদের প্রতি আমাদের বিদ্বেষপরায়ণ করে তুলতে পারে। এইরকম ঈর্ষা এক স্বার্থপর, ধ্বংসাত্মক অনুভূতি যা নিয়ন্ত্রণ না করলে মণ্ডলীর শান্তি নষ্ট করতে পারে। কী আমাদের “মাৎসর্য্যের” বা ঈর্ষার প্রবণতাকে প্রতিরোধ করতে সাহায্য করবে? (যাকোব ৪:৫) এক কথায় উত্তর হল  প্রেম। এই মূল্যবান গুণ আমাদের সেই ব্যক্তিদের সঙ্গে আনন্দ করতে সমর্থ করে, যাদের জীবনে এমন কিছু সুযোগসুবিধা রয়েছে যা আমাদের নেই। (রোমীয় ১২:১৫) কেউ যখন কিছু বিশেষ কর্মদক্ষতা বা উল্লেখযোগ্য সাফল্যের জন্য প্রশংসা লাভ করেন, তখন প্রেম সেটাকে আমাদের আত্মসম্মানে আঘাত বলে মনে না করতে সাহায্য করে।

১৬. আমরা যদি আমাদের ভাইদের সত্যিই ভালবাসি, তা হলে কেন আমরা যিহোবার সেবায় যা করছি সেই বিষয়ে বড়াই করা এড়িয়ে চলব?

১৬ “প্রেম . . . আত্মশ্লাঘা করে না, গর্ব্ব করে না।” প্রেম আমাদের প্রতিভা বা সাফল্যগুলোকে জাহির করা থেকে বিরত করে। আমরা যদি আমাদের ভাইদের সত্যিই ভালবাসি, তা হলে কীভাবে আমরা পরিচর্যায় আমাদের সাফল্য বা মণ্ডলীতে আমাদের বিশেষ সুযোগগুলোর জন্য সবসময় আত্মশ্লাঘা করতে পারি? এইরকম বড়াই করা অন্যদের নিরুৎসাহিত করতে পারে, তাদেরকে অন্যদের তুলনায় নিকৃষ্ট মনে করাতে পারে। ঈশ্বর তাঁর সেবায় আমাদের যা করার সুযোগ দিয়েছেন, সেইজন্য প্রেম গর্ব করতে দেয় না। (১ করিন্থীয় ৩:৫-৯) এ ছাড়া, প্রেম “গর্ব্ব করে না” অথবা যেমন একটা সংস্করণ বলে, এটা “নিজের গুরুত্ব সম্বন্ধে উদ্ধত ধারণা পোষণ” করে না। প্রেম আমাদের নিজেদের সম্বন্ধে উচ্চধারণা পোষণ করতে বাধা দেয়।—রোমীয় ১২:৩.

১৭. প্রেম আমাদের অন্যদের প্রতি কোন বিবেচনা দেখাতে পরিচালিত করে আর এর ফলে আমরা কোন ধরনের আচরণ এড়িয়ে চলব?

১৭ “প্রেম . . . অশিষ্টাচরণ করে না।” যে-ব্যক্তি অশিষ্টাচরণ করেন, তিনি সম্পূর্ণ অনুচিত বা অশোভনীয়ভাবে কাজ করেন। এইরকম কাজ প্রেমপূর্ণ নয় কারণ এটা অন্যদের অনুভূতি ও মঙ্গলকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে। এর বিপরীতে প্রেমের মধ্যে সদয়ভাব রয়েছে, যা আমাদের অন্যদের প্রতি বিবেচনা দেখাতে পরিচালিত করে। প্রেম ভাল অভ্যাস, ঈশ্বরীয় আচরণ এবং আমাদের সহবিশ্বাসীদের প্রতি সম্মান গড়ে তোলে। তাই, প্রেম আমাদের “কুৎসিত ব্যবহার”—এমন কোনো আচরণ, যা আমাদের খ্রিস্টান ভাইদের আঘাত দিতে পারে বা অসন্তুষ্ট করতে পারে—করতে দেবে না।—ইফিষীয় ৫:৩, ৪.

১৮. কেন একজন প্রেমময় ব্যক্তি কখনোই চান না যে, সবকিছু তার ইচ্ছামতো হোক?

১৮ প্রেম . . . স্বার্থ চেষ্টা করে না।” আরেকটা সংস্করণ এখানে বলে: “প্রেম নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী কিছু করতে জোর করে না।” একজন প্রেমময় ব্যক্তি কখনোই চান না  যে সবকিছু তার ইচ্ছামতো হোক, যেন তার মতামতগুলো সবসময়ই সঠিক। তিনি অন্যদের কাজে লাগিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করেন না, যাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে তাদের পরাস্ত করার জন্য নিজের প্রত্যয় জন্মানোর ক্ষমতাকে ব্যবহার করেন না। এইরকম একরোখা মনোভাব অহংকার প্রকাশ করবে আর বাইবেল বলে: “বিনাশের পূর্ব্বে অহঙ্কার।” (হিতোপদেশ ১৬:১৮) আমরা যদি আমাদের ভাইদের সত্যিই ভালবাসি, তা হলে আমরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে সম্মান করব এবং যেখানে সম্ভব সেখানে তা মেনে নেওয়ার ইচ্ছা প্রদর্শন করব। মেনে নেওয়ার মনোভাব পৌলের বাক্যগুলোর সঙ্গে মিল রাখে: “কেহই স্বার্থ চেষ্টা না করুক, বরং প্রত্যেক জন পরের মঙ্গল চেষ্টা করুক।”—১ করিন্থীয় ১০:২৪.

১৯. অন্যেরা যখন আমাদের অসন্তুষ্ট করে, তখন প্রেম কীভাবে আমাদের সাড়া দিতে সাহায্য করে?

১৯ “প্রেম . . . রাগিয়া উঠে না, অপকার গণনা করে না।” প্রেম অন্যদের কথা বা কাজের দ্বারা অতি সহজেই রেগে ওঠে না। এটা ঠিক যে, অন্যেরা যখন আমাদের অসন্তুষ্ট করে তখন দুঃখিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের যদি রাগ করার উপযুক্ত কারণও থাকে, তবুও প্রেম আমাদের রাগ করে থাকতে দেয় না। (ইফিষীয় ৪:২৬, ২৭) আমরা আঘাত করে এমন কথা বা কাজের নথি রাখতে চাইব না, ঠিক যেন একটা জমাখরচের খাতায় লিখে রাখা, যাতে সেগুলো ভুলে যাওয়া না হয়। পরিবর্তে, প্রেম আমাদের প্রেমময় ঈশ্বরকে অনুকরণ করতে পরিচালিত করে। আমরা যেমন ২৬ অধ্যায়ে দেখেছি যে, যখন ক্ষমা করার সঠিক কারণ থাকে, তখন যিহোবা ক্ষমা করেন। আর তিনি যখন আমাদের ক্ষমা করেন, তখন ভুলে যান অর্থাৎ তিনি আমাদের বিরুদ্ধে সেই পাপগুলোকে ভবিষ্যতের জন্য ধরে রাখেন না। আমরা কি কৃতজ্ঞ নই যে, যিহোবা অপকার গণনা করেন না?

২০. একজন সহবিশ্বাসী যখন ভুল করে ফেলেন এবং ফলস্বরূপ কষ্ট ভোগ করেন, তখন আমাদের কীরকম প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত?

২০ “প্রেম . . . অধার্ম্মিকতায় আনন্দ করে না।” আরেকটা সংস্করণ এখানে বলে: “প্রেম . . . অন্য মানুষের পাপের জন্য উল্লাস করে না।” মোফেটের অনুবাদ বলে: “অন্যেরা যখন ভুল করে, তখন প্রেম কখনোই আনন্দ করে না।” প্রেম কখনোই অধার্মিকতায় আনন্দ খুঁজে পায় না, তাই আমরা কোনো ধরনের অনৈতিকতাকে খাটো করে দেখি না। একজন সহবিশ্বাসী যখন পাপ করে ফেলেন আর ফলস্বরূপ  কষ্টভোগ করেন, তখন আমরা কীরকম প্রতিক্রিয়া দেখাই? প্রেম আমাদের আনন্দ করতে দেবে না, এটা বলতে দেবে না যে ‘ভাল হয়েছে! সে এটার যোগ্য ছিল!’ (হিতোপদেশ ১৭:৫) কিন্তু আমরা তখন আনন্দ করি, যখন ভুল করেছেন এমন একজন ভাই তার আধ্যাত্মিক পতন থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য সঠিক পদক্ষেপ নেন।

“উৎকৃষ্ট এক পথ”

২১-২৩. (ক) পৌল যখন বলেছিলেন, “প্রেম কখনও শেষ হয় না,” তখন তিনি কী বুঝিয়েছিলেন? (খ) শেষ অধ্যায়ে কী বিবেচনা করা হবে?

২১ “প্রেম কখনও শেষ হয় না।” পৌল এই কথাগুলোর দ্বারা কী বুঝিয়েছিলেন? বর্ণনা প্রসঙ্গে যেমন দেখা যায় যে, তিনি আত্মার দানগুলো সম্বন্ধে আলোচনা করছিলেন, যেগুলো প্রাথমিক খ্রিস্টানদের মধ্যে ছিল। সেই দানগুলো চিহ্নস্বরূপ ছিল যে, নবগঠিত মণ্ডলীর ওপর ঈশ্বরের অনুগ্রহ রয়েছে। কিন্তু সমস্ত খ্রিস্টানই সুস্থ করতে, ভবিষ্যদ্বাণী বলতে বা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতে পারতেন না। তবে, সেটা  গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না; অলৌকিক দানগুলো একসময় শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এমন কিছু থাকবে, যা প্রত্যেক খ্রিস্টান গড়ে তুলতে পারবে। এটা যেকোনো অলৌকিক দানের চেয়ে আরও বেশি উল্লেখযোগ্য, স্থায়ী ছিল। বস্তুত, পৌল এটাকে “উৎকৃষ্ট এক পথ” বলেছিলেন। (১ করিন্থীয় ১২:৩১) এই ‘উৎকৃষ্ট পথ’ কী ছিল? এটা ছিল প্রেমের পথ।

যিহোবার লোকেরা পরস্পরের প্রতি তাদের প্রেমের দ্বারা শনাক্তিকৃত হয়

২২ সত্যিই, প্রেমের পথ কখনও শেষ হয় না। আজ পর্যন্ত আত্মত্যাগমূলক ভ্রাতৃপ্রেম যিশুর প্রকৃত অনুসারীদের শনাক্ত করে। পৃথিবীব্যাপী যিহোবার উপাসকদের মণ্ডলীতে আমরা কি এইরকম প্রেমের প্রমাণ দেখতে পাই না? সেই প্রেম চিরস্থায়ী হবে কারণ যিহোবা তাঁর বিশ্বস্ত দাসদের জন্য অনন্তজীবনের প্রতিজ্ঞা করেন। (গীতসংহিতা ৩৭:৯-১১, ২৯) আমরা যেন ‘প্রেমে চলিবার’ জন্য আমাদের যথাসাধ্য করি। তা করার মাধ্যমে, আমরা দান করা থেকে যে বেশি সুখ পাওয়া যায়, তা উপভোগ করতে পারি। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, আমরা আমাদের প্রেমময় ঈশ্বর যিহোবাকে অনুকরণ করে অনন্তকাল ধরে বেঁচে থাকতে পারি—হ্যাঁ, ভালবেসে যেতে পারি।

২৩ প্রেম নিয়ে আলোচিত বিভাগের এই শেষ অধ্যায়ে, আমরা আলোচনা করেছি যে কীভাবে আমরা পরস্পরের প্রতি প্রেম দেখাতে পারি। যিহোবার প্রেম ও সেইসঙ্গে তাঁর শক্তি, ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞা থেকে আমরা যে-উপায়গুলোতে উপকার পেতে পারি, সেগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের নিজেদের জিজ্ঞেস করা উচিত, ‘আমি যিহোবাকে কীভাবে দেখাতে পারি যে, সত্যিই আমি তাঁকে ভালবাসি?’ এই প্রশ্নের উত্তর শেষ অধ্যায়ে বিবেচনা করা হবে।

^ অনু. 12 অবশ্য, খ্রিস্টীয় প্রেম কোনোভাবেই সহজে প্রতারণাযোগ্য নয়। বাইবেল আমাদের পরামর্শ দেয়: “যাহারা দলাদলি ও বিঘ্ন জন্মায়, তাহাদিগকে চিনিয়া রাখ ও তাহাদের হইতে দূরে থাক।”—রোমীয় ১৬:১৭.