১, ২. কেন অনেক লোকের আইনের প্রতি সামান্য সম্মান রয়েছে, তা সত্ত্বেও আমরা কীভাবে ঈশ্বরের আইনগুলোর প্রতি সম্মান গড়ে তুলতে পারি?

“আইন এক অতল গহ্বর, এটা . . . সমস্তকিছুই গ্রাস করে।” এই উক্তিটা ১৭১২ সালে প্রকাশিত একটা বইয়ে দেখা গিয়েছিল। এর লেখক আইনের প্রক্রিয়াকে নিন্দা করেছিলেন, যেখানে মামলাগুলো আদালতে বছরের পর বছর ধরে ধীরগতিতে চলতে থাকে, যা ন্যায়বিচার আকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিদের নিঃস্ব করে দেয়। অনেক দেশে, আইন ও বিচারসংক্রান্ত পদ্ধতিগুলো এতই জটিল ও এত বেশি অবিচার, পক্ষপাতিত্ব এবং অসংগতিতে পূর্ণ যে, আইনের প্রতি অবজ্ঞা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

এর বিপরীতে, প্রায় ২,৭০০ বছর আগে লেখা এই কথাগুলো বিবেচনা করুন: “আমি তোমার ব্যবস্থা কেমন ভালবাসি!” (গীতসংহিতা ১১৯:৯৭) গীতরচকের অনুভূতি এত দৃঢ় ছিল কেন? কারণ তিনি যে-ব্যবস্থার প্রশংসা করেছিলেন, তা কোনো জাগতিক সরকারের কাছ থেকে নয় কিন্তু যিহোবা ঈশ্বরের কাছ থেকে এসেছিল। আপনি যখন যিহোবার আইনগুলো নিয়ে অধ্যয়ন করবেন, তখন আপনিও হয়তো অনেকটা গীতরচকের মতোই অনুভব করবেন। এইরকম অধ্যয়ন আপনাকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বোচ্চ বিচারশক্তি সম্বন্ধে অন্তর্দৃষ্টি দেবে।

সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবস্থাপক

৩, ৪. কোন কোন উপায়ে যিহোবা ব্যবস্থাপক প্রমাণিত হয়েছেন?

বাইবেল আমাদের জানায় যে, “একমাত্র ব্যবস্থাপক ও বিচারকর্ত্তা আছেন।” (যাকোব ৪:১২) বাস্তবিকপক্ষে, যিহোবাই হলেন একমাত্র প্রকৃত ব্যবস্থাপক। এমনকি জ্যোতিষ্কমণ্ডলের গতিপথ তাঁর “আকাশমণ্ডলের বিধান” দ্বারা পরিচালিত হয়। (ইয়োব ৩৮:৩৩) যিহোবার হাজার হাজার পবিত্র দূতেরাও একইভাবে ঐশিক আইনের দ্বারা পরিচালিত হয়, কারণ তারা নির্দিষ্ট পদমর্যাদায় সংগঠিত এবং যিহোবার পরিচারক হিসেবে তাঁর আদেশাধীনে সেবা করে।—গীতসংহিতা ১০৪:৪; ইব্রীয় ১:৭, ১৪.

যিহোবা মানবজাতিকেও বিভিন্ন আইন দিয়েছেন। আমাদের প্রত্যেকের বিবেক রয়েছে, যা হল যিহোবার বিচারসম্বন্ধীয় বোধশক্তির প্রতিফলন। এক ধরনের  আভ্যন্তরীণ আইন হিসেবে, বিবেক আমাদের ভাল-মন্দ পার্থক্য করতে সাহায্য করতে পারে। (রোমীয় ২:১৪) আমাদের প্রথম পিতামাতাকে এক সিদ্ধ বিবেক দেওয়া হয়েছিল, তাই তাদের শুধু অল্প কয়েকটা আইনের দরকার ছিল। (আদিপুস্তক ২:১৫-১৭) কিন্তু, ঈশ্বরের ইচ্ছা পালন করার জন্য নিজেকে পরিচালিত করতে অসিদ্ধ মানুষের আরও বেশি আইনের দরকার। নোহ, অব্রাহাম ও যাকোবের মতো কুলপতিরা যিহোবা ঈশ্বরের কাছ থেকে বিভিন্ন আইন পেয়েছিল ও সেগুলো তাদের পরিবারকে জানানো হয়েছিল। (আদিপুস্তক ৬:২২; ৯:৩-৬; ১৮:১৯; ২৬:৪, ৫) যিহোবা অভূতপূর্ব উপায়ে একজন ব্যবস্থাপক হয়েছিলেন, যখন তিনি মোশির মাধ্যমে ইস্রায়েল জাতিকে এক ব্যবস্থাবিধি দিয়েছিলেন। এই আইনসংক্রান্ত বিধি, যিহোবার ন্যায়বিচারের বোধশক্তি সম্বন্ধে আমাদের এক ব্যাপক অন্তর্দৃষ্টি দেয়।

মোশির ব্যবস্থা—এক সারাংশ

৫. মোশির ব্যবস্থা কি দুর্বহ, জটিল আইনের সমষ্টি ছিল আর আপনি কেন এইরকম উত্তর দেন?

অনেকে চিন্তা করতে পারে যে, মোশির ব্যবস্থা ছিল এক দুর্বহ, জটিল আইনের সমষ্টি। এইরকম ধারণা একেবারেই সত্য নয়। সম্পূর্ণ বিধিতে ৬০০-রও বেশি আইন রয়েছে। এটা শুনে হয়তো অনেক বেশি বলে মনে হতে পারে কিন্তু একটু ভেবে দেখুন: বিংশ শতাব্দীর শেষে, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনগুলো দিয়ে আইনের বইগুলোর ১,৫০,০০০-রেরও বেশি পৃষ্ঠা ভরে গিয়েছিল। প্রতি দুই বছর অন্তর প্রায় ৬০০-রও বেশি নতুন আইন যুক্ত হচ্ছে! তাই, আমরা যদি শুধু পরিমাণের কথা বলি, তা হলে মানুষের অগণিত আইনগুলোর তুলনায় মোশির ব্যবস্থা ক্ষুদ্র বলেই মনে হয়। অথচ, ঈশ্বরের ব্যবস্থা ইস্রায়েলীয়দের জীবনের সেই সমস্ত ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করেছিল, যেগুলো আধুনিক আইনগুলো এখনও স্পর্শও করেনি। এক সারাংশ বিবেচনা করুন।

৬, ৭. (ক) কোন বিষয়টা মোশির ব্যবস্থাকে অন্য যেকোনো আইনবিধি থেকে পৃথক করে এবং সেই ব্যবস্থার সবচেয়ে মহৎ আজ্ঞা কোনটি? (খ) ইস্রায়েলীয়রা কীভাবে দেখাতে পারত যে তারা যিহোবার সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করেছে?

ব্যবস্থা যিহোবার সার্বভৌমত্বকে উচ্চীকৃত করেছিল। তাই, মোশির ব্যবস্থাকে অন্য কোনো আইনবিধির সঙ্গে তুলনাই করা যায় না। এর আইনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মহৎ আইনটি ছিল: “হে ইস্রায়েল, শুন; আমাদের ঈশ্বর সদাপ্রভু একই সদাপ্রভু; আর তুমি তোমার সমস্ত হৃদয়, তোমার সমস্ত প্রাণ, ও তোমার সমস্ত শক্তি দিয়া আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুকে প্রেম করিবে।” ঈশ্বরের লোকেদের তাঁর প্রতি কীভাবে  প্রেম প্রকাশ করতে হতো? তাদের তাঁকে সেবা করতে হতো, তাঁর সার্বভৌমত্বের প্রতি বশীভূত হতে হতো।—দ্বিতীয় বিবরণ ৬:৪, ৫; ১১:১৩.

প্রত্যেক ইস্রায়েলীয় তার ওপর যারা কর্তৃত্বে ছিল, তাদের প্রতি বশীভূত থেকে দেখাতেন যে, যিহোবার সার্বভৌমত্বকে তিনি স্বীকার করেন। পিতামাতা, গোষ্ঠীপ্রধান, বিচারক, যাজক আর সবশেষে রাজা সবাই ঐশিক কর্তৃত্বকে প্রতিনিধিত্ব করেছিল। কর্তৃত্বে রয়েছেন এমন যেকারও বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে যিহোবা তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বলে দেখতেন। অন্যদিকে, যারা কর্তৃত্বে ছিল তারা যদি তাঁর লোকেদের সঙ্গে অন্যায়ভাবে বা উদ্ধতভাবে আচরণ করত, তা হলে সেই ব্যক্তিদের যিহোবার ক্রোধের পাত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি ছিল। (যাত্রাপুস্তক ২০:১২; ২২:২৮; দ্বিতীয় বিবরণ ১:১৬, ১৭; ১৭:৮-২০; ১৯:১৬, ১৭) এভাবে উভয় পক্ষেরই ঈশ্বরের সার্বভৌমত্বকে সমর্থন করার দায়িত্ব ছিল।

৮. কীভাবে ব্যবস্থা যিহোবার পবিত্রতার মানকে সমর্থন করেছিল?

ব্যবস্থা যিহোবার পবিত্রতার মানকে সমর্থন করেছিল। “পবিত্র” ও “পবিত্রতা” শব্দগুলো মোশির ব্যবস্থায় ২৮০ বারেরও বেশি পাওয়া যায়। ব্যবস্থা ঈশ্বরের লোকেদের শুচি-অশুচি, শুদ্ধ-অশুদ্ধের মধ্যে পার্থক্য করতে সাহায্য করেছিল, সেখানে ৭০টা বিষয় সম্বন্ধে উল্লেখ করা আছে, যা একজন ইস্রায়েলীয়কে রীতিগতভাবে অশুচি করতে পারত। এই আইনগুলো শারীরিক পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যতালিকা আর এমনকি মলত্যাগ সম্বন্ধে উল্লেখ করেছিল। এইরকম আইনগুলো স্বাস্থ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য উপকার নিয়ে এসেছিল। * কিন্তু, সেগুলোর আরও বড় একটা উদ্দেশ্য ছিল—সেগুলো লোকেদের যিহোবার অনুগ্রহে রেখেছিল, তাদের আশেপাশের নৈতিক দিক দিয়ে অধঃপতিত জাতিগুলোর পাপপূর্ণ অভ্যাসগুলো থেকে পৃথক রেখেছিল। একটা উদাহরণ বিবেচনা করুন।

৯, ১০. ব্যবস্থা চুক্তি যৌনসম্পর্ক ও সন্তান জন্মদান সম্বন্ধে কোন সংবিধিগুলো অন্তর্ভুক্ত করেছিল আর এই আইনগুলো কোন কোন উপকার নিয়ে এসেছিল?

ব্যবস্থা চুক্তির সংবিধি উল্লেখ করেছিল যে যৌনসম্পর্ক ও সন্তান জন্মদান—এমনকি বিবাহিত লোকেদেরও—কিছু সময়ের জন্য অশুচি করত। (লেবীয়  পুস্তক ১২:২-৪; ১৫:১৬-১৮) এই ধরনের সংবিধি ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া শুচি উপহারগুলোর মর্যাদাকে তুচ্ছ করেনি। (আদিপুস্তক ১:২৮; ২:১৮-২৫) বরং, সেই আইনগুলো যিহোবার পবিত্রতাকে সমর্থন করেছিল, তাঁর উপাসকদের কলুষিত হওয়া থেকে মুক্ত রেখেছিল। উল্লেখযোগ্য যে, ইস্রায়েলের আশেপাশের জাতিগুলো উপাসনাকে যৌনতা ও প্রজননসংক্রান্ত আচারব্যবহারের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলেছিল। কনানীয় ধর্মের মধ্যে পুরুষ ও মহিলা বেশ্যাবৃত্তি ছিল। এর ফলে জঘন্যতম নৈতিক অবক্ষয়ের উদ্ভব হয়েছিল ও চারিদিকে তা ছড়িয়ে পড়েছিল। এর বিপরীতে, ব্যবস্থা যিহোবার উপাসনাকে যৌনতা সংক্রান্ত বিষয়গুলো থেকে সম্পূর্ণ পৃথক রেখেছিল। * তা ছাড়া, অন্য উপকারগুলোও ছিল।

১০ সেই আইনগুলো এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ সত্য শিক্ষা দেওয়ার জন্য কাজ করেছিল। * বস্তুত, আদমের পাপের কলঙ্ক কীভাবে এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়েছিল? এটা কি যৌনসম্পর্ক ও সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে নয়? (রোমীয় ৫:১২) হ্যাঁ, ঈশ্বরের ব্যবস্থা তাঁর লোকেদের সবসময় পাপের অস্তিত্বকে মনে করিয়ে দিয়েছিল। বাস্তবিকপক্ষে, আমরা সকলে পাপে জন্মেছি। (গীতসংহিতা ৫১:৫) আমাদের পবিত্র ঈশ্বরের নিকটবর্তী হওয়ার জন্য ক্ষমা ও মুক্তি দরকার।

১১, ১২. (ক) ব্যবস্থা ন্যায়বিচারের কোন গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে সমর্থন করেছিল? (খ) ব্যবস্থার মধ্যে ন্যায়বিচার বিকৃত করার বিরুদ্ধে কোন কোন সুরক্ষা ছিল?

১১ ব্যবস্থা যিহোবার সিদ্ধ ন্যায়বিচারকে সমর্থন করেছিল। মোশির ব্যবস্থা ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে সমতুল্য বা ভারসাম্যের নীতি বজায় রেখেছিল। তাই, ব্যবস্থা উল্লেখ করেছিল: “প্রাণের পরিশোধ প্রাণ, চক্ষুর পরিশোধ চক্ষু দন্তের পরিশোধ দন্ত, হস্তের পরিশোধ হস্ত, পদের পরিশোধ পদ।” (দ্বিতীয় বিবরণ ১৯:২১) ফলে, অপরাধের মামলাগুলোতে, শাস্তি অপরাধের সমতুল্য হতে হতো। ঐশিক ন্যায়বিচারের এই দিকটা ব্যবস্থার সর্বত্র পরিব্যাপ্ত ছিল আর এটা আজকে খ্রিস্ট যিশুর মুক্তির মূল্য বোঝার জন্য আবশ্যক, যা ১৪ অধ্যায় দেখাবে।—১ তীমথিয় ২:৫, ৬.

 ১২ এ ছাড়া, ব্যবস্থার মধ্যে ন্যায়বিচার বিকৃত করার বিরুদ্ধে সুরক্ষাগুলোও ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, একটা অভিযোগের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য অন্তত দুজন সাক্ষির দরকার ছিল। মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার শাস্তি খুবই কঠিন ছিল। (দ্বিতীয় বিবরণ ১৯:১৫, ১৮, ১৯) দুর্নীতি ও ঘুস দেওয়া-নেওয়াও একেবারে নিষিদ্ধ ছিল। (যাত্রাপুস্তক ২৩:৮; দ্বিতীয় বিবরণ ২৭:২৫) এমনকি ব্যাবসাবাণিজ্যেও, ঈশ্বরের লোকেদের যিহোবার ন্যায়বিচারের উচ্চ মানকে সমর্থন করতে হতো। (লেবীয় পুস্তক ১৯:৩৫, ৩৬; দ্বিতীয় বিবরণ ২৩:১৯, ২০) সেই মহৎ ও পক্ষপাতহীন আইনসংক্রান্ত বিধি ইস্রায়েলের জন্য এক বিরাট আশীর্বাদ ছিল!

বিচারসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে যে-আইনগুলো করুণা এবং পক্ষপাতহীন আচরণের ওপর জোর দেয়

১৩, ১৪. ব্যবস্থা কীভাবে একজন চোর ও তার শিকারের প্রতি পক্ষপাতহীন ও ন্যায্য আচরণকে সমর্থন করেছিল?

১৩ মোশির ব্যবস্থা কি এক অনমনীয়, নির্মম নীতিমালা ছিল? একেবারেই না! রাজা দায়ূদ এটা লেখার জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যে, “সদাপ্রভুর [“যিহোবার,” NW] ব্যবস্থা সিদ্ধ।” (গীতসংহিতা ১৯:৭) তিনি ভাল করেই জানতেন যে, ব্যবস্থা করুণা ও পক্ষপাতহীন আচরণকে সমর্থন করত। এটা কীভাবে তা করেছিল?

১৪ আজকে কিছু দেশে আইন, অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের জন্য যতটা না চিন্তিত হয়, সেটার চেয়ে অপরাধীদের প্রতি আরও বেশি কোমল ও অনুকূল মনোভাব দেখায় বলে মনে হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, চোরদের হয়তো কারাগারে রাখা হতে পারে। অন্যদিকে, যারা এর শিকার হয় তারা হয়তো তাদের জিনিস ফিরে পায় না, অথচ এইরকম অপরাধীদের বাসস্থান ও খাওয়ার জন্য তাদের কর দিতে হয়। কিন্তু প্রাচীন ইস্রায়েলে, আজকে আমরা যেগুলোকে কারাগার বলে জানি তেমন কিছু ছিল না। শাস্তি কতটা কঠিন হবে সেই বিষয়ে নির্দিষ্ট সীমা ছিল। (দ্বিতীয় বিবরণ ২৫:১-৩) একজন চোর যার জিনিস চুরি করত, তাকে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হতো। শুধু তাই নয়, যে চুরি করত, তাকে আরও বেশি মূল্য দিতে হতো। কতটা? এর পরিমাণ বিভিন্ন ছিল। স্পষ্টতই, বিচারকদের বেশ কিছু বিষয় বিবেচনা করার অধিকার দেওয়া হয়েছিল, যেমন পাপীর অনুতাপ। সেটা ব্যাখ্যা করবে যে কেন লেবীয় পুস্তক ৬:১-৭ পদ অনুযায়ী একজন চোরের কাছ থেকে যে-ক্ষতিপূরণ দাবি করা হতো, সেটার চেয়ে যাত্রাপুস্তক ২২:৭ পদে বলা বিষয় থেকে অনেক কম।

১৫. একজন ব্যক্তি দুর্ঘটনাক্রমে কাউকে মেরে ফেললে সেই ক্ষেত্রে ব্যবস্থা কীভাবে করুণা ও ন্যায়বিচার দুটোই নিশ্চিত করেছিল?

 ১৫ ব্যবস্থা করুণার সঙ্গে স্বীকার করেছিল যে, সমস্ত অন্যায়ই ইচ্ছাকৃত নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন ব্যক্তি দুর্ঘটনাক্রমে কাউকে মেরে ফেললে, তাকে প্রাণের পরিশোধে প্রাণ দিতে হতো না যদি সে ইস্রায়েলের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আশ্রয় নগরগুলোর একটাতে পালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে সঠিক পদক্ষেপ নিত। যোগ্য বিচারকরা তার ঘটনাটা পরীক্ষা করে দেখার পর, মহাযাজকের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাকে সেখানেই থাকতে হতো। এরপর সে তার ইচ্ছামতো জায়গায় থাকতে পারত। এভাবে সে ঐশিক করুণা থেকে উপকার লাভ করত। একই সময়ে এই আইন মানব জীবন যে মহামূল্যবান সেটার ওপর জোর দিয়েছিল।—গণনাপুস্তক ১৫:৩০, ৩১; ৩৫:১২-২৫.

১৬. কীভাবে ব্যবস্থা কিছু ব্যক্তিগত অধিকারকে সুরক্ষিত করেছিল?

১৬ ব্যবস্থা ব্যক্তিগত অধিকারগুলোকে সুরক্ষিত করেছিল। যারা ঋণী ছিল তাদের এটা কোন কোন উপায়ে রক্ষা করেছিল তা বিবেচনা করুন। ব্যবস্থা একজন ঋণীর বাড়িতে গিয়ে ঋণের জামিন হিসেবে সম্পত্তি দখল করাকে নিষেধ করেছিল। বরং, ঋণদাতাকে বাইরে থাকতে হতো ও ঋণীকে তার জামিন নিয়ে আসতে দিতে হতো। এভাবে একজন ব্যক্তির বাড়ি কেউ অবৈধভাবে দখল করতে পারত না। ঋণদাতা যদি বন্ধক হিসেবে ঋণীর বস্ত্র নিত, তা হলে তাকে সন্ধ্যার মধ্যে সেটা ফেরত দিতে হতো কারণ ঋণীর হয়তো রাতে উষ্ণ থাকার জন্য এটা দরকার হতো।—দ্বিতীয় বিবরণ ২৪:১০-১৪.

১৭, ১৮. যুদ্ধবিগ্রহের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বিষয়গুলোতে, ইস্রায়েলীয়রা অন্য জাতিগুলো থেকে কীভাবে আলাদা ছিল এবং কেন?

১৭ এমনকি যুদ্ধবিগ্রহও ব্যবস্থার অধীনে নিয়ন্ত্রিত হতো। ঈশ্বরের লোকেদের শুধু ক্ষমতা বা জয়ের আকাঙ্ক্ষায় নয় বরং ‘সদাপ্রভুর যুদ্ধে’ ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার জন্য যুদ্ধ করতে হতো। (গণনাপুস্তক ২১:১৪) অনেক ক্ষেত্রে, ইস্রায়েলীয়দের প্রথমে অন্য পক্ষকে আত্মসমপর্ণ করার ব্যাপারে প্রস্তাব পাঠাতে হতো। কোনো নগর যদি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করত, তা হলে ইস্রায়েল সেই নগরকে অবরোধ করতে পারত—তবে ঈশ্বরের নিয়ম অনুযায়ী। ইতিহাস জুড়ে অনেক সৈন্যদের বৈসাদৃশ্যে, ইস্রায়েলের সেনাবাহিনীর পুরুষেরা নারীদের ধর্ষণ অথবা নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড করতে পারত না। এমনকি তাদের পরিবেশের প্রতিও সম্মান দেখাতে  হতো, শত্রুদের ফলের গাছগুলো তারা কাটতে পারত না। * অন্য সেনাবাহিনীদের এইরকম নিষেধাজ্ঞাগুলো ছিল না।—দ্বিতীয় বিবরণ ২০:১০-১৫, ১৯, ২০; ২১:১০-১৩.

১৮ আপনি যখন শোনেন যে কিছু দেশে বাচ্চাদের পর্যন্ত সৈনিক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তখন আপনার কি সেটাকে জঘন্য বলে মনে হয়? প্রাচীন ইস্রায়েলে, ২০ বছরের নিচের কোনো পুরুষকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হতো না। (গণনাপুস্তক ১:২, ৩) এমনকি একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকেও নিষ্কৃতি দেওয়া হতো যদি সে খুবই ভীতু হতো। একজন নববিবাহিত পুরুষকে পুরো এক বছরের জন্য অব্যাহতি দেওয়া হতো, যাতে এমন একটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হওয়ার আগে সে তার একজন উত্তরাধিকারীর জন্ম দেখতে পারে। এভাবে ব্যবস্থা ব্যাখ্যা করেছিল যে, যুবক স্বামী তার নতুন স্ত্রীর “চিত্তরঞ্জন” করতে পারবে।—দ্বিতীয় বিবরণ ২০:৫, ৬, ৮; ২৪:৫.

১৯. ব্যবস্থা নারী, শিশু, পরিবার, বিধবা ও অনাথদের সুরক্ষার জন্য কোন বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করেছিল?

১৯ ব্যবস্থা নারী, শিশু এবং পরিবারগুলোকেও সুরক্ষিত করেছিল, তাদের দেখাশোনার ব্যবস্থা করেছিল। এটা বাবামাদের তাদের সন্তানদের প্রতি সবসময় মনোযোগ দেওয়ার ও তাদেরকে আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো শিক্ষা দেওয়ার আদেশ দিয়েছিল। (দ্বিতীয় বিবরণ ৬:৬, ৭) এটা সমস্ত ধরনের অজাচারকে নিষিদ্ধ করেছিল, যেগুলোর শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। (লেবীয় পুস্তক ১৮ অধ্যায়) একইভাবে এটা পারদারিকতাকেও নিষিদ্ধ করেছিল, যা প্রায়ই পরিবারগুলোকে ভেঙে দেয় এবং তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নষ্ট করে। ব্যবস্থা বিধবা ও অনাথদের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্তকিছু জুগিয়েছিল এবং তাদের প্রতি খারাপ আচরণ করা যথাসম্ভব জোরালোভাবে নিষেধ করেছিল।—যাত্রাপুস্তক ২০:১৪; ২২:২২-২৪.

২০, ২১. (ক) কেন মোশির ব্যবস্থা ইস্রায়েলীয়দের মধ্যে বহুগামিতাকে থাকতে দিয়েছিল? (খ) বিবাহবিচ্ছেদের ব্যাপারে, ব্যবস্থা কেন সেই মান থেকে আলাদা, যা পরে যিশু পুনর্স্থাপন করেছিলেন?

২০ কিন্তু, এই প্রসঙ্গে কেউ কেউ হয়তো ভাবতে পারেন যে, ‘ব্যবস্থা কেন  বহুগামিতাকে থাকতে দিয়েছিল?’ (দ্বিতীয় বিবরণ ২১:১৫-১৭) এই আইনগুলো আমাদের সেই সময়ের প্রসঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। যারা মোশির ব্যবস্থাকে আধুনিক সময় ও সংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে, তারা নিশ্চয়ই এটাকে ভুল বুঝবে। (হিতোপদেশ ১৮:১৩) এদনে স্থাপিত যিহোবার মান বিবাহকে একজন স্বামী ও একজন স্ত্রীর মধ্যে এক স্থায়ী বন্ধন করে তুলেছিল। (আদিপুস্তক ২:১৮, ২০-২৪) কিন্তু যিহোবা যখন ইস্রায়েলকে ব্যবস্থা দিয়েছিলেন, সেই সময়ের মধ্যে বহুগামিতার মতো অভ্যাসগুলো ইতিমধ্যেই শত শত বছর ধরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। যিহোবা ভালভাবেই জানতেন যে, তাঁর “শক্তগ্রীব জাতি” বার বার সবচেয়ে মৌলিক আজ্ঞাগুলোর বাধ্য হতে ব্যর্থ হবে, যেমন প্রতিমাপূজাকে নিষিদ্ধ করার মতো আজ্ঞাগুলো। (যাত্রাপুস্তক ৩২:৯) তাই, বিজ্ঞতার সঙ্গে তিনি তাদের বিবাহ সংক্রান্ত অভ্যাসগুলোকে সংস্কার করার জন্য সেই যুগকে বেছে নেননি। সেইসঙ্গে মনে রাখবেন যে, যিহোবা বহুগামিতার প্রবর্তন করেননি। কিন্তু, তিনি তাঁর লোকেদের মধ্যে বহুগামিতাকে নিয়ন্ত্রণ করার ও এই অভ্যাসের অপব্যবহার প্রতিরোধ করার জন্য মোশির ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছিলেন।

২১ একইভাবে, মোশির ব্যবস্থা একজন পুরুষকে গুরুতর কারণগুলোর অপেক্ষাকৃত ব্যাপক পরিধির ওপর ভিত্তি করে তার স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ করা অনুমোদন করেছিল। (দ্বিতীয় বিবরণ ২৪:১-৪) যিশু এটাকে এক বিশেষ অনুমোদন বলেছিলেন, যা ঈশ্বর যিহুদি লোকেদের “অন্তঃকরণ কঠিন বলিয়া” দিয়েছিলেন। কিন্তু, এই বিশেষ অনুমোদন ক্ষণস্থায়ী ছিল। যিশু তাঁর অনুসারীদের জন্য বিবাহ সম্বন্ধে যিহোবার আদি মান পুনর্স্থাপন করেছিলেন।—মথি ১৯:৮.

ব্যবস্থা প্রেম বৃদ্ধি করেছিল

২২. কোন কোন উপায়ে মোশির ব্যবস্থা প্রেম দেখাতে উৎসাহিত করেছিল ও কাদের প্রতি?

২২ আপনি কি এমন কোনো আধুনিক আইনসংক্রান্ত পদ্ধতির কথা কল্পনা করতে পারেন, যা প্রেমকে উৎসাহিত করে? মোশির ব্যবস্থা প্রেমকে সবকিছুর উর্ধ্বে রেখেছিল। শুধু দ্বিতীয় বিবরণ বইতেই “প্রেম” শব্দটা বিভিন্ন রূপে ২০ বারেরও বেশি বার দেখা যায়। “তুমি . . . আপন প্রতিবাসীকে আপনার মত প্রেম করিবে,” আজ্ঞাটা সমস্ত ব্যবস্থার মধ্যে দ্বিতীয় সর্বমহৎ আজ্ঞা ছিল। (লেবীয় পুস্তক ১৯:১৮; মথি ২২:৩৭-৪০) ঈশ্বরের লোকেদের এইরকম প্রেম শুধু একে অন্যের প্রতিই নয়, সেইসঙ্গে তাদের মধ্যে থাকা বিদেশিদের প্রতিও দেখাতে হতো, এই কথা মনে রেখে যে  ইস্রায়েলীয়রাও এক সময় প্রবাসী ছিল। গরিব ও দুর্দশাগ্রস্তদের প্রতি তাদের প্রেম দেখাতে হতো, বস্তুগতভাবে সাহায্য করতে হতো ও তাদের খারাপ অবস্থার সুযোগ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হতো। তাদের এমনকি ভারবাহী পশুদের প্রতিও দয়া ও বিবেচনার সঙ্গে আচরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।—যাত্রাপুস্তক ২৩:৬; লেবীয় পুস্তক ১৯:১৪, ৩৩, ৩৪; দ্বিতীয় বিবরণ ২২:৪, ১০; ২৪:১৭, ১৮.

২৩. একশো উনিশ গীতের লেখক কী করার জন্য পরিচালিত হয়েছিলেন আর আমরা হয়তো কী করতে সংকল্পবদ্ধ হতে পারি?

২৩ অন্য আর কোন জাতি এইরকম এক আইনসংক্রান্ত বিধি পেয়েছিল? এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, গীতরচক লিখেছিলেন: “আমি তোমার ব্যবস্থা কেমন ভালবাসি!” কিন্তু, তাঁর প্রেম নিছক এক আবেগ ছিল না। এটা তাকে কাজ করতে পরিচালিত করেছিল কারণ তিনি সেই ব্যবস্থা পালন করার ও সেই অনুযায়ী জীবনযাপন করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। এ ছাড়া, তিনি আরও বলেছিলেন: “[তোমার ব্যবস্থা] সমস্ত দিন আমার ধ্যানের বিষয়।” (গীতসংহিতা ১১৯:১১, ৯৭) হ্যাঁ, তিনি যিহোবার আইনগুলো অধ্যয়ন করার জন্য নিয়মিত সময় করে নিয়েছিলেন। কোনো সন্দেহ নেই যে, তা করার ফলে সেগুলোর প্রতি তাঁর প্রেম বৃদ্ধি পেয়েছিল। একই সময়ে, ব্যবস্থাপক যিহোবা ঈশ্বরের প্রতিও তার প্রেম বেড়ে গিয়েছিল। ঐশিক ব্যবস্থা অধ্যয়ন করে চলার সময় আপনিও যেন মহান ব্যবস্থাপক ও ন্যায়বিচারের ঈশ্বর যিহোবার আরও নিকটবর্তী হন।

^ অনু. 8 উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, আইনগুলো অনুযায়ী মানুষের মল মাটি চাপা দিতে হতো, অসুস্থদের আলাদা রাখতে হতো এবং যে মৃতদেহ স্পর্শ করত তাকে স্নান করতে হতো, যা সেই যুগের জন্য অগ্রিম জ্ঞান ছিল।—লেবীয় পুস্তক ১৩:৪-৮; গণনাপুস্তক ১৯:১১-১৩, ১৭-১৯; দ্বিতীয় বিবরণ ২৩:১৩, ১৪.

^ অনু. 9 কনানীয় মন্দিরগুলোতে যৌনক্রিয়ার জন্য কক্ষ আলাদা করা ছিল কিন্তু মোশির ব্যবস্থা উল্লেখ করেছিল যে, যারা অশুচি অবস্থায় থাকে তারা এমনকি মন্দিরে প্রবেশ করতে পারত না। অতএব, যৌনসম্পর্ক যেহেতু কিছু সময়ের জন্য অশুচি করত, তাই কেউই আইনগতভাবে যৌনতাকে যিহোবার গৃহের উপাসনার অংশ করতে পারত না।

^ অনু. 10 ব্যবস্থার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা দেওয়া। বাস্তবিকপক্ষে, এনসাইক্লোপিডিয়া জুডাইকা উল্লেখ করে যে, “আইন” এর জন্য ব্যবহৃত ইব্রীয় শব্দ তোরাহ্‌-র মানে হচ্ছে “শিক্ষা।”

^ অনু. 17 ব্যবস্থা সুনির্দিষ্টভাবে জিজ্ঞেস করেছিল: “ক্ষেত্রের বৃক্ষ কি মানুষ যে, তাহাও তোমার অবরোধের যোগ্য হইবে?” (দ্বিতীয় বিবরণ ২০:১৯) প্রথম শতাব্দীর একজন যিহুদি পণ্ডিত ফাইলো এই আইনটি উল্লেখ করে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, ঈশ্বর মনে করেন, “মানুষের বিরুদ্ধে রাগ কোনো জিনিসপত্রের ওপর দেখানো অন্যায়, যেগুলো কোনো খারাপ কিছু করতে পারে ন।”