সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ  |  নং  ১ ২০১৭

 বাইবেল জীবনকে পরিবর্তন করে

আমি মারা যেতে চাইনি!

আমি মারা যেতে চাইনি!
  • জন্ম: ১৯৬৪ সাল

  • দেশ: ইংল্যান্ড

  • ইতিহাস: আগে আমি স্বেচ্ছাচারী এক কিশোর বয়সি মা ছিলাম

আমার অতীত

ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরের এক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, প্যাডিংটনে আমার জন্ম হয়। আমি আমার মা ও তিন দিদির সঙ্গে থাকতাম। আমার বাবা মদের প্রতি আসক্ত ছিলেন আর তাই বেশির ভাগ সময়ই তিনি আমাদের সঙ্গে থাকতেন না।

আমি যখন ছোটো ছিলাম, তখন মা আমাকে প্রতিদিন রাতে প্রার্থনা করতে শেখান। আমার কাছে কেবল গীতসংহিতা বই সংবলিত একটি ছোটো বাইবেল ছিল। আমি বিভিন্ন সুর তৈরি করতাম, যেন সেই বইয়ের গীতগুলো গাইতে পারি। আমার মনে আছে, একবার আমি একটা বইয়ে এমন বাক্যাংশ দেখতে পাই, যেটা পরবর্তী সময়ে আমার মাথায় ঘুরতে থাকে: “একদিন সব কিছু শেষ হয়ে যাবে।” সেই কথাগুলো পড়ার পর আমি রাতে শুয়ে শুয়ে ভবিষ্যতের বিষয়ে চিন্তা করতে থাকি। আমি চিন্তা করি, ‘নিশ্চয়ই এই জীবনই সমস্ত কিছু নয়। কেন আমি এখানে আছি?’ আমি মারা যেতে চাইনি!

একসময় জাদুবিদ্যার ব্যাপারে আমি খুবই কৌতূহলী হয়ে উঠি। আমি মৃতদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতাম, স্কুলের বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কবরস্থানে যেতাম এবং তাদের সঙ্গে ভৌতিক সিনেমা দেখতাম। আমাদের কাছে সেগুলোকে একইসঙ্গে খুবই রোমাঞ্চকর ও ভয়ানক বলে মনে হতো।

আমার বয়স যখন মাত্র ১০ বছর, তখন থেকেই আমি স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠি। আমি ধূমপান করতে শুরু করি এবং শীঘ্রই এর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ি। এরপর আমি গাঁজা খাওয়াও আরম্ভ করি। ১১ বছর বয়সে আমি মদ খাওয়া শুরু করি। যদিও মদ খেতে আমার ভালো লাগত না কিন্তু মাতাল হওয়ার পর যে-অনুভূতি হতো, সেটা আমার ভালো লাগত। এ ছাড়া, আমি সংগীত ও নাচও ভীষণ ভালোবাসতাম। সুযোগ পেলেই আমি বিভিন্ন পার্টিতে ও নাইটক্লাবে যেতাম। আমি রাতের বেলা লুকিয়ে লুকিয়ে বাইরে যেতাম এবং ভোর হওয়ার ঠিক আগেই চুপচাপ ঘরে ঢুকে পড়তাম। পরের দিন যেহেতু আমি ক্লান্ত থাকতাম, তাই আমি নিয়মিতভাবে স্কুল ফাঁকি দিতাম। আর যখন স্কুলে যেতাম, তখন প্রায়ই ক্লাস চলাকালীন মদ খেতাম।

স্কুলে আমার পরীক্ষার রেজাল্ট খুবই খারাপ হয়। যেহেতু মা আমার স্বেচ্ছাচারী আচার-আচরণ সম্বন্ধে পুরোপুরি জানতেন না, তাই রেজাল্ট দেখে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন এবং অনেক রেগে যান। আমাদের মধ্যে ঝগড়া হয় আর আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। কিছু সময়ের জন্য আমি আমার বয়ফ্রেন্ড টোনির সঙ্গে থাকি। সে ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত ছিল, ড্রাগ বিক্রি করত এবং প্রচণ্ড হিংস্র স্বভাবের জন্য কুখ্যাত ছিল। শীঘ্রই আমি গর্ভবতী হয়ে পড়ি এবং মাত্র ১৬ বছর বয়সে আমার ছেলের জন্ম হয়।

বাইবেল যেভাবে আমার জীবনকে পরিবর্তন করেছে

অবিবাহিত মা ও তাদের সন্তানদের জন্য নির্ধারিত একটা হোস্টেলে থাকার সময়, প্রথম বার যিহোবার সাক্ষিদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আমাকে  সেই হোস্টেলে থাকার জন্য একটা রুম দিয়েছিল। দু-জন সাক্ষি বোন নিয়মিতভাবে সেখানকার কয়েক জন অল্পবয়সি মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। একদিন আমি তাদের সঙ্গে আলোচনায় যোগ দিই। আমার উদ্দেশ্য ছিল, সেই সাক্ষিদের ভুল প্রমাণ করা। কিন্তু, তারা শান্তভাবে বাইবেল থেকে আমার প্রতিটা প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেন। তারা খুবই সদয় ও কোমল স্বভাবের ছিলেন আর এই বিষয়টা আমার উপর গভীর ছাপ ফেলে। তাই, আমি তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে বাইবেল অধ্যয়ন করতে রাজি হই।

শীঘ্র, আমি বাইবেল থেকে এমন কিছু জানতে পারি, যেটা আমার জীবনকে পরিবর্তিত করে। ছোটোবেলা থেকেই আমি মৃত্যুকে ভয় পেতাম। কিন্তু, বাইবেল অধ্যয়ন করার ফলে আমি পুনরুত্থান সম্বন্ধে যিশুর শিক্ষার বিষয়ে জানতে পারি! (যোহন ৫:২৮, ২৯) এ ছাড়া, আমি জানতে পারি যে, ঈশ্বর ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য চিন্তা করেন। (১ পিতর ৫:৭) বিশেষভাবে যিরমিয় ২৯:১১ পদের কথাগুলো আমার হৃদয় স্পর্শ করে, যেখানে লেখা আছে: “কেননা, সদাপ্রভু বলেন, আমি তোমাদের পক্ষে যে সকল সঙ্কল্প করিতেছি, তাহা আমিই জানি; সে সকল মঙ্গলের সঙ্কল্প, অমঙ্গলের নয়, তোমাদিগকে শেষ ফল [“একটা ভবিষ্যৎ,” জুবিলী বাইবেল] ও আশাসিদ্ধি দিবার সঙ্কল্প!” আমি বিশ্বাস করতে শুরু করি যে, পরমদেশ পৃথিবীতে আমি চিরকাল বেঁচে থাকতে পারব।—গীতসংহিতা ৩৭:২৯.

যিহোবার সাক্ষিরা আমার প্রতি প্রকৃত প্রেম প্রকাশ করে। প্রথম বার তাদের একটা সভাতে যোগ দিয়েই আমি বুঝতে পারি, সেখানে প্রত্যেকেই কতটা আন্তরিক, সদয় ও বন্ধুত্বপরায়ণ! (যোহন ১৩:৩৪, ৩৫) স্থানীয় গির্জার লোকেদের তুলনায় তাদের ব্যবহার একেবারে আলাদা ছিল। আমার সমস্ত ঘটনা সম্বন্ধে জানা সত্ত্বেও, সাক্ষিরা আমাকে সাদরে গ্রহণ করে নেয়। তারা আমার সঙ্গে সময় কাটায়, আমার যত্ন নেয় এবং আমার কথা মন দিয়ে শোনে। শুধু তা-ই নয়, তারা আমাকে ব্যাবহারিক সাহায্যও প্রদান করে। আমার মনে হয়েছিল, যেন আমি একটা বড়ো প্রেমময় পরিবারের অংশ হয়ে উঠেছি।

বাইবেল অধ্যয়ন করার ফলে আমি উপলব্ধি করি, ঈশ্বরের উচ্চ নৈতিক মান অনুসরণ করার জন্য আমাকে জীবনে কিছু পরিবর্তন করতে হবে। ধূমপান ত্যাগ করা আমার জন্য সহজ ছিল না। একইসঙ্গে, আমি যখন বুঝতে পারি যে, নির্দিষ্ট কিছু গান শোনার ফলে আমার গাঁজা খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যায়, তখন আমি সেই ধরনের গান শোনা বন্ধ করে দিই। যেহেতু আমি সংযমী হতে চেয়েছিলাম, তাই আমি বিভিন্ন পার্টি ও নাইটক্লাবে যাওয়া বন্ধ করি, যেখানে গেলে আমি মাতাল হওয়ার জন্য প্রলুব্ধ হতে পারি। এ ছাড়া, আমি এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলি, যাদের ইতিবাচক প্রভাব আমাকে আমার নতুন জীবনধারা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।—হিতোপদেশ ১৩:২০.

ইতিমধ্যে, টোনিও যিহোবার সাক্ষিদের সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন করতে শুরু করে। সাক্ষিরা যখন বাইবেল থেকে তার প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর দেয়, তখন সেও নিশ্চিত হয় যে, সে যা শিখছে, সেটাই সত্য। সে জীবনে বড়ো বড়ো পরিবর্তন করে যেমন, তার দৌরাত্ম্যপ্রিয় সঙ্গীসাথিদের সঙ্গে মেলামেশা ত্যাগ করা, ডাকাতি ছেড়ে দেওয়া এবং গাঁজা খাওয়া বন্ধ করা। যিহোবাকে পূর্ণরূপে খুশি করার জন্য আমরা দু-জনেই বুঝতে পারি যে, আমাদের অনৈতিক জীবনধারা পরিবর্তন করতে হবে এবং আমাদের ছেলের জন্য এক নিশ্চিত পরিবেশ জোগাতে হবে। তাই, ১৯৮২ সালে আমরা বিয়ে করি।

“এখন আমি আর রাতে শুয়ে শুয়ে ভবিষ্যৎ অথবা মৃত্যু নিয়ে দুশ্চিন্তা করি না।”

আমার মনে আছে, আমি প্রহরীদুর্গ সচেতন থাক! * (বর্তমানে সজাগ হোন!) পত্রিকা থেকে এমন ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা খুঁজে বের করতাম, যারা সফলভাবে সেইসমস্ত পরিবর্তন করেছে, যেগুলো আমিও করতে চাইতাম। আমি তাদের উদাহরণ থেকে প্রচুর উৎসাহ লাভ করি! তাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমি চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার এবং হাল ছেড়ে না দেওয়ার জন্য শক্তি লাভ করি। আমি ক্রমাগত যিহোবার কাছে প্রার্থনা করি, যেন তিনি আমার ব্যাপারে হাল ছেড়ে না দেন। ১৯৮২ সালের জুলাই মাসে টোনি এবং আমি যিহোবার সাক্ষি হিসেবে বাপ্তিস্ম নিই।

আমি যেভাবে উপকৃত হয়েছি

যিহোবা ঈশ্বরের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার ফলে আমার জীবন রক্ষা পেয়েছে। এ ছাড়া, টোনি এবং আমি কঠিন সময়গুলোতেও যিহোবার সাহায্য লাভ করেছি। বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতিতে আমরা ঈশ্বরের উপর নির্ভর করতে শিখেছি আর আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, যিহোবা সবসময় আমাদের পরিবারকে সাহায্য করেছেন এবং আমাদের যত্ন নিয়েছেন।—গীতসংহিতা ৫৫:২২.

আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, আমি আমার ছেলে ও মেয়েকেও যিহোবাকে জানতে সাহায্য করতে পেরেছি। আর এখন তাদের সন্তানদের ঈশ্বর বিষয়ক জ্ঞানে বৃদ্ধি পেতে দেখে আমি সেই একই আনন্দ উপভোগ করি।

এখন আমি আর রাতে শুয়ে শুয়ে ভবিষ্যৎ অথবা মৃত্যু নিয়ে দুশ্চিন্তা করি না। টোনি এবং আমি প্রতি সপ্তাহে যিহোবার সাক্ষিদের বিভিন্ন মণ্ডলীতে গিয়ে তাদেরকে উৎসাহিত করার কাজে ব্যস্ত আছি। তাদের সঙ্গে মিলে আমরাও অন্যদের এই বিষয়ে শিক্ষা দিই যে, তারা যদি যিশুর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, তা হলে তারাও অনন্তজীবন উপভোগ করতে পারবে। ▪

^ অনু. 17 এই প্রকাশনাও যিহোবার সাক্ষিদের দ্বারা প্রকাশিত।