সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ  |  এপ্রিল ২০১৫

 প্রচ্ছদ বিষয় | দুর্নীতিবিহীন এক সরকার

ঈশ্বরের রাজ্য—দুর্নীতিবিহীন এক সরকার

ঈশ্বরের রাজ্য—দুর্নীতিবিহীন এক সরকার

সরকারি কাজে দুর্নীতি দূর করা কেন অসম্ভব বলে মনে হয়, সেই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে নিকারাগুয়া সরকারি অডিট অফিসের প্রেসিডেন্ট বলেন, “সমাজের নাগরিকরাই যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সরকারি কর্মকর্তারাও দুর্নীতিগ্রস্ত হবে, কারণ তারাও সমাজের নাগরিক। এটাই হল দুর্নীতির প্রধান কারণ।”

আপনি কি এই বিষয়ে একমত হবেন না যে, কোনো মানবসমাজ যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই সমাজের ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত যেকোনো সরকার অবশ্যই দুর্নীতিগ্রস্ত হবে? এটা যদি সত্য হয়, তাহলে দুর্নীতিবিহীন এক সরকার কেবলমাত্র এমন উৎস থেকে আসতে পারে, যা মানবসমাজের অংশ নয়। বাইবেল ঠিক এইরকম এক সরকার সম্বন্ধে বলে, যেটার বিষয়ে যিশু তাঁর শিষ্যদের প্রার্থনা করতে শিখিয়েছিলেন আর তা হল, ঈশ্বরের রাজ্য।মথি ৬:৯, ১০.

ঈশ্বরের রাজ্য হল এক বাস্তব সরকার, যা স্বর্গ থেকে শাসন করে। এটা সমস্ত মানবসরকারকে সরিয়ে দিয়ে সেগুলোর জায়গায় শাসন করতে শুরু করবে। (গীতসংহিতা ২:৮, ৯; প্রকাশিত বাক্য ১৬:১৪; ১৯:১৯-২১) এই রাজ্য মানবজাতির জন্য যে-আশীর্বাদগুলো নিয়ে আসবে, সেগুলোর মধ্যে একটা হল, এটা সরকারি কাজকর্মে থাকা দুর্নীতি দূর করবে। এই সরকারের ছয়টা বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করুন, যেগুলো এই বিষয়ের নিশ্চয়তা দেয়।

১. ক্ষমতা

সমস্যা: মানবসরকারগুলো নাগরিকদের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পেয়ে থাকে, যা প্রধানত কর ও শুল্কের মাধ্যমে আদায় করা হয়। টাকাপয়সার এই লেন-দেন অনেক কর্মকর্তাকে চুরি করার জন্য প্রলোভিত করে, আবার কেউ কেউ এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে ঘুস নিয়ে থাকে, যারা চায় যেন সেই কর্মকর্তারা সরকারের পাওনা কর কমিয়ে দেয়। এর ফলে, সরকার সেই ক্ষতি পূরণ করার জন্য কর বাড়িয়ে দেয় আর তা আরও বেশি দুর্নীতির পথ খুলে দেয়। এইরকম এক পরিবেশে সৎ ব্যক্তিদের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

সমাধান: ঈশ্বরের রাজ্যের ক্ষমতার উৎস হলেন, সর্বশক্তিমান ঈশ্বর যিহোবা। * (প্রকাশিত বাক্য ১১:১৫) কাজকর্ম পরিচালনা  করার জন্য এই সরকারের কর আদায় করার প্রয়োজন হয় না। এর পরিবর্তে, ঈশ্বরের “শক্তির প্রাবল্য” এবং উদারতা এই নিশ্চয়তা দেয় যে, এই রাজ্য সমস্ত প্রজার চাহিদা প্রচুররূপে পূর্ণ করবে।—যিশাইয় ৪০:২৬; গীতসংহিতা ১৪৫:১৬.

২. শাসক

সমস্যা: আগের প্রবন্ধে উল্লেখিত সুজান রোজ-একারম্যান বলেন, দুর্নীতি দূর করার প্রচেষ্টা “একেবারে উপর থেকে শুরু করা উচিত।” সরকারগুলো যখন পুলিশ কিংবা শুল্ক আধিকারিকদের মধ্যে থেকে দুর্নীতি দূর করার চেষ্টা করে অথচ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সেটা প্রশ্রয় দেয়, তখন লোকেরা সেই সরকারের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। এমনকী সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ একজন শাসকের মধ্যেও জন্মগত অসিদ্ধতা রয়েছে। বাইবেল বলে, “এমন ধার্ম্মিক লোক পৃথিবীতে নাই, যে সৎকর্ম্ম করে, পাপ করে না।”—উপদেশক ৭:২০.

যিশু সবচেয়ে বড়ো ঘুস প্রত্যাখ্যান করেছিলেন

সমাধান: ঈশ্বর যিশু খ্রিস্টকে রাজ্যের রাজা হওয়ার জন্য বেছে নিয়েছেন, যাকে অসিদ্ধ মানুষের বিপরীতে কখনোই মন্দ কাজ করার জন্য প্রলোভিত করা যেতে পারে না। যিশু এটার প্রমাণ দিয়েছিলেন, যখন তিনি সবচেয়ে বড়ো ঘুস প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যেটা ছিল “জগতের সমস্ত রাজ্য ও সেই সকলের প্রতাপ।” যিশুকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তিনি যদি এই জগতের শাসক দিয়াবলকে এক বার প্রণাম করেন, তাহলে তাঁকে সমস্তকিছু দিয়ে দেওয়া হবে। (মথি ৪:৮-১০; যোহন ১৪:৩০) এমনকী যিশুকে যখন মৃত্যু পর্যন্ত নির্যাতন করা হয়েছিল, তখনও তিনি বিশ্বস্ততা বজায় রাখার জন্য এতটা দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলেন যে, তিনি মাদকদ্রব্য গ্রহণ করা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যেটা হয়তো তাঁর যন্ত্রণা কমিয়ে দিত কিন্তু সেইসঙ্গে তাঁর চেতনাকেও কিছুটা হ্রাস করে ফেলত। (মথি ২৭:৩৪) ঈশ্বর যিশুকে স্বর্গীয় জীবনে পুনরুত্থিত করার পর যিশু প্রমাণ করেছেন যে, রাজ্যের রাজা হিসেবে শাসন করার জন্য তিনি পুরোপুরিভাবে যোগ্য।—ফিলিপীয় ২:৮-১১.

৩. স্থায়ীত্ব

সমস্যা: অনেক দেশে নিয়মিতভাবে নির্বাচন হয়ে থাকে, যা নীতিগতভাবে লোকেদের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ দেয়। কিন্তু, বাস্তবে এইরকম প্রচার অভিযান এবং নির্বাচনগুলোও দুর্নীতিমুক্ত হয় না, আর এটা এমনকী তথাকথিত উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রচার অভিযানের জন্য অর্থ দান করার মাধ্যমে অথবা অন্যান্য উপায়ে ধনী ব্যক্তিরা বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ কর্মকর্তাদের নিজের স্বার্থে প্রভাবিত করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের বিচারক জন পল স্টিভেন্স লেখেন, এই ধরনের প্রভাব “শুধুমাত্র সরকারের গ্রহণযোগ্যতা এবং গুণগত মানই নয়, কিন্তু সেইসঙ্গে সেই সরকারের উপর জনসাধারণের বিশ্বাসও” নষ্ট করে দেয়। আর এই কারণেই বিশ্বের অধিকাংশ লোকই মনে করে, সমস্ত বিভাগের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত।

সমাধান: ঈশ্বরের রাজ্য স্থায়ী ও সুস্থির হওয়ায় এখানে প্রচার অভিযান অথবা নির্বাচন সংক্রান্ত জালিয়াতির কোনো সুযোগ নেই। (দানিয়েল ৭:১৩, ১৪) যেহেতু এটার শাসককে ঈশ্বর বাছাই  করেছেন, তাই ঈশ্বরের রাজ্য মানুষের ভোটের উপর নির্ভরশীল নয় এবং তারা এটাকে সরাতেও পারবে না। এটার স্থায়ীত্ব এই বিষয়টা নিশ্চিত করে, এটা যে-পদক্ষেপ নেবে, তা লোকেদের জন্য সবসময় দীর্ঘস্থায়ী সুফল নিয়ে আসবে।

৪. আইন

ঈশ্বরের রাজ্য হল এক বাস্তব সরকার, যা স্বর্গ থেকে শাসন করে

সমস্যা: আপনার হয়তো মনে হতে পারে, নতুন নতুন আইন কার্যকর করা হলে পরিস্থিতি ভালো হবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, অনেক ক্ষেত্রে যত বেশি আইন তৈরি করা হয়, তত বেশি দুর্নীতির সুযোগ খুলে যায়। এ ছাড়া, দুর্নীতি কমানোর উদ্দেশ্যে তৈরি আইন কার্যকর করার জন্য প্রায়ই অনেক খরচ হয়, অথচ এর ফলে খুব একটা উপকার হয় না।

সমাধান: ঈশ্বরের রাজ্যের আইনগুলো মানবসরকারের আইনগুলোর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। উদাহরণ স্বরূপ, আইনের এক দীর্ঘ তালিকা দেওয়ার পরিবর্তে, যিশু এমন একটা আইন দিয়েছিলেন, যেটাকে প্রায়ই সুবর্ণ নিয়ম বলা হয়। তিনি বলেছিলেন: “অতএব সর্ব্ববিষয়ে তোমরা যাহা যাহা ইচ্ছা কর যে, লোকে তোমাদের প্রতি করে, তোমরাও তাহাদের প্রতি সেইরূপ করিও।” (মথি ৭:১২) গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হল, রাজ্যের আইনগুলো উদ্দেশ্য ও কাজ, দুটোর উপরই জোর দেয়। যিশু বলেছিলেন: “তোমার প্রতিবাসীকে আপনার মত প্রেম করিবে।” (মথি ২২:৩৯) অবশ্য, একমাত্র ঈশ্বরই এই ধরনের আইন স্থাপন করতে পারেন, কারণ তিনি হৃদয় পড়তে পারেন।১ শমূয়েল ১৬:৭.

৫. মনোভাব

সমস্যা: দুর্নীতির মূল কারণ হল, লোভ ও স্বার্থপরতা। সরকারি কর্মকর্তা ও নাগরিকরা প্রায়ই এই নেতিবাচক গুণগুলো দেখিয়ে থাকে। আগের প্রবন্ধে উল্লেখিত সিওলে ডিপার্টমেন্ট স্টোর ধসে পড়ার ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তারা এমন নির্মাণকর্মীদের কাছ থেকে ঘুস নিয়েছিল, যারা জানত যে, সঠিক নির্মাণসামগ্রী এবং নির্মাণপদ্ধতি ব্যবহার করার চেয়ে বরং ঘুস দিলে অনেক টাকা বাঁচবে।

এখান থেকে বোঝা যায়, দুর্নীতি দূর করার জন্য লোকেদের কিছু জন্মগত মনোভাব যেমন, লোভ এবং স্বার্থপরতা দূর করা শেখাতে হবে। কিন্তু, মানব সরকারগুলোর এই ধরনের শিক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করার ইচ্ছা ও ক্ষমতা কোনোটাই নেই।

 সমাধান: লোকেদের খারাপ মনোভাব দূর করতে শেখানোর মাধ্যমে, ঈশ্বরের রাজ্য একেবারে গোড়া থেকে দুর্নীতি দূর করে। * এই শিক্ষা তাদের “মনের ভাবে . . . নবীনীকৃত” হতে সাহায্য করে। (ইফিষীয় ৪:২৩) তারা লোভ এবং স্বার্থপরতার পরিবর্তে সন্তুষ্ট হতে এবং অন্যদের বিষয়েও লক্ষ্য রাখতে শেখে।ফিলিপীয় ২:৪; ১ তীমথিয় ৬:৬.

৬. প্রজা

সমস্যা: এমনকী সর্বোত্তম পরিবেশে থাকার এবং সর্বোত্তম নীতিগত শিক্ষা লাভ করার পরও, কেউ কেউ অসৎ এবং দুর্নীতিপরায়ণ হওয়া বেছে নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই কারণেই মানবসরকারগুলো দুর্নীতি দূর করতে পারে না। তারা বড়োজোর আশা করতে পারে যে, দুর্নীতির হার এবং এর ধ্বংসাত্মক পরিণতি কমানো যেতে পারে।

সমাধান: রাষ্ট্রসংঘের দুর্নীতি বিরোধী চুক্তি বলে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সরকারগুলোকে লোকেদের “বিশ্বস্ত, সৎ এবং দায়িত্ববান” হওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। যদিও এটা হল এক মহৎ লক্ষ্য, কিন্তু ঈশ্বরের রাজ্য যে শুধুমাত্র এই গুণগুলোকে তুলে ধরে তা নয়—এর প্রজাদের অবশ্যই এই গুণগুলো দেখাতে হবে। বাইবেল বলে, “লোভী” এবং ‘মিথ্যাবাদীরা’ ঈশ্বরের রাজ্যে অধিকার পাবে না।১ করিন্থীয় ৬:৯-১১; প্রকাশিত বাক্য ২১:৮.

লোকেরা এই উচ্চ নৈতিক মানগুলো পালন করা শিখতে পারে যেমনটা প্রাথমিক খ্রিস্টানরা শিখেছিল। উদাহরণ স্বরূপ, যখন শিমোন নামে এক শিষ্য প্রেরিতদের কাছ থেকে পবিত্র আত্মা কিনতে চেয়েছিলেন, তখন তারা তার ঘুস প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং তাকে বলেছিল: “এই দুষ্টতা হইতে মন ফিরাও।” শিমোন সঙ্গেসঙ্গে তার মন্দ আকাঙ্ক্ষার বিপদজনক পরিণতি বুঝতে পেরেছিলেন এবং প্রেরিতদেরকে তার হয়ে প্রার্থনা করতে বলেছিলেন যাতে তিনি সেটা কাটিয়ে উঠতে পারেন।প্রেরিত ৮:১৮-২৪.

যেভাবে ঈশ্বরের রাজ্যের প্রজা হওয়া যায়

আপনি যেকোনো জাতির লোক হোন-না-কেন, আপনি ঈশ্বরের রাজ্যের প্রজা হতে পারেন। (প্রেরিত ১০:৩৪, ৩৫) এই রাজ্যের শিক্ষামূলক কাজ, যা এখন সারা বিশ্বে চলছে, তা আপনাকে এই ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। যিহোবার সাক্ষিরা আপনার বাড়িতে গিয়ে বিনা মূল্যে বাইবেল অধ্যয়নের ব্যবস্থার একটা নমুনা দেখাতে পেরে খুশি হবে, যেটার জন্য প্রতি সপ্তাহে মাত্র দশ মিনিট সময়ও যথেষ্ট। অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি আপনি “ঈশ্বরের রাজ্যের সুসমাচার” সম্বন্ধে এবং কীভাবে এটা সরকারি কাজে দুর্নীতি দূর করবে, সেই বিষয়ে আরও জানতে পারবেন। (লূক ৪:৪৩) আমরা আপনাকে আপনার এলাকার সাক্ষিদের সঙ্গে যোগাযোগ করার অথবা আমাদের ওয়েবসাইট jw.org. দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। ▪ (w১৫-E ০১/০১)

আপনি কি আপনার বাড়িতে বিনা মূল্যে বাইবেল অধ্যয়ন করতে চান?

^ অনু. 8 যিহোবা হল ঈশ্বরের নাম, যা বাইবেলে প্রকাশ করা হয়েছে।

^ অনু. 22 উদাহরণ স্বরূপ, ২০০০ সালের ১ মে প্রহরীদুর্গ পত্রিকার “আত্মার খড়্গ দিয়ে দুর্নীতির সঙ্গে লড়াই করা” শিরোনামের প্রবন্ধটা দেখুন।