সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ  |  অক্টোবর ২০১৪

কীভাবে আপনার সন্তানকে শাসন করবেন?

কীভাবে আপনার সন্তানকে শাসন করবেন?

“আমি অধৈর্য হয়ে রাস্তা দিয়ে যাওয়া প্রতিটা গাড়ির শব্দ শুনছিলাম। এই নিয়ে তিন বার জর্ডন বাড়ি ফিরতে দেরি করছে। আমি ভাবছিলাম, ‘সে কোথায় আছে? সে কি বিপদে পড়েছে? সে কি জানে না যে, আমরা তার জন্য চিন্তা করছি?’ সে যখন ফিরে আসে, তখন আমি রেগে প্রায় বোম হয়ে যাই।”—জর্জ।

“আমার মেয়ের চিৎকার শুনে আমি একেবারে ভয় পেয়ে যাই। আমি ঘুরে তাকিয়ে দেখি, সে তার মাথা ধরে কাঁদছে। তার চার বছরের ছোটো ভাই সবেমাত্র তার মাথায় আঘাত করেছে।”—নিকোল।

“‘আমি আংটিটা চুরি করিনি। এটা আমি পেয়েছি!’ আমাদের ছয় বছরের মেয়ে ন্যাটালি করুণভাবে তাকিয়ে এই কথাগুলো বলে। তাকে বার বার অস্বীকার করতে দেখে আমরা এতটাই দুঃখ পাই যে, আমাদের চোখে জল এসে যায়। আমরা জানি সে মিথ্যা বলছে।”—স্টিফেন।

আপনি যদি একজন বাবা কিংবা মা হয়ে থাকেন, তাহলে আপনারও কি ওপরে বলা কথাগুলোর মতো একইরকম অনুভূতি হয়েছে? আপনি যখন একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তখন কি চিন্তা করেন যে, কীভাবে আপনার সন্তানকে শাসন করবেন বা আদৌ তাকে শাসন করা উচিত কি না? আপনার সন্তানদের শাসন করা কি ভুল?

শাসন কী?

বাইবেলে “শাসন” শব্দটা কেবল শাস্তির বিকল্প শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। শাসনের সঙ্গে মূলত নির্দেশনা, শিক্ষা এবং সংশোধন জড়িত। এর সঙ্গে কখনোই খারাপ আচরণ করা বা নিষ্ঠুরতা যুক্ত নয়।—হিতোপদেশ ৩:১১.

বাবা-মায়ের শাসন করাকে বাগান করার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। একজন মালি মাটি প্রস্তুত করেন, চারাগাছে জল ও সার দেন এবং সেটাকে পোকামাকড় ও আগাছা থেকে রক্ষা করেন। চারাগাছ বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মালিকে হয়তো সেই গাছকে ছেঁটে দিতে হয়, যাতে তা সঠিকভাবে বাড়তে পারে। মালি জানেন যে, সতর্কতার সঙ্গে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করলে তা একটা সতেজ চারাগাছের বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে। একইভাবে, বাবা-মায়েরা বিভিন্ন উপায়ে তাদের সন্তানদের যত্ন নেন। কিন্তু, চারাগাছ ছেঁটে দেওয়ার মতো মাঝে মাঝে তাদের শাসনের প্রয়োজন। কারণ তা ছোটোবেলা থেকেই তাদের ভুল প্রবণতাগুলোকে সংশোধন করতে এবং সন্তানদেরকে সঠিকভাবে বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করবে। কিন্তু, ছেঁটে দেওয়ার কাজ খুব সাবধানে করতে হয়, তা না হলে চারাগাছ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে, বাবা-মায়েদেরও প্রেমের সঙ্গে সন্তানদের শাসন করতে হবে।

এক্ষেত্রে, বাবা-মায়েদের জন্য বাইবেলে যিহোবা ঈশ্বর এক চমৎকার উদাহরণ স্থাপন করেছেন। তিনি তাঁর বাধ্য পার্থিব উপাসকদের জন্য যে-শাসন প্রদান করেছেন, তা এতটাই কার্যকরী এবং অপরিহার্য যে, তারা আসলে ‘শাসন ভালবাসতে’ পরিচালিত হয়। (হিতোপদেশ ১২:১) তারা ‘উপদেশ [“শাসন,” জুবিলী বাইবেল] ধরিয়া রাখে’ এবং তা ‘ছাড়িয়া দেয় না।’ (হিতোপদেশ [প্রবচনমালা] ৪:১৩) ঈশ্বরের শাসন করার তিনটে প্রধান বৈশিষ্ট্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুকরণ করার দ্বারা আপনি আপনার সন্তানকে শাসন গ্রহণ করার জন্য সাহায্য করতে পারেন। ঈশ্বরের শাসন হল (১) প্রেমপূর্ণ, (২) যুক্তিযুক্ত এবং (৩) সংগতিপূর্ণ।

 প্রেমপূর্ণ শাসন

প্রেমই হল ঈশ্বরের শাসনের ভিত্তি এবং চালিকাশক্তি। বাইবেল বলে: “সদাপ্রভু যাহাকে প্রেম করেন, তাহাকেই শাস্তি প্রদান করেন, যেমন পিতা প্রিয় পুত্ত্রের প্রতি করেন।” (হিতোপদেশ ৩:১২) এ ছাড়া, যিহোবা হলেন, ‘স্নেহশীল ও কৃপাময়, ক্রোধে ধীর।’ (যাত্রাপুস্তক ৩৪:৬) এই কারণে যিহোবা কখনোই খারাপ এবং নিষ্ঠুর আচরণ করেন না। কিংবা তিনি রূঢ় বা আঘাত দেওয়ার মতো কথাবার্তা বলেন না অথবা ক্রমাগত সমালোচনা করেন না, যা কিনা “খড়্‌গাঘাতের মত” হতে পারে।—হিতোপদেশ ১২:১৮.

শুনুন

এটা ঠিক যে, ইন্দ্রিয়দমনের ক্ষেত্রে ঈশ্বরের নিখুঁত উদাহরণ বাবা-মায়েদের পক্ষে পুরোপুরিভাবে অনুকরণ করা সম্ভব নয়। মাঝে মাঝে আপনার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাবে কিন্তু বিশেষভাবে সেই কঠিন সময়গুলোতেই সবসময় মনে রাখবেন যে, রাগ করে শাস্তি দিলে তা সাধারণত নিষ্ঠুর, অতিরিক্ত এবং হিতে বিপরীত হতে পারে। এ ছাড়া, রেগে গিয়ে অথবা বিরক্ত হয়ে শাস্তি দেওয়াকে কখনোই শাসন বলা যায় না। এটা হল ইন্দ্রিয়দমন করতে না পারার এক প্রকাশ।

অন্যদিকে, আপনি যখন প্রেমের সঙ্গে এবং ইন্দ্রিয়দমন সহকারে শাসন করেন, তখন আপনি হয়তো ভালো ফল লাভ করেন। শুরুতে উল্লেখিত একজন বাবা জর্জ এবং মা নিকোল কী করেছিলেন, তা বিবেচেনা করুন।

প্রার্থনা করুন

“অবশেষে, জর্ডন যখন বাড়ি ফিরে এসেছিল, তখন আমি এবং আমার স্ত্রী যদিও ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলাম কিন্তু নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করে আমরা তার কথা শুনেছিলাম। যেহেতু অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল, তাই আমরা বিষয়টা নিয়ে সকালে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমরা একত্রে প্রার্থনা করে ঘুমাতে গিয়েছিলাম। পরের দিন, আমরা পরিস্থিতিটা নিয়ে আরও শান্তভাবে কথা বলতে এবং আমাদের ছেলের হৃদয় স্পর্শ করতে পেরেছিলাম। সে স্বেচ্ছায় আমাদের বিধি-নিষেধ মেনে নিয়েছিল এবং স্বীকার করেছিল যে, সে ভুল করেছে। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, লোকেরা যখন বিরক্ত থাকে, তখন দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানো হিতে বিপরীত ফল নিয়ে আসে। যখনই আমরা প্রথমে শুনেছি, তখনই তা সাধারণত উত্তম ফল নিয়ে এসেছে।”—জর্জ।

কথা বলুন

“আমার ছেলে যে তার দিদিকে এতটা জোরে আঘাত করেছে, তা দেখে আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম। সঙ্গেসঙ্গে রাগ প্রকাশ করার পরিবর্তে আমি তাকে তার রুমে যেতে বলি কারণ আমি এতটাই রেগে গিয়েছিলাম যে, সেইসময় কোনো ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম না। পরে আমি যখন শান্ত হয়েছিলাম, তখন দৃঢ়ভাবে তাকে বলেছিলাম, মারামারি করা ভালো কাজ নয় আর তাকে দেখিয়েছিলাম যে, সে তার দিদিকে কতটা আঘাত করেছে। এই পদ্ধতি তার জন্য কার্যকরী হয়েছিল। সে তার দিদির কাছে ক্ষমা চেয়েছিল এবং তাকে জড়িয়ে ধরেছিল।”—নিকোল।

হ্যাঁ, সঠিক শাসনের পিছনে সবসময় চালিকাশক্তি হল প্রেম, এমনকী এর সঙ্গে যদি শাস্তিও জড়িত থাকে।

 যুক্তিযুক্ত শাসন

যিহোবা সবসময় “বিচারানুরূপ” বা সঠিক মাত্রায় শাসন করেন। (যিরমিয় ৩০:১১; ৪৬:২৮) তিনি সমস্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করেন, এমনকী সেগুলোও, যেগুলো স্পষ্ট দেখা যায় না। বাবা-মায়েরাও কীভাবে একইরকম করতে পারেন? শুরুতে উল্লেখিত স্টিফেন বলেন: “যদিও আমরা অনেক দুঃখ পেয়েছিলাম এবং বুঝতে পারছিলাম না যে, কেন ন্যাটালি আংটি সম্বন্ধে বার বার মিথ্যা কথা বলছে, তবুও আমরা তার বয়স এবং বোঝার ক্ষমতা বিবেচনা করার চেষ্টা করেছিলাম।”

নিকোলের স্বামী রবার্টও সমস্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করার চেষ্টা করেন। সন্তানরা যখন খারাপ আচরণ করে, তখন তিনি বার বার নিজেকে জিজ্ঞেস করেন: ‘এটা কি সে এই প্রথমবার করেছে, নাকি এই নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য সে বার বার দেখিয়ে থাকে? সে কি ক্লান্ত অথবা অসুস্থ বোধ করছে? তার এই আচরণ কি অন্য কোনো সমস্যার লক্ষণ?’

যুক্তিবাদী বাবা-মায়েরা এও জানে যে, তাদের সন্তানরা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মতো আচরণ করতে পারে না। খ্রিস্টান প্রেরিত পৌল এই বিষয়টা স্বীকার করেছিলেন, যখন তিনি লিখেছিলেন: “আমি যখন শিশু ছিলাম, তখন শিশুর ন্যায় কথা কহিতাম, শিশুর ন্যায় চিন্তা করিতাম, শিশুর ন্যায় বিচার করিতাম।” (১ করিন্থীয় ১৩:১১) রবার্ট বলেন: “একটা যে-বিষয় আমাকে বিভিন্ন বিষয়কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে এবং অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখাতে সাহায্য করে, তা হল আমি যখন ছোটো ছিলাম, তখন কী করতাম, তা মনে করা।”

সন্তানদের কাছ থেকে যা-আশা করা হয়, সেই ব্যাপারে আপনাকে বাস্তববাদী হতে হবে এবং একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে যে, অন্যায় আচরণ অথবা মনোভাবকে সঠিক বলে মনে না করা বা প্রশ্রয় না দেওয়া অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আপনার সন্তানের ক্ষমতা, সীমাবদ্ধতা এবং অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনা করার মাধ্যমে আপনি আপনার শাসনকে ভারসাম্যপূর্ণ এবং যুক্তিযুক্ত করে তুলতে পারবেন।

সংগতিপূর্ণ শাসন

মালাখি ৩:৬ পদ বলে, “আমি সদাপ্রভু, আমার পরিবর্ত্তন নাই।” ঈশ্বরের দাসেরা এই সত্যে বিশ্বাস করে এবং এটা জেনে নিশ্চয়তা বোধ করে। সন্তানদেরও এই বিষয়ে নিশ্চয়তা বোধ থাকতে হবে যে, তারা সংগতিপূর্ণ শাসন লাভ করছে। আপনার মান যদি আপনার মেজাজের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, তাহলে আপনার সন্তান বিভ্রান্ত এবং হতাশ হয়ে যেতে পারে।

মনে করে দেখুন যে, যিশু বলেছিলেন: “তোমাদের কথা হাঁ, হাঁ, না, না, হউক।” এই কথাগুলো শাসন করার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। (মথি ৫:৩৭) শাস্তি সম্বন্ধে বলার আগে ভালো করে চিন্তা করে নিন। এমন কোনো শাস্তির কথা বলবেন না, যেটা আপনি দেবেন না। আপনার সন্তান খারাপ আচরণ করলে আপনি যদি তাকে কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে সাবধান করেন, তাহলে অবশ্যই তা দিন।

সংগতিপূর্ণ শাসনের জন্য বাবা-মায়েদের নিজেদের মধ্যে উত্তম ভাববিনিময় বজায় রাখা প্রয়োজন। রবার্ট বলেন: “মাঝে মাঝে আমাদের সন্তানরা আমাকে এমন কিছু করার জন্য রাজি করায়, যেটা আমার স্ত্রী তাদেরকে করতে নিষেধ করেছে। কিন্তু, পরে যখন আমি তা জানতে পারি, তখন আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে আমার স্ত্রীর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করি।” কোনো একটা পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, সেই বিষয়ে যদি বাবা-মায়েরা একমত না হন, তাহলে তাদের সেই মতপার্থক্য নিয়ে একান্তে আলোচনা করা এবং একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সবচেয়ে উত্তম।

শাসনের প্রয়োজন রয়েছে

আপনি যদি যিহোবার প্রেমপূর্ণ, যুক্তিযুক্ত এবং সংগতিপূর্ণ শাসন অনুকরণ করেন, তাহলে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে, আপনার প্রচেষ্টা আপনার সন্তানদের জন্য উপকারজনক হবে। আপনার প্রেমময় নির্দেশনা হয়তো আপনার সন্তানদেরকে পরিপক্ব, দায়িত্ববান এবং বিচক্ষণ প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে। বাইবেলে বলা আছে: “বালককে তাহার গন্তব্য পথানুরূপ শিক্ষা দেও, সে প্রাচীন হইলেও তাহা ছাড়িবে না।”—হিতোপদেশ ২২:৬. ▪ (w১৪-E ০৭/০১)