সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  ডিসেম্বর ২০১৫

আপনার জিহ্বার ক্ষমতার সদ্‌ব্যবহার করুন

আপনার জিহ্বার ক্ষমতার সদ্‌ব্যবহার করুন

“আমার মুখের বাক্য . . . তোমার দৃষ্টিতে গ্রাহ্য হউক, হে সদাপ্রভু।”—গীত. ১৯:১৪.

গান সংখ্যা: ২১, ৩৫

১, ২. কেন বাইবেলে আমাদের কথা বলার ক্ষমতাকে আগুনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে?

যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনের বনাঞ্চলে ১৮৭১ সালে এক দাবানল শুরু হয়েছিল। সেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল আর প্রায় দু-শো কোটি গাছপালা পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে ১,২০০ জনেরও বেশি লোক নিহত হয়েছিল। আসলে, যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য দাবানলের কারণে নিহত লোকেদের চেয়ে এই দাবানলে আরও বেশি লোক নিহত হয়েছিল। সম্ভবত বনের পাশ দিয়ে একটা ট্রেন যাওয়ার সময় সেই ট্রেন থেকে আসা আগুনের ছোট্ট স্ফুলিঙ্গের কারণে এই দাবানল শুরু হয়েছিল। এই ঘটনা আমাদেরকে বাইবেলের একটা পদের কথা মনে করিয়ে দেয়: “দেখ, কেমন অল্প অগ্নি কেমন বৃহৎ বন প্রজ্বলিত করে!” (যাকোব ৩:৫) বাইবেল লেখক যাকোব কেন এই কথা বলেছিলেন?

তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন: “জিহ্বাও অগ্নি।” (যাকোব ৩:৬) ‘জিহ্বা’ বলতে আমাদের কথা বলার ক্ষমতাকে বোঝায়। আর ঠিক আগুনের মতো, আমরা যা বলি, সেটার কারণে অনেক ক্ষতি হতে পারে। আমাদের কথাবার্তা অন্যদের উপর জোরালো প্রভাব ফেলতে পারে। বাইবেল এমনকী এটাও বলে, আমরা যা বলি, সেটা অন্যদের জীবন অথবা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। (হিতো. ১৮:২১) কিন্তু তার মানে কী এই যে, ভুল কোনো কিছু বলে ফেলার ভয়ে আমরা কোনো কথাই বলব না? অবশ্যই তা নয়। আমরা পুড়ে যেতে পারি এই ভয়ে আমরা নিশ্চয়ই আগুন ব্যবহার করা বন্ধ করে দিই না। এর পরিবর্তে, আমরা যেভাবে আগুন ব্যবহার করি, সেই ক্ষেত্রে  সতর্ক থাকি। যেমন, আমরা খাবার রান্না করার জন্য, নিজেদের উষ্ণ রাখার জন্য ও আলোর জন্য আগুন ব্যবহার করতে পারি। একইভাবে, আমরা যেভাবে কথা বলি সেই বিষয়ে আমরা যদি সতর্ক থাকি, তা হলে আমরা এই ক্ষমতাকে যিহোবার সম্মান নিয়ে আসার জন্য ও অন্যদের উপকারের জন্য ব্যবহার করতে পারি।—গীত.  ১৯:১৪.

৩. আমরা যখন অন্যদের উৎসাহিত করার জন্য কথা বলি, তখন কোন তিনটে বিষয় আমাদের সাহায্য করে?

যিহোবা আমাদের ক্ষমতা দিয়েছেন, যেন আমরা কথার মাধ্যমে অথবা হাত ব্যবহার করে সাংকেতিক ভাষার মাধ্যমে অন্যদের কাছে নিজেদের চিন্তাভাবনা ও অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি। তা হলে, অন্যদের  উৎসাহিত করার জন্য কীভাবে আমরা এই চমৎকার  দান ব্যবহার করতে পারি? (পড়ুন, যাকোব ৩:৯, ১০.) কখন কথা বলতে হবে, কী কথা বলতে হবে এবং কীভাবে  কথা বলতে হবে, তা আমাদের জানতে হবে।

আমাদের কখন কথা বলা উচিত?

৪. কখন আমাদের নীরব থাকা উচিত?

মাঝে মাঝে, কথা না বলা ভালো। বাইবেল বলে, “নীরব থাকিবার কাল” আছে। (উপ. ৩:৭) উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অন্যেরা যখন আমাদের সঙ্গে কথা বলে, তখন নীরব থাকার মাধ্যমে আমরা দেখাই, তাদের প্রতি আমাদের সম্মান রয়েছে। (ইয়োব ৬:২৪) এ ছাড়া, আমরা এমন বিষয় নিয়ে কথা বলি না, যেটা কারো ব্যক্তিগত বিষয় আর যা অন্যদের জানা উচিত নয়। (হিতো. ২০:১৯) আর আমরা যখন কারো উপর রেগে যাই, তখন কিছু না বলে শান্ত থাকার চেষ্টা করলে আমরা বিজ্ঞতার কাজ করব।—গীত. ৪:৪.

৫. কীভাবে আমরা যিহোবাকে দেখাতে পারি, তিনি আমাদের কথা বলার ক্ষমতা দিয়েছেন বলে আমরা কৃতজ্ঞ?

তবে এমন সময়ও আছে, যখন কথা বলা ভালো। (উপ. ৩:৭) যিহোবার প্রশংসা করার সময়, অন্যদের উৎসাহিত করার সময়, আমরা কেমন অনুভব করি তা প্রকাশ করার সময় এবং আমাদের প্রয়োজন সম্বন্ধে অন্যদের জানানোর সময় আছে। (গীত. ৫১:১৫) আমরা যদি আমাদের কথা বলার ক্ষমতাকে সেই উপায়ে ব্যবহার করি, তা হলে যিহোবাকে দেখাতে পারি, তিনি আমাদের এই উপহার দিয়েছেন বলে আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ কোনো বন্ধু যখন আমাদের একটা সুন্দর উপহার দেয়, তখন আমরা সেটাকে যথাসম্ভব সর্বোত্তম উপায়ে ব্যবহার করতে চাই।

৬. কেন কথা বলার জন্য উপযুক্ত সময় বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ?

কেন কথা বলার জন্য উপযুক্ত সময় বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ? হিতোপদেশ ২৫:১১ পদ বলে: “উপযুক্ত সময়ে কথিত বাক্য রৌপ্যের ডালিতে সুবর্ণ নাগরঙ্গ ফলের তুল্য।” সোনালি রঙের একটা ফল দেখতে  খুব সুন্দর আর সেটাকে যখন রূপালি রঙের কোনো পাত্রে রাখা হয়, তখন তা আরও সুন্দর দেখায়। একইভাবে, আমরা যখন কোনো ভালো বিষয় নিয়ে কারো সঙ্গে কথা বলতে চাই, তখন আমরা যদি উপযুক্ত সময় বাছাই করি, তা হলে আমরা সেই ব্যক্তিকে আরও বেশি  সাহায্য  করতে পারি। কীভাবে আমরা তা করতে  পারি?

৭, ৮. জাপানে আমাদের ভাই-বোনেরা কীভাবে যিশুকে অনুকরণ করেছিল?

আমরা যদি অনুপযুক্ত সময়ে কথা বলি, তা হলে লোকেরা হয়তো আমাদের কথা বুঝতে অথবা মেনে নিতে না-ও পারে। (পড়ুন, হিতোপদেশ ১৫:২৩.) উদাহরণ স্বরূপ, ২০১১ সালের মার্চ মাসে এক ভূমিকম্প ও সুনামিতে জাপানের পূর্বাঞ্চলের অনেক শহর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ১৫,০০০-রেরও বেশি লোক প্রাণ হারিয়েছিল। যদিও যিহোবার সাক্ষিদের মধ্যে অনেকে তাদের পরিবার ও বন্ধুবান্ধব হারিয়েছিল, কিন্তু তারা বাইবেল ব্যবহার করে একই পরিস্থিতিতে থাকা অন্যান্য ব্যক্তিকে সাহায্য করতে চেয়েছিল। তবে তারা এটাও জানত, সেখানে অধিকাংশ লোক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং তারা বাইবেল সম্বন্ধে সামান্যই জানে। তাই, তাদের কাছে পুনরুত্থানের বিষয়ে কথা বলার পরিবর্তে তারা সেই সময়ে তাদের সান্ত্বনা দিয়েছিল এবং কেন ভালো লোকেদের  প্রতি এইরকম মারাত্মক ঘটনা ঘটে থাকে, তা ব্যাখ্যা করেছিল।

সেই ভাই-বোনেরা যিশুকে অনুকরণ করেছিল। যিশু জানতেন, কখন চুপ থাকতে হবে। তবে তিনি এটাও জানতেন, কখন কথা বলতে হবে। (যোহন ১৮:৩৩-৩৭; ১৯:৮-১১) আর তিনি তাঁর শিষ্যদের নির্দিষ্ট কিছু বিষয়  শিক্ষা দেওয়ার আগে উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। (যোহন ১৬:১২) জাপানের ভাই-বোনেরা লোকেদের সঙ্গে পুনরুত্থান সম্বন্ধে কথা বলার ব্যাপারে উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করেছিল। সুনামি আঘাত হানার প্রায় আড়াই বছর পর, তারা লোকেদেরকে মৃত ব্যক্তিরা কি সত্যিই আবার জীবিত হতে পারে? শিরোনামের ট্র্যাক্ট দিয়েছিল। অনেকে সেই ট্র্যাক্ট নিয়েছিল এবং এটার বিষয়বস্তু পড়ে সান্ত্বনা লাভ করেছিল। আমাদের এলাকার লোকেদের সঙ্গে কথা বলার উপযুক্ত সময় খুঁজে বের করার জন্য, আমাদেরও লোকেদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাস সম্বন্ধে চিন্তা করা উচিত।

৯. আর কোন কোন পরিস্থিতিতে আমাদের কথা বলার আগে উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করা উচিত?

অন্য আর কোন কোন পরিস্থিতিতে আমাদের কথা বলার আগে উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করা উচিত? হতে পারে, কেউ আমাদের এমন কিছু বলেছে, যার ফলে আমরা বিরক্ত হয়েছি। সঙ্গেসঙ্গে উত্তর দেওয়ার অথবা বোকার মতো কোনো কিছু বলে ফেলার পরিবর্তে, আমরা বিজ্ঞতা দেখিয়ে একটু থেমে এই প্রশ্নগুলো চিন্তা করতে পারি: ‘তিনি কি ইচ্ছা করে এমন নির্দয় আচরণ করেছেন? তিনি যা বলেছেন, সেই বিষয় নিয়ে আমার কি আসলেই তার সঙ্গে কথা বলার কোনো প্রয়োজন আছে?’ সবচেয়ে ভালো হয়, যদি সেই বিষয়ে কোনো কথা না বলা হয়। কিন্তু আমাদের যদি মনে হয়, তার সঙ্গে কথা বলার পিছনে উত্তম কারণ রয়েছে, তা হলে আমাদের মন শান্ত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। (পড়ুন, হিতোপদেশ ১৫:২৮.) আবার এমন পরিস্থিতি হতে পারে, আমাদের পরিবারের কোনো ন-সাক্ষি সদস্যকে আমরা যিহোবা সম্বন্ধে জানার জন্য উৎসাহিত করতে চাই। তা করার জন্য আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে, আমরা যা বলতে যাচ্ছি সেই বিষয় নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে চিন্তা করতে হবে এবং তারা শোনার জন্য ইচ্ছুক হতে পারে এমন সময় খুঁজে বের করতে হবে।

আমাদের কী বলা উচিত?

১০. (ক) আমরা যা বলি, তা কেন সতর্কতার সঙ্গে বাছাই করতে হবে? (খ) কোন ধরনের কথাবার্তা আমাদের অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে?

১০ আমরা যা বলি, সেটা শুনে অন্যদের হয়তো ভালো লাগতে পারে। আবার অন্যদিকে, তারা হয়তো আঘাতও পেতে পারে। (পড়ুন, হিতোপদেশ ১২:১৮.) শয়তানের জগতে অনেক লোক ‘খড়্গ’ ও ‘তীরের’ মতো ‘কটুবাক্য’ ব্যবহার করে থাকে, কারণ তারা অন্যদের আঘাত দিতে ও তাদের বিরক্ত করতে চায়। (গীত. ৬৪:৩) অনেকে সিনেমা ও টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখে এইরকমভাবে কথা বলতে শেখে। কিন্তু খ্রিস্টানরা এমন কোনো কথা বলবে না, যা রূঢ় ও নির্দয় আচরণ প্রকাশ করে, এমনকী মজা করেও তারা তা বলবে না। মজা করা ভালো আর সেটা হয়তো আমাদের কথাকে আরও আগ্রহজনক করে তুলতে পারে। তবে, আমাদের কখনোই তীব্র ব্যঙ্গবিদ্রূপ করা অর্থাৎ শুধুমাত্র  অন্যদের  হাসানোর জন্য কাউকে বিব্রতকর কিছু বলা অথবা অপমান করা উচিত নয়। বাইবেল “নিন্দা” না করার  বিষয়ে খ্রিস্টানদের আদেশ দেয়। বাইবেল এটাও বলে: “তোমাদের মুখ হইতে কোন প্রকার কদালাপ বাহির  না হউক, কিন্তু প্রয়োজনমতে  গাঁথিয়া তুলিবার  জন্য সদালাপ বাহির হউক।”—ইফি.  ৪:২৯, ৩১.

১১. উপযুক্ত শব্দ বাছাই করার ক্ষেত্রে কী আমাদের সাহায্য করতে পারে?

১১ যিশু শিক্ষা দিয়েছিলেন, “হৃদয় হইতে যাহা ছাপিয়া উঠে, মুখ তাহাই বলে।” (মথি ১২:৩৪) এর অর্থ হচ্ছে আমরা আসলে কেমন বোধ করি, আমাদের কথা তা প্রকাশ করে দিতে পারে। তাই, আমরা যদি লোকেদের ভালোবাসি ও তাদের সম্বন্ধে সত্যিই চিন্তা করি, তা হলে আমরা সম্ভবত তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য উপযুক্ত শব্দ বাছাই করব। তাদেরকে আমরা যা বলব, সেগুলো ইতিবাচক ও উৎসাহজনক হবে।

১২. উপযুক্ত কথা বাছাই করার ক্ষেত্রে আর কোন বিষয়গুলো আমাদের সাহায্য করতে পারে?

১২ উপযুক্ত কথা বলার জন্য প্রচেষ্টা প্রয়োজন। রাজা শলোমন একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু তারপরও তিনি “মনোনিবেশ ও বিবেচনা করিতেন,” যেন তার লেখা সঠিক ও মনোরম হয়। (উপ. ১২:৯, ১০) কী বলতে হবে, তা জানার জন্য আমরা কোথায় সাহায্য খুঁজে পেতে পারি? আমরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করার নতুন নতুন উপায় খুঁজে বের করার জন্য বাইবেল ও আমাদের প্রকাশনা পরীক্ষা করতে পারি। যে-সমস্ত অভিব্যক্তির অর্থ আমরা বুঝতে পারি না, সেগুলোর অর্থ বোঝার  জন্য আমরা চেষ্টা করতে পারি। অন্যদের সাহায্য করা যায় এমন উপায়ে কথা বলতে শেখার জন্য আমরা যিশুর উদাহরণ নিয়ে অধ্যয়ন করতে পারি। কী বলতে হবে, তা তিনি সঠিকভাবে জানতেন কারণ “কিরূপে ক্লান্ত লোককে বাক্য দ্বারা সুস্থির করিতে হয়,” তা যিহোবা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। (যিশা. ৫০:৪) এ ছাড়া, আমাদের কথা শুনে অন্যদের কেমন লাগবে, তা নিয়ে চিন্তা করা গুরুত্বপূর্ণ। (যাকোব ১:১৯) আমরা নিজেদের এই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করতে পারি: ‘আমি যদি এই ব্যক্তিকে কথাটা বলি, তা হলে আমি তাকে কী বোঝাতে চাচ্ছি, তিনি কি সেটা বুঝতে পারবেন? কথাটা শুনে তার কেমন লাগবে?’

১৩. কেন আমাদের এমন উপায়ে কথা বলা উচিত, যা সহজে বোঝা যায়?

১৩ ইস্রায়েলে লোকেদের সংকেত দেওয়ার জন্য তূরী বাজানো হতো। তূরীর কোনো এক ধরনের আওয়াজের অর্থ ছিল, লোকেদের একত্রে মিলিত হতে হবে। আবার অন্য ধরনের আওয়াজের অর্থ ছিল, সৈন্যদের আক্রমণ করতে হবে। যদি তূরীর আওয়াজ অস্পষ্ট হতো, তা হলে সেনাবাহিনীর কী অবস্থা হতো, তা একটু কল্পনা করে দেখুন! বাইবেলে তূরীর স্পষ্ট আওয়াজকে এমন কথার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা সহজে বোঝা যায়। আমরা যদি বিভিন্ন বিষয় স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা না করি, তা হলে লোকেরা হয়তো বিভ্রান্ত হবে অথবা এমন কোনো কিছু বিশ্বাস করে ফেলবে, যা সত্য নয়। আমরা যদিও নিজেদের কথা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে চাই, তবে আমাদের এই বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত, যেন আমরা যা বলি, তা রূঢ় অথবা অসম্মানজনক না হয়।—পড়ুন, ১ করিন্থীয় ১৪:৮, ৯.

১৪. কোন উদাহরণ দেখায় যে, যিশু এমনভাবে কথা বলতেন, যা সহজে বোঝা যায়?

১৪ যিশু এমন কথা বাছাই করেছিলেন, যা সহজে বোঝা যায় আর সেটার একটা চমৎকার উদাহরণ হল মথি ৫ থেকে ৭ অধ্যায়। তিনি যে-বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেই বক্তৃতার মধ্যে জটিল অথবা অপ্রয়োজনীয় শব্দ ব্যবহার করে তিনি লোকেদের চমৎকৃত করতে চাননি। আর তিনি এমন কিছু বলেননি, যা অন্যদের আঘাত দেবে। যিশু এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষা দিয়েছিলেন, যেগুলোর গভীর অর্থ ছিল, কিন্তু তিনি যা বলেছিলেন, তা বোঝা সহজ ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যিশু তাঁর শিষ্যদের এই আশ্বাস দিতে চেয়েছিলেন, প্রতিদিন তারা কী খাবে, সেই ব্যাপারে তাদের চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাই তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, যিহোবা সবসময় পাখিদের খাবার জুগিয়ে দেন। তারপর, তিনি তাদের প্রশ্ন করেছিলেন: “তোমরা কি তাহাদের হইতে অধিক শ্রেষ্ঠ নও?” (মথি ৬:২৬) এই সাধারণ কথাবার্তার মাধ্যমে যিশু তাদের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বুঝতে এবং উৎসাহ লাভ করতে সাহায্য করেছিলেন।

অন্যদের সঙ্গে আমাদের কীভাবে কথা বলা উচিত?

১৫. কেন আমাদের অবশ্যই সদয়ভাবে কথা বলতে হবে?

১৫ আমরা যা বলি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে, আমরা অন্যদের সঙ্গে যেভাবে কথা বলি, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। লোকেরা যিশুর কথা শুনতে পছন্দ করত, কারণ তিনি “মধুর” বা সদয়ভাবে কথা বলতেন। (লূক ৪:২২) আমরা যখন সদয়ভাবে কথা বলি, তখন লোকেরা সম্ভবত আমাদের কথা শুনতে আরও বেশি পছন্দ করবে এবং আমরা যা বলি, তা মেনে নেবে। (হিতো. ২৫:১৫) আমরা যদি অন্যদের সম্মান করি এবং তাদের অনুভূতি সম্বন্ধে চিন্তা করি, তা হলে আমরা তাদের সঙ্গে সদয়ভাবে কথা বলতে পারব। যিশু ঠিক সেটাই করেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তিনি যখন এক জনতাকে তাঁর কথা শোনার জন্য অনেক প্রচেষ্টা করতে দেখেছিলেন, তখন তিনি অত্যন্ত আনন্দ সহকারে তাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন এবং তাদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। (মার্ক ৬:৩৪) এমনকী লোকেরা যখন যিশুকে অপমান করেছিল, তখনও তিনি উলটো তাদের অপমান করেননি।—১ পিতর ২:২৩.

১৬, ১৭. (ক) আমরা যখন আমাদের পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলি, তখন আমরা কীভাবে যিশুকে অনুকরণ করতে পারি? (শুরুতে দেওয়া ছবিটা দেখুন।) (খ) সদয়ভাবে কথা বলার মাধ্যমে একজন মা কীভাবে অনেক উত্তম ফল লাভ করেছিলেন?

১৬ আমরা যদিও আমাদের পরিবার ও বন্ধুবান্ধবকে ভালোবাসি, তবে আমরা হয়তো তাদের সঙ্গে নির্দয়ভাবে কথা বলে ফেলতে পারি কারণ আমরা তাদের খুব ভালো করে চিনি। আমরা হয়তো এমনটা চিন্তা করতে পারি, তাদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে,  সেই ব্যাপারে আমাদের সতর্ক হওয়ার দরকার নেই। কিন্তু, যিশু কখনো তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে নির্দয়ভাবে কথা বলেননি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ যখন কে শ্রেষ্ঠ এই বিষয় নিয়ে তর্ক করেছিলেন, তখন তিনি তাদের সদয়ভাবে সংশোধন করেছিলেন এবং তাদের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করার জন্য একটি শিশুর উদাহরণ ব্যবহার করেছিলেন। (মার্ক ৯:৩৩-৩৭) প্রাচীনরা অন্যদের কোমলভাবে পরামর্শ প্রদান করার মাধ্যমে যিশুর উদাহরণ অনুকরণ করতে পারে।—গালা. ৬:১.

১৭ এমনকী কেউ যখন এমন কিছু বলে যেটার কারণে আমরা বিরক্ত হই, তখনও আমরা সদয়ভাবে কথা বলার মাধ্যমে অনেক উত্তম ফল নিয়ে আসতে পারি। (হিতো. ১৫:১) উদাহরণ স্বরূপ, একজন একক মায়ের কিশোরবয়সি ছেলে, একইসঙ্গে খারাপ কাজ করছিল, আবার যিহোবাকে সেবা করার ভান করছিল। মণ্ডলীর একজন বোন সেই মায়ের জন্য দুঃখিত হয়েছিলেন এবং তাকে বলেছিলেন: “তুমি তোমার সন্তানকে প্রশিক্ষণ দিতে ব্যর্থ হয়েছ, এটা সত্যিই খুব দুঃখজনক।” সেই মা তখন থেমে একটু চিন্তা করেছিলেন এবং বলেছিলেন: “এটা ঠিক, এখন ওর পরিস্থিতি ভালো নেই, তবে ওকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আরমাগিদোনের পর আমার সঙ্গে কথা বোলো; তখন আমরা এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারব।” সেই মা যেহেতু শান্ত ছিলেন এবং বোনের সঙ্গে সদয়ভাবে কথা বলেছিলেন, তাই তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়নি। এ ছাড়া, সেই ছেলে তার মায়ের কথা শুনেছিল এবং বুঝতে পেরেছিল, সে যে নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে, তার মা এখনও সেটা বিশ্বাস করেন। তাই সেই ছেলে খারাপ বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মেলামেশা করা বন্ধ করেছিল, বাপ্তিস্ম নিয়েছিল এবং পরে বেথেলে সেবা করেছিল। আমাদের ভাই-বোন, পরিবারের সদস্য অথবা অপরিচিত লোক, যাদের সঙ্গেই আমরা কথা বলি না কেন, আমাদের কথাবার্তা যেন সবসময় “অনুগ্রহ সহযুক্ত  . . . , লবণে আস্বাদযুক্ত” হয়।—কল. ৪:৬.

১৮. কথা বলার ক্ষেত্রে আমরা কীভাবে যিশুর উদাহরণ অনুসরণ করতে পারি?

১৮ আমাদের চিন্তাভাবনা ও অনুভূতি অন্যদের কাছে প্রকাশ করার ক্ষমতা সত্যিই যিহোবার কাছ থেকে এক চমৎকার উপহার। আমরা যদি যিশুর উদাহরণ অনুসরণ করি, তা হলে আমরা কথা বলার জন্য উপযুক্ত সময় বাছাই করব, কী বলতে হবে সেই বিষয়ে সতর্ক থাকব এবং সবসময় সদয় হওয়ার চেষ্টা করব। তাই আসুন, আমাদের কথাবার্তার মাধ্যমে আমরা অন্যদের উৎসাহিত করি এবং যিহোবাকে খুশি করি।