সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  অক্টোবর ২০১৫

কোনো বিক্ষেপ ছাড়াই যিহোবার সেবা করুন

কোনো বিক্ষেপ ছাড়াই যিহোবার সেবা করুন

“মরিয়ম . . . [যিশুর] বাক্য শুনিতে লাগিলেন। কিন্তু মার্থা পরিচর্য্যা বিষয়ে অধিক ব্যতিব্যস্ত ছিলেন।”—লূক ১০:৩৯, ৪০.

গান সংখ্যা: ৪০, ৫৫

১, ২. কেন যিশু মার্থাকে ভালোবাসতেন কিন্তু মার্থা কোন ভুল করেছিলেন যেটা দেখায়, তিনি সিদ্ধ ছিলেন না?

আপনি যখন লাসারের বোন মার্থার কথা চিন্তা করেন, তখন আপনার মনে কোন ধরনের চিত্র ফুটে ওঠে? বাইবেল জানায়, যিশুর সঙ্গে মার্থার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল আর যিশু তাকে ভালোবাসতেন। অবশ্য, যিশু যে শুধু মার্থাকেই ভালোবেসেছেন ও সম্মান করেছেন এমন নয়, তিনি অন্য নারীদেরও ভালোবেসেছিলেন ও সম্মান করেছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ, মার্থার বোন মরিয়মের সঙ্গেও যিশুর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। আর যিশু তাঁর মা মরিয়মকে ভালোবাসতেন। (যোহন ১১:৫; ১৯:২৫-২৭) তাহলে কেন যিশু মার্থাকে ভালোবেসেছিলেন?

যিশু মার্থাকে ভালোবাসতেন কারণ মার্থা সদয় ও উদার ছিলেন আর সেইসঙ্গে তিনি কঠোর পরিশ্রমীও ছিলেন। কিন্তু, মার্থাকে ভালোবাসার পিছনে যিশুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটা ছিল, মার্থার দৃঢ়বিশ্বাস। তিনি যিশুর সমস্ত শিক্ষা বিশ্বাস করেছিলেন আর যিশু যে প্রতিজ্ঞাত মশীহ সেই বিষয়ে তার কোনো সন্দেহই ছিল না। (যোহন ১১:২১-২৭) তা সত্ত্বেও, মার্থা সিদ্ধ ছিলেন না। আমাদের সকলের মতো, তিনিও ভুল করেছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ, একবার যিশু যখন তাদের বাড়িতে এসেছিলেন, তখন মার্থা তার বোন মরিয়মের উপর বিরক্ত হয়েছিলেন আর যিশুকে বলেছিলেন, যেন তিনি মরিয়মকে সংশোধন করেন। মার্থা বলেছিলেন, “প্রভু, আপনি কি  কিছু মনে করিতেছেন না যে, আমার ভগিনী পরিচর্য্যার ভার একা আমার উপরে ফেলিয়া রাখিয়াছে? অতএব উহাকে বলিয়া দিউন, যেন আমার সাহায্য করে।” (পড়ুন, লূক ১০:৩৮-৪২.) কেন মার্থা এই কথা বলেছিলেন আর যিশু তাকে যে-উত্তর দিয়েছিলেন, তা থেকে আমরা কী শিখতে পারি?

মার্থা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন

৩, ৪. মরিয়ম এমন কী করেছিলেন, যেটার বিষয়ে যিশু প্রশংসা করেছিলেন আর মার্থা কোন শিক্ষা লাভ করেছিলেন? (শুরুতে দেওয়া ছবিটা দেখুন।)

মার্থা ও মরিয়ম তাদের ঘরে যিশুকে আতিথেয়তা দেখিয়েছিলেন বলে যিশু কৃতজ্ঞ ছিলেন আর তিনি সেই সুযোগে মূল্যবান সত্য সম্বন্ধে তাদের শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। মরিয়ম সঙ্গেসঙ্গে তাঁর সামনে বসে “তাঁহার বাক্য শুনিতে লাগিলেন।” তিনি এই সুযোগে মহান শিক্ষকের কাছ থেকে যা-কিছু শেখা সম্ভব, তা শিখতে চেয়েছিলেন। মার্থাও একই বিষয় করতে পারতেন। আর তিনি যদি নিজের কাজ বন্ধ করে যিশুর প্রতি মনোযোগ দিতেন, তা হলে যিশু নিশ্চয়ই তার প্রশংসা করতেন।

কিন্তু, মার্থা ব্যতিব্যস্ত বা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি যিশুর জন্য বিশেষ খাবার তৈরি করেছিলেন আর তাদের ঘরে থাকার সময়ে যিশু যেন স্বচ্ছন্দবোধ করেন, সেইজন্য অন্যান্য কাজে ব্যস্ত ছিলেন। মার্থা যখন দেখতে পান মরিয়ম তাকে সাহায্য করছেন না, তখন তিনি বিরক্ত হয়ে যিশুর কাছে অভিযোগ করেছিলেন। যিশু বুঝতে পেরেছিলেন, মার্থা অনেক কিছু করার চেষ্টা করছেন আর তাই তিনি তাকে সদয়ভাবে বলেছিলেন: “মার্থা, মার্থা, তুমি অনেক বিষয়ে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন আছ।” তিনি এটাও বলেছিলেন, সাধারণ খাবার, হতে পারে শুধু একটা পদই যথেষ্ট। এরপর যিশু মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শোনার জন্য মরিয়মের প্রশংসা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: “মরিয়ম সেই উত্তম অংশটী মনোনীত করিয়াছে, যাহা তাহার নিকট হইতে লওয়া যাইবে না।” মরিয়ম হয়তো সেই দিন কী খাবার খেয়েছিলেন, সেটা ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু নিঃসন্দেহে তিনি যিশুর সেই দিনের শিক্ষা এবং যিশু যেভাবে তার প্রশংসা করেছিলেন, তা কখনো ভুলে যাননি। এই ঘটনার ৬০ বছরেরও বেশি সময় পর, প্রেরিত যোহন লিখেছিলেন: “যীশু মার্থাকে ও তাঁহার ভগিনীকে . . . প্রেম করিতেন।” (যোহন ১১:৫) এই কথাগুলো থেকে বোঝা যায়, মার্থা নিশ্চয়ই যিশুর প্রেমপূর্ণ সংশোধন গ্রহণ করেছিলেন এবং বাকি জীবন বিশ্বস্তভাবে যিহোবার সেবা করেছিলেন।

৫. কেন বর্তমানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখা বিশেষভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে আর আমরা কোন প্রশ্নের উত্তর লাভ করব?

আমরা বুঝতে পারি, যিহোবার সেবা থেকে আমাদের বিক্ষিপ্ত করার জন্য বাইবেলের সময়ের চেয়ে বর্তমানে আমাদের কাছে আরও বেশি বিষয় রয়েছে। ১৯৫৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রহরীদুর্গ (ইংরেজি) পত্রিকায় ভাই-বোনদের সতর্ক করা হয়েছিল, প্রযুক্তি যেন যিহোবার সেবা থেকে তাদের বিক্ষিপ্ত না করে। এমনকী সেই সময়ও এইরকম মনে হয়েছিল, প্রতিদিন নতুন কিছু বের হচ্ছে। চকচকে কাগজে ছাপানো পত্রিকা, রেডিও, সিনেমা ও টেলিভিশন খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। প্রহরীদুর্গ পত্রিকায় বলা হয়েছিল, আমরা এই বিধিব্যবস্থার শেষের দিকে যত এগিয়ে যাব, “বিক্ষেপ সম্ভবত আরও বৃদ্ধি পাবে।” বর্তমানে, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আমাদের কাছে এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো আমাদের বিক্ষিপ্ত করতে পারে। মরিয়মের মতো হওয়ার জন্য এবং যিহোবার উপাসনার প্রতি মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখার জন্য আমরা কী করতে পারি?

জগৎকে পূর্ণমাত্রায় ভোগ করবেন না

৬. যিহোবার লোকেরা প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করেছে?

যিহোবার লোকেরা সুসমাচার প্রচার করার জন্য জগতের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও সেই যুদ্ধের সময়ে, তারা লোকেদের ফটো-ড্রামা অভ্‌ ক্রিয়েশন দেখিয়েছিল। স্লাইড শো আর সেইসঙ্গে স্বল্প দৈর্ঘ্যের রঙিন ও শব্দ-সহ চলচ্চিত্র ব্যবহার করে তারা বিভিন্ন দেশের লক্ষ লক্ষ লোকের কাছে প্রচার করেছিল। “ফটো-ড্রামা”-র শেষে সেই শান্তিপূর্ণ সময় সম্বন্ধে বর্ণনা করা হয়েছিল, যখন যিশু খ্রিস্ট পৃথিবীতে রাজত্ব করবেন। পরবর্তী সময়ে, যিহোবার লোকেরা বিশ্বব্যাপী রাজ্যের বার্তা সম্প্রচার করার জন্য রেডিও ব্যবহার করেছিল। বর্তমানে, সমস্ত জায়গার লোকেদের কাছে, এমনকী বিচ্ছিন্ন এলাকার লোকেদের কাছে পৌঁছানোর জন্য আমরা কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকি।

অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নয়, এমন বিষয়গুলো যেন যিহোবার উপাসনা থেকে আপনাকে বিক্ষিপ্ত না করে (৭ অনুচ্ছেদ দেখুন)

৭. (ক) জগৎকে পূর্ণমাত্রায় ভোগ করা কেন বিপদজনক? (খ) আমাদের কোন বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিত? (পাদটীকা দেখুন।)

 বাইবেল আমাদেরকে এই সংসার বা জগৎকে পূর্ণমাত্রায় ভোগ না করার জন্য সতর্ক করে। জগৎকে পূর্ণমাত্রায় ভোগ করার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, জগতের বিষয়গুলোর পিছনে অত্যধিক সময় ব্যয় করা। (পড়ুন, ১ করিন্থীয় ৭:২৯-৩১.) এগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় হয়তো ভুল নয়, কিন্তু সেগুলো আমাদের প্রচুর সময় নষ্ট করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা হয়তো বিভিন্ন ধরনের শখ, বই পড়া, টেলিভিশন দেখা, আগ্রহজনক স্থানে বেড়াতে যাওয়া, কেনাকাটা করা, অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ও বিলাসদ্রব্য সম্বন্ধে তথ্য জানার পিছনে সময় দিতে পারি। অনেকে অনলাইনে চ্যাট করতে, টেক্সট্‌ মেসেজ ও ই-মেল পাঠাতে পছন্দ করে কিংবা সবসময় খবর অথবা খেলাধুলার ফলাফল জানার চেষ্টা করে। তবে, কারো কারো জন্য এই বিষয়গুলো করা নেশার মতো হয়ে ওঠে। * (উপ. ৩:১, ৬) আমরা যদি এমন বিষয়ের পিছনে প্রচুর সময় নষ্ট করি যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নয়, তা হলে আমরা হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অর্থাৎ যিহোবার উপাসনার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ না-ও দিতে পারি।—পড়ুন, ইফিষীয় ৫:১৫-১৭.

৮. জগতের বিষয়গুলো ভালো না বাসা কেন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?

শয়তান আমাদেরকে তার জগতের বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য এবং যিহোবার সেবা থেকে বিক্ষিপ্ত করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে। প্রথম শতাব্দীতে শয়তান সেই চেষ্টা করেছিল আর বর্তমানে এমনকী আরও বেশি চেষ্টা করছে। (২ তীম. ৪:১০) তাই, জগতের বিভিন্ন বিষয় সম্বন্ধে আমরা কেমন অনুভব করি, সেই বিষয়ে আমাদের অনবরত পরীক্ষা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় রদবদল করতে হবে। বাইবেল আমাদের বলে যেন আমরা জগতের বিষয়গুলো ভালো না বাসি। এর পরিবর্তে, আমাদের যিহোবার প্রতি দৃঢ় ভালোবাসা বজায় রাখতে হবে। আমরা যদি তা করি, তা হলে যিহোবার বাধ্য হওয়া ও তাঁর নিকটবর্তী থাকা আমাদের জন্য আরও সহজ হবে।—১ যোহন ২:১৫-১৭.

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখুন

৯. যিশু তাঁর শিষ্যদের কোন বিষয়ের উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখার জন্য শিক্ষা দিয়েছিলেন আর তিনি নিজে কীভাবে উদাহরণস্থাপন করেছিলেন?

যিশু যেমন মার্থাকে অনেক বিষয়ের দ্বারা বিক্ষিপ্ত না হওয়ার জন্য সদয়ভাবে শিক্ষা দিয়েছিলেন, তেমনই তিনি তাঁর শিষ্যদেরও একই বিষয় শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে যিহোবার সেবার প্রতি ও তাঁর রাজ্যের প্রতি মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। (পড়ুন, মথি ৬:২২, ৩৩.) এই বিষয়ে যিশু নিজে চমৎকার উদাহরণস্থাপন করেছিলেন। তাঁর অনেক কিছু ছিল না আর তাঁর নিজের কোনো বাড়ি অথবা জমিও ছিল না।—লূক ৯:৫৮; ১৯:৩৩-৩৫.

১০. যিশু আমাদের জন্য কোন উদাহরণস্থাপন করেছিলেন?

 ১০ যিশু লক্ষ রেখেছিলেন, যেন কোনো কিছু তাঁকে প্রচার কাজ করা থেকে বিক্ষিপ্ত করতে না পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রচার কাজ শুরু করার অল্পসময় পরেই কফরনাহূমের লোকেরা চেয়েছিল যেন যিশু তাদের নগরে আরও বেশি সময় থাকেন। যিশু তখন কী করেছিলেন? তিনি নিজের কার্যভারের প্রতি মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: “অন্য অন্য নগরেও আমাকে ঈশ্বরের রাজ্যের সুসমাচার প্রচার করিতে হইবে; কেননা সেই জন্যই আমি প্রেরিত হইয়াছি।” (লূক ৪:৪২-৪৪) সুসমাচার প্রচার করার জন্য এবং যত বেশি সম্ভব লোককে শিক্ষা দেওয়ার জন্য, যিশু পায়ে হেঁটে দীর্ঘপথ ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি যদিও একজন সিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন, তবে কঠোর পরিশ্রমের কারণে তিনি ক্লান্ত হতেন এবং তাঁর বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল।—লূক ৮:২৩; যোহন ৪:৬.

১১. একজন ব্যক্তি যখন নিজের ব্যক্তিগত সমস্যা মিটমাট করার জন্য যিশুকে অনুরোধ করেছিলেন, তখন যিশু কী করেছিলেন আর তিনি তাঁর শিষ্যদের কী শিক্ষা দিয়েছিলেন?

১১ আরেকবার, যিশু যখন তাঁর শিষ্যদের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষা দিচ্ছিলেন, তখন একজন ব্যক্তি তাঁকে বাধা দিয়ে বলেছিলেন: “হে গুরু, আমার ভ্রাতাকে বলুন, যেন আমার সহিত পৈতৃক ধন বিভাগ করে।” যিশু তখন সেই ব্যক্তির ব্যক্তিগত সমস্যা মিটমাট করার চেষ্টা করেননি। তিনি তাঁর শিষ্যদের শিক্ষা দেওয়া থেকে বিক্ষিপ্ত হননি। আসলে, তিনি এই সুযোগে তাদের এটা শিক্ষা দিয়েছিলেন, তারা যদি আরও বেশি বিষয় লাভ করার উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে, তা হলে তারা ঈশ্বরের সেবা থেকে বিক্ষিপ্ত হতে পারে।—লূক ১২:১৩-১৫.

১২, ১৩. (ক) যিশু কী করেছিলেন, যেটা যিরূশালেমে কয়েক জন গ্রিক ব্যক্তির উপর ছাপ ফেলেছিল? (খ) সেই ব্যক্তিরা যিশুর সঙ্গে দেখা করতে পারবেন কি না, সেই বিষয়ে ফিলিপ যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, তখন যিশু কেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন?

১২ পৃথিবীতে থাকাকালীন জীবনের শেষ কয়েকটা দিন যিশুর জন্য অত্যন্ত চাপপূর্ণ ছিল। (মথি ২৬:৩৮; যোহন ১২:২৭) তিনি জানতেন, তাঁকে কঠিন পরিস্থিতি ভোগ করতে হবে ও মৃত্যুবরণ করতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ, ৯ নিশান রবিবারে যিশু একটা গাধার পিঠে চড়ে যিরূশালেমে প্রবেশ করেছিলেন। সেখানে জনতা তাঁকে তাদের রাজা হিসেবে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। (লূক ১৯:৩৮) পর দিন, যিশু সাহসের সঙ্গে সেই লোভী ব্যক্তিদের ধর্মধাম থেকে বের করে দিয়েছিলেন, যারা পশুপাখি অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি করছিল আর এভাবে লোকেদের সঙ্গে দস্যুর মতো আচরণ করছিল।—লূক ১৯:৪৫, ৪৬.

১৩ কয়েক জন গ্রিক ব্যক্তি, যারা নিস্তারপর্ব পালনের জন্য সেই সময়ে যিরূশালেমে এসেছিলেন, তারা যিশুর সেই কাজ দেখেছিলেন আর এটা তাদের উপর ছাপ ফেলেছিল। তাই তারা প্রেরিত ফিলিপকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তারা যিশুর সঙ্গে দেখা করতে পারেন কি না। কিন্তু, যিশু এমন লোকেদের খোঁজার চেষ্টা করেননি, যারা তাঁকে সমর্থন করবে এবং তাঁর শত্রুদের হাত থেকে তাঁকে উদ্ধার করবে। এর পরিবর্তে, যে-বিষয়টা আরও গুরুত্বপূর্ণ, সেটা তিনি জানতেন। তাঁর বিষয়ে যিহোবার ইচ্ছা কী, তিনি সেটার উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রেখেছিলেন আর যিহোবার ইচ্ছা হল যিশুর জীবন বলি হিসেবে দান করা। তাই তিনি তাঁর শিষ্যদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি শীঘ্র মারা যাবেন এবং যারা তাঁকে অনুসরণ করে, তাদের নিজেদের জীবন বলিদান করার জন্য ইচ্ছুক থাকতে হবে। তিনি বলেছিলেন: “যে আপন প্রাণ ভালবাসে, সে তাহা হারায়; আর যে এই জগতে আপন প্রাণ অপ্রিয় জ্ঞান করে, সে অনন্ত জীবনের নিমিত্ত তাহা রক্ষা করিবে।” তবে একইসময়ে তিনি এই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, “পিতা” যিশুর অনুসারীদের “সম্মান করিবেন” এবং তাদের অনন্তজীবন দান করবেন। ফিলিপ নিশ্চয়ই সেই গ্রিক ব্যক্তিদের কাছে এই উৎসাহজনক বার্তা জানিয়েছিলেন।—যোহন ১২:২০-২৬.

১৪. যদিও যিশু তাঁর জীবনে প্রচার কাজকে প্রথমে রেখেছিলেন, কিন্তু তিনি কোন বিষয়গুলো খেয়াল রাখতেন?

১৪ যিশু যখন পৃথিবীতে ছিলেন, তাঁর প্রধান কাজ ছিল সুসমাচার প্রচার করা। যদিও তিনি প্রচার কাজের উপর তাঁর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রেখেছিলেন, কিন্তু তিনি শুধু কাজ নিয়েই চিন্তা করেননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তিনি অন্ততপক্ষে একটা বিয়েবাড়িতে গিয়েছিলেন আর সেখানে জলকে উত্তম দ্রাক্ষারসে পরিণত করেছিলেন। (যোহন ২:২, ৬-১০) এ ছাড়া, তিনি তাঁর বন্ধুবান্ধব এবং সুসমাচারের প্রতি আগ্রহী ব্যক্তিদের বাড়িতে খাবার খেয়েছিলেন। (লূক ৫:২৯; যোহন ১২:২) এর চেয়েও  গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হল, যিশু প্রায় সময় প্রার্থনা, ধ্যান এবং বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সময় করে নিতেন।—মথি ১৪:২৩; মার্ক ১:৩৫; ৬:৩১, ৩২.

‘সমস্ত বোঝা ফেলিয়া দিন’

১৫. খ্রিস্টানদের কী করা প্রয়োজন বলে প্রেরিত পৌল উল্লেখ করেছিলেন আর তিনি কীভাবে এক উত্তম উদাহরণস্থাপন করেছিলেন?

১৫ প্রেরিত পৌল বলেছিলেন, খ্রিস্টানরা হচ্ছে এমন দৌড়বিদদের মতো, যারা এক দীর্ঘ ধাবনক্ষেত্রে রয়েছে আর সেই দৌড় সমাপ্ত করার জন্য তাদের এমন যেকোনো কিছু থেকে মুক্ত হতে হবে, যা তাদের ধীর করে দিতে অথবা থামিয়ে দিতে পারে। (পড়ুন, ইব্রীয় ১২:১.) পৌল নিজে এক উত্তম উদাহরণস্থাপন করেছিলেন। একজন যিহুদি ধর্মীয় নেতা হিসেবে তিনি ধনী ও বিখ্যাত হতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেই কেরিয়ার ত্যাগ করেছিলেন, যেন “ভিন্ন প্রকার [শ্রেয়, পাদটীকা]” বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে পারেন। তিনি প্রচার কাজের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন এবং সুরিয়া, এশিয়া মাইনর, মাকিদনিয়া ও যিহূদিয়া-সহ অনেক জায়গায় ভ্রমণ করেছিলেন। পৌল তার পুরস্কার অর্থাৎ স্বর্গে অনন্তজীবন লাভ করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: “পশ্চাৎ স্থিত বিষয় সকল ভুলিয়া গিয়া সম্মুখস্থ বিষয়ের চেষ্টায় একাগ্র হইয়া লক্ষ্যের অভিমুখে দৌড়িতে দৌড়িতে আমি . . . যত্ন করিতেছি।” (ফিলি. ১:১০; ৩:৮, ১৩, ১৪) পৌল বিবাহিত ছিলেন না আর এটা তাকে “একাগ্রমনে” বা বিক্ষেপ ছাড়াই ‘প্রভুতে আসক্ত থাকিতে’ সাহায্য করেছিল।—১ করি. ৭:৩২-৩৫.

১৬, ১৭. আমরা বিবাহিত হই কিংবা অবিবাহিত হই, কীভাবে আমরা পৌলের উদাহরণ অনুকরণ করতে পারি আর কীভাবে মার্ক এবং ক্লেয়ার তা করতে পেরেছিলেন?

১৬ পৌলের মতো, বর্তমানেও যিহোবার সাক্ষিদের মধ্যে কেউ কেউ বিয়ে করে না, যাতে তারা যিহোবার সেবায় আরও বেশি কিছু করতে পারে। (মথি ১৯:১১, ১২) অবিবাহিত ব্যক্তিদের সাধারণত বিবাহিত ব্যক্তিদের চেয়ে কম পারিবারিক দায়দায়িত্ব থাকে। কিন্তু, আমরা বিবাহিত হই কিংবা অবিবাহিত হই, আমাদের সকলের এমন ‘সমস্ত বোঝা ফেলিয়া দিতে’ হবে, যা যিহোবার সেবা থেকে আমাদের বিক্ষিপ্ত করতে পারে। আমাদের হয়তো নিজেদের বিভিন্ন অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে, যাতে আমরা সময় নষ্ট করা এড়াতে পারি এবং যিহোবার সেবায় আরও বেশি কিছু করতে পারি।

১৭ উদাহরণ স্বরূপ, মার্ক এবং ক্লেয়ার দম্পতি ওয়েলসে বড়ো হয়েছিলেন এবং তাদের স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার পর অগ্রগামী সেবা শুরু করেছিলেন। বিয়ের পরও তারা অগ্রগামী সেবা চালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তারা আরও বেশি কিছু করতে চেয়েছিলেন। মার্ক বলেন: “তিন বেডরুমের বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে এবং আমাদের পার্টটাইম চাকরি ছেড়ে দিয়ে, আন্তর্জাতিক নির্মাণ কাজে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবন আরও সাদাসিধে করতে পেরেছিলাম।” বিগত ২০ বছরে তারা কিংডম হল নির্মাণ কাজে সাহায্য করার জন্য আফ্রিকার বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছেন। কখনো কখনো তাদের হাতে খুব অল্প টাকা ছিল, কিন্তু যিহোবা সবসময় তাদের যত্ন নিয়েছেন। ক্লেয়ার বলেন: “প্রতিটা দিন যিহোবার সেবায় ব্যয় করা, আমাদের অনেক পরিতৃপ্তি দেয়। এই সময়ের মধ্যে অনেকের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব হয়েছে আর আমাদের কোনো কিছুরই অভাব হয়নি। যিহোবার জন্য পূর্ণসময় সেবা করার মাধ্যমে আমরা যে-আনন্দ লাভ করেছি, সেটার সঙ্গে তুলনা করলে, আমরা যে-বিষয়গুলো ত্যাগ করেছি, সেগুলো কিছুই নয়।” অনেক পূর্ণসময়ের দাস ঠিক একইরকম অনুভব করেন। *

১৮. আমরা নিজেদের কোন প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করতে পারি?

১৮ আপনার কি এমন মনে হয়, আপনি যিহোবার সেবায় আরও উদ্যমী হতে পারেন? এমন বিষয়গুলো কি রয়েছে, যেগুলো আপনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে বিক্ষিপ্ত করতে পারে? যদি থাকে, তা হলে আপনি কী করতে পারেন? আপনি হয়তো বাইবেল পড়ার ও অধ্যয়ন করার ক্ষেত্রে আরও উন্নতি করতে পারেন। কীভাবে আপনি তা করতে পারেন, সেই বিষয়ে পরের প্রবন্ধে ব্যাখ্যা করা হবে।

^ অনু. 7যে অবোধ, সে সকল কথায় বিশ্বাস করে” শিরোনামের প্রবন্ধ দেখুন।

^ অনু. 17 এ ছাড়া, “যা সঠিক তা জানা এবং পালন করা” শিরোনামের প্রবন্ধে হেডন ও মেলডি স্যানডারসনের জীবনকাহিনি দেখুন। (প্রহরীদুর্গ, মার্চ ১, ২০০৬) অস্ট্রেলিয়ায় তাদের ব্যাবসা বেশ ভালো চলছিল কিন্তু তারা সেটা ত্যাগ করে পূর্ণসময়ের সেবা শুরু করেছিলেন। ভারতে মিশনারি হিসেবে সেবা করার সময়ে তাদের যখন টাকাপয়সা শেষ হয়ে গিয়েছিল, তখন কী ঘটেছিল, তা পড়ুন।