সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  সেপ্টেম্বর ২০১৫

 জীবনকাহিনি

যিহোবার আশীর্বাদ আমার জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে

যিহোবার আশীর্বাদ আমার জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে

কানাডার সাসকেচুয়ানের ছোট্ট শহর ওয়াকায় ১৯২৭ সালে আমার জন্ম হয়। আমার বাবা-মায়ের সাত সন্তান। এদের মধ্যে চার জন ছেলে এবং তিন জন মেয়ে। তাই, ছোটোবেলা থেকেই আমি লোকেদের মাঝে থাকতে অভ্যস্ত ছিলাম।

১৯৩০-এর দশকে ব্যাপক মন্দা দেখা গিয়েছিল। সেই সময়ের চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রভাব আমাদের পরিবারের উপরও পড়েছিল। আমরা ধনী ছিলাম না, তবে আমাদের কখনো খাবারের অভাব হয়নি। আমাদের কিছু মুরগি আর একটা গরু ছিল, তাই আমাদের ঘরে সবসময়ই ডিম, দুধ, ননি, পনির ও মাখন থাকত। আপনারা বুঝতেই পারছেন, আমাদের পরিবারের সবাইকে খামারে এবং ঘরে বিভিন্ন কাজ করতে হতো।

সেই সময়ের দারুণ সব স্মৃতি আমার মনে এখনও গেঁথে রয়েছে আর এর মধ্যে একটা হচ্ছে, আমাদের ঘর তখন আপেলের মিষ্টি গন্ধে ছেয়ে থাকত। আসলে, বাবা যখন হেমন্ত কালে আমাদের খামারের বিভিন্ন দ্রব্য বিক্রি করার জন্য শহরে যেতেন, তখন প্রায়ই বাগান থেকে সদ্য তোলা এক বাক্স আপেল কিনে নিয়ে আসতেন। আমরা সবাই প্রতিদিন একটা রসালো আপেল খেতে পারতাম, তখন কী যে ভালো লাগত!

আমাদের পরিবার সত্য জানতে পারে

আমার বয়স যখন ছয় বছর, তখন আমার বাবা-মা সত্য সম্বন্ধে জানতে পারে। তাদের প্রথম সন্তান জনি, জন্মের অল্পসময় পরেই মারা গিয়েছিল। আমার শোকাচ্ছন্ন বাবা-মা তখন স্থানীয় যাজককে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “জনি কোথায় আছে?” সেই যাজক বলেছিলেন, যেহেতু সেই শিশুকে গির্জার রীতি অনুযায়ী বাপ্তিস্ম দেওয়া হয়নি, তাই সে স্বর্গে যায়নি। এর পরিবর্তে, সে লিম্বোতে * আছে। তিনি এটাও বলেছিলেন, আমার বাবা-মা যদি তাকে টাকা দেন, তাহলে তিনি জনির জন্য প্রার্থনা করবেন, যেন সে লিম্বো থেকে স্বর্গে যেতে পারে। এগুলো শুনলে আপনাদের কেমন লাগত? বাবা-মা অত্যন্ত আঘাত পেয়েছিলেন আর তাই সেই যাজকের সঙ্গে তারা আর কখনো কথা বলেননি। কিন্তু, জনির কী হয়েছে, সেই চিন্তা তখনও তাদের মাথা থেকে দূর হয়ে যায়নি।

একদিন মা যিহোবার সাক্ষিদের দ্বারা প্রকাশিত মৃতেরা কোথায়? (ইংরেজি) পুস্তিকা পেয়েছিলেন। তিনি আগ্রহের সঙ্গে সেটা পড়েছিলেন। বাবা যখন ঘরে ফিরে আসেন, তখন মা আনন্দের সঙ্গে তাকে বলেন: “জনি কোথায় আছে, আমি তা জানি! সে এখন ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু একদিন সে আবার জেগে উঠবে।” সে-দিন সন্ধ্যায় বাবা পুরো পুস্তিকা পড়েছিলেন। বাইবেল বলে, মৃত ব্যক্তিরা ঘুমিয়ে আছে আর ভবিষ্যতে পুনরুত্থান হবে। বাবা-মা এই বিষয়টা জেনে সান্ত্বনা পেয়েছিলেন।—উপ. ৯:৫, ১০; প্রেরিত ২৪:১৫.

তারা যা খুঁজে পেয়েছিলেন, তা আমাদের জীবন পরিবর্তন করেছিল আর আমাদের সান্ত্বনা ও আনন্দ দিয়েছিল। তারা সাক্ষিদের সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন করতে এবং ওয়াকার একটা ছোটো মণ্ডলীর সভাতে যোগ দিতে শুরু করেছিলেন। সেই মণ্ডলীতে বেশিরভাগ সদস্য ইউক্রেন থেকে এসেছিল। অল্পসময়ের মধ্যেই বাবা-মা প্রচার কাজে অংশ নিতে শুরু করেছিলেন।

এর অল্পসময় পর, আমরা ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় চলে গিয়েছিলাম আর সেখানে একটা মণ্ডলীর ভাই-বোনেরা আমাদের সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছিল। আমি এখনও আনন্দের সঙ্গে সেই সময়ের কথা চিন্তা  করি, যখন আমাদের পরিবার রবিবারের সভার প্রহরীদুর্গ অধ্যয়নের জন্য প্রস্তুতি নিত। আমরা সবাই যিহোবা ও বাইবেলের সত্যের প্রতি গভীর ভালোবাসা গড়ে তুলতে শুরু করেছিলাম। আমাদের জীবন কত সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে আর যিহোবা আমাদের কীভাবে আশীর্বাদ করছেন, তা আমি বুঝতে পেরেছিলাম।

আমরা যেহেতু সেই সময়ে ছোটো ছিলাম, তাই স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের বিশ্বাস সম্বন্ধে লোকেদের সঙ্গে কথা বলা সহজ ছিল না। তবে, যে-বিষয়টা সত্যিই সাহায্য করেছিল তা হল, আমি ও আমার ছোটো বোন ইভা প্রায় সময়ই মাসের ক্ষেত্রের পরিচর্যার জন্য উপস্থাপনা প্রস্তুত করতাম আর মণ্ডলীর পরিচর্যা সভায় আমাদের সেই নমুনা দেখাতে হতো। যদিও আমরা লাজুক স্বভাবের ছিলাম, কিন্তু এই চমৎকার উপায়ে আমরা অন্যদের কাছে বাইবেল সম্বন্ধে কথা বলতে শিখেছিলাম। প্রচার করার জন্য আমাদের এভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ!

ছেলেবেলায় আমাদের একটা স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হচ্ছে, পূর্ণসময়ের দাসেরা আমাদের সঙ্গে থাকতেন। যেমন, আমাদের সীমা অধ্যক্ষ জ্যাক নেথেন আমাদের মণ্ডলী পরিদর্শন করার সময়ে আমাদের বাড়িতে থাকতেন আর আমরা তখন অনেক খুশি হতাম। * তার কাছ থেকে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা শুনতে অনেক ভালো লাগত আর তার আন্তরিক প্রশংসা আমাদের মধ্যে বিশ্বস্তভাবে যিহোবার সেবা করার আকাঙ্ক্ষা গড়ে তুলেছিল।

আমার মনে আছে, আমি এভাবে চিন্তা করতাম, “বড়ো হয়ে আমি ভাই নেথেনের মতো হতে চাই।” আমি তখন বুঝতেই পারিনি, তার উদাহরণ আসলে আমাকে পূর্ণসময়ের কেরিয়ার গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করছিল। ১৫ বছর বয়সে আমি যিহোবাকে সেবা করার সিদ্ধান্ত নিই। ১৯৪২ সালে আমি আর ইভা বাপ্তিস্ম নিই।

বিশ্বাসের পরীক্ষা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, যখন লোকেদের মধ্যে দেশপ্রেমের অনুভূতি চরম শিখরে ছিল, তখন মিস্‌ স্কট নামে অত্যন্ত গোঁড়া একজন শিক্ষিকা আমার ছোটো দুই বোন ও এক ভাইকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। কেন? কারণ তারা পতাকা অভিবাদন করেনি। এরপর, তিনি আমার স্কুলের শিক্ষিকার সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমার শিক্ষিকা বলেছিলেন, “আমরা স্বাধীন দেশে বাস করি আর আমাদের সকলের দেশাত্ববোধক রীতিনীতি পরিহার করার অধিকার রয়েছে।” মিস্‌ স্কট অনেক চাপ দেওয়া সত্ত্বেও, আমার শিক্ষিকা দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, “এটা আমার সিদ্ধান্ত।”

কিন্তু মিস্‌ স্কট বলেছিলেন, “না, এটা আপনার সিদ্ধান্ত নয়। আপনি যদি মেলিটাকে বহিষ্কার না করেন, তাহলে আমি আপনার নামে অভিযোগ করব।” আমার শিক্ষিকা তখন আমার বাবা-মার কাছে ব্যাখ্যা করেছিলেন, যদিও তিনি জানেন আমাকে বহিষ্কার করা ঠিক নয়, কিন্তু নিজের চাকরি বাঁচানোর জন্য এটা ছাড়া তার হাতে আর কোনো উপায় নেই। তা সত্ত্বেও, আমরা স্কুল থেকে বিষয়বস্তু নিয়ে ঘরেই পড়াশোনা করেছি। এই ঘটনার অল্পসময় পর, আমরা ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) দূরের একটা জায়গায় চলে গিয়েছিলাম আর সেখানে আরেকটা স্কুলে ভরতি হতে পেরেছিলাম।

যুদ্ধের সময়, আমাদের সাহিত্যাদির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল, তবে আমরা বাইবেল নিয়ে ঘরে ঘরে প্রচারে যেতাম। এর ফলে আমরা সরাসরি শাস্ত্র থেকে রাজ্যের সুসমাচার প্রচার করায় দক্ষ হয়ে উঠেছিলাম। তাই, আমরা বাইবেলের সঙ্গে আরও ভালোভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলাম, একজন খ্রিস্টান হিসেবে উন্নতি করেছিলাম এবং যিহোবার সমর্থন লাভ করেছিলাম।

পূর্ণসময়ের সেবা শুরু করা

হেয়ারড্রেসিংয়ে আমার দক্ষতা ছিল আর এর জন্য আমি কিছু পুরস্কারও পেয়েছিলাম

আমি আর ইভা স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার পর পরই অগ্রগামী সেবা শুরু করি। প্রথমে আমি একটা খাবারের দোকানে চাকরি করতাম। পরবর্তী সময়ে, আমি হেয়ারড্রেসিং অর্থাৎ চুল কাটার ও চুলের পরিচর্যার উপর ছয় মাসের একটা কোর্স করেছিলাম আর আগে থেকেই আমি ঘরে এই কাজটা করতে পছন্দ করতাম। আমি একটা চুল কাটার দোকানে সপ্তাহে দু-দিন কাজ করতাম আর সেইসঙ্গে মাসে দু-বার হেয়ারড্রেসিংয়ের প্রশিক্ষণ দিতাম। এভাবে আমি পূর্ণসময়ের সেবা চালিয়ে যেতে পেরেছিলাম।

 ১৯৫৫ সালে, আমি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটিতে এবং জার্মানির নুরেমবার্গে “বিজয়ী রাজ্য” সম্মেলনে যোগ দিতে চেয়েছিলাম। তবে নিউ ইয়র্কে যাওয়ার আগে, বিশ্বপ্রধান কার্যালয় থেকে আসা ভাই নেথেন নরের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি ও তার স্ত্রী কানাডার ভ্যানকুভারে একটা সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছিলেন। তাদের পরিদর্শনের সময় আমাকে বোন নরের চুল কাটতে বলা হয়েছিল। ভাই নর আমার কাজ দেখে খুশি হয়েছিলেন এবং আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। কথা প্রসঙ্গে আমি তাকে বলি, আমি জার্মানি যাওয়ার আগে নিউ ইয়র্কে যাওয়ার ব্যাপারে পরিকল্পনা করছি। তখন তিনি আমাকে নয় দিনের জন্য ব্রুকলিন বেথেলে কাজ করার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

সেই ভ্রমণ আমার জীবন পালটে দিয়েছিল। নিউ ইয়র্কে, থিওডোর (টেড) জারাস নামে একজন যুবক ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তার সঙ্গে দেখা হওয়ার অল্পসময় পরই, তার এই প্রশ্ন শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম, “আপনি কি অগ্রগামী?” আমি বলেছিলাম, “না।” আমার বান্ধবী লাভন এটা শুনে আমার কথায় বাধা দিয়ে বলেছিল, “হ্যাঁ, সে অগ্রগামী।” টেড অবাক হয়ে লাভনকে জিজ্ঞেস করে, “কে সঠিক উত্তর দিতে পারবে, আপনি না উনি?” আমি তখন ব্যাখ্যা করি, আমি আগে অগ্রগামী সেবা করেছি আর সম্মেলনে যোগ দিয়ে দেশে ফেরার পর আমার আবারও তা শুরু করার ইচ্ছা আছে।

একজন আধ্যাত্মিকমনা ব্যক্তির সঙ্গে আমার বিয়ে হয়

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকিতে ১৯২৫ সালে টেডের জন্ম হয়। সে ১৫ বছর বয়সে যিহোবার কাছে উৎসর্গীকরণের প্রতীক হিসেবে বাপ্তিস্ম নেয়। যদিও তার পরিবারের কেউই সত্য গ্রহণ করেনি কিন্তু বাপ্তিস্মের দু-বছর পর সে নিয়মিত অগ্রগামী হিসেবে সেবা শুরু করে। তখন থেকেই তার প্রায় ৬৭ বছরের পূর্ণসময়ের সেবা শুরু হয়।

১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে ২০ বছর বয়সে টেড ওয়াচটাওয়ার বাইবেল স্কুল অভ্‌ গিলিয়েড-এর ৭ম ক্লাস থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়। এরপর, সে ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডে একজন ভ্রমণ অধ্যক্ষ হিসেবে সেবা শুরু করে। প্রায় চার বছর পর, তাকে অস্ট্রেলিয়ার শাখা দাস হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

টেড জার্মানির নুরেমবার্গে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল আর তাই আমরা একসঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। আমাদের মধ্যে প্রেমের হাওয়া বইতে শুরু করেছিল। তার লক্ষ্যগুলো যিহোবাকে সর্বান্তঃকরণ সেবা প্রদান করার উপর কেন্দ্রীভূত ছিল, তাই আমি অনেক আনন্দিত ছিলাম। সে একজন একনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিল। সে তার কাজকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিত, তবে স্বভাবের দিক দিয়ে সদয় ও বন্ধুত্বপরায়ণ ছিল। আমি লক্ষ করেছিলাম, সে নিজের বিষয়গুলোর চেয়ে অন্যদের বিষয়গুলো আগে রাখত। সেই সম্মেলনের পর, টেড অস্ট্রেলিয়ায় আর আমি ভ্যানকুভারে ফিরে গিয়েছিলাম। তবে আমরা চিঠির মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলাম।

অস্ট্রেলিয়ায় পাঁচ বছর থাকার পর টেড যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসে আর এরপর ভ্যানকুভারে অগ্রগামী হিসেবে সেবা শুরু করে। আমার পরিবার তাকে খুব পছন্দ করেছিল আর এটা দেখে আমি অনেক খুশি হয়েছিলাম। আমার দাদা মাইকেল আমাকে চোখে চোখে রাখত আর কোনো যুবক ভাই আমার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে কি না, সেই বিষয়ে প্রায়ই তার উদ্‌বিগ্নতা প্রকাশ করত। কিন্তু, অল্পসময়ের মধ্যেই দাদা টেডকে পছন্দ করতে শুরু করেছিল। সে আমাকে বলেছিল, “ছেলেটা বেশ ভালো মেলিটা। খেয়াল রেখো, যেন ছেলেটাকে হারাতে না হয়।”

১৯৫৬ সালে বিয়ের পর, আমরা অনেক বছর ধরে আনন্দের সঙ্গে পূর্ণসময়ের সেবা করেছি

আমিও টেডকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছিলাম। তাই, ১৯৫৬ সালে ১০ ডিসেম্বর আমরা বিয়ে করি। আমরা একসঙ্গে ভ্যানকুভার ও ক্যালিফোর্নিয়ায় অগ্রগামী সেবা করি আর এরপর আমাদের মিজৌরি এবং আরকানসাসে সীমার কাজ করার জন্য নিযুক্ত করা হয়। প্রায় ১৮ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের একটা বিরাট অংশজুড়ে ভ্রমণ কাজ করার সময় আমরা প্রতি সপ্তাহে ভিন্ন ভিন্ন বাড়িতে থেকেছি। পরিচর্যায় আমাদের চমৎকার অভিজ্ঞতা হয়েছিল আর সেইসঙ্গে আমরা ভাই-বোনদের সঙ্গেও মেলামেশা উপভোগ করেছি। প্রতি সপ্তাহে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া সহজ ছিল না, তবে আমরা ভ্রমণ কাজ উপভোগ করেছি।

টেডের যে-বিষয়টা আমি বিশেষভাবে পছন্দ করতাম তা হল, সে যিহোবার সঙ্গে তার সম্পর্ককে কখনো হালকাভাবে নেয়নি। নিখিলবিশ্বের সর্বমহান ব্যক্তির প্রতি নিজের পবিত্র সেবাকে সে মূল্যবান বলে গণ্য করত। আমরা একসঙ্গে বাইবেল পড়তাম ও অধ্যয়ন করতাম। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে, আমরা বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসতাম আর সে আমাদের হয়ে প্রার্থনা করত। তারপর আমরা নিজ নিজ প্রার্থনা করতাম। টেড যখন কোনো গুরুতর বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করত, তখন আমি সবসময় তা বুঝতে পারতাম। সে বিছানা থেকে  নেমে গিয়ে আবারও হাঁটু গেড়ে নীরবে দীর্ঘসময় ধরে প্রার্থনা করত। ছোটো-বড়ো সমস্ত বিষয়ে সে প্রার্থনায় যিহোবার সাহায্য চাইত, এই বিষয়টা আমার খুব ভালো লাগত।

আমাদের বিয়ের কয়েক বছর পর, টেড আমাকে বলেছিল, সে স্মরণার্থ সভায় প্রতীকগুলো গ্রহণ করবে। সে বলেছিল, “আমি অনেক প্রার্থনা করেছি, যাতে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারি, আমি যা করতে যাচ্ছি, তাতে যিহোবার ইচ্ছা রয়েছে।” তাকে স্বর্গে সেবা করার জন্য ঈশ্বরের আত্মা দ্বারা অভিষিক্ত করা হয়েছে, এই বিষয়টা শুনে আমি যে খুব অবাক হয়েছি, তা নয়। তখন আমি এইরকম চিন্তা করেছি, আমি খ্রিস্টের একজন ভাইকে সমর্থন করার বিশেষ সুযোগ পেয়েছি।—মথি ২৫:৩৫-৪০.

পবিত্র সেবায় এক নতুন সুযোগ

১৯৭৪ সালে অবাক করার মতো একটা ঘটনা ঘটে। টেডকে যিহোবার সাক্ষিদের পরিচালকগোষ্ঠীর একজন সদস্য হিসেবে সেবা করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর কিছুদিন পরই আমরা ব্রুকলিন বেথেলে সেবা শুরু করেছিলাম। টেড পরিচালকগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করত আর আমি হাউসকিপার অথবা হেয়ারড্রেসার হিসেবে কাজ করতাম।

টেডের দায়িত্বের অংশ হিসেবে তাকে বিভিন্ন শাখা অফিস পরিদর্শন করার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল। সে বিশেষভাবে এমন দেশগুলোর ব্যাপারে আগ্রহী ছিল, যেখানে আমাদের কাজের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। উদাহরণ স্বরূপ, সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো ব্যাপারে তার আগ্রহ ছিল। একবার, আমরা অনেক দিন পর, সুইডেনে ছুটি কাটাচ্ছিলাম। সেখানে টেড আমাকে বলে: “মেলিটা, পোল্যান্ডে প্রচার কাজের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আমি সেখানকার ভাইদের সাহায্য করতে চাই।” তাই, আমরা ভিসা নিয়ে পোল্যান্ডে গিয়েছিলাম। সেখানে টেড এমন কয়েক জন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করেছিল, যারা যিহোবার সাক্ষিদের কাজ দেখাশোনা করতেন। কেউ যাতে আড়ি পেতে তাদের কথাবার্তা শুনতে না পারে, সেইজন্য তারা দীর্ঘসময় নিয়ে হাঁটতে বের হয়েছিলেন। ভাইয়েরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চার দিন ধরে অনেক আলোচনা করেছিলেন। তবে টেড তার আধ্যাত্মিক পরিবারকে সাহায্য করতে পেরে যে-পরিতৃপ্তি লাভ করেছিল, তা দেখে আমিও খুব খুশি হয়েছিলাম।

এরপর ১৯৭৭ সালে আমরা আবার পোল্যান্ডে পরিদর্শন করেছিলাম। ভাই এফ. ডব্লু. ফ্রাঞ্জ, ভাই ড্যানিয়েল সিডলিক এবং টেড এই তিন জন, পরিচালকগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে সেখানে প্রথম আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন করেছিলেন। যদিও আমাদের কাজের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল, কিন্তু পরিচালকগোষ্ঠীর এই তিন জন সদস্য বিভিন্ন শহরের অধ্যক্ষ, অগ্রগামী ও দীর্ঘসময়ের সাক্ষিদের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলেন।

আমাদের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে রেজিস্ট্রীকৃত হওয়ার পর মস্কোর বিচার মন্ত্রণালয়ের সামনে টেড ও অন্যেরা

পরের বছর, ভাই মিলটন হেনশেল ও টেড যখন পোল্যান্ডে পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন, তখন তারা এমন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, যারা আমাদের ও আমাদের কাজকে কিছুটা সমর্থন করতে শুরু করেছিলেন। ১৯৮২ সালে পোলিশ সরকার আমাদের ভাইদের বিভিন্ন জায়গায় এক দিনের সম্মেলন করার অনুমতি দিয়েছিল। পরের বছর আরও বড়ো বড়ো সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল আর সেগুলোর বেশিরভাগ ভাড়া করা জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন, আমাদের ১৯৮৫ সালে বড়ো বড়ো স্টেডিয়ামে চারটে সম্মেলনের আয়োজন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আর এরপর, ১৯৮৯ সালের মে মাসে যখন আরও বড়ো সম্মেলনের আয়োজন করার পরিকল্পনা হচ্ছিল, তখন পোলিশ সরকার যিহোবার সাক্ষিদের বৈধ স্বীকৃতি দিয়েছিল। এই ঘটনায় টেড অনেক আনন্দিত হয়েছিল।

পোল্যান্ডে জেলা সম্মেলন

 স্বাস্থ্যগত সমস্যার সঙ্গে সফলভাবে মোকাবিলা করা

২০০৭ সালে, আমরা দক্ষিণ আফ্রিকার শাখা অফিসের একটা বিল্ডিংয়ের উৎসর্গীকরণে যোগ দেওয়ার জন্য যাত্রাপথে ছিলাম। ইংল্যান্ডে টেডের ব্লাড প্রেশার অনেক বেড়ে যায়, তাই একজন ডাক্তার তাকে ভ্রমণ স্থগিত রাখার পরামর্শ দেন। টেড সুস্থ হওয়ার পর আমরা যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর, একটা স্ট্রোকের কারণে তার শরীরের ডান দিক অবশ হয়ে যায়।

টেড অনেক ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকে আর প্রথমদিকে সে অফিসেও যেতে পারত না। তবে আমরা খুবই কৃতজ্ঞ যে, তার কথাবার্তা স্বাভাবিক ছিল। নিজের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সে তার তালিকা মেনে চলার চেষ্টা করত আর এমনকী আমাদের ড্রইং রুম থেকে টেলিফোনের মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে পরিচালকগোষ্ঠীর সভায় অংশ নিত।

বেথেলে তাকে যে-চমৎকার থেরাপি দেওয়া হতো, সেটার জন্য টেড কৃতজ্ঞ ছিল। ধীরে ধীরে, তার চলা-ফেরা করার শক্তি অনেকটাই ফিরে এসেছিল। সে তার ঈশতান্ত্রিক দায়িত্বের মধ্যে কিছু কিছু করতে সক্ষম হয়েছিল আর সে সবসময় আনন্দিত থাকত।

তিন বছর পর, তার দ্বিতীয় বার স্ট্রোক হয় আর ২০১০ সালের ৯ জুন সে শান্তিতে মৃত্যুবরণ করে। আমি সবসময়ই জানতাম, টেডকে তার পার্থিব জীবন শেষ করতে হবে। তবে তাকে হারানোর বেদনা কতটা কষ্টের আর তার শূন্যতা আমি কতটা অনুভব করি, তা ভাষায় বোঝাতে পারব না। তা সত্ত্বেও, টেডকে সহযোগিতা করতে পেরেছি বলে আমি প্রতিদিন যিহোবাকে ধন্যবাদ দিই। আমরা একসঙ্গে ৫৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে পূর্ণসময়ের পরিচর্যা করেছি। টেড আমাকে আমার স্বর্গীয় পিতার আরও নিকটবর্তী হতে সাহায্য করেছে, তাই আমি যিহোবাকে ধন্যবাদ দিই। আর এখন, এই বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহই নেই, সে তার নতুন দায়িত্বও অনেক আনন্দ ও পরিতৃপ্তি সহকারে উপভোগ করছে।

জীবনে নতুন নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হই

বেথেলের বিউটি পার্লারে কাজ করতে ও প্রশিক্ষণ দিতে আমার খুব ভালো লাগে

আমার স্বামীর সঙ্গে আনন্দ ও ব্যস্ততায় অনেক সময় অতিবাহিত করার পর, বর্তমানের বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। বেথেল পরিদর্শন করতে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে ও আমাদের কিংডম হলে আসা নতুন ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হতে টেড আর আমার খুব ভালো লাগত। এখন আমার প্রিয়তম টেড আমার সঙ্গে নেই আর আমি নিজেও আগের মতো শক্তসমর্থ নই। তাই আমি আগের মতো মেলামেশা করতে পারি না। কিন্তু, আমি এখনও বেথেলে ও মণ্ডলীতে আমার প্রিয় ভাই-বোনদের সঙ্গে সময় উপভোগ করি। বেথেলের তালিকা সহজ নয়, তবে এভাবে ঈশ্বরকে সেবা করতে পেরে আমি আনন্দ পাই। আর প্রচার কাজের জন্য আমার ভালোবাসা একটুও কমেনি। যদিও ক্লান্ত হয়ে যাই আর দীর্ঘসময় ধরে হাঁটতে পারি না, কিন্তু আমি রাস্তায় সাক্ষ্যদান করে ও বাইবেল অধ্যয়ন পরিচালনা করে অনেক পরিতৃপ্তি পাই।

আমি যখন জগতে ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটতে দেখি, তখন এটা ভেবে আনন্দিত হই, আমি একজন চমৎকার বিবাহসাথির সঙ্গে সবসময় যিহোবার সেবা করেছি! যিহোবার আশীর্বাদ আমার জীবনকে সত্যিই সমৃদ্ধ করেছে।—হিতো. ১০:২২.

^ অনু. 8 “লিম্বো” হল রোমান ক্যাথলিকদের একটা শিক্ষা। এই শিক্ষায় বর্ণনা করা হয়, বাপ্তিস্ম নেয়নি এমন ভালো ব্যক্তি ও শিশুদের আত্মা লিম্বো নামে কোনো একটা জায়গায় চলে যায়।

^ অনু. 13 ভাই জ্যাক নেথেনের জীবনকাহিনি ১৯৯০ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রহরীদুর্গ (ইংরেজি) পত্রিকার ১০-১৪ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে।