সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  আগস্ট ২০১৫

 আমাদের আর্কাইভ থেকে

“যিহোবা আপনাদের সত্য শেখার জন্য ফ্রান্সে নিয়ে এসেছেন”

“যিহোবা আপনাদের সত্য শেখার জন্য ফ্রান্সে নিয়ে এসেছেন”

ছেলেবেলায়, ওনতুয়ান স্ক্যালেকির সবসময়ের সঙ্গী ছিল একটা টাট্টু ঘোড়া। সেই ঘোড়ার সাহায্যে তিনি খুব কম আলোর একটা সুরঙ্গপথ দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে ১,৬০০ ফুট (৫০০ মিটার) গভীর খনি থেকে কয়লা বহন করে নিয়ে আসতেন। খনিধসের কারণে ওনতুয়ানের বাবা আহত হয়েছিলেন আর তাই পরিবার থেকে ওনতুয়ানকে খনির কাজে পাঠানো ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। সেখানে তাকে প্রতিদিন নয় ঘন্টা কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। একবার, খনির ছাদ হঠাৎ ধসে পড়ায় ওনতুয়ান তার জীবন প্রায় হারাতে বসেছিলেন।

পোলিশ খনি শ্রমিকদের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি এবং সান-লো-নোব্‌ল শহরের কাছাকাছি দুশিতে অবস্থিত একটা খনি, যেখানে ওনতুয়ান স্ক্যালেকি কাজ করেছিলেন

১৯২০ এবং ১৯৩০-এর দশকে ফ্রান্সে পোলিশ বংশোদ্ভূত বাবা-মায়ের ঘরে যে-শিশুরা জন্মগ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্যে ওনতুয়ান ছিলেন একজন। কেন পোলিশ অভিবাসীরা ফ্রান্সে চলে এসেছিল? প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, পোল্যান্ড যখন স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছিল, তখন সেখানে একটা গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছিল আর তা হল জনসংখ্যার আধিক্য। অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে ফ্রান্সে দশ লক্ষেরও বেশি লোক প্রাণ হারিয়েছিল। আর সেখানে কয়লার খনিতে শ্রমিকের চাহিদা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তাই, ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফ্রান্স ও পোলিশ সরকার একটা অভিবাসন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। ১৯৩১ সালের মধ্যে ফ্রান্সে পোলিশ লোকেদের সংখ্যা বেড়ে ৫,০৭,৮০০ হয়ে গিয়েছিল আর অধিকাংশ পোলিশ ব্যক্তি উত্তরের খনি অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেছিল।

এই পরিশ্রমী পোলিশ অভিবাসীরা তাদের সঙ্গে নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে এসেছিল। আর সেই সংস্কৃতির একটা বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মের প্রতি গভীর অনুভূতি। ওনতুয়ান, যার বয়স এখন ৯০ বছর, তিনি স্মরণ করে বলেন, “আমার দাদু ইউজেফ, পবিত্র শাস্ত্র সম্বন্ধে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে কথা বলতেন আর এটা তার বাবা তার মধ্যে গেঁথে দিয়েছিলেন।” প্রতি রবিবার পোলিশ খনি শ্রমিকদের পরিবারগুলো তাদের সবচেয়ে ভালো পোশাক পরে গির্জায় যেত, ঠিক যেমনটা তারা তাদের নিজেদের দেশে থাকতে করত। তবে ফ্রান্সের কিছু স্থানীয় লোক, যাদের ধর্মের প্রতি আগ্রহ ছিল না, তারা এই বিষয়টাকে অনেক তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখত।

বাইবেল ছাত্রদের সঙ্গে পোল্যান্ডের অনেক অধিবাসীর প্রথম বার দেখা হয়েছিল, ফ্রান্সের নহ্‌-পাদ-কালে অঞ্চলে। সেই অঞ্চলে বাইবেল ছাত্ররা ১৯০৪ সাল থেকে উদ্যোগের সঙ্গে প্রচার করছিল। পোলিশ ভাষায় ১৯১৫ সাল থেকে প্রতি মাসে প্রহরীদুর্গ পত্রিকা এবং ১৯২৫ সাল থেকে স্বর্ণযুগ (বর্তমানে সচেতন থাক!) পত্রিকা ছাপানো শুরু হয়। অনেক পরিবার এই পত্রিকাগুলোর ও সেইসঙ্গে পোলিশ ভাষায় ঈশ্বরের বীণা (ইংরেজি) বইয়ের শাস্ত্রীয় বিষয়গুলো গ্রহণ করে নিয়েছিল।

ভাই ওনতুয়ান ও তার পরিবারের সদস্যরা, ওনতুয়ানের মামার কাছ থেকে বাইবেল ছাত্রদের সম্বন্ধে জানতে পারেন, যিনি ১৯২৪ সালে প্রথম বার সভায় যোগ দিয়েছিলেন। সেই একই বছর,  ব্রুয়ে-ওন-আর্তোয়া শহরে বাইবেল ছাত্ররা পোলিশ ভাষায় প্রথম বারের মতো সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে সেই একই শহরে বিশ্বপ্রধান কার্যালয়ের প্রতিনিধি জোসেফ এফ. রাদারফোর্ড, জনসাধারণের উদ্দেশে একটা সভার আয়োজন করেন, যেখানে ২,০০০ লোক উপস্থিত ছিল। সেই বিরাটসংখ্যক লোক, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল পোলিশ, তাদের উপস্থিতি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ভাই রাদারফোর্ড এই কথা বলেছিলেন: “যিহোবা আপনাদের সত্য শেখার জন্য ফ্রান্সে নিয়ে এসেছেন। এখন আপনাদের এবং আপনাদের সন্তানদের দায়িত্ব হচ্ছে ফ্রান্সের অধিবাসীদের সাহায্য করা! এখনও অনেক জায়গায় প্রচার কাজ বাকি আছে আর যিহোবা এই কাজের জন্য আরও প্রকাশক জুগিয়ে দেবেন।”

যিহোবা ঈশ্বর ঠিক তা-ই করেছেন! এই পোলিশ খ্রিস্টানরা খনির কাজে যেমন পরিশ্রমী ছিলেন, তেমনই প্রচার কাজেও উদ্যোগী ছিলেন! আসলে, তারা যে-মূল্যবান সত্য জানতে পেরেছিলেন, তা অন্যদের জানানোর জন্য কেউ কেউ নিজেদের মাতৃভূমি পোল্যান্ডে ফিরে গিয়েছিলেন। পোল্যান্ডের বিশাল এলাকায় সুসমাচার ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য যারা ফ্রান্স থেকে পোল্যান্ডে চলে গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন তওফিল পিয়স্‌কস্কি, শ্টেপান কোসিক এবং ইয়ান জাবুদা।

কিন্তু, পোলিশভাষী অনেক সুসমাচার প্রচারক ফ্রান্সে থেকে গিয়েছিলেন এবং ফ্রান্সের ভাই-বোনদের সঙ্গে উদ্যোগ সহকারে প্রচার কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন। সান-লো-নোব্‌ল শহরে, ১৯২৬ সালে অনুষ্ঠিত একটা সম্মেলনে পোলিশ ভাষার অধিবেশনে ১,০০০ জন এবং ফ্রেঞ্চ ভাষার অধিবেশনে ৩০০ জন লোক উপস্থিত হয়েছিল। বর্ষপুস্তক ১৯২৯ (ইংরেজি) বইয়ে বলা হয়েছে: “সেই বছর ৩৩২ জন পোলিশ ভাই-বোন পবিত্রীকরণের [উৎসর্গীকরণের] চিহ্ন হিসেবে বাপ্তিস্ম নিয়েছিলেন।” দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, ফ্রান্সে ৮৪টা মণ্ডলীর মধ্যে ৩২টাই ছিল পোলিশভাষী মণ্ডলী।

একটা সম্মেলনে যাওয়ার পথে, ফ্রান্সে বসবাসকারী পোলিশ ভাই-বোনেরা। সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে, “যিহোবার সাক্ষিরা”

১৯৪৭ সালে পোলিশ সরকার পোলিশ লোকেদের পোল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তখন অনেক যিহোবার সাক্ষি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তারা চলে যাওয়ার পরও, তাদের ও সেইসঙ্গে তাদের ফ্রেঞ্চ সহবিশ্বাসীদের প্রচেষ্টার ফল দেখা গিয়েছিল কারণ সেই বছর রাজ্য প্রকাশকদের সংখ্যা ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে এই বৃদ্ধি পর্যায়ক্রমে ২০, ২৩ আর এমনকী ৪০ শতাংশ হয়েছিল! এই নতুন প্রকাশকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ফ্রান্স শাখা অফিস ১৯৪৮ সালে প্রথম সীমা অধ্যক্ষ নিযুক্ত করেছিল। যে-পাঁচ জন ভাইকে নিযুক্ত করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে চার জন ছিলেন পোলিশ আর এদের মধ্যে একজন ছিলেন ওনতুয়ান স্ক্যালেকি।

ফ্রান্সের যিহোবার সাক্ষিদের মধ্যে এখনও অনেকে তাদের পূর্বপুরুষদের পোলিশ পদবি ব্যবহার করে থাকে, যে-পূর্বপুরুষরা খনির কাজ এবং প্রচার কাজ উভয় ক্ষেত্রেই কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। বর্তমানেও, ফ্রান্সে অনেক অভিবাসী সত্য শিখছে। ফ্রান্সে অন্যান্য দেশ থেকে আসা প্রচারকরা তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাক কিংবা তাদের নতুন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করুক, যেটাই করুক না কেন, তারা উদ্যোগের সঙ্গে রাজ্য ঘোষণাকারীদের পথ, যেমন তাদের পোলিশ পূর্বপুরুষদের পথ অনুসরণ করছে।—আমাদের আর্কাইভ থেকে, ফ্রান্স।