সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  জুন ২০১৫

“ধৈর্য্যে তোমাদের প্রয়োজন আছে”

“ধৈর্য্যে তোমাদের প্রয়োজন আছে”

অনিতা * একজন যিহোবার সাক্ষি হিসেবে বাপ্তিস্ম নেওয়ার পর, তার স্বামী প্রচণ্ড বিরোধিতা করেছিলেন। অনিতা বলেন, “সে আমাকে সভাতে যেতে বাধা দিত আর এমনকী ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ করতেও নিষেধ করত। যিহোবার নাম উচ্চারণ করলেই আমার স্বামী তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠত।”

সন্তানদের যিহোবা সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়া, অনিতার জন্য আরেকটা বড়ো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। “আমার ঘরে যিহোবার উপাসনা করা নিষেধ ছিল। আমি আমার সন্তানদেরকে সবার সামনে অধ্যয়ন করাতে পারতাম না কিংবা তাদের সভাতেও নিয়ে যেতে পারতাম না।”

অনিতার অভিজ্ঞতা যেমন দেখায়, একজন খ্রিস্টানের নীতিনিষ্ঠা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে আসা বিরোধিতা আসলেই একটা পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। যখন দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়, সন্তান অথবা বিবাহসাথির মৃত্যু ঘটে কিংবা পরিবারের কোনো ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি যিহোবার কাছ থেকে দূরে সরে যায়, তখনও একই বিষয় বলা যেতে পারে। তাহলে, কোন বিষয়টা একজন খ্রিস্টানকে যিহোবার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে সাহায্য করতে পারে?

এই ধরনের পরীক্ষার সময়ে আপনি কী করতে পারেন? প্রেরিত পৌল বলেছিলেন: “ধৈর্য্যে তোমাদের প্রয়োজন আছে।” (ইব্রীয় ১০:৩৬) কিন্তু, কী আপনাকে ধৈর্য ধরার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে?

প্রার্থনা করার মাধ্যমে যিহোবার উপর নির্ভর করা

পরীক্ষার সময় ধৈর্য ধরার জন্য শক্তি প্রয়োজন। এই শক্তি লাভ করার বিভিন্ন উপায় রয়েছে আর সেগুলোর মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ উপায় হচ্ছে, প্রার্থনা করার মাধ্যমে ঈশ্বরের উপর নির্ভর করা। একটা উদাহরণ বিবেচনা করুন। সোমবার দুপুরে অ্যানার পরিবারে একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। হঠাৎ করেই তার স্বামী মারা যান, যার সঙ্গে তিনি জীবনের ৩০ বছর কাটিয়েছিলেন। অ্যানা বলেন, “সে অফিসে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। তার বয়স ছিল মাত্র ৫২ বছর।”

কীভাবে অ্যানা এই কষ্টের সঙ্গে মোকাবিলা করেছিলেন? যেহেতু তাকে কাজে ফিরে যেতে হয়েছিল আর তার চাকরিটা এমন ছিল, যেখানে পূর্ণ মনোযোগ দিতে হতো, তাই তার কষ্ট কিছুটা কমেছিল। তবে অ্যানার কষ্ট পুরোপুরি দূর হয়ে যায়নি। তিনি বলেন: “আমি যিহোবার কাছে হৃদয় উজাড় করে মিনতি করেছিলাম, যেন তিনি আমাকে স্বামী হারানোর প্রচণ্ড বেদনার সঙ্গে মোকাবিলা করতে সাহায্য করেন।” যিহোবা কি তার প্রার্থনার উত্তর দিয়েছিলেন? হ্যাঁ, যিহোবা উত্তর দিয়েছিলেন আর এই বিষয়টা অ্যানা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। তিনি বলেন: “একমাত্র ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া শান্তিই আমার মনকে শান্ত করেছিল এবং আমাকে মানসিকভাবে স্থির থাকতে সাহায্য করেছিল। যিহোবা যে আমার স্বামীকে পুনরুত্থিত করবেন, সেই বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।”—ফিলি. ৪:৬, ৭.

“প্রার্থনা-শ্রবণকারী” প্রতিজ্ঞা করেছেন, তিনি তাঁর দাসদেরকে তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য প্রদান করবেন। (গীত. ৬৫:২) এই আশ্বাস আমাদের বিশ্বাসকে শক্তিশালী করে। আপনি কি এই বিষয়ে একমত নন? এটা কি আপনাকে বুঝতে সাহায্য করে না, কেন আপনিও ধৈর্য ধরতে পারেন?

খ্রিস্টীয় সভা—সাহায্যের এক উৎস

যিহোবা খ্রিস্টীয় মণ্ডলীর মাধ্যমে তাঁর লোকেদের সাহায্য করে এসেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, থিষলনীকীর মণ্ডলী যখন প্রচণ্ড তাড়না সহ্য করেছিল, তখন পৌল সেখানকার খ্রিস্টানদের এই জোরালো পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘যেমন তোমরা করিয়া থাক, তেমনি তোমরা পরস্পরকে আশ্বাস দেও, এবং এক জন অন্যকে গাঁথিয়া তুল।’ (১ থিষল. ২:১৪; ৫:১১) প্রেমের বন্ধনে একতাবদ্ধ হয়ে এবং একে অন্যকে সাহায্য করার মাধ্যমে, থিষলনীকীর খ্রিস্টানরা তাদের বিশ্বাসের পরীক্ষায় জয়ী হতে পেরেছিল। তাদের ধৈর্যের বিবরণ বর্তমানে আমাদের জন্য এক চমৎকার উদাহরণ আর এটা এমন একটা বিষয় সম্বন্ধে প্রকাশ করে, যা ধৈর্য ধরার ক্ষেত্রে আমাদের সাহায্য করতে পারে।

মণ্ডলীর সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা অন্যদের সঙ্গে এমন বিষয়গুলো ভাগ করে নিতে পারি,, “যে যে বিষয়ের দ্বারা” আমরা “পরস্পরকে গাঁথিয়া তুলিতে পারি।” (রোমীয় ১৪:১৯) এটা বিশেষভাবে দুর্দশার সময়ে গুরুত্বপূর্ণ। পৌল নিজে অনেক তাড়না ভোগ করেছিলেন এবং যিহোবা তাকে সেই সময়ে ধৈর্য ধরার জন্য শক্তি দিয়েছিলেন। কখনো কখনো, ঈশ্বর সহবিশ্বাসীদের মাধ্যমে পৌলকে অনেক উৎসাহ দিয়েছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ, পৌল যখন কলসী মণ্ডলীর ভাই-বোনদের উদ্দেশে ব্যক্তিগতভাবে শুভেচ্ছা পাঠিয়েছিলেন, তখন তিনি তাদের সম্বন্ধে এই কথা বলেছিলেন: “ইহাঁরা আমার সান্ত্বনাজনক হইয়াছেন।” (কল. ৪:১০, ১১) হ্যাঁ, তারা পৌলকে ভালোবাসতেন আর তাই পৌলের প্রয়োজনের সময়ে  তারা তাকে সান্ত্বনা দিতে ও শক্তিশালী করতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। পৌলের মতো আপনিও হয়তো ইতিমধ্যেই আপনার মণ্ডলীর সদস্যদের কাছ থেকে একইরকম উৎসাহ ও সাহায্য লাভ করেছেন।

প্রাচীনদের কাছ থেকে সাহায্য

ঈশ্বর খ্রিস্টীয় মণ্ডলীতে সাহায্যের আরেকটা উৎসের ব্যবস্থা করেছেন আর তা হল, প্রাচীনরা। আধ্যাত্মিকভাবে পরিপক্ব এই পুরুষরা ‘বাত্যা হইতে আচ্ছাদন, ও ঝটিকা হইতে অন্তরাল, শুষ্ক স্থানে জলস্রোত ও শ্রান্তিজনক ভূমিতে কোন প্রকাণ্ড শৈলের ছায়ার’ মতো হতে পারেন। (যিশা. ৩২:২) কী এক সতেজতাদায়ক আশ্বাস! আপনি কি এই প্রেমপূর্ণ ব্যবস্থা থেকে উপকার লাভ করেছেন? প্রাচীনদের কাছ থেকে পাওয়া উৎসাহ এবং সাহায্য আপনাকে ধৈর্য ধরার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।

এটা ঠিক যে, প্রাচীনরা অলৌকিক কাজ করতে পারেন না। তারা অসিদ্ধ ও “[আমাদের] ন্যায় সুখদুঃখভোগী” মানুষ। (প্রেরিত ১৪:১৫) তা সত্ত্বেও, তারা যখন আমাদের হয়ে প্রার্থনা করেন, তখন সেই প্রার্থনা অনেক কিছু সম্পাদন করতে পারে। (যাকোব ৫:১৪, ১৫) ইতালির একজন ভাই বহুবছর ধরে মাসকুলার ডিসট্রফি রোগে (দেহের পেশি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে ও শুকিয়ে যায় এমন রোগে) ভুগেছেন। তিনি বলেছিলেন: “ভাইয়েরা আমার প্রতি ভালোবাসা দেখান আর সেইসঙ্গে প্রায়ই আমাকে দেখতে আসেন। এই বিষয়গুলো আমাকে ধৈর্য ধরতে সাহায্য করেছে।” আপনি কি যিহোবার এই প্রেমপূর্ণ ব্যবস্থা থেকে অর্থাৎ প্রাচীনদের কাছ থেকে পূর্ণরূপে উপকার লাভ করতে পারেন?

আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোর এক নিয়মিত তালিকা বজায় রাখুন

ধৈর্য ধরার জন্য আমরা আরও কিছু করতে পারি। এগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে, আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোর এক নিয়মিত তালিকা বজায় রাখা। ৩৯ বছর বয়সি জনের কথা বিবেচনা করুন, যার মারাত্মক ক্যান্সার হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন: “মনে হয়েছিল, আমার প্রতি অবিচার করা হয়েছে কারণ আমার বয়স কম ছিল।” সেইসময়ে জনের সন্তানের বয়স মাত্র তিন বছর। জন বলেন, “তার মানে আমার স্ত্রীকে অনেক কাজ করতে হয়েছে। আমাদের ছোট্ট সন্তানের পাশাপাশি তাকে আমারও যত্ন নিতে হয়েছে আর আমার সঙ্গে সবসময় ডাক্তারের কাছে যেতে হয়েছে।” কেমোথেরাপির পর জন শারীরিকভাবে প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভব করতেন এবং তার বমি বমি লাগত। আর এখানেই শেষ নয়। জনের বাবাও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং তার যত্নের প্রয়োজন ছিল।

জন ও তার পরিবার কীভাবে এই কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করেছিলেন? তিনি বলেন, “ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও আমি খেয়াল রাখতাম, যেন আমাদের পরিবার এক নিয়মিত আধ্যাত্মিক তালিকা বজায় রাখতে পারে। আমরা সমস্ত সভায় যেতাম, সপ্তাহে এক বার প্রচারে যেতাম আর এমনকী কঠিন পরিস্থিতিতেও নিয়মিতভাবে পারিবারিক উপাসনা করতাম।” জন বুঝতে পেরেছিলেন, যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরার একটা চাবিকাঠি হল, আধ্যাত্মিকতা বজায় রাখা। যারা কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে, তাদের জন্য জন কি কোনো পরামর্শ দিয়েছেন? হ্যাঁ, তিনি বলেন: “প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ওঠার পর, আপনি নেতিবাচক চিন্তার পরিবর্তে যিহোবার কাছ থেকে প্রাপ্ত শক্তি ও প্রেম উপলব্ধি করতে পারবেন। যিহোবা আপনাকে শক্তি দিতে পারেন, যেমনটা তিনি আমাকে দিয়েছেন।”

এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহই নেই, এখন অথবা ভবিষ্যতে যেকোনো কঠিন পরীক্ষা বা পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার সময়, আমরা যিহোবার সাহায্যে ধৈর্য ধরতে পারব। আসুন, আমরা প্রার্থনা করার মাধ্যমে যিহোবার উপর নির্ভর করি, মণ্ডলীর সকলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে তুলি, খ্রিস্টান প্রাচীনদের কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণ করি এবং আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোর এক নিয়মিত তালিকা বজায় রাখি। এগুলো করার মাধ্যমে আমরা পৌলের এই কথার সঙ্গে মিল রেখে কাজ করতে পারব: “ধৈর্য্যে তোমাদের প্রয়োজন আছে।”

^ অনু. 2 কিছু নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।