সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  মে ২০১৫

 জীবনকাহিনি

প্রথম প্রেম স্মরণে রাখা আমাকে ধৈর্য ধরতে সাহায্য করেছে

প্রথম প্রেম স্মরণে রাখা আমাকে ধৈর্য ধরতে সাহায্য করেছে

সময়টা হল ১৯৭০ সালের গ্রীষ্মের শুরুর দিকে। আমি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার ফিনিক্সভিলে ভ্যালি ফোর্জ জেনারেল হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি। একজন পুরুষ নার্স প্রতি আধঘন্টা পর পর আমার ব্লাড প্রেশার মাপছিলেন। আমি তখন ২০ বছর বয়সি এক সৈনিক আর আমি এক মারাত্মক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলাম। আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড়ো সেই নার্সের চোখে-মুখে উদ্‌বিগ্নতা ফুটে উঠেছিল। আমার ব্লাড প্রেশার কমতেই থাকে আর আমি সেই নার্সকে বলি: “আপনি এর আগে কাউকে নিজের চোখের সামনে মারা যেতে দেখেননি, তাই-না?” তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল আর তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “না, দেখিনি।”

সেই সময়ে, আমার বাঁচার কোনো আশাই ছিল না। কিন্তু কীভাবে আমি হাসপাতাল থেকে ফিরে এসেছিলাম? তাহলে এখন, আমার জীবনের কিছু গল্প আপনাদের বলি।

যুদ্ধ সম্বন্ধে আমার প্রাথমিক অভিজ্ঞতা

ভিয়েতনামে যুদ্ধ চলাকালীন, আমি অপারেশন থিয়েটারে একজন টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। অসুস্থ ও আহত ব্যক্তিদের সাহায্য করতে আমার ভালো লাগত আর আমি একজন সার্জন বা শল্য চিকিৎসক হতে চেয়েছিলাম। আমি ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে ভিয়েতনামে এসেছিলাম। অন্য সকল আগন্তুকের মতো আমাকেও সেই দেশের সময় ও প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছিল।

আমি ভিয়েতনামে ডং টেমের মেকং ডেলটায় একটা অস্ত্রোপচার হাসপাতালে কাজ শুরু করার অল্পসময় পরেই, আহত ও নিহত সৈনিকে পূর্ণ অসংখ্য হেলিকপ্টার সেখানে এসে পৌঁছায়। যেহেতু দেশের প্রতি আমার প্রচণ্ড ভক্তি ছিল আর আমি কাজ করতে ভালোবাসতাম, তাই আমি সঙ্গেসঙ্গেই কাজ করতে চেয়েছিলাম। আহত ব্যক্তিদের দ্রুত প্রস্তুত করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছোট্ট কয়েকটা ধাতব কনটেইনারে ঢোকানো হয়েছিল। এই কনটেইনারগুলো অপারেশন থিয়েটার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সেই ছোট্ট জায়গায় গাদাগাদি করে একজন সার্জন, একজন অ্যানেসথেটিস্ট, অপারেশন থিয়েটারে ডাক্তারের সহকারী নার্স এবং অপারেশনের আগে ও পরে রোগীর তত্ত্বাবধানকারী নার্স, আহত ব্যক্তিদের জীবন বাঁচানোর জন্য যথাসাধ্য করতেন। আমি বড়ো বড়ো কালো রঙের কিছু ব্যাগ দেখতে পেয়েছিলাম, যেগুলো হেলিকপ্টার থেকে নামানো হয়নি। আমাকে জানানো হয়েছিল, ওই ব্যাগগুলোর মধ্যে যুদ্ধের সময়ে বোমা বিস্ফোরণে নিহত সৈনিকদের ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষ রয়েছে। এটাই ছিল যুদ্ধ সম্বন্ধে আমার প্রাথমিক অভিজ্ঞতা।

 আমি ঈশ্বরের অনুসন্ধান করি

অল্পবয়সে আমি সত্য সম্বন্ধে কিছুটা জেনেছিলাম

ছোটোবেলায় আমি যিহোবার সাক্ষিদের কাছ থেকে সত্য সম্বন্ধে কিছুটা জানতে পেরেছিলাম। আমার প্রিয় মা সাক্ষিদের সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন করতেন, তবে তিনি বাপ্তিস্ম নেওয়ার মতো উন্নতি করেননি। মা অধ্যয়ন করার সময় তার সঙ্গে বসে আলোচনা শুনতে আমার খুব ভালো লাগত। সেইসময়ে একদিন আমি আমার সৎবাবার সঙ্গে একটা কিংডম হলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, “এটা কী?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “কক্ষনো ওই লোকেদের কাছে যাবে না!” আমি আমার সৎবাবাকে ভালোবাসতাম আর তার উপর আমার আস্থা ছিল। তাই আমি তার উপদেশ মেনে নিয়েছিলাম। ফলে, যিহোবার সাক্ষিদের সঙ্গে আমার যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

ভিয়েতনাম থেকে ফিরে আসার পর, আমি নিজের জীবনে ঈশ্বরের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলাম। যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি আমার আবেগঅনুভূতিকে অসাড় করে দিয়েছিল। এই ব্যাপারে লোকেদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে আমার মনে হতো, ভিয়েতনামে কী ঘটছে, তা আসলে কেউ বুঝতে পারছে না। আমার মনে আছে, প্রতিবাদকারীরা মিছিল ও সমাবেশে আমেরিকার সৈন্যদের শিশু হত্যাকারী বলে অভিহিত করেছিল কারণ বিভিন্ন রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছিল, যুদ্ধে নিরীহ শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে।

আমার আধ্যাত্মিক ক্ষুধা মেটানোর জন্য আমি বিভিন্ন গির্জায় যোগ দিতে শুরু করেছিলাম। ঈশ্বরের জন্য আমার সবসময়ই ভালোবাসা ছিল, কিন্তু বিভিন্ন গির্জার অভিজ্ঞতা আমার মনে খুব একটা দাগ কাটেনি। অবশেষে, আমি ফ্লোরিডার ডেল্‌রে বিচে যিহোবার সাক্ষিদের একটা কিংডম হলে গিয়েছিলাম। এটা ছিল ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কোনো এক রবিবার।

আমি যখন হলে প্রবেশ করি, তখন জনসাধারণের উদ্দেশে বক্তৃতা প্রায় শেষ হতে যাচ্ছিল আর তাই আমি এর পরে প্রহরীদুর্গ অধ্যয়নে যোগ দেওয়ার জন্য থেকে যাই। সেখানে কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল, তা আমার মনে নেই। তবে আমার এখনও সেই ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়ের কথা মনে আছে, যারা তাদের বাইবেলের পৃষ্ঠা উলটে শাস্ত্রপদ খুঁজে বের করছিল। এই বিষয়টা সত্যিই আমার মনে দাগ কেটেছিল! আমি চুপচাপ আলোচনা শুনেছিলাম এবং সব কিছু লক্ষ করেছিলাম। আমি যখন কিংডম হল থেকে বের হব, তখন একজন প্রেমময় ভাই আমার কাছে এসেছিলেন, যার বয়স প্রায় ৮০ বছর। তার নাম জিম গার্ডনার। তার হাতে একটা বই ছিল, যেটার নাম যে সত্য অনন্ত জীবনে লইয়া যায় আর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি কি বইটা নিতে চাও?” আমরা তখন বৃহস্পতিবার সকালে আমাদের প্রথম বাইবেল অধ্যয়নের জন্য সময় নির্ধারণ করি।

সেই একই দিনে অর্থাৎ রবিবার রাতের বেলা আমাকে কাজে যেতে হয়েছিল। আমি ফ্লোরিডার বোকা র্র্যাটনে একটা বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি করতাম আর সেখানে আমি জরুরি বিভাগে কাজ করতাম। আমি রাত ১১:০০টা থেকে সকাল ৭:০০টা পর্যন্ত কাজ করতাম। যেহেতু বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল, তাই আমি সত্য বইটা পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেইসময়ে একজন সিনিয়র পুরুষ নার্স সেখানে আসেন আর আমার হাত থেকে বইটা কেড়ে নিয়ে এটার প্রচ্ছদ দেখে চিৎকার করে বলেন, “তুমিও তাদের দলে যোগ দেবে নাকি?” আমি তার হাত থেকে সত্য বইটা নিয়ে নিই এবং বলি, “আমি বইটা মাত্র অর্ধেক পড়েছি, তবে মনে হচ্ছে আমি একজন যিহোবার সাক্ষি হয়েই যাব!” সেই নার্স তখন চলে যান আর আমি সেই রাতে বইটা পড়ে শেষ করি।

আমার বাইবেল শিক্ষক অভিষিক্ত ভাই জিম গার্ডনার, যিনি চার্লস টেজ রাসেলকে চিনতেন

প্রথম বার বাইবেল অধ্যয়ন করার সময় আমি ভাই গার্ডনারকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আমরা এখন কী অধ্যয়ন করব?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “তোমাকে যে-বইটা দিয়েছি, সেটা।” আমি বলেছিলাম, “আমি ইতিমধ্যেই বইটা পড়ে ফেলেছি।” ভাই গার্ডনার সদয়ভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, “তাহলে, আমরা প্রথম অধ্যায়টা একটু আলোচনা করি।” আমি যে কত কিছু বাদ দিয়েছি, তা দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তিনি আমার কিং জেমস্‌ ভারশন বাইবেলের  রেড-লেটার এডিশন (যিশুর উক্তিগুলো লাল অক্ষরে ছাপানো থাকে এমন সংস্করণ) থেকে আমাকে অনেক শাস্ত্রপদ দেখিয়েছিলেন। অবশেষে আমি সত্য ঈশ্বর যিহোবা সম্বন্ধে শিখতে পেরেছিলাম। ভাই গার্ডনারকে আমি বন্ধুর মতোই মনে করতাম আর তাকে জিম বলে ডাকতাম। সেই দিন সকালে আমরা তিনটে অধ্যায় আলোচনা করেছিলাম। এরপর থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার সকালে আমরা তিনটে করে অধ্যায় আলোচনা করতাম। অধ্যয়ন করতে আমার খুব ভালো লাগত। চার্লস টেজ রাসেলকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন, এমন একজন অভিষিক্ত ভাইয়ের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারা আমার জন্য কী এক বিশেষ সুযোগই-না ছিল!

কয়েক সপ্তাহ পর, আমাকে একজন সুসমাচার প্রকাশক হিসেবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। জিম আমাকে বিভিন্ন উদ্‌বিগ্নতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছিলেন, যেগুলোর মধ্যে ছিল ঘরে ঘরে প্রচার করার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। (প্রেরিত ২০:২০) জিম নিজে আমার সঙ্গে কাজ করতেন আর তাই আমি প্রচার কাজ উপভোগ করতে শুরু করেছিলাম। আমি এখনও প্রচার কাজকে সর্বমহৎ সুযোগ হিসেবে মনে করি। ঈশ্বরের সহকার্যকারী হতে পারা কতই-না আনন্দদায়ক!—১ করি. ৩:৯.

যিহোবা হলেন আমার প্রথম প্রেম

এখন আমি আপনাদের অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটা বিষয় জানাতে চাই। যিহোবা হলেন আমার প্রথম প্রেম। (প্রকা. ২:৪) যিহোবার প্রতি প্রেম আমাকে যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি ও অন্যান্য অনেক পরীক্ষার সঙ্গে মোকাবিলা করতে সাহায্য করেছে।—যিশা. ৬৫:১৭.

যিহোবার প্রতি প্রথম প্রেম আমাকে যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি ও অন্যান্য অনেক পরীক্ষার সঙ্গে মোকাবিলা করতে সাহায্য করেছে

আমি ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ইয়াংকি স্টেডিয়ামে “ঐশিক নাম” জেলা সম্মেলনে বাপ্তিস্ম নিই

১৯৭১ সালের বসন্ত কালের একটা বিশেষ দিনের কথা আমার মনে আছে। সম্প্রতি আমার বাবা-মা তাদের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে আমাকে বের করে দিয়েছেন। আমার সৎবাবা তার বাড়িতে কোনোভাবেই একজন সাক্ষিকে থাকতে দেবেন না! তখন আমার হাতে বেশি টাকা ছিল না। আমি যে-হাসপাতালে চাকরি করতাম, সেখানে দু-সপ্তাহ পর পর বেতন দেওয়া হতো আর আমি সেই টাকার বেশিরভাগই আমার কাপড়চোপড়ের পিছনে ব্যয় করে ফেলেছিলাম, যাতে পরিচর্যার সময় উপযুক্তভাবে যিহোবার প্রতিনিধিত্ব করতে পারি। আমার জমানো কিছু টাকা ছিল, তবে সেগুলো দেশের উত্তরাঞ্চলে  মিশিগানের একটা ব্যাঙ্কে জমা ছিল, যে-জায়গায় আমি বড়ো হয়েছি। তাই, কয়েক দিন আমাকে আমার গাড়িতেই রাত কাটাতে হয়েছিল। আমি গ্যাস-স্টেশনের টয়লেটে শেভিং ও অন্যান্য কাজ সারতাম।

সেই সময়েই একদিন, ক্ষেত্রের পরিচর্যা দলের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য আমি কয়েক ঘন্টা আগে কিংডম হলে পৌঁছে গিয়েছিলাম। আমি সবেমাত্র হাসপাতালে আমার কাজ শেষ করে সেখানে এসেছিলাম। দলের জন্য অপেক্ষা করার সময় আমার মনে ভিয়েতনামের স্মৃতি ভেসে ওঠে। আমি নরমাংসের পোড়া গন্ধ পেতে থাকি আর আমার চোখের সামনে রক্ত আর ক্ষতের মধ্যে জমাটবাঁধা রক্তের দৃশ্য ভেসে উঠতে থাকে। আমি স্পষ্টভাবে দেখতে পাই এবং শুনতে পাই যুবকরা আমার কাছে কাকুতিমিনতি করছে, “আমি কি বাঁচব? আমি কি বাঁচব?” আমি জানতাম তারা মারা যাবে, কিন্তু তারপরও আমি আমার চেহারায় সেটা গোপন করে তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার যথাসম্ভব চেষ্টা করেছিলাম। কিংডম হলের পিছনে সেই জায়গায় বসে আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম।

বিশেষভাবে পরীক্ষা ও সমস্যার সময়ে আমি যিহোবার প্রতি আমার প্রথম প্রেম পরিত্যাগ না করার জন্য যথাসাধ্য করে যাচ্ছি

আমি তখন প্রার্থনা করেছিলাম আর আমার দু-চোখ কান্নায় ভেসে যাচ্ছিল। (গীত. ৫৬:৮) আমি পুনরুত্থানের আশা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে শুরু করেছিলাম। আর তখনই এই বিষয়টা আমার মাথায় আসে: আমি যে-ব্যাপক হত্যাকাণ্ড দেখেছি এবং অন্যান্য ব্যক্তির মতো আমি যে-আবেগগত কষ্ট পেয়েছি, পুনরুত্থানের মাধ্যমে যিহোবা ঈশ্বর তা দূর করে দেবেন। ঈশ্বর সেই যুবকদের জীবন ফিরিয়ে দেবেন আর তারা তাঁর সম্বন্ধে সত্য জানার সুযোগ পাবে। (প্রেরিত ২৪:১৫) সেই সময়ে, আমার হৃদয় যিহোবার প্রতি গভীর ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সেই দিনটা আমার কাছে স্মরণীয় এক দিন। তখন থেকে, বিশেষভাবে পরীক্ষা ও সমস্যার সময়ে আমি যিহোবার প্রতি আমার প্রথম প্রেম পরিত্যাগ না করার জন্য যথাসাধ্য করে যাচ্ছি।

যিহোবা সবসময়ই আমার মঙ্গল করেছেন

যুদ্ধের সময় লোকেরা ভয়ানক সব কাজ করে থাকে। আমিও এর ব্যতিক্রম ছিলাম না। কিন্তু, আমার দুটো প্রিয় শাস্ত্রপদ নিয়ে ধ্যান করার মাধ্যমে আমি সাহায্য পেয়েছি। প্রথমটা হচ্ছে প্রকাশিত বাক্য ১২:১০, ১১ পদ, যেখানে বলা আছে, দিয়াবল কেবল আমাদের সাক্ষ্যের বাক্য প্রযুক্ত নয় কিন্তু সেইসঙ্গে মেষশাবকের রক্ত প্রযুক্ত নিপাতিত হয়েছে। দ্বিতীয়টা হচ্ছে গালাতীয় ২:২০ পদ। সেই পদ থেকে আমি বুঝতে পারি, খ্রিস্ট যিশু “আমার নিমিত্তে” মারা গিয়েছেন। যিশুর রক্তের মাধ্যমেই যিহোবা আমার প্রতি চিন্তা দেখান আর এর ভিত্তিতেই তিনি আমার কাজের জন্য আমাকে ক্ষমা করেছেন। এই বিষয়টা জানতে পেরে, আমি এক শুদ্ধ বিবেক লাভ করতে পেরেছি এবং আমাদের করুণাময় ঈশ্বর যিহোবা সম্বন্ধে অন্যদের সত্য জানতে সাহায্য করার জন্য যথাসাধ্য করতে অনুপ্রাণিত হয়েছি!—ইব্রীয় ৯:১৪.

অতীত জীবনের দিকে ফিরে তাকালে, আমি গভীরভাবে এটা উপলব্ধি করতে পারি, যিহোবা সবসময়ই আমার যত্ন নিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জিম যে-দিন জানতে পারেন, আমি আমার গাড়িতে রাত কাটাচ্ছি, সেই দিনই তিনি একজন বোনের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেন। সেই বোনের একটা গেস্ট হাউস ছিল। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, আমাকে একটা চমৎকার থাকার জায়গা জুগিয়ে দেওয়ার জন্য যিহোবাই জিম ও সেই প্রিয় বোনকে ব্যবহার করেছিলেন। যিহোবা খুবই সদয় ব্যক্তি! তিনি তাঁর বিশ্বস্ত উপাসকদের যত্ন নেন।

উদ্যোগ ও কৌশলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে শেখা

১৯৭১ সালের মে মাসে আমাকে একটা কাজের জন্য মিশিগানে যেতে হয়েছিল। ফ্লোরিডার ডেল্‌রে মণ্ডলী ছেড়ে যাওয়ার আগে, আমি আমার গাড়ির পিছনে মালপত্র রাখার জায়গায় সাহিত্যাদি বোঝাই করে নিই আর এরপর ৭৫ নম্বর আন্তঃরাজ্যীয় মহাসড়ক ধরে উত্তরে যাত্রা শুরু করি। কিন্তু, অর্ধেক পথ যাওয়ার আগেই আমার সাহিত্যাদি শেষ হয়ে যায়। পথে আমি সমস্ত জায়গায় উদ্যোগের সঙ্গে রাজ্যের সুসমাচার প্রচার করেছি। আমি বিভিন্ন কারাগারের সামনে থেমেছি, এমনকী বিভিন্ন বিশ্রামস্থলের টয়লেটের সামনে যে-পুরুষরা ছিল, তাদের কাছেও ট্র্যাক্ট বিতরণ করেছি। রোপিত সেই বীজগুলোর মধ্যে কোনোটা অঙ্কুরিত হয়েছে কি না, তা আমি এখনও ভাবি।—১ করি. ৩:৬, ৭.

তবে আমাকে এটা স্বীকার করতেই হবে, সত্য জানার পর প্রথমদিকে আমি খুব একটা কৌশলী ছিলাম না আর তা বিশেষভাবে আমার পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময়। যিহোবার প্রতি আমার প্রথম প্রেম আমাকে এতটাই উদ্দীপিত করেছিল যে, আমি সাহসের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রচার করতাম, তাদের মুখের উপর সব কিছু বলে দিতাম। আমার দাদা জন ও রনকে আমি খুব ভালোবাসতাম আর তাই জোর করেই তাদের কাছে সত্য সম্বন্ধে কথা বলতাম। আর এই  কারণে পরে আমাকে নিজের অসংযত আচরণের জন্য দুঃখপ্রকাশ করে ক্ষমা চাইতে হয়েছে। কিন্তু, তারা যেন সত্য গ্রহণ করে, আমি সেই বিষয়ে প্রার্থনা করা বন্ধ করিনি। তখন থেকে যিহোবা আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন আর আমি প্রচার করার ও শিক্ষা দেওয়ার সময় আরও কৌশলী হতে পেরেছি।—কল. ৪:৬.

আমার জীবনের অন্যান্য প্রেম

যিহোবার প্রতি প্রথম প্রেম স্মরণে রাখার সময়, আমি জীবনের অন্যান্য প্রেম ভুলে যাইনি। আমার জীবনের পরবর্তী প্রেম হচ্ছে আমার প্রিয় স্ত্রী সুজ্যান। আমি সবসময় এমন একজন সাথি চেয়েছি, যে রাজ্যের কাজ সম্পাদন করার ব্যাপারে আমাকে সহযোগিতা করবে। সুজ্যান একজন দৃঢ় আধ্যাত্মিকমনা নারী। বিয়ের আগে মেলামেশা করার সময়ের একটা দিনের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। সুজ্যান রোড আইল্যান্ডের ক্র্যানস্টনে তাদের বাড়ির সামনে বারান্দায় বসে ছিল। সে প্রহরীদুর্গ পত্রিকা পড়ছিল আর তার কাছে বাইবেল ছিল। যে-বিষয়টা আমাকে অবাক করেছিল তা হল, সে পত্রিকার একটা পার্শ্বপ্রবন্ধ পড়ছিল ও শাস্ত্রপদ মিলিয়ে দেখছিল। আমি ভেবেছিলাম, ‘খুবই আধ্যাত্মিকমনা এক মেয়ে!’ ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে আমরা বিয়ে করি আর আমি খুবই কৃতজ্ঞ কারণ সেই সময় থেকে সে আমার পাশে থেকে আমাকে সমর্থন করে যাচ্ছে। তার যে-বিষয়টা আমি সত্যিই উপলব্ধি করি তা হল, সে আমাকে ভালোবাসে ঠিকই, তবে সে যিহোবাকে আরও বেশি ভালোবাসে।

আমার স্ত্রী সুজ্যান এবং আমাদের ছেলে পল ও জেসি

সুজ্যান ও আমি, আমাদের দুই ছেলে জেসি ও পলকে পেয়ে অনেক আনন্দিত। তারা বেড়ে ওঠার সময় যিহোবা তাদের সঙ্গে সঙ্গে ছিলেন। (১ শমূ. ৩:১৯) সত্যকে নিজের করে নেওয়ার মাধ্যমে তারা আমাদের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে। তারা যিহোবাকে সেবা করে  যাচ্ছে কারণ তারা যিহোবার প্রতি তাদের প্রথম প্রেম স্মরণে রেখেছে। তারা দু-জনেই ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পূর্ণসময়ের পরিচর্যা করছে। এ ছাড়া, আমি সুন্দরী দুই পুত্রবধূ স্টেফানি ও রাকেলকে পেয়ে গর্বিত, যাদের আমি নিজের মেয়ের মতোই মনে করি। আমার দুই ছেলেই আধ্যাত্মিকমনা মেয়েদের বিয়ে করেছে, যারা মনপ্রাণ দিয়ে যিহোবাকে ভালোবাসে।—ইফি. ৬:৬.

আমরা পরিবারগতভাবে এমন এলাকায় প্রচার কাজ উপভোগ করতাম, যেখানে খুব একটা প্রচার করা হতো না

বাপ্তিস্মের পর ১৬ বছর ধরে আমি রোড আইল্যান্ডে সেবা করেছি আর অনেকের সঙ্গে চমৎকার বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছি। আমি যে-চমৎকার প্রাচীনদের সঙ্গে সেবা করেছি, তাদের সঙ্গে আমার দারুণ সব স্মৃতি রয়েছে। এ ছাড়া, আমি সেই ভ্রমণ অধ্যক্ষদের কাছে অনেক কৃতজ্ঞ, যারা আমার উপর উত্তম প্রভাববিস্তার করেছেন আর তাদের সংখ্যা এত বেশি যে, নাম গুণে শেষ করা যাবে না। যিহোবার প্রতি প্রথম প্রেম বজায় রেখেছেন এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করতে পারা কতই-না বিশেষ এক সুযোগ! ১৯৮৭ সালে আমরা যেখানে বেশি প্রয়োজন সেখানে সেবা করার জন্য উত্তর ক্যারোলাইনায় চলে গিয়েছিলাম আর সেখানেও আমরা চমৎকার বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছি। *

ভ্রমণ অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করার সময় ক্ষেত্রের পরিচর্যা সভা পরিচালনা করছি

২০০২ সালের আগস্ট মাসে, সুজ্যান ও আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্যাটারসন বেথেল পরিবারের সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করি। আমি পরিচর্যা বিভাগে কাজ করতাম আর সুজ্যান লন্ড্রি বিভাগে কাজ করত। সেই কাজ সে ভালোবাসত! ২০০৫ সালের আগস্ট মাসে আমাকে পরিচালকগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে সেবা করার বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আমি এই কার্যভার পাব, তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি। আমার প্রিয় স্ত্রী সেই দায়িত্ব, কাজ ও ভ্রমণের কথা চিন্তা করে উদ্‌বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। সুজ্যান প্লেনে ভ্রমণ করতে পছন্দ করে না, কিন্তু আমাদের প্লেনে চড়ে অনেক ভ্রমণ করতে হয়! সুজ্যান বলে, পরিচালকগোষ্ঠীর অন্যান্য সদস্যের স্ত্রীদের সদয় মন্তব্য তাকে সাহায্য করেছে, যাতে সে আমাকে যথাসম্ভব সমর্থন করতে পারে। আর নিশ্চিতভাবে সে তা করছে আর সেইজন্য আমি তাকে ভালোবাসি।

আমার অফিসের দেওয়ালে অনেক ছবি রয়েছে, যেগুলো আমার কাছে অনেক অর্থপূর্ণ! এগুলো আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, আমি কী দারুণ এক জীবন উপভোগ করেছি। যিহোবার প্রতি আমার প্রথম প্রেম স্মরণে রাখার জন্য যথাসাধ্য করে আমি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন চমৎকার পুরস্কার পেয়েছি!

আমি আমার পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে অনেক পছন্দ করি

^ অনু. 31 ভাই মরিসের পূর্ণসময়ের পরিচর্যা সম্বন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা ২০০৬ সালের ১৫ মার্চ প্রহরীদুর্গ পত্রিকার ২৬ পৃষ্ঠায় পাওয়া যাবে।