সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  মার্চ ২০১৫

পাঠক-পাঠিকাদের থেকে প্রশ্নসকল

পাঠক-পাঠিকাদের থেকে প্রশ্নসকল

অতীতে আমাদের প্রকাশনায় প্রায়ই কোনো বিষয়ের পূর্বাভাস ও এর পরিপূর্ণতা সম্বন্ধে উল্লেখ করা হতো, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা খুব-একটা দেখা যায় না। এর কারণ কী?

১৯৫০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রহরীদুর্গ (ইংরেজি) পত্রিকায় এটা ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, বাইবেলের কোনো ব্যক্তি, কোনো ঘটনা অথবা কোনো বস্তু মাঝে মাঝে ভবিষ্যতের আরও মহৎ কোনো কিছুকে চিত্রিত করে। অতীতে আমাদের প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছিল, দবোরা, ইলীহূ, যিপ্তহ, ইয়োব, রাহব, রিবিকা ও সেইসঙ্গে এইরকম অনেক বিশ্বস্ত নারী-পুরুষ, আসলে অভিষিক্ত ব্যক্তি অথবা ‘বিস্তর লোকের’ পূর্বাভাস বা ছায়া স্বরূপ ছিলেন। (প্রকা. ৭:৯) উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগে মনে করা হতো যিপ্তহ, ইয়োব ও রিবিকা অভিষিক্ত ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্ব করেন আর অন্যদিকে দবোরা ও রাহব বিস্তর লোককে প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের প্রকাশনায় আর এইরকম তুলনা করা হয় না। এর কারণ কী?

শাস্ত্র এটা ইঙ্গিত দেয়, বাইবেলে উল্লেখিত কয়েক জন ব্যক্তির মাধ্যমে আরও মহৎ কোনো কিছুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। গালাতীয় ৪:২১-৩১ পদে যেমন লিপিবদ্ধ রয়েছে, প্রেরিত পৌল এমন এক “রূপক” ঘটনা সম্বন্ধে উল্লেখ করেন, যেখানে দুটো নারী চরিত্র রয়েছে। হাগার, যিনি অব্রাহামের দাসী ছিলেন, তিনি আক্ষরিক ইস্রায়েল জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, যে-জাতি মোশির ব্যবস্থার মাধ্যমে যিহোবার অধীনে ছিল। কিন্তু সারা, যিনি ‘স্বাধীনা’ ছিলেন, তিনি ঈশ্বরের স্ত্রী বা তাঁর সংগঠনের স্বর্গীয় অংশকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। পৌল ইব্রীয়দের উদ্দেশে লেখা তার চিঠিতে, রাজা ও যাজক মল্কীষেদককে যিশুর সঙ্গে যুক্ত করেন, তাদের দু-জনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সাদৃশ্য তুলে ধরেন। (ইব্রীয় ৬:২০; ৭:১-৩) এ ছাড়া, পৌল যিশাইয় ও তার ছেলেদেরকে, যিশু এবং তাঁর অভিষিক্ত অনুসারীদের সঙ্গে তুলনা করেন। (ইব্রীয় ২:১৩, ১৪) পৌল ঈশ্বরের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এই বিষয়গুলো লিখেছিলেন; তাই, তিনি পূর্বাভাস হিসেবে যে-সমস্ত বিষয় বলেছিলেন, সেগুলো আমরা আনন্দের সঙ্গে মেনে নিই।

পূর্বাভাস

প্রাচীন ইস্রায়েলে নিস্তারপর্বের সময় যে-মেষশাবক বলিদান করা হতো, সেটা ছিল এক পূর্বাভাস—গণনা. ৯:২

পরিপূর্ণতা

পৌল খ্রিস্টকে “আমাদের নিস্তারপর্ব্বীয় মেষশাবক” হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন—১ করি. ৫:৭

কিন্তু বাইবেলে কোনো ব্যক্তির পূর্বাভাস হিসেবে যখন আরেকজন ব্যক্তির কথা বলা হয়, তখন আমাদের এইরকম সিদ্ধান্তে আসা উচিত নয় যে, সেই ব্যক্তির জীবনের খুঁটিনাটি প্রতিটা বিষয় অথবা ঘটনা আরও মহৎ কোনো কিছুকে চিত্রিত করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পৌল আমাদের জানান, মল্কীষেদক যিশুকে প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু, মল্কীষেদক যে একবার চার জন রাজাকে পরাজিত  করার পর অব্রাহামের জন্য রুটি ও দ্রাক্ষারস এনেছিলেন, সেই বিষয়ে পৌল কিছুই বলেননি। তাই, এই ঘটনার মধ্যে গুপ্ত অর্থ খোঁজার শাস্ত্রীয় কোনো ভিত্তি নেই।—আদি. ১৪:১, ১৮.

খ্রিস্টের মৃত্যুর শত শত বছর পর, কয়েক জন লেখক অযৌক্তিক চিন্তাভাবনা করতে শুরু করেছিলেন আর তা হল, তারা সব কিছুর মধ্যে পূর্বাভাস খুঁজতে শুরু করেছিলেন। ওরিজেন, অ্যামব্রোস ও জেরোমের শিক্ষা সম্বন্ধে বর্ণনা করে দি ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বাইবেল এনসাইক্লোপিডিয়া ব্যাখ্যা করে: “তারা শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ প্রতিটা বিষয় ও ঘটনার, তা সেটা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, সেটার মধ্যে পূর্বাভাস খোঁজার চেষ্টা করতেন আর নিশ্চিতভাবেই তা পেয়ে যেতেন। এমনকী অতি সামান্য ও সাধারণ কোনো ঘটনার মধ্যে অতি নিগূঢ় সত্য [গুপ্ত] রয়েছে বলে মনে করা হতো . . . , এমনকী পুনরুত্থিত ত্রাণকর্তা শিষ্যদের সামনে আবির্ভূত হওয়ার রাতে শিষ্যরা যে ১৫৩টা মাছ ধরেছিলেন, সেই সংখ্যার মধ্যেও কোনো পূর্বাভাস আছে কি না, তা খোঁজার জন্য কেউ কেউ কতই-না প্রচেষ্টা করেছেন!”

হিপ্পোর অগাস্টিন বাইবেলের সেই বিবরণ সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে মন্তব্য করেছিলেন, যেখানে আমরা পড়ি, যিশু যবের পাঁচটা রুটি ও দুটো মাছ দিয়ে প্রায় ৫,০০০ পুরুষকে খাইয়েছিলেন। যেহেতু যবকে গম থেকে নিকৃষ্টমানের শস্য বলে মনে করা হতো, তাই অগাস্টিন এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, পাঁচটা রুটি নিশ্চয়ই মোশির পাঁচটা পুস্তককে চিত্রিত করে (নিকৃষ্ট শস্য যব, “পুরাতন নিয়ম”-এর তথাকথিত নগণ্যতাকে চিত্রিত করে)। আর দুটো মাছ কোন বিষয়কে চিত্রিত করে? কয়েকটা কারণে তিনি সেগুলোকে একজন রাজা ও একজন যাজকের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এ ছাড়া, আরেকজন পণ্ডিত ব্যক্তি আবার এক বাটি রাঙা বা লাল ডালের বিনিময়ে যাকোব যে এষৌর জ্যেষ্ঠাধিকার ক্রয় করেছিলেন, সেই বিষয়টার সঙ্গে যিশুর লাল রক্তের মাধ্যমে মানবজাতির জন্য স্বর্গীয় উত্তরাধিকার ক্রয় করার বিষয়টার মিল খোঁজার ব্যাপারে উৎসুক ছিলেন!

এইসমস্ত ব্যাখ্যা যদি আপনার কাছে অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়, তাহলে আপনি নিশ্চয়ই সমস্যাটা বুঝতে পারছেন। বাইবেলের কোন বিবরণগুলো আসন্ন বিষয়ের ছায়া স্বরূপ আর কোনগুলো নয়, মানুষ তা জানতে পারে না। সবচেয়ে ভালো কাজ হল: শাস্ত্র যখন শিক্ষা দেয় যে, কোনো ব্যক্তি, ঘটনা অথবা বস্তু অন্য কারো অথবা অন্য কোনো কিছুর পূর্বাভাস স্বরূপ, তখন আমরা যেন সেটা মেনে নিই। অন্যদিকে, যদি সুনির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় ভিত্তি না থাকে, তাহলে কোনো ব্যক্তি অথবা ঘটনা যে আগে উল্লেখিত অন্য কোনো কিছুর পরিপূর্ণতা, এমন ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত নয়।

তাহলে, কীভাবে আমরা শাস্ত্রে উল্লেখিত ঘটনা এবং উদাহরণগুলো থেকে উপকৃত হতে পারি? রোমীয় ১৫:৪ পদে আমরা এই কথাগুলো পড়ি: “পূর্ব্বকালে যাহা যাহা লিখিত হইয়াছিল, সে সকল আমাদের শিক্ষার নিমিত্তে লিখিত হইয়াছিল, যেন শাস্ত্রমূলক ধৈর্য্য ও সান্ত্বনা দ্বারা আমরা প্রত্যাশা প্রাপ্ত হই।” পৌল এখানে বলতে চেয়েছিলেন, প্রথম শতাব্দীতে তার অভিষিক্ত ভাইয়েরা শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ ঘটনাগুলো থেকে জোরালো শিক্ষা লাভ করতে পারতেন। কিন্তু, ঈশ্বরের দাসদের প্রত্যেক প্রজন্ম—তা তারা অভিষিক্ত ব্যক্তি হোক কিংবা “আরও মেষ” হোক, “শেষ কালে” বাস করুক কিংবা না-ই করুক—তারা “পূর্ব্বকালে যাহা যাহা লিখিত হইয়াছিল, সে সকল” শিক্ষা থেকে উপকৃত হতে পারে আর তারা উপকৃত হয়েছে।—যোহন ১০:১৬; ২ তীম. ৩:১.

তাই, আমাদের এমনটা চিন্তা করা উচিত নয়, বাইবেলের অধিকাংশ বিবরণ হয় অভিষিক্ত ব্যক্তি নতুবা বিস্তর লোকের প্রতি, কোনো একটা শ্রেণির প্রতি কিংবা শুধু একটা সময়কালের প্রতি প্রযোজ্য। বরং, এই বিবরণগুলো আমাদের যা শিক্ষা দেয়, তা ঈশ্বরের লোকেদের যেকোনো শ্রেণির ও যেকোনো সময়কালের ব্যক্তিরা নিজেদের প্রতি প্রয়োগ করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইয়োবের বিবরণ যে কেবল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অভিষিক্ত ব্যক্তিদের কষ্টের অভিজ্ঞতাকেই চিত্রিত করে, আমরা এমনটা চিন্তা করব না। ঈশ্বরের অনেক দাস, যাদের মধ্যে নারী-পুরুষ, অভিষিক্ত ব্যক্তি ও বিস্তর লোক সকলেই রয়েছে, তারা ইয়োবের মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে এবং ‘প্রভুর [ঈশ্বরের] পরিণামও দেখিয়াছে’ আর তিনি যে “স্নেহপূর্ণ ও দয়াময়,” তা উপলব্ধি করেছে।—যাকোব ৫:১১.

এই বিষয়টা বিবেচনা করুন: বর্তমানে আমাদের মণ্ডলীতে আমরা কি দবোরার মতো অনুগত বয়স্ক নারীদের, ইলীহূর মতো বিজ্ঞ কমবয়সি প্রাচীনদের, যিপ্তহের মতো উদ্যোগী নির্ভীক অগ্রগামীদের এবং ইয়োবের মতো ধৈর্যশীল বিশ্বস্ত নারী-পুরুষদের দেখতে পাই না? আমরা “যেন শাস্ত্রমূলক ধৈর্য্য ও সান্ত্বনা দ্বারা . . . প্রত্যাশা প্রাপ্ত হই,” সেইজন্য যিহোবা “পূর্ব্বকালে যাহা যাহা লিখিত হইয়াছিল, সে সকল” সংরক্ষণ করে রেখেছেন। এই কারণে আমরা কতই-না কৃতজ্ঞ!

তাই, এইসমস্ত কারণে আমাদের প্রকাশনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন পূর্বাভাস ও সেগুলোর পরিপূর্ণতার উদাহরণ খোঁজার চেষ্টা করার পরিবর্তে বাইবেলের বিবরণগুলো থেকে আমরা যা শিখতে পারি, সেগুলোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে।