সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  ডিসেম্বর ২০১৪

আপনার কি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা উচিত?

আপনার কি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা উচিত?

একদল অল্পবয়সি সাক্ষি একটা সিনেমা দেখার সিদ্ধান্ত নেয়। স্কুলে সবাই বলাবলি করছে যে, সেটা খুবই ভালো একটা সিনেমা। তারা যখন সিনেমা হলে গিয়ে এর পোস্টার দেখে, তখন সেখানে তারা ভয়ানক অস্ত্রশস্ত্র এবং অশালীন পোশাক পরিহিত মহিলাদের ছবি দেখতে পায়। এখন সেই অল্পবয়সি সাক্ষিরা কী করবে? তারা কি ভিতরে গিয়ে সিনেমাটা দেখবে?

প্রতিদিন আমাদের এমন অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যেগুলো যিহোবার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে হয় আরও শক্তিশালী করতে নতুবা দুর্বল করে দিতে পারে। আপনি হয়তো কিছু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিন্তু বিষয়টা নিয়ে আপনি যখন আরও চিন্তা করেন, তখন আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে অন্য কিছু করার পরিকল্পনা করেন। এর অর্থ কি এই যে, আপনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অপারদর্শী, নাকি আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?

যখন আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা উচিত নয়

আমরা যিহোবাকে এতটাই ভালোবাসি যে, আমরা তাঁর কাছে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছি এবং বাপ্তিস্ম নিয়েছি। আমরা তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থাকার প্রতিজ্ঞা করেছি এবং আমরা সত্যিই সেই প্রতিজ্ঞা রাখতে চাই। কিন্তু, আমাদের বিশ্বস্ততাকে নষ্ট করার জন্য আমাদের শত্রু শয়তান দিয়াবল যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। (প্রকা. ১২:১৭) আমরা যিহোবাকে সেবা করার এবং তাঁর প্রতি বাধ্য থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা যদি আমাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করি, তাহলে আমরা নিজেদের জীবন হারাতে পারি।

২,৬০০ বছরেরও বেশি আগে, বাবিলীয় রাজা নবূখদ্‌নিৎসর এক বিরাট সোনার প্রতিমা নির্মাণ করে প্রত্যেককে সেটার উপাসনা করার আজ্ঞা দেন। কোনো ব্যক্তি যদি সেই আজ্ঞা অমান্য করেন, তাহলে তাকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হবে। শদ্রক, মৈশক এবং অবেদ্‌-নগো নামে তিন জন যুবক যিহোবার সেবা করতেন এবং তারা তাঁকে অসন্তুষ্ট করতে চাননি। তাই, তারা রাজার আজ্ঞা অমান্য করেন আর এর ফলে রাজা তাদেরকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেন। যিহোবা একটা অলৌকিক কাজ করার মাধ্যমে তাদের জীবন রক্ষা করেন। তারা ঈশ্বরের অবাধ্য হওয়ার চেয়ে বরং মরতে ইচ্ছুক ছিলেন।—দানি. ৩:১-২৭.

 পরবর্তী সময়ে, ভাববাদী দানিয়েল জানতে পারেন যে, অন্যেরা যদি তাকে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে দেখে, তাহলে তাকে সিংহের খাদে নিক্ষেপ করা হবে এবং তিনি ভয়ানক মৃত্যুভোগ করবেন। তা সত্ত্বেও, তিনি দিনে তিন বার প্রার্থনা করা চালিয়ে যান। তিনি সত্যময় ঈশ্বরের উপাসনা করার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেননি এবং ফল স্বরূপ যিহোবা তাকে “সিংহদের হস্ত হইতে” রক্ষা করেন।—দানি. ৬:১-২৭.

বর্তমানেও, ঈশ্বরের দাসেরা যখন যিহোবার কাছে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে, তখন তারা তাঁর কাছে যে-প্রতিজ্ঞা করে, তা পূরণ করে থাকে। আফ্রিকায় একদল অল্পবয়সি সাক্ষি স্কুলের এক অনুষ্ঠানে একটা জাতীয় প্রতীককে স্যালুট করতে প্রত্যাখ্যান করে আর এর ফলে তাদেরকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পরে সেখানকার শিক্ষামন্ত্রী সেই অল্পবয়সি সাক্ষিদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা ভয় না পেয়ে বরং নম্রভাবে ব্যাখ্যা করে যে, কেন তারা স্যালুট না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপর আর কখনো এই বিষয়টা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়নি। তাদের এখন আর স্কুলে গিয়ে যিহোবার অবাধ্য হওয়ার এই চাপ নেই।

জোসেফ নামে একজন ভাই পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন, যখন তার স্ত্রী হঠাৎ করে মারা যান। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা সম্বন্ধে জোসেফের পরিবার তার ইচ্ছাকে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু, তার স্ত্রীর পরিবার সত্যে না থাকায়, তারা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বিভিন্ন রীতিনীতি পালন করতে চেয়েছিল, যেগুলো ঈশ্বরকে অসন্তুষ্ট করে। জোসেফ বলেন: “আমি যখন তাদের ইচ্ছা মানতে প্রত্যাখ্যান করি, তখন তারা আমার ছেলে-মেয়েদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল; কিন্তু আমার ছেলে-মেয়েরা দৃঢ় ছিল। এ ছাড়া, আত্মীয়স্বজনরা তাদের রীতিনীতি অনুযায়ী আমার বাড়িতে মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে একটা অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি তাদেরকে বলেছিলাম যে, তারা আমার বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান করতে পারবে না। তারা বুঝেছিল যে, আমার এবং আমার স্ত্রীর বিশ্বাসের সঙ্গে এই অনুষ্ঠান সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না, তাই অনেক আলোচনার পর তারা অন্য এক জায়গায়, সেই অনুষ্ঠান করে।

“এই চরম দুঃখের সময়ে, আমি যিহোবার কাছে সাহায্য চেয়ে বিনতি করি, যাতে আমার পরিবার তাঁর আইনগুলো লঙ্ঘন না করে। তিনি আমার প্রার্থনা শোনেন এবং চাপের মধ্যেও আমাদের দৃঢ় থাকতে সাহায্য করেন।” জোসেফ এবং তার ছেলে-মেয়েরা যিহোবার বাধ্য থাকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার কথা এমনকী কখনো চিন্তাও করেনি।

যখন আপনার সিদ্ধান্ত হয়তো পরিবর্তন করা উচিত

৩২ খ্রিস্টাব্দে, একজন ন-ইস্রায়েলীয় মহিলা যিশুকে অনুরোধ করেন, যাতে তিনি তার মেয়ের মধ্যে থেকে মন্দ আত্মা বের করে দেন। সেই মহিলা অনেক বার অনুরোধ করার সত্ত্বেও, যিশু তাকে কোনো উত্তর দেননি। তিনি তাঁর শিষ্যদের বলেন: “ইস্রায়েল-কুলের হারান মেষ ছাড়া আর কাহারও নিকটে আমি প্রেরিত হই নাই।” সেই মহিলা যখন অনুরোধ করেই চলেন, তখন যিশু তাকে বলেন: “সন্তানদের খাদ্য লইয়া কুকুরদের কাছে ফেলিয়া দেওয়া ভাল নয়।” কিন্তু, এই কথা বলার দ্বারা সেই মহিলা দেখান যে, তার প্রচুর বিশ্বাস রয়েছে: “হাঁ, প্রভু, কেননা কুকুরেরাও আপন আপন কর্ত্তাদের মেজ হইতে যে গুঁড়াগাঁড়া পড়ে, তাহা খায়।” যিশু তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এবং সেই মহিলার মেয়ের মধ্যে থেকে মন্দ আত্মা বের করে দেন।—মথি ১৫:২১-২৮.

যখন উপযুক্ত, তখন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে ইচ্ছুক হওয়ার মাধ্যমে যিশু যিহোবাকে অনুকরণ করেছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ, ইস্রায়েলীয়রা যখন একটা সোনার বাছুরকে উপাসনা করার মাধ্যমে যিহোবার অবাধ্য হয়, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা মৃত্যুর যোগ্য। কিন্তু, মোশি যখন তাদের মেরে না ফেলার বিষয়ে তাঁকে অনুরোধ করেন, তখন যিহোবা তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে ইচ্ছুক হন।—যাত্রা. ৩২:৭-১৪.

যিহোবা এবং যিশুর মতো প্রেরিত পৌলও তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে ইচ্ছুক ছিলেন। তার প্রথম মিশনারি যাত্রার সময়, মার্ক তাকে ছেড়ে চলে যান। এই কারণে পৌল আর কোনো যাত্রায় মার্ককে নিয়ে যেতে চাননি। কিন্তু পরে পৌল হয়তো লক্ষ করেন যে, মার্ক পরিপক্ক হয়ে উঠেছেন এবং বেশ কার্যকারী হতে পারেন। তাই, পৌল তীমথিয়কে বলেছিলেন: “তুমি মার্ককে সঙ্গে করিয়া আইস, কেননা তিনি পরিচর্য্যা বিষয়ে আমার বড় উপকারী।”—২ তীম. ৪:১১.

এই উদাহরণগুলো থেকে আমরা কী শিখতে পারি? যদিও যিহোবা সিদ্ধ, তবুও তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে ইচ্ছুক কারণ তিনি করুণাময়, ধৈর্যশীল এবং প্রেমময়।  আমরা সিদ্ধ নই আর সবসময় বিভিন্ন বিষয়কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার ক্ষমতা আমাদের নেই। তাই, কখনো কখনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার এমনকী আরও বেশি কারণ আমাদের রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, আমরা যখন অন্যদের পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি, তখন হয়তো তাদের সম্বন্ধে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করতে পারি।

মাঝে মাঝে আমাদের হয়তো ঈশতান্ত্রিক লক্ষ্যগুলো সম্বন্ধে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। আমরা হয়তো বাইবেল অধ্যয়ন করি এবং সভাগুলোতে যাই কিন্তু বাপ্তিস্ম নিতে দেরি করছি। কিংবা আমরা হয়তো অগ্রগামীর কাজ করতে সমর্থ কিন্তু তা শুরু করতে ইতস্তত করছি। একজন ভাই হয়তো যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মণ্ডলীতে পরিচালক দাস অথবা প্রাচীন হিসেবে সেবা করতে ইচ্ছুক নন। (১ তীম. ৩:১) আপনার কি কখনো একইরকম অনুভূতি হয়েছে? আপনি কি আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন? যিহোবা আপনাকে এই সুযোগগুলো উপভোগ করতে এবং ঈশ্বরের ও অন্যদের সেবা করে আনন্দিত থাকতে আমন্ত্রণ জানান।

আপনি যদি আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন, তাহলে তা হয়তো আপনার জন্য আশীর্বাদ নিয়ে আসতে পারে

এলা নামের আফ্রিকার একজন বেথেল কর্মী বলেন: “প্রথম বেথেলে আসার পর আমি বুঝতে পারিনি যে, আমি সেখানে বেশি দিন থাকতে পারব কি না। যিহোবাকে পূর্ণহৃদয়ে সেবা করার আকাঙ্ক্ষা আমার ছিল কিন্তু পরিবারের জন্যও আমার খুব মন খারাপ লাগত। প্রথম প্রথম, তাদের কথা আমার খুব মনে পড়ত! কিন্তু, যার সঙ্গে আমি একই রুমে থাকতাম, তিনি আমাকে উৎসাহিত করেছিলেন আর তাই আমি বেথেলে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। বেথেলে দশ বছর কাটানোর পর, আমার এখন এইরকম অনুভূতি রয়েছে যে, বেথেলের কার্যভারে থাকার মাধ্যমে যতদিন সম্ভব আমি আমার ভাই-বোনদের সেবা করে যেতে চাই।”

যখন আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা আবশ্যক

এ ছাড়া, এমন সময়ও রয়েছে, যখন আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা আবশ্যক। উদাহরণ স্বরূপ, কয়িন তার ভাইয়ের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে ‘অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়াছিলেন।’  ঈশ্বর দেখেন যে, কয়িন মন্দ কিছু করতে যাচ্ছেন আর তাই তাকে তার রাগ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সাবধান করেন। ঈশ্বর বলেছিলেন, পাপ “দ্বারে গুঁড়ি মারিয়া রহিয়াছে।” কিন্তু, নিজের সিদ্ধান্ত এবং মনোভাব পরিবর্তন করার পরিবর্তে, কয়িন ঈশ্বরের সাবধানবাণী উপেক্ষা করেন। আর এর দুঃখজনক ফল হল, কয়িন তার ভাইকে হত্যা করেন!—আদি. ৪:২-৮.

কয়িন যদি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতেন, তাহলে কী হতো?

এ ছাড়া, রাজা উষিয়ের উদাহরণ থেকেও আমরা শিখতে পারি। প্রথমে, তিনি বাধ্য ছিলেন এবং যিহোবার সঙ্গে তার এক উত্তম সম্পর্ক ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, তিনি অনেক গর্বিত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ধূপ জ্বালানোর জন্য মন্দিরে প্রবেশ করেন, যদিও কেবল যাজকদের তা করার অনুমতি ছিল। যাজকরা তাকে তা না করার জন্য সাবধান করে দেন কিন্তু তিনি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেননি। উষিয় ‘কোপান্বিত হন’ এবং তাদের সাবধানবাণী উপেক্ষা করেন। তাই, যিহোবা তাকে কুষ্ঠরোগ দিয়ে আঘাত করেন।—২ বংশা. ২৬:৩-৫, ১৬-২০.

আধুনিক দিনের একটা উদাহরণ হল জোয়াকিম, যাকে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়েছিল। তিনি ১৯৫৫ সালে বাপ্তিস্ম নেন কিন্তু ১৯৭৮ সালে তাকে সমাজচ্যুত করা হয়। ২০ বছরেরও বেশি সময় পরে তিনি তার মনোভাব পরিবর্তন করেন, অনুতপ্ত হন এবং সত্যে ফিরে আসেন। একজন প্রাচীন যখন তাকে জিজ্ঞেস করেন যে, কেন তিনি ফিরে আসতে এতটা সময় নিয়েছেন, তখন জোয়াকিম বলেন: “আমি রাগ পুষে রেখেছিলাম এবং গর্বিত হয়ে পড়েছিলাম। এত দীর্ঘ সময় ধরে দেরি করেছি বলে আমি আক্ষেপ করি। সমাজচ্যুত হওয়া সত্ত্বেও, আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, যিহোবার সাক্ষিরাই সত্য সম্বন্ধে শিক্ষা দিয়ে থাকে।”

কখনো কখনো আমাদেরও হয়তো নিজেদের সিদ্ধান্ত এবং কাজ পরিবর্তন করতে হবে। আমরা যখন তা করার জন্য ইচ্ছুক থাকব, তখন যিহোবা আমাদের প্রতি খুশি হবেন।—গীত. ৩৪:৮.