সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  নভেম্বর ২০১৪

“সেই জাতি, সদাপ্রভু যাহার ঈশ্বর”

“সেই জাতি, সদাপ্রভু যাহার ঈশ্বর”

“ধন্য সেই জাতি, সদাপ্রভু যাহার ঈশ্বর।” —গীত. ১৪৪:১৫.

১. ঈশ্বরের উপাসনা করে এমন লোকেদের সম্বন্ধে কেউ কেউ কী মনে করে?

বর্তমানে অনেকে বলে, জগতের প্রধান ধর্মগুলো মানবজাতিকে সাহায্য করার জন্য সামান্যই কাজ করে থাকে। কেউ কেউ মনে করে, ঈশ্বর এই ধর্মগুলো অনুমোদন করেন না কারণ এসব ধর্ম ঈশ্বর সম্বন্ধে সত্য শিক্ষা দেয় না এবং বিভিন্ন ভয়াবহ কাজ করে থাকে। তারপরও, তারা এটা বিশ্বাস করে, ঈশ্বর সমস্ত ধর্মের মধ্য থেকে ভালো লোকেদের গ্রহণ করেন। কিন্তু, এটা কি সত্য? না কি, ঈশ্বর চান যেন তাঁর উপাসনা করে এমন ব্যক্তিরা মিথ্যা ধর্মগুলো থেকে পৃথক হবে? ইতিহাসজুড়ে যিহোবার সত্য উপাসকদের সম্বন্ধে বাইবেল যা বলে, তা পরীক্ষা করার মাধ্যমে আসুন আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করি।

ঈশ্বর তাঁর লোকেদের সঙ্গে চুক্তি করেন

২. কারা যিহোবার লোক হয়ে উঠেছিল আর কোন ব্যবস্থা তাদেরকে এমন লোক হিসেবে শনাক্ত করেছিল, যাদের যিহোবার সঙ্গে এক বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে? (শুরুতে দেওয়া ছবিটা দেখুন।)

প্রায় ৪,০০০ বছর আগে, যিহোবা একটা দলকে মনোনীত করেছিলেন, যারা পৃথিবীতে তাঁর লোক হবে। বাইবেলে অব্রাহামকে “যাহারা বিশ্বাস করে, . . . তাহাদের সকলের পিতা” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং তিনি এক  বিরাট পরিবারের নেতা ছিলেন, যাদের মধ্যে শত শত দাস-দাসী ছিল। (রোমীয় ৪:১১; আদি. ১৪:১৪) কনানে তাকে “রাজাস্বরূপ” সম্মান করা হতো। (আদি. ২১:২২; ২৩:৬) যিহোবা অব্রাহাম ও তার বংশধরদের সঙ্গে একটা নিয়ম বা চুক্তি করেছিলেন। (আদি. ১৭:১, ২, ১৯;) ঈশ্বর অব্রাহামকে বলেছিলেন: “তোমাদের সহিত ও তোমার ভাবী বংশের সহিত কৃত আমার যে নিয়ম তোমরা পালন করিবে, তাহা এই, তোমাদের প্রত্যেক পুরুষের ত্বক্‌ছেদ হইবে।” তিনি আরও বলেন: “তাহাই তোমাদের সহিত আমার নিয়মের চিহ্ন হইবে।” (আদি. ১৭:১০, ১১) তাই, অব্রাহাম ও তার পরিবারের সমস্ত পুরুষের ত্বকচ্ছেদ করা হয়েছিল। (আদি. ১৭:২৪-২৭) ত্বকচ্ছেদ করার ব্যবস্থা অব্রাহামের বংশধরদের এমন লোক হিসেবে শনাক্ত করেছিল, যাদের যিহোবার সঙ্গে এক বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।

৩. কীভাবে অব্রাহামের বংশধরেরা এক জাতি হয়ে উঠেছিল?

অব্রাহামের নাতি যাকোবের অর্থাৎ ইস্রায়েলের ১২ জন ছেলে ছিল। (আদি. ৩৫:১০, ২২খ-২৬) পরে, এই ছেলেরা ইস্রায়েলের ১২ বংশের পিতা হয়েছিল। (প্রেরিত ৭:৮) যাকোবের ছেলে যোষেফকে মিশরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আর ফরৌণ পরে তাকে অনেক ক্ষমতা প্রদান করেছিলেন। একটা দুর্ভিক্ষের সময়ে, যোষেফকে পুরো দেশের খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই দুর্ভিক্ষের কারণে যাকোব ও তার পরিবার মিশরে চলে এসেছিল। (আদি. ৪১:৩৯-৪১; ৪২:৬) যাকোবের বংশধরদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল আর তাদেরকে “জাতিসমাজ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।—আদি. ৪৮:৪; পড়ুন, প্রেরিত ৭:১৭.

যিহোবা তাঁর লোকেদের উদ্ধার করেন

৪. শুরুতে মিশরীয়দের ও যাকোবের বংশধরদের মধ্যে কেমন সম্পর্ক ছিল?

যাকোবের বংশধরেরা মিশরের গোশন নামক প্রদেশে ২০০ বছরেরও বেশি সময় বাস করেছিল। (আদি. ৪৫:৯, ১০) ফরৌণ যেহেতু যোষেফকে জানতেন এবং তাকে সম্মান করতেন, তাই তিনি ইস্রায়েলীয়দের মিশরে বাস করার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। (আদি. ৪৭:১-৬) প্রায় ১০০ বছর ধরে তারা মিশরীয়দের সঙ্গে শান্তিতে ছিল। ইস্রায়েলীয়রা ছোটো ছোটো নগরে বাস করত এবং পশুপালন করত। যদিও মিশরীয়রা পশুপালকদের ঘৃণা করত, কিন্তু তাদেরকে ফরৌণের কথার বাধ্য হয়ে ইস্রায়েলীয়দেরকে সেখানে থাকার সুযোগ দিতে হয়েছিল।—আদি. ৪৬:৩১-৩৪.

৫, ৬. (ক) কীভাবে মিশরে ঈশ্বরের লোকেদের পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল? (খ) কেন মোশিকে হত্যা করা হয়নি আর যিহোবা তাঁর লোকেদের জন্য কী করেছিলেন?

এর অল্পসময় পরে, মিশরীয়রা ইস্রায়েলীয়দের তাদের দাস করে। বাইবেল বলে: “পরে মিসরের উপরে এক নূতন রাজা উঠিলেন, তিনি যোষেফকে জানিতেন না। তিনি আপন প্রজাদিগকে কহিলেন, দেখ, আমাদের অপেক্ষা ইস্রায়েল-সন্তানদের জাতি বহুসংখ্যক ও বলবান্‌।” তাই, মিশরীয়রা তাদের দাস হিসেবে ইস্রায়েলীয়দের দিয়ে জোর করে ইট তৈরি, ক্ষেত্রের দেখাশোনা ও অন্যান্য কঠিন কাজ করিয়েছিল। তারা ইস্রায়েলীয়দের সঙ্গে নির্দয় আচরণ করত।—যাত্রা. ১:৮, ৯, ১৩, ১৪.

সেই নতুন ফরৌণ এই আজ্ঞাও দিয়েছিলেন, যেন ইস্রায়েলীয়দের সমস্ত পুত্রসন্তানকে জন্মের সঙ্গেসঙ্গে হত্যা করা হয়। (যাত্রা. ১:১৫, ১৬) সেই সময়ে, যোকেবদ নামে একজন ইস্রায়েলীয় নারী মোশিকে জন্ম দিয়েছিলেন। মোশির বয়স যখন তিন মাস, তখন তিনি তাকে নীল নদের তীরে নলবনে লুকিয়ে রেখেছিলেন। অল্পসময়ের মধ্যে ফরৌণের মেয়ে মোশিকে খুঁজে পেয়েছিলেন এবং তাকে দত্তক নিয়েছিলেন। তিনি মোশির যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব মোশির মাকেই দিয়েছিলেন। পরে, মোশি যিহোবার একজন অনুগত দাস হয়েছিলেন। (যাত্রা. ২:১-১০; ইব্রীয় ১১:২৩-২৫) যিহোবা তাঁর লোকেদের কষ্টভোগ করতে দেখেছিলেন এবং তাদেরকে মিশর থেকে বের করে আনার জন্য মোশিকে তাদের নেতা হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। (যাত্রা. ২:২৪, ২৫; ৩:৯, ১০) এভাবে, যিহোবা ইস্রায়েলীয়দের “মুক্ত” বা উদ্ধার ‘করিয়াছিলেন।’—যাত্রা. ১৫:১৩; পড়ুন, দ্বিতীয় বিবরণ ১৫:১৫.

 ঈশ্বরের লোকেরা এক জাতি হয়ে ওঠে

৭, ৮. কীভাবে যিহোবার লোকেরা এক পবিত্র জাতি হয়ে উঠেছিল?

যদিও যিহোবা তখনও পর্যন্ত আইনকানুন ও যাজকবর্গ দিয়ে ইস্রায়েলীয়দের একটা জাতি হিসেবে সুসংগঠিত করেননি, তবে তিনি তাদেরকে তাঁর লোক হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। এই কারণে মোশি ও হারোণকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন তারা ফরৌণকে এই কথা বলে: “সদাপ্রভু ইস্রায়েলের ঈশ্বর, এই কথা কহেন, প্রান্তরে আমার উদ্দেশে উৎসব করণার্থে আমার প্রজাদিগকে ছাড়িয়া দেও।”—যাত্রা. ৫:১.

কিন্তু, ফরৌণ ইস্রায়েলীয়দের ছেড়ে দিতে চাননি। যিহোবা তাঁর লোকেদের মুক্ত করার জন্য প্রথমে মিশরের ওপর দশটা আঘাত এনেছিলেন আর এরপর ফরৌণ ও তার সেনাবাহিনীকে সূফসাগরে ধবংস করেছিলেন। (যাত্রা. ১৫:১-৪) তারপর, তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে যিহোবা সীনয় পর্বতে ইস্রায়েলীয়দের সঙ্গে একটা চুক্তি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: “যদি তোমরা আমার রবে অবধান কর ও আমার নিয়ম পালন কর, তবে তোমরা সকল জাতি অপেক্ষা আমার নিজস্ব অধিকার হইবে।” তারা “পবিত্র এক জাতি” হবে।—যাত্রা. ১৯:৫, ৬.

৯, ১০. (ক) দ্বিতীয় বিবরণ ৪:৫-৮ পদে যেমন ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কীভাবে ব্যবস্থা ইস্রায়েলীয়দের অন্যান্য জাতি থেকে আলাদা করেছিল? (খ) ইস্রায়েলীয়রা যে “সদাপ্রভুর উদ্দেশে পবিত্র প্রজা,” তা প্রকাশ করার জন্য তাদের কী করতে হয়েছিল?

শত শত বছর ধরে, যিহোবার দাসেরা পিতৃকুলপতিদের নেতৃত্বের অধীনে ছিল, যারা শাসক, বিচারক ও যাজক হিসেবে সেবা করেছে। মিশরে দাস হওয়ার আগে, ইস্রায়েলীয়রা নেতৃত্বের এই পদ্ধতি অনুসরণ করত। (আদি. ৮:২০; ১৮:১৯; ইয়োব ১:৪, ৫) কিন্তু, ইস্রায়েলীয়দেরকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করার পর যিহোবা তাদেরকে এমন আইনকানুন দিয়েছিলেন, যেগুলো তাদেরকে অন্য সমস্ত জাতি থেকে আলাদা করেছিল। (পড়ুন, দ্বিতীয় বিবরণ ৪:৫-৮; গীত. ১৪৭:১৯, ২০) ব্যবস্থা অনুযায়ী একটা পৃথক দলকে সেই জাতির যাজক করা হয়েছিল। ব্যবস্থায় এটাও বলা হয়েছিল, যে-‘প্রাচীনবর্গ’ তাদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার জন্য সম্মানিত ছিল, তারা বিচারক হবে। (দ্বিতীয়. ২৫:৭, ৮) ব্যবস্থা লোকেদেরকে তাদের উপাসনাপদ্ধতি ও তাদের রোজকার জীবনযাপন সম্বন্ধে নির্দেশনা দিয়েছিল।

১০ ইস্রায়েলীয়রা প্রতিজ্ঞাত দেশে প্রবেশ করার ঠিক আগে, যিহোবা পুনরায় তাঁর আইনগুলো তাদের কাছে তুলে ধরেছিলেন। মোশি তাদের বলেছিলেন: “অদ্য সদাপ্রভুও এই অঙ্গীকার করিয়াছেন যে, তাঁহার প্রতিজ্ঞানুসারে তুমি তাঁহার নিজস্ব প্রজা হইবে ও তাঁহার সমস্ত আজ্ঞা পালন করিবে; আর তিনি আপনার রচিত সমস্ত জাতি অপেক্ষা তোমাকে শ্রেষ্ঠ করিয়া প্রশংসা, কীর্ত্তি ও মর্য্যাদাস্বরূপ করিবেন, এবং . . . তুমি আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুর উদ্দেশে পবিত্র প্রজা হইবে।”—দ্বিতীয়. ২৬:১৮, ১৯.

ন-ইস্রায়েলীয়রা ঈশ্বরের লোকেদের সঙ্গে উপাসনা করতে পারত

১১-১৩. (ক) ঈশ্বরের লোকেদের সঙ্গে কারা উপাসনা করতে শুরু করেছিল? (খ) ন-ইস্রায়েলীয় ব্যক্তিরা যদি যিহোবার উপাসনা করতে চাইত, তাহলে তাদের কী করতে হতো?

১১ যদিও পৃথিবীতে ইস্রায়েলীয়রাই যিহোবার মনোনীত জাতি ছিল, কিন্তু তিনি ন-ইস্রায়েলীয় ব্যক্তিদেরকেও তাঁর লোকেদের মধ্যে বাস করার সুযোগ দিয়েছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ, বাইবেল জানায়, ঈশ্বর যখন ইস্রায়েলীয়দের মিশর থেকে বের করে এনেছিলেন, তখন তাদের সঙ্গে ন-ইস্রায়েলীয় ব্যক্তিদের একটা বিরাট দল বের হয়ে এসেছিল, যাদের মধ্যে মিশরীয়রাও ছিল। (যাত্রা. ১২:৩৮) সম্ভবত তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফরৌণের দাস ছিল, যারা সপ্তম আঘাতের সময় মোশির সতর্কবাণীর বাধ্য হয়েছিল।—যাত্রা. ৯:২০.

১২ ইস্রায়েলীয়রা কনানে যাওয়ার সময় যর্দন নদী পার হওয়ার ঠিক আগে, মোশি তাদের বলেছিলেন, যেন তারা তাদের মাঝে থাকা বিদেশিদের অর্থাৎ তাদের সঙ্গে বাস করে এমন ন-ইস্রায়েলীয় ব্যক্তিদের ‘প্রেম করে।’ (দ্বিতীয়. ১০:১৭-১৯) ঈশ্বরের লোকেদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যদি কোনো ন-ইস্রায়েলীয় ব্যক্তি মৌলিক আইনগুলোর বাধ্য হতে, যেমন দশ আজ্ঞা মানতে ইচ্ছুক হয়, তাহলে তারা যেন সেই ব্যক্তিকে তাদের সমাজে বাস করতে দেয়।  (লেবীয়. ২৪:২২) কিছু ন-ইস্রায়েলীয় ব্যক্তি এমনকী যিহোবার উপাসকও হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মোয়াবীয়া রূৎ যিহোবার সেবা করতে চেয়েছিলেন। তিনি ইস্রায়েলীয় নয়মীকে বলেছিলেন: “তোমার লোকই আমার লোক, তোমার ঈশ্বরই আমার ঈশ্বর।” (রূৎ. ১:১৬) ন-ইস্রায়েলীয় ব্যক্তিদেরকে ধর্মান্তরিত ব্যক্তি বলা হতো এবং পুরুষদের ত্বকচ্ছেদ করা হতো। (যাত্রা. ১২:৪৮, ৪৯) যিহোবা তাদেরকে তাঁর মনোনীত প্রজার অংশ হতে দিয়ে আনন্দিত ছিলেন।—গণনা. ১৫:১৪, ১৫.

ইস্রায়েলীয়রা তাদের মধ্যে বসবাসরত অন্যান্য জাতির লোকেদের প্রতি প্রেম দেখিয়েছিল (১১-১৩ অনুচ্ছেদ দেখুন)

১৩ শলোমনের একটা প্রার্থনাও দেখায় যে, ন-ইস্রায়েলীয় উপাসকদের প্রতি যিহোবার অনুমোদন ছিল। মন্দির উৎসর্গ করার সময় শলোমন এই প্রার্থনা করেছিলেন: “তোমার প্রজা ইস্রায়েলগোষ্ঠীয় নয়, এমন কোন বিদেশী লোক যখন তোমার মহানাম, তোমার বলবান হস্ত ও তোমার বিস্তারিত বাহুর উদ্দেশে দূর দেশ হইতে আসিবে, যখন তাহারা আসিয়া এই গৃহের অভিমুখে প্রার্থনা করিবে, তখন তুমি স্বর্গ হইতে, তোমার নিবাস-স্থান হইতে তাহা শুনিও; এবং সেই বিদেশী লোক তোমার নিকটে যে কিছু প্রার্থনা করিবে, তদনুসারে করিও; যেন তোমার প্রজা ইস্রায়েলের ন্যায় পৃথিবীস্থ সমস্ত জাতি তোমার নাম জ্ঞাত হয়, ও তোমাকে ভয় করে, এবং তাহারা যেন জানিতে পায় যে, আমার নির্ম্মিত এই গৃহের উপরে তোমারই নাম কীর্ত্তিত।” (২ বংশা. ৬:৩২, ৩৩) এমনকী যিশুর দিনেও, ন-ইস্রায়েলীয় ব্যক্তিরা যদি যিহোবার উপাসনা করতে চাইত, তাহলে তাদেরকে যিহোবার মনোনীত লোকেদের সঙ্গে উপাসনা করতে হতো।—যোহন ১২:২০; প্রেরিত ৮:২৭.

এক সাক্ষি জাতি

১৪-১৬. (ক) কীভাবে ইস্রায়েলীয়রা যিহোবার জন্য এক সাক্ষি জাতি হয়ে উঠেছিল? (খ) বর্তমানে ঈশ্বর তাঁর লোকেদের কাছ থেকে কী চান?

১৪ ইস্রায়েলীয়রা তাদের ঈশ্বর যিহোবার সেবা করত, কিন্তু অন্যান্য জাতির লোকেরা তাদের দেব-দেবীর উপাসনা করত। তাই, একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন ছিল আর তা হল: সত্য ঈশ্বর কে? যিশাইয়ের দিনে যিহোবা বলেছিলেন, এই প্রশ্নের উত্তর ঠিক সেভাবে দেওয়া হবে, যেমনটা আদালতে কোনো বিচারের সময় প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়। তিনি বলেছিলেন, অন্যান্য জাতির দেব-দেবী যদি বাস্তব হয়ে থাকে, তাহলে তাদেরকে এই বিচারে নিজ নিজ সাক্ষি নিয়ে আসা উচিত। তিনি এই কথা বলেছিলেন: “তাহারা আপনাদের সাক্ষীদিগকে উপস্থিত করুক, তাহাতে নির্দ্দোষীকৃত হইবে; অথবা তাহারা শ্রবণ করুক, ও বলুক, সত্য বটে।”—যিশা. ৪৩:৯.

 ১৫ অন্যান্য জাতির দেব-দেবী প্রমাণ করতে পারেনি যে, তারা বাস্তব। তারা ছিল এমন প্রতিমা, যা কথা বলতে পারে না এবং অন্য কেউ বহন না করলে নড়তেও পারে না। (যিশা. ৪৬:৫-৭) কিন্তু, যিহোবা তাঁর প্রজা ইস্রায়েলীয়দের বলেছিলেন: “তোমরাই আমার সাক্ষী, এবং আমার মনোনীত দাস; যেন তোমরা জানিতে ও আমাতে বিশ্বাস করিতে পার, এবং বুঝিতে পার যে, আমিই তিনি; আমার পূর্ব্বে কোন ঈশ্বর নির্ম্মিত হয় নাই, এবং আমার পরেও হইবে না। আমি, আমিই সদাপ্রভু [“যিহোবা,” NW]; আমি ভিন্ন আর ত্রাণকর্ত্তা নাই। . . . অতএব তোমরাই আমার সাক্ষী, . . . আর আমিই ঈশ্বর।”—যিশা. ৪৩:১০-১২.

১৬ আদালতের একজন সাক্ষির মতো, যিহোবার লোকেদেরও এই সাক্ষ্য দেওয়ার সম্মাননীয় সুযোগ ছিল, যিহোবা হচ্ছেন একমাত্র সত্য ঈশ্বর। তাদের সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন, “সেই . . . প্রজাবৃন্দকে আমি আপনার নিমিত্ত নির্ম্মাণ করিয়াছি, তাহারা আমার প্রশংসা প্রচার করিবে।” (যিশা. ৪৩:২১) তারা যিহোবার প্রজা বা লোক হিসেবে পরিচিত ছিল। যেহেতু যিহোবা ইস্রায়েলীয়দের মিশর থেকে মুক্ত করেছিলেন, তাই তিনি চেয়েছিলেন যেন তারা স্বেচ্ছায় তাঁর বাধ্য হয় এবং তাঁকে তাদের সার্বভৌম প্রভু হিসেবে গৌরবান্বিত করে। যিহোবা বর্তমানেও তাঁর লোকেদের কাছ থেকে একই বিষয় চান। ঈশ্বরের লোকেদের কেমন মনোভাব থাকা উচিত, সেই বিষয়ে ভাববাদী মীখা প্রকাশ করেন: “জাতিমাত্র প্রত্যেকে আপন আপন দেবের নামে চলে; আর আমরা যুগে যুগে চিরকাল আমাদের ঈশ্বর সদাপ্রভুর নামে চলিব।”—মীখা ৪:৫.

এক বিদ্রোহী জাতি

১৭. কেন যিহোবা ইস্রায়েল জাতিকে মন্দ দ্রাক্ষালতা হিসেবে দেখেছিলেন?

১৭ দুঃখের বিষয়টা হল, ইস্রায়েল জাতি যিহোবার প্রতি বিশ্বস্ত ছিল না। তারা সেই জাতিগুলোকে অনুকরণ করতে শুরু করেছিল, যারা কাঠ ও পাথর দিয়ে নির্মিত দেব-দেবীর উপাসনা করত। এ ছাড়া, তারা মিথ্যা উপাসনার জন্য অনেক বেদি নির্মাণ করেছিল। প্রায় ২,৮০০ বছর আগে, ভাববাদী হোশেয় বলেছিলেন, ইস্রায়েল জাতি এমন এক দ্রাক্ষালতার মতো, যেটাতে আর উত্তম ফল ধরে না। তিনি আরও বলেছিলেন: “তাহাদের অন্তঃকরণ বিভক্ত; এখন তাহারা দোষী প্রতিপন্ন হইবে।” (হোশেয় ১০:১, ২) এর প্রায় ১৫০ বছর পর, যিরমিয়ও বিদ্রোহী ইস্রায়েল জাতিকে একটা দ্রাক্ষালতার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তিনি তাদেরকে উত্তম দ্রাক্ষালতা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যা পরে পরিবর্তিত হয়ে মন্দ হয়ে যায়। যিরমিয়ের মাধ্যমে যিহোবা বলেছিলেন: “তুমি আপনার জন্য যাহাদিগকে নির্ম্মাণ করিয়াছ, তোমার সেই দেবতারা কোথায়? তাহারাই উঠুক, যদি বিপৎকালে তোমাকে নিস্তার করিতে পারে।” তিনি আরও বলেছিলেন: “আমার লোক . . . আমাকে ভুলিয়া রহিয়াছে।”—যির. ২:২১, ২৮, ৩২.

১৮, ১৯. (ক) পৃথিবীতে যে যিহোবার এক নতুন মনোনীত জাতি থাকবে, সেই বিষয়ে তিনি কীভাবে ভবিষ্যদ্‌বাণী করেছিলেন? (খ) পরের প্রবন্ধে কী আলোচনা করা হবে?

১৮ ইস্রায়েল জাতি মন্দ ফল উৎপন্ন করেছিল কারণ তারা যিহোবাকে সঠিক উপায়ে উপাসনা করেনি। তারা তাঁর সাক্ষি হিসেবে থাকেনি, বরং বিভিন্ন প্রতিমার উপাসনা করেছিল। তাই, যিশু তাঁর দিনের দুষ্ট যিহুদি নেতাদের এই কথা বলেছিলেন: “তোমাদের নিকট হইতে ঈশ্বরের রাজ্য কাড়িয়া লওয়া যাইবে, এবং এমন এক জাতিকে দেওয়া হইবে, যে জাতি তাহার ফল দিবে।” (মথি ২১:৪৩) শুধুমাত্র যিহোবা যে-ব্যক্তিদের মনোনীত করবেন, তারাই নতুন জাতি অর্থাৎ আত্মিক ইস্রায়েলের অংশ হতে পারবে। তিনি তাদের সঙ্গে “এক নূতন নিয়ম” বা চুক্তি করবেন। যিহোবা তাদের সম্বন্ধে বলেছিলেন: “আমি তাহাদের ঈশ্বর হইব, ও তাহারা আমার প্রজা হইবে।”—যির. ৩১:৩১-৩৩.

১৯ তাই, ইস্রায়েল জাতি অবিশ্বস্ত হয়ে পড়ার পরও, যিহোবা প্রথম শতাব্দীতে তাঁর প্রজা হওয়ার জন্য আত্মিক ইস্রায়েলকে মনোনীত করেছিলেন। বর্তমানে কারা তাঁর লোক? ঈশ্বরকে সেবা করতে চায় এমন ব্যক্তিরা কীভাবে জানতে পারে, কারা তাঁর সত্য উপাসক? পরের প্রবন্ধে আমরা তা আলোচনা করব।