সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  নভেম্বর ২০১৪

 আমাদের আর্কাইভ থেকে

সূর্যোদয়ের দেশে ভোরের আলো ফুটে ওঠে

সূর্যোদয়ের দেশে ভোরের আলো ফুটে ওঠে

জনসাধারণের উদ্দেশে বক্তৃতার আমন্ত্রণপত্র টোকিওতে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং ওসাকা শহরে উড়োজাহাজের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল

উনিশ-শো ছাব্বিশ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, জাপানি বংশোদ্ভূত একজন পিলগ্রিম (ভ্রমণ অধ্যক্ষ) যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাপানে একজন মিশনারি হিসেবে সেবা করার জন্য ফিরে এসেছিলেন। তাকে স্বাগত জানানোর জন্য সেখানে প্রহরীদুর্গ পত্রিকার একমাত্র গ্রাহক অপেক্ষা করছিলেন, যিনি ইতিমধ্যে কোবে শহরে একটা বাইবেল অধ্যয়ন দল শুরু করেছিলেন। ১৯২৭ সালের ২ জানুয়ারি বাইবেল ছাত্ররা সেই শহরে তাদের প্রথম সম্মেলনের ব্যবস্থা করেছিল। সেই সম্মেলনে মোট ৩৬ জন ব্যক্তি উপস্থিত হয়েছিল এবং ৮ জন ব্যক্তি বাপ্তাইজিত হয়েছিল। শুরুটা দারুণ ছিল, কিন্তু এই ছোট্ট দল কীভাবে জাপানের সেই ছয় কোটি লোকের কাছে পৌঁছাবে, যাদের বাইবেলের সত্যের আলো দেখা প্রয়োজন?

১৯২৭ সালের মে মাসে উদ্যোগী বাইবেল ছাত্ররা বাইবেলভিত্তিক কিছু বক্তৃতা সম্বন্ধে প্রচার করার জন্য জনসাধারণ্যে সাক্ষ্যদানের অভিযান শুরু করেছিল। প্রথম বক্তৃতা ওসাকায় তুলে ধরা হয়েছিল আর এর জন্য ভাই-বোনেরা শহরজুড়ে ফুটপাথে সাইনবোর্ড ও বড়ো বড়ো বিলবোর্ড লাগিয়েছিল এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে ৩,০০০ আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছিল। তারা ১,৫০,০০০ ইস্তাহার বিতরণ করেছিল এবং সেই বক্তৃতা সম্বন্ধে ওসাকার প্রধান প্রধান সংবাদপত্রে এবং ট্রেনের ৪,০০,০০০ টিকেটে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। বক্তৃতার দিন দুটো উড়োজাহাজের মাধ্যমে ১,০০,০০০ ইস্তাহার শহরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। “ঈশ্বরের রাজ্য সন্নিকট” শিরোনামের বক্তৃতা শোনার জন্য প্রায় ২,৩০০ আসনবিশিষ্ট ওসাকা আসাহি হল পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। প্রায় এক হাজার ব্যক্তিকে আসন না পেয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল। বক্তৃতার পর, উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে ৬০০-রও বেশি ব্যক্তি প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য সেখানে রয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী মাসগুলোতে, কিয়োতো এবং জাপানের পশ্চিমাঞ্চলের অন্যান্য শহরে জনসাধারণের উদ্দেশ্যে বাইবেলভিত্তিক বক্তৃতা দেওয়া হয়েছিল।

১৯২৭ সালের অক্টোবর মাসে, বাইবেল ছাত্ররা টোকিওতে বিভিন্ন বক্তৃতা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। আবারও দেশের প্রধান ব্যক্তিদের কাছে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছিল, যাদের মধ্যে ছিল প্রধানমন্ত্রী, সংসদ সদস্যগণ এবং ধর্মীয় ও সামরিক নেতারা। পোস্টার, সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন ও সেইসঙ্গে ৭,১০,০০০ ইস্তাহার ব্যবহার করা হয়েছিল আর এর ফলে জাপানের রাজধানীতে দেওয়া তিনটে বক্তৃতায় মোট ৪,৮০০ জন ব্যক্তি উপস্থিত হয়েছিল।

উদ্যোগী কলপোর্টাররা

কাৎসুও এবং হাগিনো মিউরা

প্রতিটা ঘরে রাজ্যের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য কলপোর্টাররা (অগ্রগামীরা) এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। জাপানের প্রথম দিকের একজন কলপোর্টার মাৎসুএ ইশিই এবং তার স্বামী জিজৌ, সুদূর উত্তরের সাপ্পোরো থেকে শুরু করে সেনদাই, টোকিও, ইয়োকোহামা, নাগোয়া, ওসাকা, কিয়োতো, ওকাইয়ামা এবং তোকুশিমা পর্যন্ত দেশের চার ভাগের তিন ভাগ এলাকায় প্রচার করেছিল। বোন ইশিই এবং সাকিকো তানাকা নামে একজন বয়স্ক বোন, তাদের ভালো কিমোনো পরে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। সেই কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন কারাগারের লাইব্রেরিতে রাখার জন্য ঈশ্বরের বীণা (ইংরেজি) এবং মুক্তি (ইংরেজি) বইয়ের ৩০০টা করে কপি চেয়ে অনুরোধ করেছিলেন।

 কাৎসুও এবং হাগিনো মিউরা, বোন ইশিইর কাছ থেকে বিভিন্ন বই নিয়েছিল এবং এটাই যে সত্য, তা সঙ্গেসঙ্গে উপলব্ধি করতে পেরেছিল। তারা ১৯৩১ সালে বাপ্তাইজিত হয়েছিল এবং কলপোর্টার হয়েছিল। হারুইচি ও তানে ইয়ামাদা এবং তাদের অনেক আত্মীয়স্বজন ১৯৩০ সালের কিছু সময় আগে রাজ্যের বার্তা গ্রহণ করে নিয়েছিল। ইয়ামাদা দম্পতি কলপোর্টারের কাজ শুরু করেছিল এবং তাদের মেয়ে ইউকিকো টোকিওর বেথেলে সেবা করার জন্য চলে গিয়েছিল।

ছোটো ও বড়ো “এহিউ”

বড়ো এহিউ, যেখানে ছয় জন অগ্রগামী থাকতে পারত

সেই সময়ে মোটর গাড়ির দাম অনেক বেশি ছিল আর রাস্তাও অনেক খারাপ ছিল। তাই, কাজুমি মিনোউরা এবং অল্পবয়সি কলপোর্টাররা ইঞ্জিনবিহীন ট্রেইলার বা ভ্রাম্যমাণ বাড়ি ব্যবহার করত। তারা একজন উদ্যমী রথচালকের নাম অনুসারে এগুলোর নাম দিয়েছিল এহিউ (যেহূ), যিনি পরে ইস্রায়েলের রাজা হয়েছিলেন। (২ রাজা. ১০:১৫, ১৬) তিনটা বড়ো এহিউয়ের আকার ছিল দৈর্ঘ্যে ২.২ মিটার (৭.২ ফুট), প্রস্থে ১.৯ মিটার (৬.২ ফুট) এবং উচ্চতায় ১.৯ মিটার (৬.২ ফুট) আর এগুলোর প্রত্যেকটাতে ছয় জনের মতো অগ্রগামী ঘুমাতে পারত। এ ছাড়া, জাপানের শাখা অফিসে সাইকেলচালিত ১১টা ছোটো এহিউ তৈরি করা হয়েছিল, যেগুলোর প্রত্যেকটাতে দু-জন করে ব্যক্তি থাকতে পারত। কিইচি ইওয়াসাকি, যিনি এহিউ তৈরি করতে সাহায্য করেছিলেন, তিনি স্মরণ করে বলেন, “প্রতিটা এহিউয়ের মধ্যে একটা করে তাঁবু ও সেইসঙ্গে বাতি জ্বালানোর বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য একটা করে গাড়ির ব্যাটারি ছিল।” কলপোর্টাররা পাহাড়ের চড়াই-উতরাই এবং উপত্যকার মধ্যে দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে এহিউ চালিয়ে উত্তরের হোক্কাইডো থেকে দক্ষিণের কিয়ুশু পর্যন্ত পুরো জাপানে সত্যের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

ছোটো এহিউ, যেখানে দু-জন ব্যক্তি থাকতে পারত

কলপোর্টার ইকুমাৎসু ঔতা বলেন: “কোনো একটা শহরে পৌঁছানোর পর আমরা নদীর পারে অথবা কোনো খোলা মাঠে এহিউ দাঁড় করাতাম। প্রথমে আমরা শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে, যেমন মেয়রের সঙ্গে দেখা করতাম আর এরপর ঘরে ঘরে গিয়ে আমাদের সাহিত্যাদি দেখাতাম। সেই এলাকায় কাজ শেষ করার পর, আমরা পরবর্তী শহরে যেতাম।”

বাইবেল ছাত্রদের ৩৬ জন সদস্যের একটা দল যখন কোবে শহরে তাদের প্রথম সম্মেলনের আয়োজন করেছিল, তখন এটা ছিল “ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ের” এক ‘দিন।’ (সখ. ৪:১০) এর ঠিক পাঁচ বছর পর, ১৯৩২ সালে জাপানে ১০৩ জন কলপোর্টার এবং প্রকাশক তাদের কাজ সম্বন্ধে ও সেইসঙ্গে ১৪,০০০-এরও বেশি বই অর্পণ করার বিষয়ে রিপোর্ট দিয়েছিল। বর্তমানে, জাপানের বড়ো বড়ো শহরে সুসংগঠিতভাবে জনসাধারণ্যে সাক্ষ্যদানের কাজ করা হচ্ছে এবং প্রায় ২,২০,০০০ প্রকাশক সূর্যোদয়ের দেশের সমস্ত জায়গায় তাদের আলো উজ্জ্বল হতে দিচ্ছে।—আমাদের আর্কাইভ থেকে, জাপান।

কিইচি ইওয়াসাকির আঁকা স্কেচ, যিনি জাপান বেথেলে এহিউ তৈরি করেছিলেন