সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  জুলাই ২০১৪

 জীবনকাহিনি

একজন বাবাকে হারিয়েছি—আরেকজন বাবাকে পেয়েছি

একজন বাবাকে হারিয়েছি—আরেকজন বাবাকে পেয়েছি

আমার বাবার জন্ম অস্ট্রিযার গ্রাতস্‌ শহরে ১৮৯৯ সালে আর তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি তরুণ ছিলেন। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার অল্পসময় পর, তাকে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত করা হয়। ১৯৪৩ সালে রাশিয়ায় যুদ্ধ করার সময় তিনি মারা যান। দুঃখের বিষয় হল, এভাবেই আমি আমার বাবাকে হারাই। তখন আমার বয়স প্রায় দুই বছর। আমি তাকে জানার কোনো সুযোগই পাইনি আর আমি প্রচণ্ডভাবে তার অভাব বোধ করতাম, বিশেষভাবে যখন আমি বুঝতে পারি, স্কুলের বেশিরভাগ ছেলেরই বাবা আছে। পরে কিশোর বয়সে, আমি আমাদের স্বর্গীয় পিতা, আরও মহান এক পিতা যিনি কখনো মারা যাবেন না, তাঁর সম্বন্ধে জানতে পেরে সান্ত্বনা লাভ করি।

বয় স্কাউট হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা

আমি যখন কিশোরবয়সি

আমার বয়স যখন সাত বছর, তখন আমি বয় স্কাউট-এর একজন সদস্য হই। বয় স্কাউট হচ্ছে বিশ্বব্যাপী এক সংগঠন, যেটা ১৯০৮ সালে গ্রেট ব্রিটেনে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল রবার্ট স্টিফেনসন স্মিথ বেডেন-পোওয়েল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ১৯১৬ সালে, আমার বয়সি ছেলেদের জন্য উল্ফ কাবস্‌ (বা কাব স্কাউটস্‌) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গ্রামাঞ্চলে গিয়ে ক্যাম্প করতে—সেখানে গিয়ে তাঁবুতে ঘুমাতে, ইউনিফর্ম পরতে ও ড্রামের তালে তালে কুচকাওয়াজ করতে—আমার খুব ভালো লাগত। বিশেষ করে, আমি সন্ধ্যা বেলা খোলা জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে অন্যান্য স্কাউটের সঙ্গে বসে গান গাইতে ও বনের মধ্যে খেলাধুলা করতে পছন্দ করতাম। এ ছাড়া, আমরা প্রকৃতি সম্বন্ধে অনেক কিছু শিখতাম, যার ফলে আমাদের সৃষ্টিকর্তার হস্তকৃত কর্মের প্রতি আমার উপলব্ধি গড়ে ওঠে।

বয় স্কাউটদের প্রতিদিন একটা ভালো কাজ করার জন্য উৎসাহিত করা হতো। এটাই ছিল তাদের মূলমন্ত্র। আমরা “সদাপ্রস্তুত” শব্দটা বলে একে অন্যকে সম্ভাষণ জানাতাম। এই শব্দ আমার হৃদয়কে অনেক নাড়া দিত। আমাদের দলে এক-শোর বেশি সদস্য ছিল আর এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক ক্যাথলিক, অর্ধেক প্রোটেস্টান্ট ও একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিল।

১৯২০ সাল থেকে, কয়েক বছর পর পর আন্তর্জাতিক স্কাউট সমাবেশ বা জাম্বুরি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। আমি ১৯৫১ সালের আগস্ট মাসে অস্ট্রিযার বাত ইশেলে অনুষ্ঠিত সপ্তম বিশ্ব স্কাউট জাম্বুরি এবং ১৯৫৭ সালের আগস্ট মাসে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের কাছাকাছি সাটন পার্কে অনুষ্ঠিত নবম বিশ্ব স্কাউট জাম্বুরিতে যোগ দিয়েছি। এর মধ্যে দ্বিতীয় সমাবেশে ৮৫টা দেশ ও এলাকা থেকে প্রায় ৩৩,০০০ স্কাউট যোগ দিয়েছিল। এ ছাড়া, প্রায় ৭,৫০,০০০ লোক আমাদের সমাবেশ দেখতে এসেছিল আর এর মধ্যে ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথও ছিলেন। আমার কাছে এটা একটা আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃসমাজের মতোই ছিল। কিন্তু, তখন আমি জানতামই না যে, খুব শীঘ্র এর চেয়ে হাজার গুণ চমৎকার এক ভ্রাতৃসমাজের সঙ্গে—এক আধ্যাত্মিক ভ্রাতৃসমাজের সঙ্গে—আমার পরিচয় হবে।

প্রথম বার একজন যিহোবার সাক্ষির সঙ্গে দেখা হয়

রুডি শিগার্ল, একজন পেস্ট্রি শেফ, আমার কাছে প্রথম সাক্ষ্যদান করেছিলেন

১৯৫৮ সালের বসন্ত কালে, আমি অস্ট্রিযার গ্রাতস্‌ শহরের গ্র্যান্ড হোটেল উইস্‌লার-এ একজন ওয়েটার হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার শেষ পর্যায়ে ছিলাম। সেখানে রুডল্ফ শিগার্ল নামে একজন সহকর্মী এবং পেস্ট্রি শেফ আমার কাছে রীতিবহির্ভূতভাবে সাক্ষ্যদান  করেছিলেন। আমি সত্য সম্বন্ধে আগে কখনোই কিছু শুনিনি। তিনি প্রথমে আমার সঙ্গে ত্রিত্বের মতবাদ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন এবং বলেছিলেন, এটা বাইবেলের শিক্ষা নয়। আমি ত্রিত্বের মতবাদের পক্ষসমর্থন করে তর্ক করেছিলাম এবং তাকে ভুল প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম। আমি আমার সহকর্মীকে পছন্দ করতাম আর তাই তাকে ক্যাথলিক চার্চে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রচেষ্টা করেছিলাম।

রুডল্ফকে আমরা রুডি বলে ডাকতাম। তিনি আমাকে একটা বাইবেল দিয়েছিলেন। আমি তাকে জোর দিয়ে বলেছিলাম, আমাকে একটি ক্যাথলিক সংস্করণ দিতে হবে। আমি সেই বাইবেল পড়তে শুরু করি আর শীঘ্র দেখতে পাই রুডি বাইবেলের ভিতরে ওয়াচটাওয়ার সোসাইটি-র ছাপানো একটা ট্র্যাক্ট ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আমি সেই ট্র্যাক্টের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলাম কারণ আমার মনে হয়েছিল, এইরকম প্রকাশনায় এমনভাবে শব্দ বাছাই করা হয় যাতে কোনো শিক্ষাকে সঠিক বলে মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে সেই শিক্ষা সঠিক নয়। তা সত্ত্বেও, আমি রুডির সঙ্গে বাইবেল আলোচনা করার জন্য ইচ্ছুক ছিলাম। রুডি বিচক্ষণতা দেখিয়ে আমাকে আর কোনো ছাপানো বিষয়বস্তু দেননি। আমরা প্রায় তিন মাস ধরে মাঝে মাঝে বাইবেল আলোচনা করেছিলাম আর এই আলোচনা করতে করতে প্রায়ই রাত হয়ে যেত।

আমার নিজের শহর গ্রাতসের হোটেলে প্রশিক্ষণ শেষ করার পর, আমার মা আমাকে হোটেল ম্যানেজমেন্টের ওপর আরও পড়াশোনা করানোর জন্য একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভরতি করিয়ে দিয়েছিলেন। তাই, আমি আল্পস্‌ পর্বতমালার উপত্যকায় অবস্থিত বাত হোফগাস্তাইন শহরে সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার জন্য চলে গিয়েছিলাম। এই প্রতিষ্ঠান বাত হোফগাস্তাইনের গ্র্যান্ড হোটেলের সঙ্গে যুক্ত ছিল আর মাঝে মাঝে আমি ক্লাসে শেখা বিষয়গুলোর অভিজ্ঞতা লাভ করার জন্য সেখানে কাজ করতাম।

দু-জন মিশনারি বোন আমার সঙ্গে দেখা করে

ইলজে উন্টারডোরফার এবং এলফ্রিডি লোর ১৯৫৮ সালে আমার সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করে

রুডি আমার নতুন ঠিকানা ভিয়েনার শাখা অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আর শাখা অফিস সেই ঠিকানা ইলজে উন্টারডোরফার এবং এলফ্রিডি লোর নামে দু-জন মিশনারি বোনের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল। * একদিন, হোটেলের রিসেপশনিস্ট আমাকে ডেকে বলেন, বাইরে গাড়িতে দু-জন মহিলা বসে আছে আর তারা আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। আমি অনেক অবাক হয়ে যাই কারণ এই ব্যাপারে আমি কিছুই জানতাম না। কিন্তু তারা কে, তা দেখার জন্য আমি বাইরে যাই। পরে আমি জানতে পারি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যখন সাক্ষিদের কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল, তখন এই বোনেরা নাতসি জার্মানিতে সাক্ষি বার্তাবাহক হিসেবে সেবা করেছে। এমনকী যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, জার্মানির গোয়েন্দা পুলিশ (গেস্টাপো) তাদের গ্রেপ্তার করে লিখটেনবার্গ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিয়েছিল। এরপর, যুদ্ধের সময় তাদের বার্লিনের কাছে অবস্থিত রেভেন্সব্রুক কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।

সেই বোনেরা আমার মায়ের বয়সি ছিল আর নিশ্চিতভাবেই তাদের প্রতি আমার সম্মান ছিল। এই কারণে আমি তাদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের সময় নষ্ট করতে চাইনি, যেহেতু কয়েক সপ্তাহ অথবা কয়েক মাস আলোচনা করার পর তাদের হয়তো বলতে হবে, আমি আর আলোচনা চালিয়ে যেতে চাই না। তাই, আমি তাদের বলেছিলাম, প্রেরিতদের উত্তরাধিকার সম্বন্ধে ক্যাথলিকদের যে-মতবাদ রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা করার জন্য তারা আমাকে শাস্ত্রপদের একটা তালিকা এনে দিতে পারে কি না। তাদের বলেছিলাম, সেই তালিকা নিয়ে আমি স্থানীয় যাজকের সঙ্গে আলোচনা করব। আমার মনে হয়েছিল, তারপরই আমি বুঝতে পারব কোনটা সত্য।

স্বর্গের প্রকৃত পবিত্র পিতা সম্বন্ধে জানতে পারি

প্রেরিতদের উত্তরাধিকার সম্বন্ধে রোমান ক্যাথলিকদের শিক্ষায় দাবি করা হয় যে, প্রেরিত পিতরের উত্তরাধিকারী হিসেবে একের পর এক পোপ এসেছে। (গির্জা মথি ১৬:১৮, ১৯ পদে উদ্ধৃত যিশুর  কথাগুলোর ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে।) ক্যাথলিক ধর্ম এটাও দাবি করে, মতবাদ সংক্রান্ত বিষয়ে পোপ যখন তার পদাধিকারবলে অথবা প্রতিনিধি হিসেবে কোনো কিছু বলেন, তখন এতে কোনো ভুল থাকতে পারে না। আমি তা বিশ্বাস করতাম এবং এইরকম মনে করতাম, ক্যাথলিকরা যাকে পবিত্র পিতা বলে সম্বোধন করে, সেই পোপ যেহেতু মতবাদ সংক্রান্ত বিষয়ে ভুল করতে পারেন না আর তিনিই ত্রিত্বকে সত্য বলে ঘোষণা দিয়েছেন, তাই এই শিক্ষা নিশ্চয়ই সত্য। কিন্তু তিনি যদি ভুল করেন, তাহলে এই মতবাদ মিথ্যা হতে পারে। কোনো সন্দেহ নেই, অনেক ক্যাথলিক ব্যক্তির জন্য প্রেরিতদের উত্তরাধিকার বিষয়ক শিক্ষাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, কারণ এই শিক্ষা সঠিক, না কি ভুল, সেটার ওপরই ক্যাথলিকদের অন্যান্য শিক্ষার সত্যতা নির্ভর করে!

আমি যখন যাজকের সঙ্গে দেখা করি, তখন তিনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। তবে তিনি তার শেল্‌ফ থেকে ক্যাথলিক মতবাদের ওপর এমন একটা বই বের করে দিয়েছিলেন, যেখানে প্রেরিতদের উত্তরাধিকার বিষয়ক আলোচনা রয়েছে। আমি সেই বইটা ঘরে নিয়ে যাই ও যাজকের পরামর্শমতো সেটা পড়ি এবং আরও প্রশ্ন নিয়ে তার কাছে আবার ফিরে যাই। আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে না পেরে অবশেষে তিনি বলেন: “আমি তোমাকে কোনোভাবে বিশ্বাস করাতে পারব না আর তুমিও আমাকে কোনোভাবে বিশ্বাস করাতে পারবে না। . . . তোমার প্রতি শুভকামনা রইল!” তিনি আমার সঙ্গে আর কোনো আলোচনা করতে চাননি।

এই বার, আমি ইলজে ও এলফ্রিডির সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন করার জন্য প্রস্তুত হই। তারা আমাকে স্বর্গের প্রকৃত পবিত্র পিতা যিহোবা ঈশ্বর সম্বন্ধে অনেক কিছু শিখিয়েছিল। (যোহন ১৭:১১) সেই এলাকায় তখন কোনো মণ্ডলী ছিল না আর তাই এই দুই বোন এক আগ্রহী পরিবারের বাড়িতে সভা পরিচালনা করত। সেখানে অল্প কয়েক জন ব্যক্তি যোগ দিত। নেতৃত্ব নেওয়ার মতো কোনো বাপ্তাইজিত ভাই না থাকায়, বোনেরা সভার বেশিরভাগ বিষয়বস্তু নিজেদের মধ্যে আলোচনা করত। মাঝে মাঝে, অন্য জায়গা থেকে কোনো ভাই এসে ভাড়া করা জায়গায় জনসাধারণের উদ্দেশে বক্তৃতা দিতেন।

পরিচর্যা শুরু করি

ইলজে ও এলফ্রিডি ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে আমার সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করে আর এর তিন মাস পর ১৯৫৯ সালের জানুয়ারি মাসে আমি বাপ্তিস্ম নিই। বাপ্তিস্মের আগে, আমি তাদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, কীভাবে প্রচার করা হয় তা দেখার জন্য আমি তাদের সঙ্গে ঘরে ঘরে পরিচর্যায় যেতে পারি কি না। (প্রেরিত ২০:২০) প্রথম বার তাদের সঙ্গে যাওয়ার পর আমি তাদের জিজ্ঞেস করি, আমি কাজ করার জন্য ব্যক্তিগত কোনো এলাকা নিতে পারি কি না। তারা আমাকে একটা গ্রামে প্রচার করার দায়িত্ব দেয়। আমি একাই সেখানে যেতাম, ঘরে ঘরে প্রচার করতাম এবং আগ্রহী ব্যক্তিদের সঙ্গে পুনর্সাক্ষাৎ করতাম। প্রথম যে-ভাই আমার সঙ্গে ঘরে ঘরে পরিচর্যায় যোগ দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন সীমা অধ্যক্ষ আর পরে তিনি আমাদের পরিদর্শন করেছিলেন।

১৯৬০ সালে, হোটেল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর, আমি আমার আত্মীয়স্বজনকে বাইবেলের সত্য শিখতে সাহায্য করার জন্য নিজের শহরে ফিরে যাই। যদিও এখন পর্যন্ত তাদের মধ্যে এক জনও সত্যে আসেনি, তবে কেউ কেউ অনেক আগ্রহ দেখাচ্ছে।

পূর্ণসময়ের সেবার এক জীবন

আমার বয়স যখন ২০-এর কোঠায়

১৯৬১ সালে, শাখা অফিস থেকে মণ্ডলীগুলোর উদ্দেশে লেখা চিঠি পড়া হয়, যে-চিঠিতে ভাই-বোনদেরকে অগ্রগামী সেবা করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছিল। আমি অবিবাহিত ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলাম আর তাই মনে করেছিলাম, অগ্রগামী সেবা না করার পিছনে কোনো অজুহাত নেই। আমি সীমা অধ্যক্ষ কুর্ট কুনের কাছে আমার চিন্তাভাবনা প্রকাশ করেছিলাম। আমি তাকে বলেছিলাম, একটা গাড়ি কেনার জন্য আমি আরও কয়েক মাস চাকরি করতে চাই কারণ অগ্রগামী কাজ করার জন্য গাড়ি সাহায্যকারী হবে। তিনি কী মন্তব্য করেছিলেন? “পূর্ণসময়ের সেবা করার জন্য যিশু ও প্রেরিতদের কি গাড়ি প্রয়োজন হয়েছিল?” এতেই কাজ হয়েছিল! আমি যত শীঘ্র সম্ভব অগ্রগামী সেবা শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু, আমি যেহেতু একটা হোটেলের রেস্টুরেন্টে সপ্তাহে ৭২ ঘণ্টা কাজ করতাম, তাই প্রথমে আমাকে কিছু পরিবর্তন করতে হয়েছিল।

 আমি আমার বসের কাছে অনুরোধ করেছিলাম, তিনি আমাকে সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা কাজ করতে দেবেন কি না। তিনি আমার অনুরোধ রেখেছিলেন এবং আমাকে আগের বেতনই দিয়েছিলেন। এর অল্পসময় পর, আমি তাকে অনুরোধ করি, আমি সপ্তাহে শুধু ৪৮ ঘণ্টা কাজ করতে পারি কি না। তিনি আমার সেই অনুরোধও রেখেছিলেন এবং আগের মতোই বেতন দিয়েছিলেন। এরপর আমি যখন অনুরোধ করি, আমি প্রতি সপ্তাহে শুধু ৩৬ ঘণ্টা অথবা সপ্তাহে ৬ দিন শুধু ৬ ঘণ্টা করে কাজ করতে পারি কি না, তখনও আমার অনুরোধ রাখা হয়। আশ্চর্যের বিষয়টা হল, আমি তখনও একই বেতন পাই! মনে হয়েছিল যেন আমার বস্‌ আমাকে ছাড়তেই চান না। এভাবে তালিকা করে আমি নিয়মিত অগ্রগামী সেবা শুরু করি। সেই সময়ে, নিয়মিত অগ্রগামীদের মাসে ১০০ ঘণ্টা পূরণ করতে হতো।

চার মাস পর, আমাকে ক্যারিনথিয়া প্রদেশের শ্পিতাল আন দের দ্রাউ শহরের একটা ছোটো মণ্ডলীতে একজন বিশেষ অগ্রগামী এবং দাস হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। সেই সময়ে, বিশেষ অগ্রগামীদের মাসে ১৫০ ঘণ্টা পূরণ করতে হতো। আমার কোনো অগ্রগামী সঙ্গী ছিল না, তবে আমি পরিচর্যায় গারট্রুড লোবনার নামে একজন বোনের কাছ থেকে যে-সমর্থন পেয়েছি, তা অনেক উপলব্ধি করি। সেই বোন মণ্ডলীর সহকারী দাস হিসেবে সেবা করতেন। *

কার্যভারে দ্রুত পরিবর্তন

১৯৬৩ সালে, আমাকে সীমার কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। মাঝে মাঝে আমি ভারী সুটকেস নিয়ে ট্রেনে করে এক মণ্ডলী থেকে আরেক মণ্ডলীতে যেতাম। অধিকাংশ ভাই-বোনেরই গাড়ি ছিল না, তাই আমাকে স্টেশন থেকে নেওয়ার জন্য কেউ আসতে পারত না। “জাহির করার মনোভাব” এড়িয়ে চলার জন্য, আমি যে-বাড়িতে থাকব, সেখানে ট্যাক্সি নিয়ে যেতে চাইতাম না। তাই হেঁটে হেঁটেই সেই বাড়িতে যেতাম।

১৯৬৫ সালে, আমাকে গিলিয়েড স্কুল-এর ৪১তম ক্লাসে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমি তখনও বিয়ে করিনি। আমার সহছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে অনেকেই অবিবাহিত ছিল। গ্র্যাজুয়েশনের সময় আমাকে যখন মাতৃভূমি অস্ট্রিযায় ফিরে গিয়ে সীমার কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য নিযুক্ত করা হয়, তখন আমি অনেক অবাক হই। কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করার আগে আমাকে চার সপ্তাহের জন্য একজন সীমা অধ্যক্ষের সঙ্গে কাজ করতে বলা হয়। আমি এই প্রেমময় ভাই অ্যান্থনি কনটির সঙ্গে সেবা করতে পেরে অনেক কৃতজ্ঞ, যিনি ক্ষেত্রের পরিচর্যায় যেতে ভালোবাসতেন এবং কার্যকরী উপায়ে প্রচার করতেন। আমরা একসঙ্গে নিউ ইয়র্কের প্রান্তে কর্নওয়ল এলাকায় সেবা করেছিলাম।

আমাদের বিয়ের দিন

আমি যখন অস্ট্রিযায় ফিরে আসি, তখন আমাকে একটা সীমায় নিযুক্ত করা হয়। এখানেই টোভে মেরেট নামে একজন সুন্দরী অবিবাহিত বোনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। সে পাঁচ বছর বয়স থেকেই সত্যে বড়ো হয়ে উঠেছে। ভাই-বোনেরা যখন আমাদের জিজ্ঞেস করে, কীভাবে আমাদের পরিচয় হয়েছে, তখন আমরা মজা করে বলি, “শাখা অফিস সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।” পরিচয়ের এক বছর পর, ১৯৬৭ সালের এপ্রিল মাসে আমরা বিয়ে করি আর আমাদের একসঙ্গে ভ্রমণ সেবা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

এর পরের বছর আমি বুঝতে পারি, যিহোবা অযাচিত দয়া দেখিয়ে আমাকে তাঁর আত্মিক পুত্র হিসেবে দত্তক নিয়েছেন। এভাবে আমাদের স্বর্গীয় পিতার সঙ্গে ও সেইসঙ্গে রোমীয় ৮:১৫ পদ অনুসারে যারা তাঁকে ‘আব্বা, পিতা, বলিয়া ডাকিয়া উঠে,’ তাদের সকলের সঙ্গে এক বিশেষ সম্পর্ক শুরু হয়।

মেরেট ও আমি একসঙ্গে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সীমার কাজ ও জেলার কাজ চালিয়ে যাই। শীত কালে, মাঝে মাঝে আমাদের এমন রুমে ঘুমাতে হতো, যেখানে উত্তাপের কোনো ব্যবস্থা থাকত না আর তাপমাত্রা থাকত হিমাঙ্কের নীচে। একবার, আমরা ঘুম থেকে জেগে দেখি, আমাদের নিঃশ্বাসের কারণে কম্বলের ওপরের প্রান্তটা ঠাণ্ডা হয়ে জমে শক্ত ও সাদা হয়ে গিয়েছে। অবশেষে আমরা নিজেদের সঙ্গে একটা ছোটো ইলেকট্রিক হিটার নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই,  যাতে রাতের বেলা তাপমাত্রা সহ্য করার পর্যায়ে থাকে। কোনো কোনো জায়গায়, রাতের বেলা বাথরুম ব্যবহার করার জন্য আমাদের তুষারের ওপর দিয়ে হেঁটে বাড়ির বাইরে কোনো নড়বড়ে বাথরুমে যেতে হতো, যেখানে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বাতাস বইত। এ ছাড়া, আমাদের কোনো অ্যাপার্টমেন্ট ছিল না, তাই সোমবারে আমরা সেই একই বাড়িতে থাকতাম, যেখানে সেই সপ্তাহে আমরা পরিদর্শন করতাম। তারপর, মঙ্গলবার সকালে আমরা পরের মণ্ডলীতে যাত্রা করতাম।

আমি আনন্দের সঙ্গে বলতে চাই, বছরের পর বছর ধরে আমার প্রিয় স্ত্রী আমাকে অনেক সমর্থন করেছে। সে ক্ষেত্রের পরিচর্যায় যেতে ভালোবাসে, পরিচর্যায় বের হওয়ার জন্য তাকে কোনো দিন উৎসাহিত করতে হয়নি। এ ছাড়া, সে আমাদের বন্ধুবান্ধবকেও ভালোবাসে আর অন্যদের ব্যাপারে অনেক চিন্তা করে। এটা আমার জন্য বিরাট সাহায্য।

১৯৭৬ সালে আমাদেরকে ভিয়েনাতে অস্ট্রিযার শাখা অফিসে সেবা করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় আর আমাকে শাখা কমিটির একজন সদস্য হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। সেই সময়ে অস্ট্রিযা শাখা অফিস পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কাজ দেখাশোনা করত এবং সেই দেশগুলোতে সাহিত্য পাঠানোর জন্য বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবস্থা করত। ভাই ইয়ুরগেন রুনডেল এই কাজে নেতৃত্ব নিয়েছিলেন, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন। আমি তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম আর এরপর আমাকে পূর্ব ইউরোপের দশটা ভাষায় অনুবাদ কাজ দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ইয়ুরগেন ও তার স্ত্রী গারট্রুড বিশ্বস্তভাবে জার্মানিতে বিশেষ অগ্রগামী হিসেবে সেবা করছে। ১৯৭৮ সালে, অস্ট্রিযা শাখা অফিস ফটোটাইপসেটের মাধ্যমে পত্রিকা তৈরি করতে এবং একটা ছোটো অফসেট ছাপাখানায় ছয়টা ভাষায় সেই পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেছিল। এ ছাড়া, বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের প্রকাশনার জন্য অনুরোধ করত এমন গ্রাহকদের কাছে আমরা প্রকাশনা পাঠাতাম। অটো কুগলিচ, যিনি তার স্ত্রী ইংগ্রিটের সঙ্গে এখন জার্মানির শাখা অফিসে সেবা করছেন, তিনিই মূলত এসব কাজ করতেন।

অস্ট্রিযাতে আমি বিভিন্ন উপায়ে সাক্ষ্যদান উপভোগ করেছি আর এর মধ্যে ছিল রাস্তায় সাক্ষ্যদান করা

এ ছাড়া, পূর্ব ইউরোপের ভাইয়েরা নিজ নিজ দেশে মিমিওগ্রাফ মেশিনে অথবা ফিল্‌ম থেকে বিষয়বস্তুর প্রতিলিপি করার পদ্ধতি ব্যবহার করে সাহিত্যাদি তৈরি করত। তা সত্ত্বেও, তাদের দেশের বাইরে থেকে সাহায্য প্রয়োজন ছিল। যিহোবা এই কাজের রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন। আর আমাদের শাখা অফিসে অনেক বছর ধরে কঠিন পরিস্থিতি ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও যে-ভাইয়েরা সেবা করে গিয়েছে, তাদের আমরা অনেক ভালোবাসি।

রোমানিয়ায় এক বিশেষ পরিদর্শন

১৯৮৯ সালে, আমি পরিচালকগোষ্ঠীর একজন সদস্য ভাই থিওডোর জারাসের সঙ্গে রোমানিয়ায় যাওয়ার বিশেষ সুযোগ  পেয়েছিলাম। আমাদের লক্ষ্য ছিল, ভাই-বোনদের একটা বিরাট দলকে সংগঠনের সঙ্গে পুনরায় একতাবদ্ধ হওয়ার জন্য সাহায্য করা। ১৯৪৯ সালের শুরুতে তারা সংগঠনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছেদ করে নিজেদের মণ্ডলী গঠন করেছিল। কিন্তু, তারা তখনও পর্যন্ত লোকেদের কাছে প্রচার করছিল এবং তাদের বাপ্তাইজিত করছিল। বিশ্বপ্রধান কার্যালয়ের অনুমোদিত সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত ভাই-বোনদের মতো, তারাও তাদের খ্রিস্টীয় নিরপেক্ষতার জন্য জেলে গিয়েছিল। রোমানিয়ায় তখন নিষেধাজ্ঞা ছিল, তাই আমরা ভাই পামফিল আলবুর বাড়িতে সেখানকার গুরুত্বপূর্ণ চার জন প্রাচীন ও সেইসঙ্গে অনুমোদিত রোমানিয়া কান্ট্রি কমিটি-র প্রতিনিধিদের সঙ্গে গোপনে দেখা করি। আমরা অস্ট্রিযা থেকে দোভাষী হিসেবে কাজ করার জন্য রল্ফ কেলনারকে নিয়ে গিয়েছিলাম।

দ্বিতীয় দিন রাতে আলোচনা করার সময়, ভাই আলবু তার সহপ্রাচীনদেরকে আমাদের সঙ্গে একতাবদ্ধ হওয়ার জন্য উৎসাহিত করে এই কথা বলেছিলেন: “আমরা যদি এখনই ফিরে না যাই, তাহলে হয়তো আর কোনো দিনই সুযোগ পাব না।” এরপর প্রায় ৫,০০০ ভাই-বোন সংগঠনের সঙ্গে সম্মিলিত হয়েছিল। যিহোবার জন্য কত বড়ো এক বিজয় আর শয়তানের জন্য কী এক চপেটাঘাত!

১৯৮৯ সালের শেষের দিকে পূর্ব ইউরোপে সাম্যবাদের পতনের আগে, পরিচালকগোষ্ঠী আমার স্ত্রী ও আমাকে নিউ ইয়র্কের বিশ্বপ্রধান কার্যালয়ে আসার আমন্ত্রণ জানায়। এটা আমাদের জন্য এক অপ্রত্যাশিত সুযোগ ছিল। আমরা ১৯৯০ সালের জুলাই মাসে ব্রুকলিন বেথেলে সেবা শুরু করি। ১৯৯২ সালে আমাকে পরিচালকগোষ্ঠীর সার্ভিস (পরিচর্যা সংক্রান্ত) কমিটি-র একজন সহায়ক হিসেবে নিযুক্ত করা হয় আর ১৯৯৪ সালের জুলাই মাস থেকে আমি পরিচালকগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে সেবা করার বিশেষ সুযোগ পেয়েছি।

অতীতের দিকে ফিরে তাকানো ও ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকা

নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে আমার স্ত্রীর সঙ্গে

অনেক বছর আগে আমি একটা হোটেলে একজন ওয়েটার হিসেবে কাজ করেছি। এখন আমি আমাদের বিশ্বব্যাপী ভ্রাতৃসমাজের জন্য আধ্যাত্মিক খাদ্য প্রস্তুত ও বিতরণের কাজে অংশগ্রহণ করার বিশেষ সুযোগ উপভোগ করি। (মথি ২৪:৪৫-৪৭) ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পূর্ণসময়ের সেবার দিকে ফিরে তাকালে, আমি আমাদের বিশ্বব্যাপী ভ্রাতৃসমাজের ওপর যিহোবার আশীর্বাদের জন্য শুধু গভীর কৃতজ্ঞতা ও আনন্দই প্রকাশ করতে পারি। আমাদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে যোগ দিতে আমার ভালো লাগে, যেখানে আমাদের স্বর্গীয় পিতা যিহোবা সম্বন্ধে এবং বাইবেলের সত্য সম্বন্ধে শেখার ওপর জোর দেওয়া হয়।

আমি প্রার্থনা করি যেন আরও লক্ষ লক্ষ ব্যক্তি বাইবেল অধ্যয়ন করে, সত্য গ্রহণ করে নেয় এবং বিশ্বব্যাপী আমাদের খ্রিস্টীয় ভ্রাতৃসমাজের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে যিহোবার সেবা করে। (১ পিতর ২:১৭) এ ছাড়া, আমি স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে পুনরুত্থান দেখার আর অবশেষে আমার পার্থিব বাবাকে দেখার অপেক্ষায় আছি। আমি আশা করি, আমার বাবা, মা ও অন্যান্য প্রিয় আত্মীয়স্বজন সবাই পরমদেশে যিহোবার সেবা করতে চাইবে।

আমি স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে পুনরুত্থান দেখার আর অবশেষে আমার পার্থিব বাবাকে দেখার অপেক্ষায় আছি

^ অনু. 15 ১৯৭৯ সালের ১ নভেম্বর প্রহরীদুর্গ (ইংরেজি) পত্রিকায় তাদের জীবনকাহিনি দেখুন।

^ অনু. 27 বর্তমানে, মণ্ডলীর দাস এবং মণ্ডলীর সহকারী দাসের পরিবর্তে, প্রত্যেক প্রাচীনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে একজন কোঅর্ডিনেটর ও একজন সেক্রেটারি নিযুক্ত করা হয়।