সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  মে ২০১৪

যিহোবা হলেন এক সুসংগঠিত ঈশ্বর

যিহোবা হলেন এক সুসংগঠিত ঈশ্বর

“ঈশ্বর গোলযোগের ঈশ্বর নহেন, কিন্তু শান্তির।” —১ করি. ১৪:৩৩.

১, ২. (ক) ঈশ্বরের প্রথম সৃষ্টি কে আর যিহোবা তাঁকে কীভাবে ব্যবহার করেন? (খ) কী ইঙ্গিত দেয় যে, স্বর্গদূতেরা সুসংগঠিত?

নিখিলবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা যিহোবা সমস্ত বিষয় এক সুসংগঠিত উপায়ে করেন। তাঁর প্রথম সৃষ্টি হল তাঁর একজাত আত্মিক পুত্র, যাঁকে “বাক্য” বলা হয় কারণ তিনি ঈশ্বরের প্রধান মুখপাত্র। বাক্য হিসেবে তিনি যুগ যুগ ধরে যিহোবার সেবা করেছেন কারণ বাইবেল বলে: “আদিতে বাক্য ছিলেন, এবং বাক্য ঈশ্বরের কাছে ছিলেন।” এ ছাড়া, আমাদের এও বলা হয়েছে: “সকলই তাঁহার [বাক্যের] দ্বারা হইয়াছিল, যাহা হইয়াছে, তাহার কিছুই তাঁহা ব্যতিরেকে হয় নাই।” ২,০০০ বছরেরও একটু বেশি আগে, ঈশ্বর এই বাক্যকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন, যেখানে বাক্য সিদ্ধ মানুষ যিশু খ্রিস্ট হিসেবে বিশ্বস্তভাবে তাঁর পিতার ইচ্ছা পালন করেছিলেন।—যোহন ১:১-৩, ১৪.

মনুষ্যপূর্ব অস্তিত্বের সময়, ঈশ্বরের পুত্র অনুগতভাবে পিতার “কার্য্যকারী [‘দক্ষ কর্মী,’ ইজি-টু-রিড ভারশন]” হিসেবে সেবা করেন। (হিতো. ৮:৩০) তাঁর মাধ্যমে যিহোবা স্বর্গের আরও লক্ষ লক্ষ আত্মিক প্রাণীকে অস্তিত্বে নিয়ে এসেছেন। (কল. ১:১৬) এই স্বর্গদূতদের সম্বন্ধে বাইবেলের একটা বিবরণ আমাদের বলে: “সহস্রের সহস্র [সদাপ্রভুর] পরিচর্য্যা করিতেছিল, এবং অযুতের অযুত তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান ছিল।” (দানি. ৭:১০) ঈশ্বরের অসংখ্য আত্মিক প্রাণীকে যিহোবার সুসংগঠিত “বাহিনি” হিসেবে উল্লেখ করা হয়।—গীত. ১০৩:২১.

৩. তারা এবং গ্রহের সংখ্যা কতটা ব্যাপক এবং কীভাবে সেগুলো সুসংগঠিত?

 ভৌত সৃষ্টি সম্বন্ধে যেমন, অসংখ্য তারা এবং গ্রহ সম্বন্ধে কী বলা যায়? তারকামণ্ডল সম্বন্ধে টেক্সাসের হিউসটনের ক্রনিকল পত্রিকা এক সাম্প্রতিক গবেষণা সম্বন্ধে বলে, এর সংখ্যা হল “৩০০ সেক্সটিলিয়ন অথবা বিজ্ঞানীরা আগে যে-অনুমান করেছিল, সেটার চেয়ে তিন গুণ বেশি।” সেই রিপোর্টে আরও বলা হয়: “এর অর্থ হল, ৩-এর পরে আরও ২৩টা শূন্য। অথবা ৩ লক্ষ কোটি গুণ ১০ হাজার কোটি।” তারকামণ্ডল বিভিন্ন ছায়াপথের মধ্যে সুসংগঠিত আর প্রতিটা ছায়াপথে কোটি কোটি অথবা এমনকী লক্ষ কোটি তারা ও সেইসঙ্গে অনেক গ্রহ রয়েছে। অধিকাংশ ছায়াপথ আবার দলে সংগঠিত, যেগুলোকে গুচ্ছ বলা হয়। আবার কয়েকটা গুচ্ছ মিলে বড়ো বড়ো গুচ্ছ গঠন করে।

৪. কেন এই উপসংহারে আসা যুক্তিযুক্ত যে, পৃথিবীতেও ঈশ্বরের দাসেরা সুসংগঠিত হবে?

স্বর্গীয় ধার্মিক আত্মিক প্রাণীরা এবং আকাশমণ্ডল অপূর্ব উপায়ে সংগঠিত। (যিশা. ৪০:২৬) তাই, এই উপসংহারে আসা যুক্তিযুক্ত যে, যিহোবা পৃথিবীতে তাঁর দাসদের সংগঠিত করেন। তিনি চান যেন তারা এক উত্তম শৃঙ্খলা বজায় রাখে এবং এটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ কারণ তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক কাজ রয়েছে। অতীতে এবং বর্তমানে যিহোবার উপাসকদের বিশ্বস্ত সেবার চমৎকার নথি জোরালো প্রমাণ দেয় যে, তিনি তাদের সঙ্গে সঙ্গে আছেন এবং তিনি “গোলযোগের ঈশ্বর নহেন, কিন্তু শান্তির।”—পড়ুন, ১ করিন্থীয় ১৪:৩৩, ৪০.

প্রাচীন কালে ঈশ্বরের সংগঠিত লোকেরা

৫. পৃথিবী পরিপূর্ণ করার বিষয়ে মানব পরিবারের জন্য সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা কীভাবে ব্যাহত হয়?

যিহোবা যখন প্রথম মানুষদের সৃষ্টি করেছিলেন, তখন তিনি তাদের বলেছিলেন: “তোমরা প্রজাবন্ত ও বহুবংশ হও, এবং পৃথিবী পরিপূর্ণ ও বশীভূত কর, আর সমুদ্রের মৎস্যগণের উপরে, আকাশের পক্ষিগণের উপরে, এবং ভূমিতে গমনশীল যাবতীয় জীবজন্তুর উপরে কর্ত্তৃত্ব কর।” (আদি. ১:২৮) যিহোবা লক্ষ লক্ষ লোককে একসঙ্গে সৃষ্টি করেননি। তিনি চেয়েছিলেন, আদম ও হবার সন্তান হবে, এরপর আবার তাদের সন্তানদের সন্তান হবে। এভাবে সেই সময় পর্যন্ত চলবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা পৃথিবী পরিপূর্ণ করে। তাদের জন্য ঈশ্বরের উদ্দেশ্য ছিল, তারা পুরো পৃথিবীকে এক পরমদেশে পরিণত করবে। সেই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার পরিপূর্ণতা আদম ও হবার অবাধ্যতার কারণে সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। (আদি. ৩:১-৬) পরবর্তী সময়ে “সদাপ্রভু দেখিলেন, পৃথিবীতে মনুষ্যের দুষ্টতা বড়, এবং তাহার অন্তঃকরণের চিন্তার সমস্ত কল্পনা নিরন্তর কেবল মন্দ।” এর ফলে, “পৃথিবী ঈশ্বরের সাক্ষাতে ভ্রষ্ট, পৃথিবী দৌরাত্ম্যে পরিপূর্ণ ছিল।” তাই, ঈশ্বর পৃথিবীব্যাপী এক জলপ্লাবন নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেন, যা অধার্মিক লোকেদের ধবংস করে দেবে।—আদি. ৬:৫, ১১-১৩, ১৭.

৬, ৭. (ক) কেন নোহ যিহোবার দৃষ্টিতে অনুগ্রহ পেয়েছিলেন? (শুরুতে দেওয়া ছবিটা দেখুন।) (খ) নোহের সময়কার সমস্ত অবিশ্বস্ত লোকেদের কী হয়েছিল?

কিন্তু, “নোহ সদাপ্রভুর দৃষ্টিতে অনুগ্রহ প্রাপ্ত হইলেন” কারণ তিনি “তৎকালিন লোকদের মধ্যে ধার্ম্মিক ও সিদ্ধ [“ত্রুটিহীন,” জুবিলী বাইবেল] লোক ছিলেন।” যেহেতু “নোহ ঈশ্বরের সহিত গমনাগমন করিতেন,” তাই যিহোবা তাকে এক বিরাট জাহাজ নির্মাণ করার নির্দেশ দেন। (আদি. ৬:৮, ৯, ১৪-১৬) মানুষ এবং পশুপাখির জীবন রক্ষা করার জন্য এর নকশা একেবারে উপযুক্ত ছিল। বাধ্যতার সঙ্গে, “নোহ সদাপ্রভুর আজ্ঞানুসারে সকল কর্ম্ম করিলেন” এবং তার পরিবারের সাহায্যে তিনি এক সুসংগঠিত উপায়ে নির্মাণ কাজ শেষ করেন। জীবিত প্রাণীদের জাহাজে নিয়ে আসার পর “সদাপ্রভু . . . পশ্চাৎ দ্বার বদ্ধ করিলেন।”—আদি. ৭:৫, ১৬.

খ্রিস্টপূর্ব ২৩৭০ সালে যখন জলপ্লাবন হয়, তখন যিহোবা “ভূমণ্ডল-নিবাসী সমস্ত প্রাণী . . . উচ্ছিন্ন” করেন, কিন্তু তিনি বিশ্বস্ত নোহ ও তার পরিবারকে জাহাজের মধ্যে সুরক্ষিত রাখেন। (আদি. ৭:২৩) বর্তমানে, পৃথিবীর সমস্ত লোক নোহ ও তার ছেলেদের এবং তাদের স্ত্রীদের বংশধর। কিন্তু, জাহাজের বাইরে সমস্ত অবিশ্বস্ত লোক ধবংস হয়েছিল কারণ তারা “ধার্ম্মিকতার প্রচারক” নোহের কথা শুনতে প্রত্যাখ্যান করেছিল।—২ পিতর ২:৫.

বিভিন্ন বিষয় উত্তমভাবে সংগঠিত করার ফলে আট জন ব্যক্তি জলপ্লাবন থেকে রক্ষা পেয়েছিল (৬, ৭ অনুচ্ছেদ দেখুন)

৮. ঈশ্বর যখন তাঁর লোকেদের প্রতিজ্ঞাত দেশে প্রবেশ করার নির্দেশ দেন, তখন সুসংগঠিত করার কোন প্রমাণ দেখা যায়?

 জলপ্লাবনের ৮০০ বছরেরও বেশি সময় পর, ঈশ্বর ইস্রায়েলীয়দেরকে একটা জাতি হিসেবে সংগঠিত করেন। তিনি তাদের জীবনের সমস্ত দিককে সুসংগঠিত করেছিলেন, বিশেষভাবে তাদের উপাসনা সম্বন্ধে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ, ইস্রায়েলে অসংখ্য যাজক এবং লেবীয় ছিল আর সেইসঙ্গে “সমাগম-তাম্বুর দ্বারসমীপে সেবার্থে শ্রেণীভূত” বা সুসংগঠিত ‘স্ত্রীলোকেরা’ ছিল। (যাত্রা. ৩৮:৮) কিন্তু, যিহোবা ঈশ্বর যখন ইস্রায়েল জাতিকে কনান দেশে প্রবেশ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন সেই জাতি অবিশ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল আর তাই ঈশ্বর তাদেরকে বলেছিলেন: “আমি তোমাদিগকে যে দেশে বাস করাইব বলিয়া হস্ত উত্তোলন করিয়াছিলাম, সেই দেশে তোমরা প্রবেশ করিবে না, কেবল যিফূন্নির পুত্ত্র কালেব ও নূনের পুত্ত্র যিহোশূয় প্রবেশ করিবে” কারণ প্রতিজ্ঞাত দেশ নিরীক্ষণ করার পর তারা উত্তম সংবাদ নিয়ে এসেছিল। (গণনা. ১৪:৩০, ৩৭, ৩৮) ঈশ্বরের নির্দেশনার সঙ্গে মিল রেখে পরবর্তী সময়ে মোশি তার উত্তরসূরি যিহোশূয়কে আজ্ঞা দিয়েছিলেন। (গণনা. ২৭:১৮-২৩) যিহোশূয় যখন ইস্রায়েলীয়দের কনানে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন, তখন তাকে বলা হয়েছিল: “তুমি বলবান হও ও সাহস কর, মহাভয়ে ভীত কি নিরাশ হইও না; কেননা তুমি যে কোন স্থানে যাও, সেই স্থানে তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমার সহবর্ত্তী।”—যিহো. ১:৯.

৯. যিহোবা এবং তাঁর লোকেদের প্রতি রাহবের কেমন মনোভাব ছিল?

যিহোশূয় যেখানেই গিয়েছিলেন, যিহোবা ঈশ্বর আসলেই তার সঙ্গে ছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ, ইস্রায়েলীয়রা যখন কনানীয় নগর যিরীহোর কাছাকাছি শিবিরস্থাপন করেছিল, তখন যা ঘটেছিল, তা বিবেচনা করুন। ১৪৭৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, যিহোশূয় দু-জন ব্যক্তিকে যিরীহো নগর নিরীক্ষণ করতে পাঠান এবং সেখানে রাহব বেশ্যার সঙ্গে তাদের দেখা হয়। রাহব সেই দু-জনকে তার বাড়ির ছাদে লুকিয়ে রাখেন এবং যিরীহোর রাজা সেই লোকেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য যাদের পাঠান, তাদের হাত থেকে রক্ষা করেন। রাহব ইস্রায়েলীয় গুপ্তচরদের বলেন: ‘আমি জানি, সদাপ্রভু তোমাদিগকে এই দেশ দিয়াছেন, কেননা সদাপ্রভু তোমাদের সম্মুখে কি প্রকারে সূফসাগরের জল শুষ্ক করিয়াছিলেন, এবং তোমরা ইমোরীয়দের দুই রাজার প্রতি যাহা করিয়াছ, তাহা আমরা শুনিলাম।’ তিনি  আরও বলেন: “তোমাদের ঈশ্বর সদাপ্রভু উপরিস্থ স্বর্গে ও নীচস্থ পৃথিবীতে ঈশ্বর।” (যিহো. ২:৯-১১) যেহেতু রাহব সেই সময় যিহোবার সংগঠনকে সমর্থন করেছিলেন, তাই ঈশ্বর লক্ষ রেখেছিলেন, ইস্রায়েলীয়রা যখন যিরীহো নগর জয় করে, তখন তিনি এবং তার পরিবারের লোকেরা যেন রক্ষা পায়। (যিহো. ৬:২৫) রাহব বিশ্বাস, যিহোবার প্রতি সশ্রদ্ধ ভয় এবং তাঁর লোকেদের জন্য সম্মান দেখিয়েছিলেন।

প্রথম শতাব্দীতে এক অগ্রগতিশীল সংগঠন

১০. যিশু তাঁর দিনের যিহুদি ধর্মীয় নেতাদের কী বলেছিলেন এবং কেন তিনি এইরকম উক্তি করেছিলেন?

১০ যিহোশূয়ের নেতৃত্বে, ইস্রায়েলের লোকেরা একটার পর একটা কনানীয় নগর জয় করেছিল। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে কী ঘটে? শত শত বছরেরও বেশি সময় ধরে ইস্রায়েলীয়রা বার বার ঈশ্বরের আইন লঙ্ঘন করে। যে-সময়ে যিহোবা তাঁর পুত্রকে পৃথিবীতে পাঠান, তখন তারা ঈশ্বরের প্রতি বাধ্যতা এবং তাঁর মুখপাত্রের কথা শোনার ক্ষেত্রে একেবারে ব্যর্থ হয়েছিল। তাই যিশু যিরূশালেম সম্বন্ধে বলেছিলেন, “তুমি ভাববাদিগণকে বধ করিয়া থাক।” (পড়ুন, মথি ২৩:৩৭, ৩৮.) যিহুদি ধর্মীয় নেতারা যেহেতু তাঁর প্রতি অবিশ্বস্ত হয়ে পড়েছিল, তাই ঈশ্বর তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই কারণে যিশু তাদেরকে বলেছিলেন: “তোমাদের নিকট হইতে ঈশ্বরের রাজ্য কাড়িয়া লওয়া যাইবে, এবং এমন এক জাতিকে দেওয়া হইবে, যে জাতি তাহার ফল দিবে।”—মথি ২১:৪৩.

১১, ১২. (ক) কী প্রমাণ দেয় যে, প্রথম শতাব্দীতে যিহোবা যিহুদি জাতির পরিবর্তে আরেকটা নতুন সংগঠনের ওপর আশীর্বাদ বর্ষণ করেন? (খ) কারা ঈশ্বরের দ্বারা অনুমোদিত নতুন সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত ছিল?

১১ প্রথম খ্রিস্টাব্দে যিহোবা অবিশ্বস্ত ইস্রায়েল জাতিকে পরিত্যাগ করেন। কিন্তু, এর অর্থ এই ছিল না যে, পৃথিবীতে তাঁর অনুগত দাসদের কোনো সংগঠন থাকবে না। ইস্রায়েল জাতির পরিবর্তে তিনি এক নতুন অগ্রগতিশীল সংগঠনের ওপর আশীর্বাদ বর্ষণ করেন, যে-সংগঠন যিশু খ্রিস্ট এবং তাঁর শিক্ষাগুলো মেনে চলত। এর শুরু হয়েছিল ৩৩ খ্রিস্টাব্দের পঞ্চাশত্তমীর দিনে। সেই সময় যিশুর প্রায় ১২০ জন শিষ্য যখন যিরূশালেমের একটা স্থানে একত্রিত হয়েছিল, তখন “হঠাৎ আকাশ হইতে প্রচণ্ড বায়ুর বেগের শব্দবৎ একটা শব্দ আসিল, এবং যে গৃহে তাঁহারা বসিয়াছিলেন, সেই গৃহের সর্ব্বত্র ব্যাপ্ত হইল।” এরপর “অংশ অংশ হইয়া পড়িতেছে, এমন অনেক অগ্নিবৎ জিহ্বা তাঁহাদের দৃষ্টিগোচর হইল; এবং তাঁহাদের প্রত্যেক জনের উপরে বসিল। তাহাতে তাঁহারা সকলে পবিত্র আত্মায় পরিপূর্ণ হইলেন, এবং আত্মা তাঁহাদিগকে যেরূপ বক্তৃতা দান করিলেন, তদনুসারে অন্য অন্য ভাষায় কথা কহিতে লাগিলেন।” (প্রেরিত ২:১-৪) এই বিস্ময়কর ঘটনা নিশ্চিত প্রমাণ দিয়েছিল যে, যিহোবা খ্রিস্টের শিষ্যদের নিয়ে গঠিত তাঁর নতুন সংগঠনকে সমর্থন করছেন।

১২ সেই রোমাঞ্চকর দিনে যিশুর অনুসারীদের সঙ্গে ‘কমবেশ তিন হাজার লোক সংযুক্ত হইয়াছিল।’ এ ছাড়া, ‘যাহারা পরিত্রাণ পাইতেছিল, প্রভু [ঈশ্বর] দিন দিন তাহাদিগকে তাহাদের সহিত সংযুক্ত করিয়াছিলেন।’ (প্রেরিত ২:৪১, ৪৭) প্রথম শতাব্দীর প্রচারকদের কাজ এতটাই কার্যকরী ছিল যে, “ঈশ্বরের বাক্য ব্যাপিয়া গেল, এবং যিরূশালেমে শিষ্যদের সংখ্যা অতিশয় বৃদ্ধি পাইতে লাগিল।” এমনকী “যাজকদের মধ্যে বিস্তর লোক বিশ্বাসের বশবর্ত্তী হইল।” (প্রেরিত ৬:৭) এভাবে অনেক আন্তরিক ব্যক্তি, এই নতুন সংগঠনের সদস্যদের দ্বারা ঘোষিত সত্য গ্রহণ করেছিল। পরবর্তী সময়ে, যিহোবা যখন “পরজাতীয়দের” খ্রিস্টীয় মণ্ডলীতে আনতে শুরু করেছিলেন, তখন তিনি একইরকম সমর্থনের প্রমাণ দিয়েছিলেন।—পড়ুন, প্রেরিত ১০:৪৪, ৪৫.

১৩. পৃথিবীতে ঈশ্বরের নতুন সংগঠনের কাজ কী ছিল?

১৩ ঈশ্বর প্রদত্ত কাজের ব্যাপারে খ্রিস্টের অনুসারীদের কোনো সন্দেহ ছিল না। যিশু নিজে তাদের জন্য উদাহরণস্থাপন করেছিলেন কারণ তাঁর বাপ্তিস্মের পর পরই তিনি “স্বর্গ-রাজ্য” সম্বন্ধে প্রচার করতে শুরু করেছিলেন। (মথি ৪:১৭) যিশু তাঁর শিষ্যদের একই কাজ করার জন্য শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেছিলেন: “তোমরা যিরূশালেমে, সমুদয় যিহূদীয়া ও শমরিয়া দেশে, এবং পৃথিবীর প্রান্ত পর্য্যন্ত আমার সাক্ষী হইবে।” (প্রেরিত ১:৮) খ্রিস্টের প্রাথমিক অনুসারীরা স্পষ্টভাবে বুঝতে  পেরেছিল যে, তাদের কাছ থেকে কী চাওয়া হচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ, পিষিদিয়ার আন্তিয়খিয়ায় পৌল এবং বার্ণবা সাহসের সঙ্গে তাদের যিহুদি বিরোধীদের বলেছিল: “প্রথমে তোমাদেরই নিকটে ঈশ্বরের বাক্য প্রচার করা যায়, ইহা আবশ্যক ছিল; তোমরা যখন তাহা ঠেলিয়া ফেলিতেছ, এবং আপনাদিগকে অনন্ত জীবনের অযোগ্য বিবেচনা করিতেছ, তখন দেখ, আমরা পরজাতিগণের দিকে ফিরিতেছি। কেননা প্রভু [ঈশ্বর] আমাদিগকে এইরূপ আজ্ঞা দিয়াছেন, ‘আমি তোমাকে জাতিগণের দীপ্তিস্বরূপ করিয়াছি, যেন তুমি পৃথিবীর সীমা পর্য্যন্ত পরিত্রাণস্বরূপ হও।’” (প্রেরিত ১৩:১৪, ৪৫-৪৭) প্রথম শতাব্দী থেকে ঈশ্বরের সংগঠনের পার্থিব অংশ পরিত্রাণের বিষয়ে তাঁর ব্যবস্থা সম্বন্ধে জানিয়ে আসছে।

অনেকে ধবংস হয় কিন্তু ঈশ্বরের দাসেরা রক্ষা পায়

১৪. প্রথম শতাব্দীর যিরূশালেমের প্রতি কী ঘটেছিল কিন্তু কারা রক্ষা পেয়েছিল?

১৪ সাধারণ যিহুদিরা সুসমাচার গ্রহণ করেনি আর তাই তাদের ওপর বিপর্যয় আসে কারণ যিশু তাঁর শিষ্যদের এই সতর্কবাণী দিয়েছিলেন: “যখন তোমরা যিরূশালেমকে সৈন্যসামন্ত দ্বারা বেষ্টিত দেখিবে, তখন জানিবে যে, তাহার ধবংস সন্নিকট। তখন যাহারা যিহূদিয়ায় থাকে, তাহারা পাহাড় অঞ্চলে পলায়ন করুক, এবং যাহারা নগরের মধ্যে থাকে, তাহারা বাহিরে যাউক; আর যাহারা পল্লীগ্রামে থাকে, তাহারা নগরে প্রবেশ না করুক।” (লূক ২১:২০, ২১) যিশু যা ভবিষ্যদ্‌বাণী করেছিলেন, তা-ই ঘটেছিল। যিহুদি বিদ্রোহের কারণে ৬৬ খ্রিস্টাব্দে সেস্টিয়াস গ্যালাসের অধীনে রোমীয় সেনাবাহিনী যিরূশালেম অবরোধ করে। কিন্তু, হঠাৎ করে সেই অবরোধ প্রত্যাহার করা হয় আর এর ফলে যিরূশালেম এবং যিহূদিয়ায় বসবাসরত যিশুর অনুসারীরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। ইতিহাসবেত্তা ইউসেবিয়াসের কথা অনুসারে, অনেকে যর্দন নদী পার হয়ে পিরিয়ার পেল্লায় পালিয়ে যায়। ৭০ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি টাইটাসের নেতৃত্বে রোমীয় সেনাবাহিনী ফিরে আসে এবং যিরূশালেমকে ধবংস করে দেয়। কিন্তু, বিশ্বস্ত খ্রিস্টানরা রক্ষা পায় কারণ তারা যিশুর সতর্কবাণীতে মনোযোগ দেয়।

১৫. কী সত্ত্বেও খ্রিস্টধর্ম সমৃদ্ধি লাভ করেছিল?

১৫ খ্রিস্টের অনুসারীরা কষ্ট, তাড়না এবং বিশ্বাসের অন্যান্য পরীক্ষা সহ্য করা সত্ত্বেও, প্রথম শতাব্দীতে খ্রিস্টধর্ম সমৃদ্ধি লাভ করে। (প্রেরিত ১১:১৯-২১; ১৯:১, ১৯, ২০) সেই প্রাথমিক খ্রিস্টানরা আধ্যাত্মিকভাবে উন্নতি লাভ করে কারণ তাদের ওপর ঈশ্বরের আশীর্বাদ ছিল।—হিতো. ১০:২২.

১৬. আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে সফল হওয়ার জন্য প্রত্যেক খ্রিস্টানকে কী করতে হয়েছিল?

১৬ আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে সফল হওয়ার জন্য প্রত্যেক খ্রিস্টানকে ব্যক্তিগতভাবে প্রচেষ্টা করতে হয়েছিল। শাস্ত্র নিয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা, উপাসনার জন্য নিয়মিতভাবে সভাতে উপস্থিত হওয়া এবং রাজ্যের প্রচার কাজে উদ্যোগের সঙ্গে অংশ নেওয়া অপরিহার্য ছিল। এই বিষয়গুলো সেই সময় যিহোবার লোকেদের আধ্যাত্মিক অবস্থাকে ভালো রেখেছিল এবং তাদের একতায় অবদান রেখেছিল, যেমনটা আজকেও রাখে। যে-ব্যক্তিরা প্রথম শতাব্দীর সুসংগঠিত মণ্ডলীগুলোর সঙ্গে মেলামেশা করেছিল, তারা অধ্যক্ষ এবং পরিচারক দাসদের ইচ্ছুক মনোভাব এবং সদয় প্রচেষ্টা থেকে প্রচুর উপকার লাভ করেছিল। (ফিলি. ১:১; ১ পিতর ৫:১-৪) আর পৌলের মতো প্রাচীনরা যখন ভ্রমণ অধ্যক্ষ হিসেবে মণ্ডলীগুলো পরিদর্শন করত, তখন তা কতই-না আনন্দজনক হতো! (প্রেরিত ১৫:৩৬, ৪০, ৪১) আমাদের এবং প্রথম শতাব্দীর উপাসনার মধ্যে যে-সাদৃশ্য রয়েছে, তা উল্লেখযোগ্য। যিহোবা সেই সময়ে এবং বর্তমানে তাঁর দাসদের সুসংগঠিত করেছেন বলে আমরা কতই-না কৃতজ্ঞ! *

১৭. পরবর্তী প্রবন্ধে কী আলোচনা করা হবে?

১৭ এই শেষকালে শয়তানের জগতের শেষ যতই এগিয়ে আসছে, যিহোবার সর্বজনীন সংগঠনের পার্থিব অংশ আগের চেয়ে এখন আরও দ্রুত সামনের দিকে যাচ্ছে। আপনি কি এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছেন? আপনি কি আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে উন্নতি করে চলছেন? পরবর্তী প্রবন্ধ দেখাবে যে, কীভাবে আপনি তা করতে পারেন।

^ অনু. 16 ২০০২ সালের ১৫ জুলাই প্রহরীদুর্গ পত্রিকায় “খ্রীষ্টানরা আত্মায় ও সত্যে উপাসনা করেন” এবং “তারা সত্যে চলা বজায় রাখেন” শিরোনামের প্রবন্ধ দেখুন। বর্তমানে ঈশ্বরের সংগঠনের পার্থিব অংশ সম্বন্ধে আরও বিস্তারিত আলোচনার জন্য আজকে কারা যিহোবার ইচ্ছা পালন করছে? শিরোনামের ব্রোশার দেখুন।