সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  মার্চ ২০১৪

বয়স্ক ব্যক্তিদের যত্ন নেওয়া

বয়স্ক ব্যক্তিদের যত্ন নেওয়া

“বৎসেরা, আইস, আমরা বাক্যে কিম্বা জিহ্বাতে নয়, কিন্তু কার্য্যে ও সত্যে প্রেম করি।”—১ যোহন ৩:১৮.

১, ২. (ক) অনেক পরিবার কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয় এবং কোন প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হয়? (খ) বাবা-মা এবং সন্তানরা কীভাবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে?

আপনি যখন বুঝতে পারেন যে, একসময় আপনার যে-বাবা-মা সুস্থসবল এবং স্বনির্ভরশীল ছিল, তারা এখন আর নিজেরা নিজেদের দেখাশোনা করতে পারে না, তখন খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক। হতে পারে মা অথবা বাবা পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে ফেলেছে কিংবা দিকভ্রান্ত হয়ে কোথাও চলে গিয়েছিল অথবা তাদের গুরুতর কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা ধরা পড়েছে। এ ছাড়া, বাবা-মায়েরও বিভিন্ন দুঃশ্চিন্তা রয়েছে। শারীরিক পরিবর্তন অথবা অন্যান্য পরিস্থিতির কারণে তাদের স্বাধীনতা কিছুটা কমে গিয়েছে বলে, তা মেনে নেওয়া হয়তো বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য কঠিন বলে মনে হতে পারে। (ইয়োব ১৪:১) কী করা যেতে পারে? কীভাবে তাদের যত্ন নেওয়া যেতে পারে?

বয়স্ক ব্যক্তিদের যত্ন নেওয়ার বিষয়ে একটা প্রবন্ধ বলে: “যদিও বার্ধক্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা কঠিন বলে মনে হয় কিন্তু যে-পরিবার বিভিন্ন বাছাই নিয়ে আলোচনা করে আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখে, সেই পরিবার ভবিষ্যতে যা-ই ঘটুক না কেন, তা সুন্দরভাবে মোকাবিলা করতে পারে।” আমরা যখন স্বীকার করি যে, বার্ধক্যের কারণে বিভিন্ন পরীক্ষা আসবেই, তখন আমরা উপলব্ধি করতে পারি, এই ধরনের আলোচনা সত্যিই অনেক মূল্যবান। তবে, আমরা কিছু প্রস্তুতি নিতে এবং আগাম সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখতে পারি। আসুন আমরা বিবেচনা করে দেখি, কীভাবে পরিবারগুলো এইরকম কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাটিয়ে ওঠার জন্য পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে প্রেমের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারে।

 ‘দুঃসময়ের’ জন্য পরিকল্পনা করা

৩. বয়স্ক বাবা-মায়ের যখন ক্রমান্বয়ে সাহায্যের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন পরিবারগুলো হয়তো কী করতে পারে? (শুরুতে দেওয়া ছবিটা দেখুন।)

এমন একটা সময় আসে, যখন বেশির ভাগ বয়স্ক ব্যক্তিই পুরোপুরিভাবে নিজেদের যত্ন আর নিজেরা নিতে পারে না; তাদের কিছুটা সাহায্যের প্রয়োজন হয়। (পড়ুন, উপদেশক ১২:১-৭.) বয়স্ক বাবা-মায়েরা যখন আর নিজেরাই সমস্তকিছু সামাল দিতে পারে না, তখন বাবা-মা এবং প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের, কোনটা সবচেয়ে ভালো সাহায্য হবে, তা নির্ধারণ করা এবং যুক্তিযুক্ত সমাধানের ব্যবস্থা করা উচিত। সহযোগিতা, প্রয়োজন এবং বিভিন্ন উপায় নিয়ে পরিবারগতভাবে আলোচনা করা সাধারণত বিজ্ঞতার কাজ। এর সঙ্গে জড়িত সকলের, বিশেষভাবে বাবা-মায়ের খোলাখুলিভাবে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করা এবং বিভিন্ন বিষয় বাস্তবসম্মত উপায়ে তুলে ধরা উচিত। বাড়তি সাহায্য পেলে বাবা-মা নিজেরাই নিজেদের বাড়িতে নিরাপদে থাকতে পারবে কি না, সেই বিষয়টা নিয়ে হয়তো তারা আলোচনা করতে পারে। * অথবা বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করার জন্য প্রত্যেক আত্মীয় কীভাবে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করতে পারে, সেটাও বিবেচনা করা যেতে পারে। (হিতো. ২৪:৬) উদাহরণ স্বরূপ, কেউ কেউ হয়তো কাছে থেকেই প্রতিদিন যত্ন নিতে, আবার কেউ কেউ আরেকটু বেশি টাকা দিয়ে সাহায্য প্রদান করতে পারে। সবার এই বিষয়টা বুঝতে হবে যে, তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা রয়েছে; তবে সময়ে সময়ে এই ভূমিকা পরিবর্তিত হতে এবং পালাক্রমে সেই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার বিষয়টা বিবেচনা করে দেখতে হতে পারে।

৪. পরিবারের সদস্যরা কোথা থেকে সাহায্য পেতে পারে?

আপনি যখন যত্ন নিতে শুরু করেন, তখন আপনার বাবা-মায়ের অবস্থা সম্বন্ধে যতটুকু সম্ভব জানার জন্য সময় করে নিন। বাবা অথবা মা যদি, দিন দিন খারাপের দিকে যায় এমন রোগে আক্রান্ত হন, তাহলে এর কারণে ভবিষ্যতে কোন কোন সমস্যা দেখা দিতে পারে, সেগুলো জেনে নিন। (হিতো. ১:৫) সেই সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করুন, যেগুলো বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য সেবা প্রদান করে থাকে। কোন ধরনের সামাজিক সুযোগ-সুবিধা পেলে আপনার কাজ আরও সহজ হয়ে উঠবে এবং আপনি আরও ভালোভাবে যত্ন নিতে পারবেন, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। পরিবারের মধ্যে আসন্ন পরিবর্তনের কারণে আপনি হয়তো আবেগগতভাবে চাপের মুখোমুখি হতে পারেন যেমন, হারানোর ভয়, মানসিক আঘাত অথবা বিহ্বল হয়ে পড়া। আপনার এই বিষয়গুলো নিয়ে কোনো বিশ্বস্ত বন্ধুর সঙ্গে কথা বলুন। সর্বোপরি, মন খুলে যিহোবার কাছে প্রার্থনা করুন। তিনি আপনাকে মনের শান্তি দেবেন, যা যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য আপনার প্রয়োজন।—গীত. ৫৫:২২; হিতো. ২৪:১০; ফিলি. ৪:৬, ৭.

৫. বয়স্ক ব্যক্তিদের যত্নের বিষয়ে আগে থেকেই তথ্য সংগ্রহ করে রাখা কেন বিজ্ঞতার কাজ?

কিছু বয়স্ক ব্যক্তি এবং তাদের পরিবার, যত্ন নেওয়ার বিষয়ে বিজ্ঞতার সঙ্গে আগে থেকেই তথ্য সংগ্রহ করে রাখে। উদাহরণ স্বরূপ, বাবা অথবা মায়ের পক্ষে কোনো ছেলের অথবা মেয়ের সঙ্গে থাকাটা, বৃদ্ধাশ্রমের সাহায্য নেওয়া এবং স্থানীয় সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করাটা ব্যাবহারিক হবে কি না, তা জেনে নেওয়া যেতে পারে। তারা আগে থেকেই ভাবী ‘ক্লেশ ও দুঃখ’ সম্বন্ধে বুঝতে এবং সেগুলোর জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে। (গীত. ৯০:১০) বেশির ভাগ পরিবারই আগে থেকে পরিকল্পনা করে না আর তাই যখন কোনো সংকট দেখা দেয়, তখন তারা তাড়াহুড়ো করে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। এই “সময়টা সবসময়ই এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সবচেয়ে খারাপ সময়,” একজন বিশেষজ্ঞ বলেন। এইরকম কঠিন সময়ে পরিবারের সদস্যরা উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়তে পারে আর এতে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, যদি অনেক আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যে-রদবদলগুলো করার প্রয়োজন হয়, সেগুলো কম দুঃখজনক হয়ে থাকে।—হিতো. ২০:১৮.

কীভাবে প্রয়োজনগুলো পূরণ করা যেতে পারে, সেটা নিয়ে আলোচনা করার জন্য একটা পরিবার একত্রিত হতে পারে (৬-৮ অনুচ্ছেদ দেখুন)

৬. কীভাবে বাবা-মা ও সেইসঙ্গে সন্তানরা, বয়স্ক ব্যক্তিদের থাকার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা থেকে উপকার লাভ করতে পারে?

বাবা-মায়ের থাকার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে পরিবর্তন করার বিষয়টা নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতে আপনার হয়তো অস্বস্তি লাগতে পারে। কিন্তু, অনেকে বলেছে যে, পরবর্তী সময়ে এই ধরনের আলোচনা অনেক উপকারজনক হয়েছে। কেন? কারণ এর ফলে এক প্রেমময় ও সদয় পরিবেশে ব্যাবহারিক পরিকল্পনা করার সুযোগ পাওয়া গিয়েছে। তারা লক্ষ করেছে যে, এইরকম প্রেমময় এবং সদয় পরিবেশে আগে থেকেই পরস্পরের  দৃষ্টিভঙ্গি সম্বন্ধে জানার ফলে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছে, তখন তা সহজেই নেওয়া গিয়েছে। মাঝে মাঝে বয়স্ক ব্যক্তিরা একা একা বাস করতে এবং যতটা সম্ভব নিজেদের পরিস্থিতি নিজেরাই সামাল দিতে চায়। কিন্তু যখন প্রয়োজন দেখা দেবে, তখন তারা কোন ধরনের যত্ন পেতে চায়, সেই বিষয়টা নিয়ে যদি আগে থেকেই সন্তানদের সঙ্গে আলোচনা করে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তা উপকারজনক হবে।

৭, ৮. কোন বিষয়গুলো নিয়ে পরিবারের সদস্যদের আলোচনা করা উচিত এবং কেন?

বাবা-মায়েরা, এইরকম আলোচনার সময়ে আপনাদের পরিবারের কাছে নিজেদের ইচ্ছা, আর্থিক সামর্থ্য এবং পছন্দের বিষয়ে খোলাখুলিভাবে কথা বলুন। এর ফলে, আপনারা যখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে থাকবেন না, তখন তাদের জন্য উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ হয়ে উঠবে। তারা হয়তো আপনার ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখাতে এবং যতটা সম্ভব আপনার স্বাধীনতা বজায় রাখতে চাইবে। (ইফি. ৬:২-৪) উদাহরণ স্বরূপ, আপনি কি আপনার কোনো সন্তানের কাছে গিয়ে তার পরিবারের সঙ্গে থাকতে চান, না কি অন্য কিছু আশা করেন? বাস্তববাদী হোন এবং মনে রাখবেন যে, সকলে হয়তো বিভিন্ন বিষয়কে আপনার মতো করে দেখবে না এবং বাবা-মা কিংবা সন্তানের পক্ষে চিন্তাভাবনা রদবদল করার জন্য সময়ের প্রয়োজন।

সকলের এটা বোঝা উচিত যে, পরিকল্পনা এবং আলোচনা করার মাধ্যমে সমস্যা এড়ানো যেতে পারে। (হিতো. ১৫:২২) এই আলোচনার মধ্যে কোন ধরনের চিকিৎসা গ্রহণ করতে চান, সেই বিষয়টাও যুক্ত রয়েছে। যিহোবার সাক্ষিদের দ্বারা ব্যবহৃত ডিপিএ কার্ডের মধ্যে যে-বিষয়গুলো রয়েছে, সেগুলো স্পষ্টতই এই আলোচনার সময় উল্লেখ করতে হবে। কোন ধরনের চিকিৎসা পাওয়া যাবে, সেই সম্বন্ধে জানার এবং নির্দিষ্ট একটা চিকিৎসা গ্রহণ করার কিংবা তা প্রত্যাখ্যান করার অধিকার একজন ব্যক্তির রয়েছে। এই ক্ষেত্রে চিকিৎসা সংক্রান্ত অগ্রিম নির্দেশিকার মধ্যে একজন ব্যক্তির ইচ্ছা সম্বন্ধে উল্লেখ করা থাকে। ডিপিএ কার্ডে উল্লেখিত নির্ভরযোগ্য একজন প্রতিনিধি (যেখানে বৈধ এবং গ্রহণযোগ্য) প্রয়োজনের সময় উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা উচিত, যাতে দরকারের সময় সেগুলো ব্যবহার করা যায়। কেউ কেউ তাদের উইলের সঙ্গে অথবা বিমা, টাকাপয়সা, সরকারি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের সঙ্গে এই কপিগুলো রেখে দেয়।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিগুলোর সঙ্গে সফলভাবে মোকাবিলা করা

৯, ১০. সন্তানদের কাছ থেকে বাবা-মায়েদের কখন আরও বেশি সাহায্যের প্রয়োজন?

অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা এবং সন্তান এই বিষয়ে একমত হয় যে, বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষমতা এবং সীমাবদ্ধতা অনুযায়ী যতটা সম্ভব, তারা যেন ততটা স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে। তারা হয়তো রান্না করতে, ওষুধপত্র গ্রহণ করতে এবং কোনো সমস্যা ছাড়াই যোগাযোগ করতে পারে। তাই, তারা তাদের সন্তানদের এই নিশ্চয়তা দেয় যে, তাদের রোজকার জীবনে সন্তানদের অতিরিক্ত জড়িত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মায়েদের পক্ষে যদি চলাফেরা করাটা কঠিন হয়ে পড়ে, তারা যদি দোকানে যেতে না পারে অথবা তাদের মধ্যে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে শুরু করে, তাহলে সন্তানদের সাহায্য করার প্রয়োজন হতে পারে।

১০ বয়সের কারণে বিভ্রান্তি, বিষণ্ণতা, মলমূত্রের বেগ ধারণে অক্ষমতা এবং শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও স্মৃতিশক্তি হ্রাস পেতে পারে; কিন্তু এইরকম কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা  দেখা দিলেও সেগুলোর সঙ্গে সফলভাবে মোকাবিলা করা যেতে পারে। এইরকম কিছু দেখা দিলেই চিকিৎসা শুরু করুন। এই ক্ষেত্রে হয়তো সন্তানদের পদক্ষেপ নিতে হবে। একটা পর্যায়ে গিয়ে, তাদের হয়তো বাবা-মায়ের সেই ব্যক্তিগত কাজগুলোর ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব নিতে হতে পারে, যেগুলো বাবা-মায়েরা আগে নিজেরা করত। সঠিকভাবে বাবা-মায়ের যত্ন নিতে চাইলে সন্তানদেরই হয়তো তাদের উকিল, সচিব, ড্রাইভার এবং অন্যান্য চরিত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে।—হিতো. ৩:২৭.

১১. সমাধানযোগ্য নয় এমন পরিবর্তনগুলোর প্রভাব হ্রাস করার জন্য কী করা যেতে পারে?

১১ আপনার বাবা-মায়ের সমস্যা যদি সমাধানযোগ্য না হয়, তাহলে তাদের যত্ন নেওয়ার অথবা জীবনযাপনের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। পরিবর্তনগুলো যত ছোটো হবে, সেগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া হয়তো তত সহজ হবে। আপনি যদি আপনার বাবা-মায়ের কাছ থেকে কিছুটা দূরে বাস করেন, তাহলে হয়তো কোনো সহ-সাক্ষি অথবা প্রতিবেশী নিয়মিতভাবে তাদের সঙ্গে দেখা করে আপনাকে আপনার বাবা-মায়ের খবরাখবর জানালেই কি যথেষ্ট হবে? তাদের কি কেবল রান্নাবান্না এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে সাহায্যের প্রয়োজন? ঘরে ছোটোখাটো রদবদল করা হলে কি তাদের পক্ষে চলাফেরা, স্নান এবং অন্যান্য বিষয় করতে সহজ ও নিরাপদ হবে? বয়স্ক ব্যক্তিরা যতটুকু স্বাধীনতা উপভোগ করতে চায়, সেটার জন্য তাদের হয়তো শুধু যে-বিষয়টার প্রয়োজন, তা হল একজন গৃহপরিচারকের সাহায্য। কিন্তু, একাকী থাকাটা যদি তাদের পক্ষে নিরাপদ না হয়, তাহলে আরও স্থায়ী কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, স্থানীয় কোন সেবাগুলো পাওয়া যেতে পারে, তা খুঁজে বের করুন। *—পড়ুন, হিতোপদেশ ২১:৫.

কেউ কেউ যেভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাটিয়ে উঠেছে

১২, ১৩. বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে বাস করে এমন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরা কীভাবে ক্রমাগত বাবা-মায়েদের প্রতি সম্মান দেখাতে এবং তাদের যত্ন নিতে পারে?

১২ প্রেমময় সন্তানরা চায় যেন তাদের বাবা-মা স্বচ্ছন্দ বোধ করে। তাদের যত্ন নেওয়া হচ্ছে, এই বিষয়টা জানা সন্তানদের যথেষ্ট মনের শান্তি প্রদান করে। কিন্তু, বিভিন্ন দায়িত্বের কারণে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান তাদের বাবা-মায়ের কাছাকাছি বাস করতে পারে না। এইরকম ক্ষেত্রে কেউ কেউ ছুটি নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যায় এবং তাদের প্রয়োজনগুলোর যত্ন নিয়ে থাকে ও সেইসঙ্গে ঘরের ছোটোখাটো কাজগুলো করে দেয়, যেগুলো বাবা-মা এখন আর করতে পারে না। নিয়মিতভাবে, সম্ভব হলে এমনকী প্রতিদিন টেলিফোন করা, চিঠি লেখা অথবা ই-মেইল পাঠানো বাবা-মায়েদের এই নিশ্চয়তা দেয় যে, তারা ভালোবাসার পাত্র।—হিতো. ২৩:২৪, ২৫.

১৩ পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, আপনার বাবা-মাকে রোজ যেভাবে যত্ন নেওয়া হয়, সেটা বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। আপনি যদি তাদের কাছাকাছি বাস না করেন এবং আপনার বাবা-মা যদি সাক্ষি হয়ে থাকে, তাহলে আপনি তাদের মণ্ডলীর প্রাচীনদের সঙ্গে কথা বলতে এবং তাদের পরামর্শ চাইতে পারেন। আর বিষয়টা নিয়ে প্রার্থনা করতে ভুলবেন না। (পড়ুন, হিতোপদেশ ১১:১৪.) এমনকী আপনার বাবা-মা যদি সাক্ষি না-ও হয়, তবুও আপনি ‘আপনার পিতাকে ও আপনার মাতাকে সমাদর করিতে’ চান। (যাত্রা. ২০:১২; হিতো. ২৩:২২) এটা ঠিক যে, সব পরিবারই একই সিদ্ধান্ত নেবে না। কেউ কেউ বয়স্ক বাবা অথবা মাকে তাদের সঙ্গে নিয়ে কিংবা তাদের কাছাকাছি বাস করার ব্যবস্থা করে। কিন্তু, সবসময় তা সম্ভব নয়। কিছু বাবা-মা তাদের প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান ও তাদের পরিবারের সঙ্গে বাস করতে চায় না; তারা স্বাধীন থাকতে চায় এবং বোঝা হতে চায় না। কারো কারো হয়তো নিজেদের বাড়িতে থেকেই যত্ন লাভ করার জন্য কাউকে বেতন দেওয়ার মতো টাকাপয়সা দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে আর তারা হয়তো সেটাই চায়।—উপ. ৭:১২.

১৪. মূলত যে-ব্যক্তিরা যত্ন নিয়ে থাকে, তাদের ক্ষেত্রে কোন সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে?

১৪ অনেক পরিবারে হয়তো দেখাশোনার বেশিরভাগ দায়িত্ব সেই ছেলে বা মেয়ের ওপর পড়ে, যিনি বাবা-মায়ের সবচেয়ে নিকটে বাস করেন। কিন্তু, মূলত যিনি যত্ন নেন, তার বাবা-মায়ের চাহিদা ও নিজের পরিবারের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। প্রত্যেকের সময় এবং শক্তির একটা সীমা রয়েছে। আর যিনি যত্ন নেন, তার পরিস্থিতি যেহেতু পরিবর্তিত হতে পারে, তাই বর্তমান ব্যবস্থাগুলো পুনরায় মূল্যায়ন করে দেখার প্রয়োজন হতে পারে। হতে পারে পরিবারের একজন সদস্যকে  কি একসঙ্গে অনেক দায়িত্ব গ্রহণ করতে হচ্ছে? অন্যান্য ছেলে-মেয়ে কি আরেকটু বেশি সাহায্য করতে পারে, হতে পারে পালা পালা করে যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে?

১৫. কীভাবে সেই ব্যক্তির পরিশ্রান্ত হওয়াকে প্রতিরোধ করা যেতে পারে, যিনি যত্ন নিয়ে থাকেন?

১৫ একজন বয়স্ক বাবা অথবা মায়ের যখন নিয়মিত যত্নের প্রয়োজন হয়, তখন যিনি যত্ন নিয়ে থাকেন, তার পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। (উপ. ৪:৬) প্রেমময় সন্তানরা বাবা-মায়ের জন্য তাদের যথাসাধ্য করতে চায় কিন্তু ক্রমাগত বিভিন্ন দাবি পূরণ করতে গিয়ে তারা ভারগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে। যে-ব্যক্তি যত্ন নেন, তিনি যখন এইরকম পরিস্থিতিতে পড়েন, তখন তার বাস্তববাদী হতে হবে, হয়তো সাহায্য চাইতে হবে। নার্সিং হোমের সেবার ওপর অযথা নির্ভর করাকে রোধ করার জন্য কেবল মাঝে মাঝে সাহায্য পাওয়াই যথেষ্ট।

১৬, ১৭. বয়স্ক বাবা-মায়ের যত্ন নিতে গিয়ে সন্তানরা হয়তো কোন সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয় আর কীভাবে তারা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারে? (“উপলব্ধি সহকারে যত্ন নেওয়া” শিরোনামের বাক্সটা দেখুন।)

১৬ প্রিয় বাবা-মায়ের ওপর বার্ধক্যের বেদনাদায়ক প্রভাবগুলো দেখা অনেক কষ্টকর। যত্ন নিয়ে থাকে এমন অনেকে দুঃখ, উদ্‌বিগ্নতা, হতাশা, রাগ ও অপরাধবোধ অনুভব করে এবং এমনকী অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে, বয়স্ক বাবা অথবা মা হয়তো নির্দয় কিছু বলে ফেলে কিংবা কৃতজ্ঞতার অভাব দেখায়। যদি তা-ই হয়, তাহলে সহজেই বিরক্ত হয়ে যাবেন না। একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন: “যেকোনো অনুভূতির সঙ্গে, বিশেষভাবে আপনার কাছে অসহনীয় বলে মনে হয় এমন অনুভূতির সঙ্গে মোকাবিলা করার সর্বোত্তম উপায় হল নিজের কাছে তা স্বীকার করা। সেই অনুভূতিকে উপেক্ষা করা অথবা এর জন্য নিজেকে কঠোরভাবে বিচার করা এড়িয়ে চলুন।” আপনার বিবাহসাথি, পরিবারের অন্য সদস্য অথবা নির্ভরযোগ্য কোনো বন্ধুর কাছে আপনার অনুভূতির কথা খুলে বলুন। এই ধরনের আলোচনা আপনাকে আপনার আবেগগত অনুভূতিকে সঠিকভাবে দেখতে সাহায্য করতে পারে।—যিশা. ৩৫:৩.

১৭ কখনো কখনো এমন সময় আসতে পারে, যখন একটা পরিবারের কাছে কোনো প্রিয়জনকে বাড়িতে রেখে ক্রমাগত যত্ন নেওয়ার মতো টাকাপয়সা অথবা অভিজ্ঞ লোক থাকে না। সেই সময় নার্সিং হোমে ভর্তি করা জরুরি হয়ে পড়ে। একজন খ্রিস্টান বোন প্রায় প্রতিদিন একটা নার্সিং হোমে তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যান। তিনি তার পরিবার সম্বন্ধে বলেন: “মায়ের ২৪ ঘণ্টা যত্নের প্রয়োজন ছিল আর আমরা সেই যত্ন নিতে পারছিলাম না। তাকে নার্সিং হোমে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। এটা খুবই কষ্টকর ছিল। কিন্তু, তার জীবনের শেষ মাসগুলোতে তার জন্য এটাই সবচেয়ে উত্তম সমাধান ছিল আর সে তা মেনে নিয়েছিল।”

১৮. যারা যত্ন নিয়ে থাকে, তারা কোন আশ্বাস পেতে পারে?

১৮ বাবা-মায়েরা যখন বৃদ্ধ হয়ে যায়, তখন তাদের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব জটিল এবং আবেগগতভাবে কষ্টকর হতে পারে। বয়স্ক ব্যক্তিদের যত্ন প্রদান করার নির্দিষ্ট কোনো সমাধান নেই। তবে, বিজ্ঞতার সঙ্গে পরিকল্পনা করা, বিবেচনাপূর্ণ সহযোগিতা করা, উত্তম ভাববিনিময় করা এবং সর্বোপরি আন্তরিক প্রার্থনার মাধ্যমে আপনি আপনার প্রিয়জনদের সমাদর করার দায়িত্বগুলো পালন করতে পারেন। তা করার মাধ্যমে আপনি এই পরিতৃপ্তি লাভ করতে পারেন যে, তারা প্রয়োজনীয় যত্ন এবং মনোযোগ লাভ করছে। (পড়ুন, ১ করিন্থীয় ১৩:৪-৮.) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আপনি এই আশ্বাস পেতে পারেন যে, আপনি মনের শান্তি লাভ করবেন, যা যিহোবা সেই ব্যক্তিদের প্রদান করেন, যারা তাদের বাবা-মাকে সমাদর করে।—ফিলি. ৪:৭.

^ অনু. 3 বাবা-মা এবং সন্তানরা কোন বিষয়টা বেছে নেবে, তা স্থানীয় সংস্কৃতির দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে। কিছু এলাকায় পরিবারের কয়েক প্রজন্ম একত্রে বাস করা অথবা নিয়মিতভাবে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করা খুবই স্বাভাবিক এবং এমনকী কাঙ্ক্ষিত বলেও মনে করা হয়।

^ অনু. 11 আপনার বাবা-মা যদি বাড়িতেই থাকে, তাহলে এই বিষয়টা নিশ্চিত করুন যে, সেবা প্রদানকারী নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের কাছে যেন বাড়ির চাবি থাকে, যেটা দিয়ে তারা জরুরি মুহূর্তে বয়স্ক ব্যক্তিদের বাড়িতে প্রবেশ করতে পারবে।