সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  মার্চ ২০১৪

আপনার কথা কি “‘হাঁ’ আবার ‘না’ হয়”?

আপনার কথা কি “‘হাঁ’ আবার ‘না’ হয়”?

এই দৃশ্যটা বিবেচনা করুন: একজন প্রাচীন, যিনি হসপিটাল লিয়েইজন কমিটি-র একজন সদস্য, তিনি রবিবার সকালে এক অল্পবয়সি ভাইয়ের সঙ্গে ক্ষেত্রের পরিচর্যায় কাজ করার জন্য ব্যবস্থা করেন। সেই দিন সকালে এই প্রাচীন একজন ভাইয়ের কাছ থেকে জরুরি এক ফোন কল পান, যার স্ত্রী সবেমাত্র গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন এবং তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি প্রাচীন ভাইকে এমন একজন ডাক্তার খুঁজে বের করার জন্য সাহায্য করতে বলেন, যিনি রক্ত সংক্রান্ত বিষয়ে সহযোগিতা করবেন। তাই প্রাচীন ভাই সেই অল্পবয়সি ভাইয়ের সঙ্গে ক্ষেত্রের পরিচর্যায় কাজ করার যে-ব্যবস্থা করেন, তা বাতিল করে দেন, যেন তিনি দুর্ঘটনাকবলিত সেই পরিবারকে প্রেমের সঙ্গে সাহায্য করতে পারেন।

আরেকটা দৃশ্য কল্পনা করুন: দুই সন্তানের একজন একক মা তার মণ্ডলীর একটা দম্পতির কাছ থেকে সন্ধ্যায় তাদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য আমন্ত্রণ লাভ করেন। তিনি যখন তার সন্তানদের এই কথা বলেন, তখন তারা অত্যন্ত আনন্দিত হয়। তারা সেই সন্ধ্যার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে। কিন্তু, সেখানে যাওয়ার একদিন আগে সেই দম্পতি মাকে বলে যে, এক অপ্রত্যাশিত বিষয় ঘটায় সেই আমন্ত্রণ বাতিল করতে হবে। পরবর্তী সময়ে তিনি সেই দম্পতির আমন্ত্রণ বাতিল করার কারণটা জানতে পারেন। তাকে আমন্ত্রণ জানানোর পর, সেই দম্পতি কয়েক জন বন্ধুর কাছ থেকে সেই একই সন্ধ্যায় তাদের বাড়িতে যাওয়ার আমন্ত্রণ লাভ করে আর তারা সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে।

খ্রিস্টান হিসেবে আমাদেরকে অবশ্যই আমাদের কথা রাখা উচিত। অর্থাৎ কখনোই আমাদের “‘হাঁ’ আবার ‘না’” হওয়া উচিত নয়। (২ করি. ১:১৮) কিন্তু ওপরের এই দুটো উদাহরণ যেমন দেখায় যে, সমস্ত পরিস্থিতি এক নয়। কখনো কখনো এমন সময় আসতে পারে, যখন একটা ব্যবস্থা বাতিল করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। প্রেরিত পৌল একবার এইরকম একটা পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন।

পৌলকে অস্থিরমনা লোক বলে অভিযোগ করা হয়

৫৫ খ্রিস্টাব্দে পৌল যখন তৃতীয় মিশনারি যাত্রার সময় ইফিষে ছিলেন, তখন তিনি ঈজিয়ান সমুদ্র পার হয়ে প্রথমে করিন্থে এবং এরপর সেখান থেকে মাকিদনিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। যিরূশালেমে ফিরে আসার পথে, তিনি দ্বিতীয় বারের মতো করিন্থীয় মণ্ডলী পরিদর্শন করার পরিকল্পনা করেন আর স্পষ্টতই এর কারণ ছিল যিরূশালেমের ভাইদের জন্য তাদের সদয় দান সংগ্রহ করা। (১ করি. ১৬:৩) ২ করিন্থীয় ১:১৫, ১৬ পদ থেকে এই বিষয়টা স্পষ্ট বোঝা যায়, যেখানে আমরা পড়ি: “এই দৃঢ় বিশ্বাস প্রযুক্ত আমার এই মানস ছিল যে, আমি অগ্রে তোমাদের কাছে যাইব, যেন তোমরা দ্বিতীয় বার অনুগ্রহ প্রাপ্ত হও; আর তোমাদের নিকট দিয়া মাকিদনিয়ায় গমন করিব, পরে মাকিদনিয়া হইতে আবার তোমাদের কাছে যাইব, আর তোমরা আমাকে যিহূদিয়ার পথে আগাইয়া দিয়া আসিবে।”

এটা মনে হয় যে, আগে একটা চিঠিতে পৌল করিন্থের ভাইদেরকে তার পরিকল্পনা সম্বন্ধে জানিয়েছিলেন।  (১ করি. ৫:৯) কিন্তু, সেই চিঠি লেখার কিছু দিন পর, পৌল ক্লোয়ীর পরিবারের মাধ্যমে জানতে পারেন যে, মণ্ডলীতে প্রচণ্ড বিবাদ রয়েছে। (১ করি. ১:১০, ১১) পৌল তার মূল পরিকল্পনা রদবদল করার সিদ্ধান্ত নেন এবং তিনি একটি চিঠি লেখেন, যেটিকে এখন ১ করিন্থীয় বলা হয়। এই চিঠিতে পৌল প্রেমের সঙ্গে পরামর্শ এবং সংশোধন প্রদান করেছেন। এ ছাড়া, তিনি উল্লেখ করেন যে, তিনি তার যাত্রাপথ পরিবর্তন করেছেন, প্রথমে তিনি মাকিদনিয়া এবং পরে করিন্থে যাবেন।—১ করি. ১৬:৫, ৬. *

এমনটা মনে হয় যে, করিন্থের ভাইয়েরা যখন তার চিঠি পেয়েছিল, তখন সেই মণ্ডলীর “প্রেরিত-চূড়ামণিদের” মধ্যে কেউ কেউ তার প্রতিজ্ঞা না রাখার কারণে পৌলকে চঞ্চল বা অস্থিরমনা লোক বলে অভিযোগ করেছিল। আত্মপক্ষ সমর্থন করে পৌল জিজ্ঞেস করেছিলেন: “ভাল, এরূপ মানস করায় কি আমি চাঞ্চল্য প্রকাশ করিয়াছিলাম? অথবা আমি যে সকল মনস্থ করি, সে সকল মনস্থ কি মাংসের মতে করিয়া থাকি যে, আমার কাছে হাঁ হাঁ ও না না, হইবে?”—২ করি. ১:১৭; ১১:৫.

আমরা হয়তো জিজ্ঞেস করতে পারি, এই পরিস্থিতিগুলোতে প্রেরিত পৌল কি সত্যিই ‘চাঞ্চল্য প্রকাশ করিয়াছিলেন,’ এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি নির্ভরযোগ্য নন এবং তার প্রতিজ্ঞা রাখেননি? অবশ্যই না! ‘আমি কি মাংসের মতে মনস্থ করিয়া থাকি?’ পৌলের এই প্রশ্নটা দেখে করিন্থের খ্রিস্টানদের স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল, তার পরিকল্পনা পরিবর্তন করার সিদ্ধান্তের কারণ এই ছিল না যে, তিনি নির্ভরযোগ্য নন।

এই কথা লেখার মাধ্যমে পৌল দৃঢ়ভাবে তাদের মিথ্যা অভিযোগ খণ্ডন করেছিলেন: “বরং ঈশ্বর যেমন বিশ্বাস্য, তেমনি তোমাদের প্রতি আমাদের বাক্য ‘হাঁ’ আবার ‘না’ হয় না।” (২ করি. ১:১৮) নিশ্চিতভাবেই, পৌল যখন তার পরিকল্পনা পরিবর্তন করেছিলেন, তখন তিনি করিন্থের ভাই-বোনদের সর্বোত্তম মঙ্গলের কথা চিন্তা করেই তা করেছিলেন। ২ করিন্থীয় ১:২৩ পদে আমরা পড়ি যে, ‘তাহাদের প্রতি মমতা করাতেই’ তিনি করিন্থে যাওয়ার ব্যাপারে তার মূল পরিকল্পনা পরিবর্তন করেছিলেন। তিনি আসলে তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার আগে সমস্ত কিছু মিটমাট করা জন্য তাদের একটা সুযোগ দিয়েছিলেন। মাকিদনিয়াতে থাকার সময় পৌল তীতের কাছ থেকে জানতে পারেন যে, তিনি যেমনটা আশা করেছেন, সেই অনুযায়ী তার চিঠি সত্যিই তাদেরকে দুঃখিত এবং অনুতপ্ত হতে অনুপ্রাণিত করেছে আর এটা শুনে তিনি অনেক আনন্দিত হয়েছিলেন।—২ করি. ৬:১১; ৭:৫-৭.

যিশুর দ্বারা ঈশ্বরের কাছে “আমেন” বলা হয়

অস্থিরমনা লোক বলে অভিযোগ করা হয়তো এই অর্থ প্রকাশ করেছিল যে, রোজকার জীবনের প্রতিজ্ঞাগুলো রাখার ব্যাপারে পৌলের ওপর যদি নির্ভর করা না যায়, তাহলে প্রচার কাজের ব্যাপারেও তার ওপর নির্ভর করা যেতে পারে না। কিন্তু, পৌল করিন্থীয়দের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি তাদের কাছে যিশু খ্রিস্টকে প্রচার করেছেন। “ঈশ্বরের পুত্র যীশু খ্রীষ্ট, যিনি আমাদের দ্বারা, অর্থাৎ আমার ও সীলের ও তীমথিয়ের দ্বারা তোমাদের নিকটে প্রচারিত হইয়াছেন, তিনি ‘হাঁ’ আবার ‘না’ হন নাই, কিন্তু তাঁহাতেই ‘হাঁ’ হইয়াছে।” (২ করি. ১:১৯) পৌলের আদর্শ যিশু খ্রিস্ট কি কোনো দিক দিয়ে অনির্ভরযোগ্য ছিলেন? না! তাঁর জীবনকালে এবং পরিচর্যার সময়ে যিশু সবসময় সত্য বলেছিলেন। (যোহন ১৪:৬; ১৮:৩৭) যিশুর প্রচারিত সমস্ত কিছু যদি পুরোপুরি সত্য এবং নির্ভরযোগ্য হয়ে থাকে আর পৌলও যদি সেই একই বার্তা প্রচার করে থাকেন, তাহলে পৌলের প্রচারও নির্ভরযোগ্য ছিল।

অবশ্যই, যিহোবা “সত্যের ঈশ্বর।” (গীত. ৩১:৫) এটা আমরা পৌল পরে যা লিখেছেন, তা থেকে দেখতে পারি: “ঈশ্বরের যত প্রতিজ্ঞা, তাঁহাতেই” অর্থাৎ খ্রিস্টের দ্বারা “সে সকলের ‘হাঁ’ হয়।” পৃথিবীতে থাকাকালীন যিশুর অটল বিশ্বস্ততা, যিহোবার প্রতিজ্ঞাগুলো নিয়ে সন্দেহ করার যেকোনো সম্ভাবনাকে দূর করে দেয়। পৌল আরও বলেন: “সে জন্য তাঁহার [যিশুর] দ্বারা ‘আমেন’ও হয়, যেন আমাদের দ্বারা ঈশ্বরের গৌরব হয়।” (২ করি. ১:২০) যিহোবা যত প্রতিজ্ঞা করেন, সেগুলো যে সত্য হবেই, সেই বিষয়ে স্বয়ং যিশুই হলেন নিশ্চয়তা অথবা “আমেন”!

ঠিক যেমন যিহোবা এবং যিশু সবসময় সত্য বলে, তেমনই পৌলের হ্যাঁ কখনো না হতো না। (২ করি. ১:১৯) তিনি অস্থিরমনা লোক ছিলেন না, যিনি “মাংসের মতে” প্রতিজ্ঞা করেন। (২ করি. ১:১৭) এর পরিবর্তে, তিনি  ‘আত্মার বশে চলিতেন।’ (গালা. ৫:১৬) অন্যদের সঙ্গে আচরণ করার সময় তিনি তাদের সর্বোত্তম মঙ্গলের কথাই চিন্তা করতেন। তার হ্যাঁ, হ্যাঁ ছিল!

আপনার হ্যাঁ কি হ্যাঁ হয়?

বর্তমানে, যে-লোকেরা বাইবেলের নীতি অনুযায়ী জীবনযাপন করে না, তাদের জন্য প্রতিজ্ঞা করা এবং এরপর সামান্য সমস্যা দেখা দিলেই অথবা আরও ভালো কোনো সুযোগ পেলেই তা ভেঙে ফেলা খুবই সাধারণ। ব্যাবসার ক্ষেত্রে “হাঁ” সবসময় “হাঁ” হয় না, এমনকী যদিও এর জন্য লিখিত চুক্তি করা হয়ে থাকে। অনেকে বিয়েকে আর দু-জন ব্যক্তির মধ্যে এক চুক্তি, সারাজীবনের প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখে না। এর পরিবর্তে, ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া বিবাহবিচ্ছেদের হার দেখায় যে, অনেকে বিয়েকে এমন এক স্বাভাবিক বন্ধন হিসেবে দেখে, যেটা চাইলেই ভেঙে ফেলা যায়।—২ তীম. ৩:১, ২.

আপনার সম্বন্ধে কী বলা যায়? আপনার হ্যাঁ কি হ্যাঁ হয়? এটা ঠিক যে, এই প্রবন্ধের শুরুতে যেমন বিবেচনা করা হয়েছে, আপনাকে হয়তো কোনো একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করতে হবে আর তা আপনি অস্থিরমনা লোক বলে নয় বরং পরিস্থিতি আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু, একজন খ্রিস্টান হিসেবে আপনি যদি একটা প্রতিজ্ঞা বা প্রতিশ্রুতি করেন, তাহলে তা রাখার জন্য আপনার যথাসাধ্য করা উচিত। (গীত. ১৫:৪; মথি ৫:৩৭) আপনি যদি তা করেন, তাহলে আপনি একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে সুনাম অর্জন করবেন, যিনি তার কথা রাখেন এবং যিনি সবসময় সত্য বলেন। (ইফি. ৪:১৫, ২৫; যাকোব ৫:১২) লোকেরা যখন বুঝতে পারে যে, রোজকার বিষয়গুলোতে আপনার ওপর নির্ভর করা যেতে পারে, তখন তারা হয়তো সেই সময় আপনার কথা শোনার জন্য আরও ইচ্ছুক হবেন, যখন আপনি তাদেরকে ঈশ্বরের রাজ্য সম্বন্ধীয় সত্য জানাবেন। তাই, আসুন আমরা লক্ষ রাখি, যেন আমাদের হ্যাঁ আসলেই হ্যাঁ হয়!

^ অনু. 7 ১ করিন্থীয় চিঠিটি লেখার অল্পসময় পর, পৌল প্রকৃতই ত্রোযা হয়ে মাকিদনিয়ায় যাত্রা করেছিলেন, যেখানে তিনি ২ করিন্থীয় চিঠিটি লিখেছিলেন। (২ করি. ২:১২; ৭:৫) পরে তিনি করিন্থে গিয়েছিলেন।