সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  ফেব্রুয়ারি ২০১৪

 আমাদের আর্কাইভ থেকে

এক-শো বছরের পুরোনো বিশ্বাসের এক মহাকাব্য

এক-শো বছরের পুরোনো বিশ্বাসের এক মহাকাব্য

“মনে হয় যেন ভাই রাসেল জীবন্ত দাঁড়িয়ে কথা বলছেন!”—১৯১৪ সালে “ফটো-ড্রামা”-র একজন দর্শক।

এই বছর “ফটো-ড্রামা অভ্‌ ক্রিয়েশন”-এর প্রথম প্রদর্শনীর ১০০ বছর পূর্ণ হয়েছে আর এই বৃহৎ শিক্ষণ-সহায়কটা ঈশ্বরের বাক্য বাইবেলের প্রতি বিশ্বাস গড়ে তোলার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। বিবর্তনবাদ, সমালোচনা এবং সংশয়বাদ যখন বিশ্বাসকে নষ্ট করে দিচ্ছিল, তখন “ফটো-ড্রামা” যিহোবাকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে তুলে ধরে।

চার্লস টি. রাসেল, যিনি সেই সময় বাইবেল ছাত্রদের মধ্যে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তিনি বাইবেলের সত্যকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সবসময় সবচেয়ে দ্রুত এবং কার্যকরী উপায় খুঁজতেন। বাইবেল ছাত্ররা ইতিমধ্যেই ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ছাপানো বিষয়বস্তু কার্যকরীভাবে ব্যবহার করছিল। কিন্তু এক নতুন সম্ভাবনা তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আর তা হল চলচ্চিত্র।

চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সুসমাচার ছড়িয়ে দেওয়া

১৮৯০-এর দশকে লোকেরা প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্রের সঙ্গে পরিচিত হয়। ১৯০৩ সালের প্রথম দিকে, নিউ ইয়র্ক সিটির একটা গির্জায় এক ধর্মীয় চলচ্চিত্র দেখানো হয়। তাই, ১৯১২ সালের দিকে ভাই রাসেল যখন সাহসের সঙ্গে “ফটো-ড্রামা”-র জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন, তখন চলচ্চিত্রশিল্প বলতে গেলে কেবল জন্ম লাভ করে। তিনি উপলব্ধি করেন যে, যোগাযোগের এই মাধ্যম বাইবেলের সত্যকে এমন উপায়ে প্রকাশ করতে পারবে, যা কিনা শুধু ছাপানো বিষয়বস্তুর দ্বারা প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

আট ঘণ্টার “ফটো-ড্রামা” সাধারণত চারটে ভাগে দেখানো হতো এবং এতে ৯৬টা সংক্ষিপ্ত বাইবেলভিত্তিক বক্তৃতা রেকর্ড করা ছিল। আর এই বক্তৃতাগুলো সেই সময়কার এমন একজন উল্লেখযোগ্য বক্তা তুলে ধরতেন, যার কণ্ঠস্বর চমৎকার ছিল। অনেক দৃশ্যের মধ্যে ক্ল্যাসিকাল মিউজিকও ছিল। দক্ষ ব্যক্তিরা ফোনোগ্রাফের মধ্যে ধারণকৃত স্বর এবং যন্ত্রসংগীত বাজাতেন, লক্ষ রাখতেন যেন রঙিন স্লাইড এবং বাইবেলের সুপরিচিত গল্পগুলো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয় করে তুলে ধরার সময় এর সঙ্গে শব্দের মিল থাকে।

“এর মধ্যে নক্ষত্র সৃষ্টি করার সময় থেকে শুরু করে খ্রিস্টের গৌরবময় হাজার বছরের রাজত্বের চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত সমস্ত ছবি রয়েছে।” —এফ. স্টুয়ার্ট বার্নস্‌, বয়স ১৪, ১৯১৪ সাল

চলচ্চিত্রের অধিকাংশ অংশ-বিশেষ এবং অনেক কাচের স্লাইড বাণিজ্যিক স্টুডিও থেকে আনা হতো। ফিলাডেলফিয়া, নিউ ইয়র্ক,  প্যারিস এবং লন্ডনের পেশাদার চিত্রশিল্পীরা একটা একটা করে কাচের স্লাইডে এবং চলচ্চিত্রে ছবি আঁকত। বেথেলের আর্ট রুমের কর্মীরাও এই কাজে অনেক সাহায্য করত, যে-স্লাইডগুলো ভেঙে যেত, সেগুলোর পরিবর্তে নতুনগুলো তৈরি করত। চলচ্চিত্র কিনে আনা ছাড়াও, বেথেল পরিবারের সদস্যরা কাছেই নিউ ইয়র্কের ইয়নকারসে যখন তারা অব্রাহাম, ইস্‌হাক এবং সেই দূতের ভূমিকায় অভিনয় করে, যিনি অব্রাহামকে তার ছেলেকে আক্ষরিকভাবে বলিদান করায় বাধা দিয়েছিলেন, তখন তা ধারণ করা হয়েছিল।—আদি. ২২:৯-১২.

একেবারে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দক্ষ অপারেটররা একইসঙ্গে ৩.২ কিলোমিটার (দুই মাইল) দীর্ঘ ফিল্ম, রেকর্ডকৃত ২৬টা ফোনোগ্রাফ এবং প্রায় ৫০০টা কাচের স্লাইড উপস্থাপন করত

ভাই রাসেলের একজন সহযোগী সংবাদমাধ্যমকে বলেন যে, “অতীতে ধর্মীয় অগ্রগতির জন্য করা হয়েছে এমন যেকোনো কিছুর চেয়ে” বরং এই মাধ্যম “হাজার হাজার ব্যক্তিকে শাস্ত্রের প্রতি আগ্রহী করে [তুলবে]।” আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো সম্বন্ধে জানতে অত্যন্ত আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছানোর এই অভিনব প্রচেষ্টাকে কি পাদরিরা প্রশংসা করেছিল? এর পরিবর্তে, খ্রিস্টীয়জগতের পরিচারকরা মিলে এই “ফটো-ড্রামা” বর্জন করেছিল, এমনকী কেউ কেউ ধূর্ত অথবা সাহসী কৌশল ব্যবহার করেছিল, যাতে জনগণ সেটা না দেখে। একটা জায়গায়, পরিচারকদের এক দল বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।

স্থানীয় মণ্ডলীর যে-বোনেরা দর্শকদের আসন দেখিয়ে দেওয়ার কাজ করত, তারা “ফটো-ড্রামা”-র দৃশ্য সম্বলিত ছবির লক্ষ লক্ষ কপি বিনামূল্যে প্রদান করেছিল

যারা পরিচারকের কাজ করত, তাদেরকে শিশু যিশুর ছবি সম্বলিত একটা “শান্তিসূচক” পিন দেওয়া হতো। এই পিন এর পরিধানকারীদের “শান্তির পুত্র” হওয়ার বিষয়ে স্মরণ করিয়ে দিত

তা সত্ত্বেও, বিনামূল্যে “ফটো-ড্রামা” দেখার জন্য থিয়েটার দর্শকে পরিপূর্ণ হয়ে যেত। যুক্তরাষ্ট্রে, প্রতিদিন প্রায় ৮০টা শহরে “ফটো-ড্রামা” দেখানো হতো। অনেক দর্শক প্রথম বারের মতো ‘সবাক চলচ্চিত্র’ দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। একটার পর একটা ছবির মাধ্যমে তারা একটা মুরগির বাচ্চাকে ডিম থেকে বেরিয়ে আসতে এবং চমৎকার উপায়ে ফুল ফুটতে দেখেছিল। সেই সময়ের বৈজ্ঞানিক তথ্য যিহোবার অপূর্ব প্রজ্ঞা সম্বন্ধে তুলে ধরেছিল। শুরুতে যেমন বলা হয়েছে, স্ক্ৰিনের মধ্যে ভাই রাসেল যখন “ফটো-ড্রামা”-র সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন একজন দর্শন ভেবেছিলেন, যেন “ভাই রাসেল জীবন্ত দাঁড়িয়ে কথা বলছেন!”

বাইবেল শিক্ষা কার্যক্রমে এক মাইলফলক

১৯১৪ সালের ১১ জানুয়ারি নিউ ইয়র্ক সিটির এই চমৎকার থিয়েটারে প্রথম “ফটো-ড্রামা” দেখানো হয় আর এটা সেই সময় আন্তর্জাতিক বাইবেল ছাত্রসংঘ-এর অধীনে ছিল এবং তারাই এটার দেখাশোনা করত

গ্রন্থকার এবং চলচ্চিত্র বিষয়ক ইতিহাসবিদ টিম ডার্কস্‌ “ফটো-ড্রামা”-কে “এমন প্রথম দীর্ঘ চলচ্চিত্র” বলে বর্ণনা করেছিলেন, “যেটার মধ্যে একইসঙ্গে শব্দ (রেকর্ডকৃত কথা), চলচ্চিত্র এবং রঙিন কাচের স্লাইড ছিল।” “ফটো-ড্রামা”-র আগে যে-চলচ্চিত্রগুলো তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে এইরকম কিছু কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল কিন্তু সবগুলো একসঙ্গে করা হয়নি, বিশেষভাবে বাইবেলভিত্তিক কোনো চলচ্চিত্রে কখনো করা হয়নি। শুধুমাত্র প্রথম বছরেই উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে সব মিলিয়ে প্রায় নব্বই লক্ষ দর্শক ছিল! অন্য আর কোনোটাতেই এত বেশি দর্শক দেখা যায়নি।

১৯১৪ সালের ১১ জানুয়ারি নিউ ইয়র্ক সিটিতে প্রথম “ফটো-ড্রামা” দেখানো হয়েছিল। এর সাত মাস পরেই বিপর্যয় দেখা দেয়, যেটাকে পরে ১ম বিশ্বযুদ্ধ নাম দেওয়া হয়। কিন্তু, সারা বিশ্বের লোকেরা “ফটো-ড্রামা” দেখার জন্য একত্রিত হতেই থাকে এবং ভবিষ্যতে রাজ্য যে-আশীর্বাদগুলো নিয়ে আসবে, সেগুলোর চমৎকার দৃশ্য দেখে সান্ত্বনা লাভ করে। ১৯১৪ সাল অন্য আর যে-কোনো বিষয়ের জন্য উল্লেখযোগ্য হোক না কেন, “ফটো-ড্রামা” সত্যিই সেই বছরের এক উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল।

উত্তর আমেরিকা জুড়ে বিভিন্ন দল কুড়িটা “ফটো-ড্রামা”-র আলাদা আলাদা সেট ব্যবহার করেছিল