সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি দ্বিতীয় মেনুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

যিহোবার সাক্ষিরা

বাংলা

প্রহরীদুর্গ (অধ্যয়ন সংস্করণ)  |  জানুয়ারি ২০১৪

অনন্তকালীন রাজা যিহোবার উপাসনা করুন

অনন্তকালীন রাজা যিহোবার উপাসনা করুন

“যিনি যুগপর্য্যায়ের রাজা, . . . যুগপর্য্যায়ের যুগে যুগে তাঁহারই সমাদর ও মহিমা হউক।”—১ তীম. ১:১৭.

১, ২. (ক) “যুগপর্য্যায়ের রাজা” বা অনন্তকালীন রাজা কে এবং কেন এই উপাধি যথোপযুক্ত? (শুরুতে দেওয়া ছবিটা দেখুন।) (খ) যিহোবার শাসনের কোন দিকটা আমাদেরকে তাঁর নিকটবর্তী করে?

সোয়াজিল্যান্ডের রাজা সোবুজা ২য় প্রায় ৬১ বছর ধরে শাসন করেছিলেন। আধুনিক দিনের একজন শাসকের জন্য সত্যিই এটা এক বিরাট রেকর্ড। কিন্তু, রাজা সোবুজার শাসনের ব্যাপ্তি যত উল্লেখযোগ্য বলেই মনে হোক না কেন, এমন একজন রাজা রয়েছেন, যাঁর শাসনকাল মানুষের মতো সংক্ষিপ্ত আয়ুর দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। আসলে, বাইবেল তাঁকে “যুগপর্য্যায়ের রাজা” বা অনন্তকালীন রাজা হিসেবে উল্লেখ করে। (১ তীম. ১:১৭) এই রাজা সদাপ্রভু যিহোবা ঈশ্বর ছাড়া আর কেউই নন। বাইবেল বলে: “সদাপ্রভু অনন্তকালীন রাজা।”—গীত. ১০:১৬.

ঈশ্বরের রাজত্বের এই ব্যাপ্তিকালের কারণে তাঁর শাসন মানুষের চেয়ে আলাদা। তবে, যে-বিষয়টা আমাদেরকে যিহোবার প্রতি আকৃষ্ট করে, তা হল তাঁর শাসন পদ্ধতি। প্রাচীন ইস্রায়েলে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শাসন করেছেন এমন একজন রাজা এই কথাগুলো বলার মাধ্যমে ঈশ্বরের প্রশংসা করেন: “সদাপ্রভু স্নেহশীল ও কৃপাময়, ক্রোধে ধীর ও দয়াতে মহান। সদাপ্রভু স্বর্গে আপন সিংহাসন স্থাপন করিয়াছেন, তাঁহার রাজ্য কর্ত্তৃত্ব করে সমস্তের উপরে।” (গীত. ১০৩:৮, ১৯) যিহোবা কেবল আমাদের রাজাই নন, কিন্তু সেইসঙ্গে তিনি আমাদের প্রেমময় ও স্বর্গীয় পিতা। এটা দুটো প্রশ্নের উত্থাপন করে: কোন উপায়ে যিহোবা একজন পিতা হিসেবে কাজ করেন? এদনে বিদ্রোহের সময় থেকে কীভাবে যিহোবা শাসন করে আসছেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদেরকে যিহোবার আরও নিকটবর্তী হতে এবং আমাদের সমস্ত হৃদয় দিয়ে তাঁর উপাসনা করতে অনুপ্রাণিত করবে।

 অনন্তকালীন রাজা এক স্বর্গীয় এবং পার্থিব পরিবার গঠন করেন

৩. যিহোবার স্বর্গীয় পরিবারের প্রথম সদস্য কে এবং আর কাদেরকে ঈশ্বরের ‘পুত্ত্র’ হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছিল?

যিহোবা যখন তাঁর একজাত পুত্রকে সৃষ্টি করেছিলেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই কত আনন্দিতই-না হয়েছিলেন! ঈশ্বর তাঁর প্রথমজাত পুত্রকে একজন নগণ্য ব্যক্তি হিসেবে দেখেননি। বরং, তিনি তাঁকে একজন পুত্র হিসেবে ভালোবেসেছিলেন এবং অন্যান্য সিদ্ধ প্রাণীদের সৃষ্টি করার যে-আনন্দজনক কাজ, তাতে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। (কল. ১:১৫-১৭) এরা হল অযুত অযুত স্বর্গদূত। স্বর্গদূতদেরকে “তাঁহার পরিচারক, তাঁহার অভিমত-সাধক” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে আর তারা আনন্দের সঙ্গে ঈশ্বরের সেবা করে এবং যিহোবা তাদেরকে তাঁর “পুত্ত্রগণ” বলে অভিহিত করে মর্যাদা দেন। তারা যিহোবার স্বর্গীয় পরিবারের অংশ।—গীত. ১০৩:২০-২২; ইয়োব ৩৮:৭.

৪. ঈশ্বরের পরিবারের মধ্যে কীভাবে মানুষ যুক্ত হয়েছিল?

স্বর্গ এবং পৃথিবী সৃষ্টি করার পর যিহোবা তাঁর পরিবারকে আরও বড়ো করেছিলেন। পৃথিবীকে এক চমৎকার বাড়ি হিসেবে প্রস্তুত করার পর, যিহোবা প্রথম মানুষ আদমকে নিজ প্রতিমূর্তিতে সৃষ্টি করেছিলেন। (আদি. ১:২৬-২৮) সৃষ্টিকর্তা হিসেবে যিহোবা উপযুক্তভাবেই চেয়েছিলেন যেন আদম তাঁর বাধ্য থাকে। আর পিতা হিসেবে যিহোবা প্রেমের সঙ্গে এবং সদয়ভাবে তাঁর সমস্ত নির্দেশনা সম্বন্ধে জানিয়েছিলেন। তবে, সেই নির্দেশনাগুলো কোনোভাবেই মানুষের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অযথা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।—পড়ুন, আদিপুস্তক ২:১৫-১৭.

৫. ঈশ্বর তাঁর মানব সন্তানদের দ্বারা পৃথিবী পূর্ণ করার জন্য কোন ব্যবস্থা করেন?

অনেক মানব শাসকের বিপরীতে, যিহোবা তাঁর প্রজাদের দায়িত্ব প্রদান করে আনন্দিত হন এবং তাদেরকে তাঁর পরিবারের নির্ভরযোগ্য সদস্য হিসেবে দেখেন। উদাহরণ স্বরূপ, তিনি আদমকে অন্যান্য জীবিত প্রাণীর ওপর কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা দেন, এমনকী তাকে পশুপাখিদের নামকরণ করার মতো উপভোগ্য এবং কঠিন কাজ প্রদান করেন। (আদি. ১:২৬; ২:১৯, ২০) পৃথিবী পরিপূর্ণ করার জন্য ঈশ্বর লক্ষ লক্ষ সিদ্ধ মানুষকে সৃষ্টি করেননি। এর পরিবর্তে, আদমের জন্য তিনি এক সিদ্ধ পরিপূরক সৃষ্টি করেছিলেন আর সে হল হবা। (আদি. ২:২১, ২২) এরপর, এই দম্পতিকে তিনি তাদের সন্তানসন্ততি দিয়ে পৃথিবী পরিপূর্ণ করার সুযোগ দিয়েছিলেন। নিখুঁত অবস্থার মধ্যে মানুষ ধীরে ধীরে পুরো পৃথিবী পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত পরমদেশের সীমানা বৃদ্ধি করতে পারত। স্বর্গদূতদের সঙ্গে মিলে তারা যিহোবার পরিবারের অংশ হিসেবে চিরকাল তাঁর উপাসনা করতে পারত। কী অপূর্ব এক প্রত্যাশা! আর যিহোবা কত চমৎকারভাবেই-না তাঁর পিতৃসুলভ প্রেম দেখান!

বিদ্রোহী পুত্ররা ঈশ্বরের শাসনকে প্রত্যাখ্যান করে

৬. (ক) ঈশ্বরের পরিবারে কীভাবে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল? (খ) কেন বিদ্রোহের অর্থ এই ছিল না যে, যিহোবা তাঁর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন?

দুঃখের বিষয় হল, আদম ও হবা যিহোবাকে তাদের শাসক হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট ছিল না। এর পরিবর্তে, তারা ঈশ্বরের একজন বিদ্রোহী আত্মিক পুত্র শয়তানকে অনুসরণ করা বেছে নিয়েছিল। (আদি. ৩:১-৬) ঈশ্বরের শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা নিজেদের ও তাদের বংশধরের জন্য বেদনা, কষ্ট এবং মৃত্যু নিয়ে এসেছিল। (আদি. ৩:১৬-১৯; রোমীয় ৫:১২) সেই সময় পৃথিবীতে ঈশ্বরের আর কোনো বাধ্য প্রজা ছিল না। এর অর্থ কি এই ছিল যে, তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন এবং পৃথিবী ও এর অধিবাসীদের ওপর তাঁর শাসন পরিত্যাগ করেছেন? একেবারেই না! প্রথম মানব-মানবীকে এদন বাগান থেকে বের করে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি তাঁর কর্তৃত্ব ব্যবহার করেছিলেন এবং তারা যাতে আর ফিরে আসতে না পারে, সেইজন্য বাগানের প্রবেশপথে পাহারা দেওয়ার জন্য করূবদের নিযুক্ত করেছিলেন। (আদি. ৩:২৩, ২৪) একই সময়ে ঈশ্বর তাঁর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের বিষয়টা নিশ্চিত করার মাধ্যমে পিতৃসুলভ প্রেমও দেখিয়েছিলেন। আর এই উদ্দেশ্য হল বিশ্বস্ত আত্মিক পুত্র ও মানব সন্তানদের নিয়ে একটা পরিবার গঠন করা। তিনি একজন ‘বংশ’ সম্বন্ধে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যিনি শয়তানকে শেষ করবেন এবং আদমের পাপের প্রভাবগুলো দূর করে দেবেন।—পড়ুন, আদিপুস্তক ৩:১৫.

৭, ৮. (ক) নোহের সময়ে পরিস্থিতি কতটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল? (খ) পৃথিবীকে পরিষ্কার করার এবং মানব পরিবারকে রক্ষা করার জন্য যিহোবা কোন ব্যবস্থা করেছিলেন?

 এর পরের শতাব্দীগুলোতে, কিছু ব্যক্তি যিহোবার প্রতি অনুগত থাকা বেছে নিয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিল হেবল ও হনোক। কিন্তু, অধিকাংশ মানুষই যিহোবাকে তাদের পিতা এবং রাজা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। নোহের সময়ে পৃথিবী “দৌরাত্ম্যে পরিপূর্ণ” হয়ে গিয়েছিল। (আদি. ৬:১১) এর অর্থ কি এই ছিল যে, পৃথিবীর ওপর যিহোবার আর নিয়ন্ত্রণ নেই? ইতিহাস এই সম্বন্ধে কী জানায়?

নোহের বিবরণ বিবেচনা করুন। যিহোবা নোহকে এক বিরাট জাহাজ তৈরি করার বিস্তারিত নকশা এবং নির্দেশনা দিয়েছিলেন, যেটা নোহ ও তার পরিবারকে রক্ষা করবে। এ ছাড়া, নোহকে “ধার্ম্মিকতার প্রচারক” হওয়ার আজ্ঞা দেওয়ার মাধ্যমেও যিহোবা তাঁর পুরো মানব পরিবারের প্রতি মহৎ প্রেম দেখিয়েছিলেন। (২ পিতর ২:৫) নিঃসন্দেহে নোহ লোকেদেরকে অনুতপ্ত হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং আসন্ন ধবংস সম্বন্ধে সাবধান করেছিলেন, তবে কেউই এতে কান দেয়নি। বহু বছর ধরে, নোহ ও তার পরিবার দৌরাত্ম্যপূর্ণ এবং চরম অনৈতিক এক জগতের মধ্যে বাস করেছিল। একজন যত্নশীল পিতা হিসেবে যিহোবা সেই আট জন অনুগত ব্যক্তিকে সুরক্ষা করেছিলেন এবং আশীর্বাদ করেছিলেন। পৃথিবীব্যাপী জলপ্লাবন নিয়ে আসার মাধ্যমে যিহোবা বিদ্রোহী মানুষ এবং দুষ্ট দূতদের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব ব্যবহার করেছিলেন। হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই যিহোবার হাতে নিয়ন্ত্রণ ছিল।—আদি. ৭:১৭-২৪.

যিহোবা সবসময়ই শাসন করছেন (৬, ৮, ১০, ১২, ১৭ অনুচ্ছেদ দেখুন)

জলপ্লাবনের পর যিহোবার শাসন

৯. জলপ্লাবনের পর যিহোবা মানবজাতিকে কোন সুযোগ দিয়েছিলেন?

নোহ ও তার পরিবার যখন জাহাজ থেকে বের হয়ে আসে, তখন নিশ্চিতভাবেই যিহোবার যত্ন এবং সুরক্ষার জন্য তারা তাঁর প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হয়। সঙ্গেসঙ্গে নোহ একটা বেদি নির্মাণ করেন এবং যিহোবাকে উপাসনা করার জন্য বলি উৎসর্গ করেন। ঈশ্বর নোহ ও তার পরিবারকে আশীর্বাদ করেন এবং তাদেরকে এই নির্দেশনা দেন, “তোমরা প্রজাবন্ত ও বহুবংশ হও, পৃথিবী পরিপূর্ণ কর।” (আদি. ৮:২০–৯:১) আবারও, মানবজাতি একতাবদ্ধভাবে উপাসনা করার এবং পৃথিবী পরিপূর্ণ করার সুযোগ লাভ করে।

১০. (ক) জলপ্লাবনের পর কোথায় এবং কীভাবে যিহোবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল? (খ) যিহোবা তাঁর ইচ্ছা সম্পাদন করার বিষয়টা নিশ্চিত করার জন্য কোন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন?

১০ তবে, জলপ্লাবন অসিদ্ধতাকে দূর করে দেয়নি আর তখনও মানুষকে শয়তান এবং বিদ্রোহী দূতদের অদৃশ্য প্রভাবের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছিল। শীঘ্র, যিহোবার প্রেমময় শাসনের বিরুদ্ধে আবার বিদ্রোহ দেখা দেয়। উদাহরণ স্বরূপ, নোহের প্রপৌত্র নিম্রোদ আরও তীব্রভাবে যিহোবার শাসনের বিরোধিতা করেন। নিম্রোদকে “সদাপ্রভুর সাক্ষাতে পরাক্রান্ত ব্যাধ” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি বাবিলের মতো বড়ো বড়ো নগর তৈরি করেন এবং নিজেকে “শিনিয়র দেশে” একজন রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। (আদি. ১০:৮-১২) অনন্তকালীন রাজা এই বিদ্রোহী রাজার বিরুদ্ধে ও সেইসঙ্গে “পৃথিবী পরিপূর্ণ” করার বিষয়ে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করার জন্য তিনি যে-প্রচেষ্টা করেন, সেটার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেন? ঈশ্বর লোকেদের মধ্যে ভাষার ভেদ সৃষ্টি করেন আর এর ফলে নিম্রোদের প্রজারা বিরক্ত হয়ে “সমস্ত ভূমণ্ডলে” ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। তারা যেখানেই যায়, সেখানেই নিজেদের মিথ্যা উপাসনা এবং মানব শাসন পদ্ধতি অনুসরণ করে।—আদি. ১১:১-৯.

১১. কীভাবে যিহোবা দেখিয়েছিলেন যে, তিনি তাঁর বন্ধু অব্রাহামের প্রতি অনুগত?

১১ জলপ্লাবনের পর যদিও অনেকে মিথ্যা দেবতাদের উপাসনা করত কিন্তু তখনও কিছু বিশ্বস্ত ব্যক্তি যিহোবাকে সম্মান করে চলে। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন অব্রাহাম। ঊর নগরে তার আরামদায়ক জীবন ছিল কিন্তু যিহোবার বাধ্য হয়ে তিনি সেই নগর ত্যাগ করেন এবং অনেক বছর ধরে তাঁবুতে বাস করেন। (আদি. ১১:৩১; ইব্রীয় ১১:৮, ৯) অব্রাহাম যাযাবরের মতো জীবন কাটাতেন আর অন্যদিকে তার চারপাশে অনেক রাজা প্রাচীরবেষ্টিত নগরে বাস করত। কিন্তু, যিহোবা অব্রাহাম ও তার পরিবারকে সুরক্ষা করেন। যিহোবার পিতৃসুলভ সুরক্ষা সম্বন্ধে একজন  গীতরচক এই ঘোষণা করেছিলেন: “[ঈশ্বর] কোন মনুষ্যকে তাহাদের প্রতি উপদ্রব করিতে দিতেন না, বরং তাহাদের জন্য রাজগণকে অনুযোগ করিতেন।” (গীত. ১০৫:১৩, ১৪) যেহেতু যিহোবা তাঁর বন্ধুর প্রতি অনুগত ছিলেন, তাই তিনি অব্রাহামের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন: “রাজারা তোমা হইতে উৎপন্ন হইবে।”—আদি. ১৭:৬; যাকোব ২:২৩.

১২. কীভাবে যিহোবা মিশরের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব প্রকাশ করেছিলেন এবং এটা কীভাবে তাঁর মনোনীত লোকেদের সাহায্য করেছিল?

১২ অব্রাহামের ছেলে ইস্‌হাক এবং নাতি যাকোবের কাছে ঈশ্বর আবারও তাদেরকে আশীর্বাদ করার প্রতিজ্ঞা করেন এবং বলেন যে, তাদের বংশধরের মধ্যে থেকে তিনি রাজাদের উৎপন্ন করবেন। (আদি. ২৬:৩-৫; ৩৫:১১) তবে, রাজা হওয়ার আগে যাকোবের বংশধররা মিশরে দাস হয়ে পড়ে। এর অর্থ কি এই ছিল যে, যিহোবা তাঁর প্রতিজ্ঞা পরিপূর্ণ করবেন না অথবা পৃথিবীর ওপর তিনি তাঁর শাসন পরিত্যাগ করেছেন? কখনোই না! যিহোবা তাঁর নিরূপিত সময়ে তাঁর ঐশিক ক্ষমতা প্রদর্শন করেন এবং একগুঁয়ে ফরৌণের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব প্রকাশ করেন। দাসত্বে থাকা ইস্রায়েলীয়রা যিহোবার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে আর তিনি তাদেরকে এক চমৎকার উপায়ে সূফসাগরের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় উদ্ধার করেন। স্পষ্টতই, যিহোবা তখনও নিখিলবিশ্বের শাসক ছিলেন আর একজন যত্নশীল পিতা হিসেবে তিনি তাঁর লোকেদের রক্ষা করার জন্য তাঁর মহৎ ক্ষমতা ব্যবহার করেন।—পড়ুন, যাত্রাপুস্তক ১৪:১৩, ১৪.

যিহোবা ইস্রায়েলে রাজত্ব করেন

১৩, ১৪. (ক) ইস্রায়েলীয়রা প্রশংসা গীত গাওয়ার সময়, যিহোবার রাজত্ব সম্বন্ধে কোন বিষয় ঘোষণা করেছিল? (খ) দায়ূদের রাজত্ব সম্বন্ধে ঈশ্বর কী প্রতিজ্ঞা করেছিলেন?

১৩ মিশর থেকে অলৌকিকভাবে উদ্ধার পাওয়ার পর পরই, ইস্রায়েলীয়রা যিহোবার প্রশংসা করার জন্য একটা বিজয় সংগীত গায়। সেই গান যাত্রাপুস্তক ১৫ অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ১৮ পদ বলে: “সদাপ্রভু যুগে যুগে অনন্তকাল রাজত্ব করিবেন।” বস্তুতপক্ষে, যিহোবা সেই নতুন জাতির ওপর রাজত্ব করছিলেন। কিন্তু, লোকেরা যিহোবাকে তাদের অদৃশ্য শাসক হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট ছিল না। মিশর ছেড়ে চলে আসার প্রায় ৪০০ বছর পর, তারা ঈশ্বরের কাছে তাদের চারপাশের পৌত্তলিক জাতিদের মতো একজন মানব রাজা চায়। (১ শমূ. ৮:৫) তা সত্ত্বেও, যিহোবা তখনও তাদের রাজা ছিলেন আর এই বিষয়টা ইস্রায়েলের দ্বিতীয় মানব রাজা দায়ূদের রাজত্বের সময় স্পষ্ট হয়েছিল।

১৪ দায়ূদ পবিত্র নিয়ম সিন্দুক যিরূশালেমে নিয়ে আসেন। এই আনন্দপূর্ণ মুহূর্তে, লেবীয়রা একটা প্রশংসা  গীত গায়। এই গীতে এক উল্লেখযোগ্য বিবৃতি রয়েছে, যা ১ বংশাবলি ১৬:৩১ পদে পাওয়া যায়: “লোকে জাতিগণের মধ্যে বলুক, সদাপ্রভু রাজত্ব করিতেছেন।” যিহোবা এই অর্থে রাজত্ব করেন যে, তিনি তাঁর কর্তৃত্ব ব্যবহার করেন অথবা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিংবা কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে তাঁকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য কাউকে নিযুক্ত করেন। যিহোবা যে এভাবে রাজত্ব করেন, তা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়ূদ মারা যাওয়ার আগে, যিহোবা তার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তার রাজত্ব চিরকাল থাকবে: “আমি তোমার পরে তোমার বংশকে, যে তোমার ঔরসে জন্মিবে তাহাকে স্থাপন করিব, এবং তাহার রাজ্য সুস্থির করিব।” (২ শমূ. ৭:১২, ১৩) এই প্রতিজ্ঞা সেই সময় সত্য হয়েছিল, যখন দায়ূদের এই ‘বংশ’ ১০০০ বছরেরও বেশি সময় পরে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি কে ছিলেন এবং তিনি কখন রাজা হয়েছিলেন?

যিহোবা একজন নতুন রাজাকে নিযুক্ত করেন

১৫, ১৬. কখন যিশুকে ভাবী রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়েছিল এবং পৃথিবীতে থাকার সময় তাঁর শাসন সম্বন্ধে যিশু কোন ব্যবস্থা করেছিলেন?

১৫ উনত্রিশ খ্রিস্টাব্দে, যোহন বাপ্তাইজক এই বলে প্রচার করতে শুরু করেন যে, “স্বর্গ-রাজ্য সন্নিকট হইল।” (মথি ৩:২) যিশু যখন যোহনের কাছে বাপ্তিস্ম নেন, তখন যিহোবা যিশুকে প্রতিজ্ঞাত মশীহ এবং ঈশ্বরের রাজ্যের ভাবী রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করেন। যিহোবা এই বলে যিশুর প্রতি তাঁর পিতৃসুলভ স্নেহ প্রকাশ করেন: “ইনিই আমার প্রিয় পুত্ত্র, ইঁহাতেই আমি প্রীত।”—মথি ৩:১৭.

১৬ পৃথিবীতে পরিচর্যার সময়, যিশু তাঁর পিতাকে মহিমান্বিত করেন। (যোহন ১৭:৪) আর তিনি তা ঈশ্বরের রাজ্য সম্বন্ধে প্রচার করার মাধ্যমে করেন। (লূক ৪:৪৩) তিনি এমনকী তাঁর অনুসারীদের সেই রাজ্য আসার বিষয়ে প্রার্থনা করতে শেখান। (মথি ৬:১০) আর তাই সেই রাজ্যের নিযুক্ত রাজা হিসেবে যিশু তাঁর বিরোধীদের বলতে পেরেছিলেন: “ঈশ্বরের রাজ্য তোমাদের মধ্যেই আছে।” (লূক ১৭:২১) পরে, তাঁর মৃত্যুর আগে সন্ধ্যা বেলায় যিশু তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে এক রাজ্যের বিষয়ে একটা প্রতিজ্ঞা করেন। এভাবে তিনি তাঁর কয়েক জন বিশ্বস্ত শিষ্যকে তাঁর সঙ্গে ঈশ্বরের রাজ্যের রাজা হওয়ার প্রত্যাশা প্রদান করেন।—পড়ুন, লূক ২২:২৮-৩০.

১৭. তেত্রিশ খ্রিস্টাব্দে যিশু শুধু কাদের ওপর শাসন করতে শুরু করেছিলেন কিন্তু তাঁকে কীসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল?

১৭ ঈশ্বরের রাজ্যের রাজা হিসেবে যিশু কখন শাসন করতে শুরু করেন? সঙ্গেসঙ্গে তিনি তা শুরু করতে পারেননি। পরের দিন দুপুর বেলা যিশুকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তাঁর অনুসারীরা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। (যোহন ১৬:৩২) কিন্তু, অতীতের মতো সেই সময়ও যিহোবার হাতে নিয়ন্ত্রণ ছিল। তৃতীয় দিনে, তিনি তাঁর পুত্রকে পুনরুত্থিত করেন এবং ৩৩ খ্রিস্টাব্দের পঞ্চাশত্তমীর দিনে যিশু খ্রিস্টীয় মণ্ডলীর ওপর শাসন করতে শুরু করেন। (কল. ১:১৩) তা সত্ত্বেও, প্রতিজ্ঞাত ‘বংশ’ হিসেবে পৃথিবীর ওপর পূর্ণরূপে শাসন করার জন্য যিশুকে অপেক্ষা করতে হয়। যিহোবা তাঁর পুত্রকে বলেন: “তুমি আমার দক্ষিণে বস, যাবৎ আমি তোমার শত্রুগণকে তোমার পাদপীঠ না করি।”—গীত. ১১০:১.

অনন্তকালীন রাজার উপাসনা করুন

১৮, ১৯. আমরা কী করার জন্য অনুপ্রাণিত হই এবং পরবর্তী প্রবন্ধে আমরা কী শিখব?

১৮ হাজার হাজার বছর ধরে স্বর্গে এবং পৃথিবীতে যিহোবার শাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। যিহোবা কখনো তাঁর শাসন পরিত্যাগ করেননি; সবসময়ই তাঁর হাতে নিয়ন্ত্রণ ছিল। একজন প্রেমময় পিতা হিসেবে তিনি নোহ, অব্রাহাম এবং দায়ূদের মতো অনুগত প্রজাদের সুরক্ষা করেন এবং যত্ন নেন। এটা কি আমাদেরকে আমাদের রাজার প্রতি বশীভূত হতে এবং তাঁর আরও নিকটবর্তী হতে অনুপ্রাণিত করে না?

১৯ কিন্তু, আমরা হয়তো জিজ্ঞেস করতে পারি: আমাদের দিনে যিহোবা কোন অর্থে রাজত্ব করেন? কীভাবে আমরা যিহোবার রাজ্যের অনুগত প্রজা এবং তাঁর স্বর্গীয় অথবা পার্থিব পরিবারের সিদ্ধ সন্তান হতে পারি? আমরা যখন ঈশ্বরের রাজ্য আসার জন্য প্রার্থনা করি, তখন এর অর্থ আসলে কী? পরবর্তী প্রবন্ধে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া হবে।